আজান


আজান নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাইনা। তার কারন এই নয়, যে আমি সোনু নিগম নই, আর কিছু বলে পরে তার প্রায়াশ্চিত্য করার জন্যে মাথা ন্যাড়া করতে হবে। আমি সাধারন মানুষ, ফেইজবুকিং করে আমার মত কিছু মানবসন্তানের সাথে বেকার সময় কাটাই। তার পরেও, আজান, নামাজ, হজ, জাকাত, কালেমা ইত্যাদি নিয়ে কিছু সোজাসাপ্টা কথা বলায় আমার পাঁচহাজার বন্ধুসহ দশ বছরের পুরাতন একটা একাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। সেইসাথে ধর্ম-কর্ম ছাড়াই প্রচুর আধ্যাত্মিক, ইহজাগতিক এবং পারলৌকিক গুরুত্বপূর্ন বিষয় সংক্রান্ত কিছু গভীর চিন্তাভাবনা আর উদ্বেগের কথাবার্তাও হারিয়ে গেছে, সম্ভবত চিরতরে। আমি নতুন একাউন্ট খোলা নিয়ে চিন্তিত না। লেখা হারানোর ভয়ও আর পাইনা। তার পরও কিছু বলার চিন্তা করলেই মনে হয়, “আজান হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সঙ্গীতময় প্রার্থনার আহ্বান।” – এর বাইরে কিছু বললেই অনেক মানুষের মাথা গরম হয়ে যায়।

সত্যি বলতে কি, আমি আজান ব্যাপারটাকে অপছন্দ করিনা। বিশেষ করে, যেহেতু আমি খুব সকাল সকাল ঘুমাই, আর খুব ভোরে বিছানা ছাড়ি, আজানের ধ্বনি আমার ঘুম ভাঙার খুব ভালো একটা এলার্মের কাজ করে। কিন্তু যাদের ঘুম পাতলা আর এতো সকালে উঠতে চাননা, তাদের অনেকেই নাকি আজানের শব্দে খুব বিরক্ত হন। বিরক্তির কারন কিছুটা আছে বটে। কারন, খুব ভোরবেলা, ঢাকার মত শহরে যে কোন জায়গায় আশেপাশের কমসেকম সাতচল্লিশটা মসজিদের আজান শুনে, এর মধ্যে ধ্বনি মাধুর্যের ব্যাপারটা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। একেক মসজিদের আজানের ধ্বনি একেক রকম। কোথাও একজন বৃদ্ধ তার গুরুগম্ভীর, ক্যানকেনে, কর্কশ, রাগী, করুন, সুরেলা বা বেসুরে গলায়, কিংবা কোথাও জান পপ্রান ছেড়ে দিয়ে খোদ মক্কা বা মদিনার কোন মোয়াজ্জিনের রেকর্ড করা গলায় যখন আজানের ধ্বনি ধ্বনিত হয়, তখন আসলে আলাদা করে কোন কন্ঠ বা ধ্বনি অনুসরন করা সম্ভব না। আসেপাশের কার প্রার্থনার আহবানে সাড়া দিলে মোয়াজ্জিনটির রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ ইত্যাদি দূর করা যাবে কিনা, বা কোন মোয়াজ্জিনটির আহবান সত্যিকার অর্থেই হৃদয় বিদারক, তা শুনে ভেবে বের করা খুবই কঠিন কাজ। তাই আলাদা করে কাউকে খুশী করার চেষ্টা চিন্তা বাদ দিয়ে আজানের ধ্বনিটিকে আমি এলার্মের বিকল্প হিসেবেই মনে করি, এর বেশী কিছুনা।

আজানের সময় আরবী ভাষায় যে কথাগুলি বলা হয়, তার মানে অনেকেই জানেন, অনেকেই জানেন না, কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই কিন্তু আমার মতোই, এক কান দিয়ে শুনে আরেক কানও দিয়ে বের করে দেন। আর আমি কিন্তু বুঝে শুনেই আজানের আহ্বান অগ্রাহ্য করি।

আজানের বিষয়টা আমার কাছে আগাগোড়াই একটা অযোক্তিক কথাবার্তা আর ধ্বনি আহবানে পরিপূর্ন, প্রশ্ন এবং প্রতিবাদযোগ্য বিষয় বলেই মনে হয়। কারনটা হচ্ছে, আজানের সময় উচ্চারিত বাক্যগুলির প্রত্যেকটাই আমার কাছে প্রশ্নবোধক। একটা একটা করে আসছি সেবিষয়ে –

প্রথমেই বলা হয়, আল্লাহু আকবার, অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ সর্বশ্রেষ্ঠ। এর মানে হতে পারে অনেক কিছুই আছে যেগুলি ভালো বা শ্রেষ্ঠ, আর তাদের মধ্যে আল্লাহ্‌ হচ্ছে, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। এখানে আল্লাহতালার সাথে আরো অনেক কিছুর তুলনা করে তাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষনা করা হচ্ছে। আমার কিন্তু মনে হয়, আল্লাহতালা এতো বিরাট এবং শ্রেষ্ঠ জে তার সাথে কোনকিছুর তুলনা করতে যাওয়াটাই এক ধরনের শিরক। তিনি প্রকৃতপক্ষে, অতুলনীয়, বা তুলনাহীন।

এরপরে বলা হয়, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কোন উপাসনাযোগ্য কেউ নাই। কথা হচ্ছে, আমাদের নবিজী নিজে ছাড়া আর কেউ আল্লাহতালাকে দেখেছে, বা তার সম্পর্কে মোটামুটি ভালো জানে, এমন মানুষ আর একজনও নাই। কাজেই, সেসম্পরকে একেবারে প্রত্যক্ষ্য সাক্ষী হিসেবে কেউ যদি আল্লাহর উপাসনার উপযোগীতার ঘোষনা দেয়, সেটা আসলে একধরনের সাজানো আর বানোয়াট সাক্ষ্য দেয়া, আর সাধারন আদালতে, এধরনের সাক্ষ্য আমলযোগ্য হওয়ার কথা না।

তারপর আবার সাক্ষ্য দেয়া হয়, মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর প্রেরীত রসুল, বা বার্তাবাহক। এই সাক্ষ্যটি দিতে পারেন শুধু তারাই, যারা নবীজীকে ব্যাকতিগতভাবে চিনতেন, জানতেন তারাই। তাকে চেনেনা, দেখেনি, এরকম কেউ তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে, সেটা হাস্যকর বিষয়। শুধু যদি বলা হত, মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর প্রেরিত রসুল, তাতেও আমার গভীর আপত্তি আছে। কারন, রসুল টাইপের মানুষ চারজন। এর মধ্যে নবীজী একজন। তিনি যে রসুল ছিলেন, সেটাও কিন্তু অন্য কোন মানুষ তার জীবদ্দশাতেও শিওর হতে পারেননি। প্রচুর মানুষ সন্দেহ করতেন, নবীজী তার নিজের মনের কথাই আল্লাহর অহী হিসেবে চালিয়ে দিতেন। তাছাড়া, তিনি নিজে ছাড়া আর কোন মানুষই জীবরাইল নামের একজন বার্তা বাহককে আল্লাহর বানী নিয়ে আসা যাওয়া করতে দেখেনি। কাজেই, এরকম সন্দেহজনক একটা বিষয়ে, আজকের দিনে দাড়িয়ে একেবারে মাইক মেরে সাক্ষী দেয়াটা আমার কাছে একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়।

এরপর ফজরের আজানে স্পেশালী বলা হয়, ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম। এই কথাটাও ভিত্তিহীন। কোনপ্রকার মেডিক্যাল বা সাইকোলজিক্যাল গবেষনায় প্রমান করা যায়নি যে, শারিরীক বা মানসিক উপকারিতার ব্যাপারে ঘুমের চেয়ে নামাজ কোনভাবে ভালো কিনা। কেউ কেউ বলেন, নামাজের মাধ্যমে ব্যায়াম হয়, অজুর কারনে শরীর পরিষ্কার থাকে। তাদের জন্যে বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে, হাতপা ধুয়ে তাহলে আপনার শারিরীক বা মানসিক সুবিধা আর প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট মাত্রার ষ্ট্রেচিং, বুকডন, উঠবস, এরোবিকস, এমনকি যোগ ব্যায়াম করেন, নিঃসন্দেহে আরো অনেক বেশী উপকার পাবেন, টু দ্যা পয়েন্ট কাজ হবে। মাঝখান থেকে অর্থ না বুঝে কিছু আরবী গদ্য বা পদ্য ঝাড়া মুখস্ত বলার হাত থেকে রেহাই পাবেন। কারন, অর্থ না বুঝে কোরানের সুরা পড়ার চেয়ে হাট্টিমাটিম টিম, আগডূম বাগডুম বা ঐ দেখা যায় তালগাছ – ইত্যাদি ছড়া পড়ার উপকারিতা, আমার হিসাবে, বেশী।

এরপর বলা হয়, সালাত বা নামাজের জন্যে এসো। এই সালাত বা নামাজের জন্যে আসাটাই মূল কথা। নামাজের টাইম হয়েছে, চলে আসেন – বলার পর দেশী বিদেশী অন্য কোন ভাষায় আগে পিছে আর কিছুই বলার দরকার ছিলনা। সেটাই ইনিয়ে বিনিয়ে বলা হয় আর কি। কিন্তু সেই নামাজ আসলে কোন তরিকা বা পদ্ধতিতে পড়তে হবে, সেবিষয়ে কোন নির্দিষ্ট রীতি নেই। মুহাম্মদ (সঃ) যেরকম আদি ও আসল পদ্ধতিতে নামাজ নামাজ পড়ার নির্দেশ এবং পদ্ধতি নিয়ে এসেছিলেন, মেরাজ নামের আরেক গাজাখোরী রূপকথার মাধ্যমে, সেইসব ফরজ মানাজের আগে পিছে তিনি নিজেই কোন এক কারনে নানা ধরনের অতিরিক্ত নামাজ পড়া শুরু করলেন, যার নাম সুন্নত। তিনি নাকি মেরাজে গিয়ে আল্লাহর দেয়া পাচশ ওয়াক্ত নামাজের নির্দেশ দরকষাকশি করে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে এসেছিলেন। তাহলে, নানান সুন্নত নামাজ পড়তে শুরু করে মানাজের পরিমান আবার বাড়ালেন কেন, সে এক রহস্য। নামাজ বা সালাতের তরিকাও পরে খলিফা আবূবকর কিছুটা আধুকায়ন করলেন। আগের সুন্নী তরীকা, শিয়া তরিকার পাশাপাশি আরেক প্রকৃতির মুসলিম আছে যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত। এরা অন্য মুসলিমদের সাথে তাল না মিলিয়ে কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে আজান দিতে থাকে। মোট কথা হল, নামাজ নাহয় পড়তে গেলাম, কিন্তু কোন তরিকার নামাজ সহী, সেটা নিয়েও কেউ কনফার্ম কিছু বলেনা, আর সবাই নিজেদেরকে সহী আর অন্যদেরকে ভূল বা পথভ্রষ্ট বলে গালিগালাজ করতে থাকে আর অমুসলিম ঘোষনা করার দাবীই জানায় না, তাদের মসজিদ, মাজারে গিয়ে বোমা-বন্দুক হামলা চালাতে থাকে।

এরপরে, কল্যানের জন্যে ডাকাডাকি করা হয়, যদিও এই কল্যানের বেশীরভাগই পারজাগতিক কল্যান প্রসঙ্গেই। কারন, ইহজগতে আল্লাহতালা যে ব্যাক্তি বা জাতিকে পছন্দ করেন, তাদেরকে নানান রকমের পরীক্ষা নীরিক্ষা আর বিপদ আপদে ফেলে দিতে থাকেন, এবং বিপদ কাটুক না কাটুক, ধৈর্য ধরে এবাদত বন্দেগী করতে থাকতে বলা হয়। সেটাও নাহয় মেনে নিলাম। সব কষ্ট ভুলে, পরকালে কিছু সুখ আর শান্তি নাহয় পাবো। কিন্তু আমার সমস্যাটা এখানেই – কোন মসজিদের ডাকে সাড়া দিয়ে কোথায় নামাজ পড়তে গেলে বেশী কল্যান হবে, সেটা বুঝতে সমস্যা হয়। আর এক মসজিদে গেলে, অন্যদের ডাকে সাড়া না দেয়ায় তারা আবার মাইন্ড করে কিনা, এজন্যে, আমি সবাইকে সমানভাবে ট্রীট করি। কোথাও যাই না।

বস্তুতপক্ষে, আজান শুনেও নামাজে যায়না, এরকম মুসলিমের সংখ্যা ৯০%। তবে অন্যদের না যাওয়ার কারন হয়তো আলাদা। আর আমি চিন্তা করে, একটা বিষয়ে আমি কিছুটা সম্ভাবনার আলো দেখছি। আমার মতে, বুড়া বা জোয়ান মোয়াজ্জিনের বদলে আজান যদি কোন নারীর সুললিত কোকিল কন্ঠে দেয়ার ব্যাবস্থা করা হত, এবং বেছে বেছে সুকন্ঠী এবং সুন্দরী নারীদেরকে মোয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেয়া যেত, তাহলে হয়তো, সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করার মত বুকের পাটা কিশোর-তরুন-বৃদ্ধ, কারই হতনা।

আর সবশেষে, একটা সিরিয়াস প্রস্তাব, মাইক না মেরে সবাই যদি আধুনিক পদ্ধতিতে এলার্ম দিয়ে নামাজ পড়তে যায়, আর আজান দিলেও, একটা মাইকের শব্দ যে পরিমান দূরত্বে ছড়িয়ে পড়ে, সেই এলাকার মধ্যে দ্বিতীয় কোন মাইক বাজানো মানে অপচয় আর শব্দদূষন ছাড়া আর কিছুই না। এটি মুসলিমেরা যত দ্রুত বুঝে, কার্যকর করবে, নিজেদেরকে অন্যদের হাস্যষ্পদ এক প্রজাতীর নিকৃষ্ট রানী থেকে নিজেদেরকে কিছুটা হলেও যৌক্তিক উন্নতির ধারায় ফীরছে, তা প্রমান করার পথে তারা কিছুটা হলেও এগুচ্ছে বলে মনে হবে। নতুবা, সিরিয়াসলী বলতে গেলে, আজান হচ্ছে মুসলিমদের ভয় তাড়ানোর গান। কোন এলাকায় তারা কতটুকু শক্তিশালী, আজানের মাধ্যমে তা জানান দিয়ে নিজেদেরকে সংখ্যায় ভারী প্রমান করে এরা নিজেদের ভয় তাড়ায়। কিন্তু, সেই আজানের রেসপন্সে শুক্রবার ছাড়া অন্যান্য দিনে বা ওয়াক্তে মুসলিমদের মসজিদে হাজিরা দেয়ার হার দেখে মনে হয়না, দেশে শতকরা পাঁচ ভাহ সহী মুসলিম আছে, যারা আজান শোনার অপেক্ষায় থাকে এবং শোনার সাথে সাথে সব কাজ বাদ দিয়ে দৌড়ে মসজিদে হাজির হয়। আর যারা হাজির হয়, তাদের মধ্যেও, মনে হয়না, শতকরা পঁচিশ ভাগ লোকও কোরান-এর যেসব সুরা ঈমাম সাহেব সবার হয়ে পড়তে পড়তে নামাজ আদায় করিয়ে দেন, তার অর্থ তারা বোঝেন।

সবাই ঠিকই জানেন, অর্থ না বুঝে ঝাড়া মুখস্ত পড়ে নামাজ বা কোরান তেলাওাতের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই। আর অন্যদিকে কোরান বা সুরাগুলির অর্থ যদি তারা বুঝতেন, তাহলে বুঝতেন, গোটা জিনিশটাই গোজামিলে ভরা একটা ধূর্ত উন্মাদের গোলমেলে ধাপ্পাবাজি।

#এস্কিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *