ওম্নিভার্স

মীটিংটা শুরু হওয়ার কথা সন্ধ্যা ছ’টায়। পাঁচ জনের মধ্যে চারজনই মীটিং শুরুর আধঘণ্টা আগেই যে যার নির্দিষ্ট আসনে বসে গেছেন। সাধারণত, যে কোন মীটিংএ এই চারজন মিটিংয়ের দশ পনর মিনিট আগে হাজির হন। আজ একটু বেশী আগেই এসে গেছেন তারা। তার একটা বিশেষ কারনও আছে – আজ সেই বিশেষ দিন। যেই দিনটির জন্য প্রায় ত্রিশ বছর ধরে স্বপ্ন দেখে আসছেন তারা, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য গত পনর বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন, আজ রাত ঠিক বারোটায় সেই বিশেষ ঘটনাটি ঘটবে, অথবা আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায়, ঘটতে শুরু করবে। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা কিছু ধর্মীয় মিথের সেই মহাপ্রলয় বা শেষ বিচারের দিন কিংবা কেয়ামতের মতো সর্ববিনাশী কোন ধংসযজ্ঞ হয়তো শুরু হবেনা, বিকট শব্দে আসমান জমিন চৌচির হয়ে সেই ফাটলের ভেতর থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হবেনা, কিংবা পাহাড় – পর্বত বিস্ফোরিত হয়ে টকটকে লাল গরম লাভা গড়িয়ে পড়তে থাকবেনা। আকাশ থেকেও একের পর এক উল্কাপিণ্ড বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে থাকবে না। তবুও ওলটপালট তো কিছু হবেই। ছোটখাট কিছু বিশৃঙ্খলা, কিছু অপ্রতিকর ঘটনা-দুর্ঘটনা, এমনকি বড়সড় কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা অন্যায়, অবিচার, শোষন, বিশৃঙ্খলা, শ্রেণী-ধর্ম-বর্নের বৈষম্য, ধন-সম্পদের অসহনীয় মাত্রার অসম বণ্টন আর পুঁজিবাদের ভয়াবহ অভিসাপে নিস্পেষিত মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত আর বিত্তহীনদের জন্য কিছুটা হলেও সহজ-স্বচ্ছন্দ জীবন যাত্রা আর সাম্যভাব নিয়ে আসার জন্য, মানুষে মানুষে ধর্মীয় আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের অদৃশ্য দেয়ালটা ভেঙ্গে ফেলার জন্য এটুকু বিশৃঙ্খলা আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি মেনে নিয়েই ‘ওম্নিভার্স’ নামের এতো বড়, দীর্ঘমেয়াদি আর প্রায় অকল্পনীয় এই প্রজেক্টের কাজ শুরু করেছিলেন তারা। আজ সেই প্রজেক্টের ফাইনাল শো-ডাউন শুরু হতে যাচ্ছে।

মিটিং রুমটি বেশ বড়সড়, পাঁচকোনা। তার ঠিক মাঝখানে চওড়া গোল কালো গ্র্যানাইট পাথরের মীটিং টেবিল। তার ওপরে একটা পাঁচকোন বিশিষ্ট তারার নকশা করা। প্লাটিনামের প্লেটে তৈরি তারার পাঁচটি কোনে ওদের একেকজন এর নাম, পরিচয় এবং ছবি খোদাই করা আছে। টেবিলের পাশে পাঁচটি চেয়ার; যদিও ওগুলোকে চেয়ার না বলে সোফা বলাই যৌক্তিক। বেশ গা এলিয়ে বসা যায়।

একটা চেয়ার এখনো ফাঁকা আছে। সেখানে বসেন অপূর্ব চক্রবর্তী। সবাই তাকে অপু নামে ডাকেন। আটচল্লিশ বছর বয়স। বাংলাদেশী। আজ থেকে পনর বছর আগে, যখন তার বয়স তেত্রিশ, ২০০৫ সালের পহেলা জানুয়ারী সন্ধ্যা ছটা বাজার এক মিনিট আগে এই রুমে প্রথম পা রেখেছিলেন অপু। সেদিন থেকে, যে কোন মীটিংয়ে, কিংবা কোথাও কোন আপয়েন্টমেন্ট থাকলে ঠিক এক মিনিট আগে হাজির হওয়াটা একটা নিয়ম হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে, আজকের মিটিংটির বিশেষত্বের জন্যেই সবাই কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছে, তিনি কি আজও এক মিনিট আগেই ঢোকেন, নাকি তার কোন হেরফের হয়!

তার ডানপাশের চেয়ারে বসেছেন ওদের অস্ট্রেলীয় সহকর্মী মার্ক স্মিথ। কিছুটা ভোলাভালা টাইপের উদাস প্রকৃতির মানুষ। সে এযুগের সবচেয়ে বিজ্ঞ আর প্রতিভাবান থিওলজিস্ট। ‘থিওলজিস্ট’ মানে হচ্ছে যিনি ‘থিওলজি’ জানেন। আর ‘থিওলজি’ হচ্ছে, “The study of the nature of God and religious belief.” অর্থাৎ, ঈশ্বর বা স্রষ্টা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকৃতি বা স্বরূপ সংক্রান্ত জ্ঞানচর্চা। তিনি পৃথিবীর অনেক ধর্ম, ধর্মীয় এবং ঐতিহ্য ভিত্তিক আচার আচরন, প্রথা, ইত্যাদি নিয়ে ছোটবেলা থেকেই নানানভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব, তিনি কেমন, তার কাজের ধরন-ধারন সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করেন। অন্যান্যদের মতো তিনিও ঠিক পনর বছর আগে ‘অম্নিভার্স’ এর বাংলাদেশ অফিসে কাজ শুরু করেন । তার পদবী ‘ধর্ম বিশেষজ্ঞ’ হলেও তিনি আসলে কোন ধর্মকর্ম পালন করেন না। তিনি নতুন একটি ধর্ম তৈরি করেছেন, সেই ধর্মের জন্য একটি পবিত্র গ্রন্থ সম্পাদনা করে প্রচারের জন্য চুড়ান্ত করেছেন এবং সামনের দিনগুলোতে কিভাবে এই ধর্মটিকে পৃথিবীর সার্বজনীন ধর্ম হিসাবে সবাইকে সাদরে গ্রহন করানো যায়, এবং বিশেষ প্রয়োজনে, সবাইকে এই ধর্মগ্রহণে বাধ্য করানো যায়, তার সব বিস্তারিত পরিকল্পনা করা আছে । তাকে নতুন পৃথিবীর প্রধান ধর্মীয় উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তার ডানপাশের চেয়ারে বসেছে আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিস্টোফার গ্রীন, ক্রিস নামেই সবাই ডাকে। আকার আক্রিতিতে দলের মধ্যে সবচেয়ে বড়সড়। পাকানো পেশীবহুল পেটানো স্বাস্থ্য। তার জন্যেই এই অফিসের জীমটা দিনে অন্তত দু’ঘণ্টা করে হলেও ব্যাবহার হয়। অন্য কেউ সেই জীমের ধারে কছেও যায় না। ক্রিস এই প্রোজেক্টের খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

ক্রিসের ডানপাশে দলের দুজন মেয়ে সদস্যের একজন, চাইনিজ, তার নাম মিং। পুরো নাম মিং জীয়া, যার মানে ‘মেঘের আড়াল থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা আলোর রশ্মি’। তার বাংলা-ইংরেজি কোনো কথাই সহজে বোঝা যায় না তার ভয়াবহ উচ্চারনের জন্য। শুধু এজন্যেই না, এমনিতেই সে কথা খুব কম বলে। সংখ্যা নিয়ে খেলতে পছন্দ করে সে। অর্থনিতি, বাণিজ্য, শেয়ার বাজার আর হিসাব নিকাশের ব্যাপারে তার দক্ষতার জন্যে সবাই তাকে ‘উইজার্ড অফ নাম্বারস’ নামেও ডাকে। প্রজেক্টে আছে ফাইনান্সিয়াল স্পেশালিষ্ট হিসাবে।

ফাঁকা চেয়ারটার বামপাশে বসেছে রুশ তরুণী ইউলিয়া, যাকে সবাই লিয়া নামেই ডাকে। ভয়াবহ সুন্দরী, কিন্তু কথাবার্তায় খুবই সহজ-সরল, আর সবসময় হাসিখুশি। তার কাজে সে অত্যন্ত চটপটে, মনযোগী, ক্ষীপ্র, দক্ষ এবং নির্ভুল। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের একজন সে, আর একই সাথে হ্যাকিং-এর ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ হ্যাকারদের একজন সে। সে এই দলের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বিশেষজ্ঞ হলেও তার মুল কাজ হ্যাকিং করা এবং যে কোন নেটওয়ার্ক এ ঢুকে তার সমস্ত তথ্য চুরি করাই শুধু নয়, সেইসাথে তার আরেকটা বড় কাজ ছিল। তা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী, কার্যকরী আর সব ধরনের কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম ও প্রোগ্রাম বিদ্ধংশী ভাইরাস তৈরি করা। আর এই ভাইরাস প্রতিরোধক একটি সহজ অপারেটিং সিস্টেম এবং সফটওয়্যার তৈরির একটা কোম্পানিকে কার্যত, নেতৃত্ব দেয়াও তার দায়িত্বের একটা বড় অংশ।

সন্ধ্যা ০৫-৫৯। অপু ঢোকার সময় হল। এঘরের পাশের একটি দরজা খুলে গেল। মীটিং রুমে ঢুকে তার আসনে গিয়ে বসলেন অপু। তিনি সচরাচর হাসিখুশি থাকলেও আজ তাকে একটু বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে। একসাথে কাজ করে যাচ্ছেন এই পাঁচ জন গত পনেরো বছর ধরে। পাঁচজন পাঁচ দেশের হলেও একসাথে পনর বছর ধরে এদেশে থাকতে থাকতে সবাই
মোটামুটি ভালোই বাংলা বলতে এবং শুনে বুঝতে শিখে গেছেন। সদা চুপচাপ মিং-ও অপু’র এই উত্তেজিত ভাব দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কি ব্যাপার, অপু! তোমাকে বেশ এক্সাইটেড মনে হচ্ছে! কি হয়েছে?’
‘সবার ট্যাব গুলো চালু করে দ্যাখো। এইমাত্র একটা ম্যাসেজ এসেছে …।’
সবাই ট্যাব চালু করতেই ম্যাসেজ বক্স-এ একটা নতুন ম্যাসেজ দেখতে পেল – “প্রোজেক্টের উপদেষ্টা কমিটি রাত এগারটায় অম্নিভার্সের বাংলাদেশ অফিসের মীটিং রুমে উপস্থিত থাকবেন। অম্নিভার্সের সব বিশেষজ্ঞকে সেসময় তাদের সাথে পেলে ধন্য হবেন।”

ম্যাসেজটি পড়ে সবাই হতবাক। উপদেষ্টা কমিটির নাম এরা সবাই শুনেছেন, উপদেষ্টা কমিটির কাছ থেকে অনেক ই-মেইল কিংবা ম্যাসেজও পেয়েছেন মাঝে মধ্যেই। কিন্তু সেই কমিটিতে ক’জন আছেন, তারা কেমন, এই প্রোজেক্টের শুরুতে কারা ছিলেন, তাদের কেউ সবাই কি এখনো উপদেষ্টা হিসাবে আছেন, নাকি নতুন কেউ যুক্ত হলেন, সে সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই এদের কারো। এসম্পর্কে প্রশ্ন করেও এতদিন কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। শুধু বলা হয়েছিল, সময় হলেই সব জানানো হবে। আজ কি তাহলে সত্যিই সেই দিন? ‘সময়’ কি তাহলে সত্যিই হয়ে গেছে?
‘আজকের এই মীটিংয়ে আলোচনা করার মতো বিষয় কি আছে এজেন্ডায়?’ জানতে চাইলেন অপু।
‘আগে থেকে নির্ধারিত কোন বিষয় নেই। তবে এই বিষয়টা যে, আমাদের উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা সবাই আসবেন, তাদের সাথে দেখা হবে, এটা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। কিংবা অন্য যে কোন বিষয়।’ লিয়া বললেন।
‘উপদেষ্টা কমিটিটা বাস্তবেও তাহলে আছে। অবশ্য তিনি বা তারা মানুষ, নাকি কোন কম্পিউটার এ নিয়েও কারো কারো সন্দেহ ছিল। তবে মানুষ আশ্চর্য প্রাণী। তারা কোনদিন ঈশ্বরকে দেখেনি, ঈশ্বরের কথা নিজ কানে শোনেনি, শুধু হাজার হাজার বছর আগে লেখা কোন বই পড়ে আর অন্যের কাছ থেকে শুনে শুনেই বিশ্বাস করে, তাকে খুশী করার জন্য কত রকম তাদের কায়দা কসরত। আর সেই তুলনায়, আমাদের উপদেষ্টা কমিটিতো তো আমাদের সাথে রীতিমতো ই-মেইল আর ম্যাসেজ চালাচালি করেছে। কাজেই তাদের অস্তিত্ব আছে, আর যার অস্তিত্ব আছে, তার সাথে দেখা হয়ে যেতেই পারে। এর মধ্যে আলোচনা করার কি আছে?’ মার্ক বলে উঠলো। যে কোন বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেই মার্কের কাজ, তাকে টেনেটুনে ঈশ্বর আর ধর্মের দিকে নিয়ে যায়। আর তার বানানো নতুন ধর্মের বানী প্রচার করার সুযোগ ছাড়ে না। আর তিনি তো তৈরি হচ্ছেন নতুন পৃথিবীর নতুন ধর্মের প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে। তার লেখা নতুন ধর্মগ্রন্থ ‘ওম্নিভার্সেস’ থেকে মাঝেমধ্যেই দু’চার ছত্র শুনতেও মন্দ লাগে না কারো – কি চমৎকার তাঁর বানী, আহা, ঈশ্বরও সম্ভবত এর চেয়ে চমৎকার নীতিগ্রন্থ লিখার কথা চিন্তাও করতে পারেন নি। চিন্তা করলেই তিনি নিশ্চই তা করেও ফেলতে পারতেন এবং করতেনও। অবশ্য, অম্নিভার্সেস লেখা শুরুর সময় থেকেই তিনি সবার সাথে শেয়ার করতেন। সবার মন্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। আর সবশেষে তা পাঠিয়ে দিতে হতো উপদেষ্টা কমিটির কাছে। সেখান থেকেও অনেক মূল্যবান পরামর্শ পাওয়া গেছে। সে একটা ভিডিও বার্তা তৈরি করে পরীক্ষামূলকভাবে ইউ টিউবে ছেড়ে দিয়েছিল এবছরের শুরুতেই। সেই ভিডিওতে মার্ককে উদাত্ত কণ্ঠে অম্নিভার্সের বানী শুনে কেউ বুঝতেও পারেনি, যে মার্ক আসলে একজন অস্ট্রেলিয়ান। কারন বাংলা উচ্চারণ শেখার জন্য তাকে বেশ কয়েকজন নামকরা আবৃতি শিল্পী আর রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীর কাছে আবৃতি আর গান শিখতে হয়েছে কয়েক বছর ধরে।
সবাইকে চুপচাপ থাকতে দেখে মার্ক আবার বলে উঠলেন, ‘তাহলে বরং এই ফাঁকে আমার প্রথম ইউটিউব ভিডিওটি আরেকবার দেখে নিই’ – বলতে বলতে সে মাঝখানের ত্রিমাত্রিক হলগ্রাফিক স্ক্রিনে তার ভিডিওটি চালু করে দিলেন। সেখানে দেখা গেল অনেকটা জিশুখিশ্তের মতো সাজসজ্জায় মার্ক বলছেন, ‘আমার আগেও আরও অনেকেই এসেছিলেন। আমিও এসেছিলাম। হয়তো বলেওছিলাম, আমার পরও আরেকজন আসবেন। তিনিও এসেছিলেন। আমরা আমাদের স্রষ্টার বানী নিয়ে এসেছিলাম। তোমরা সেসব বানীর অনেকটা বুঝেছ, অনেকটা বুঝতে পারোনি। স্রষ্টার নাম আর স্বরূপ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ আর হানাহানি করছো। আমার পুনরাবির্ভাব নিয়েও তোমাদের মধ্যে সংশয়, বিভেদ আর মতপার্থক্য। অনেকেই আবার স্রষ্টার অস্তিত্বের বিপক্ষ্যে এমন সব যুক্তি প্রদর্শন করছে কিংবা প্রমান দাবি করছে যে যে কোন আত্মসন্মান সম্পন্ন স্রষ্টাই বেশিদিন নীরব থাকতে পারেন না। তাদের সবার সংশয় আর যুক্তিতর্ককে চিরতরে নির্মূল করার জন্য, আর প্রকৃত স্রষ্টার বানী তোমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যেই আমি আবার এসেছি। আর মাত্র একটি বছর তোমরা ধৈর্য ধর। স্রষ্টার আদেশ এবং অনুমতিক্রমে, আমি এসেছি তোমাদেরকে তাঁর সেই সুসংবাদ আর সতর্কবানী পৌঁছে দিতে। আর ঠিক এক বছর পর, ২০২০ সালের সূচনা লগ্নে তিনি তাঁর অস্তিত্বের প্রমান নিয়ে তোমাদের সামনে আসবেন। প্রথমে তোমরা সবাই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আলাদা হয়ে যাবে একজন আরেকজনের কাছ থেকে। অর্থ- সম্পদ-বিত্ত-ক্ষমতা সব চলে যাবে ‘অম্নি’র হাতে। আপনাদের সবার সপ্ন পুরনের জন্যে আমাদের মহান স্রস্টা, সর্বশক্তিমান, পরম করুনাময়, মহাপরিকল্পনাকারী এবং সর্ববাস্তবায়নকারী মহাপ্রভু ‘অম্নি’ আপনাদের প্রত্যেকের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হবেন। আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, মহাবিচারক সেদিন পৃথিবীর সব মানবসৃষ্ট কৃত্তিম আলো নিভিয়ে দেবেন। মানব সৃষ্ট সকল যানবাহনকে জলে, স্থলে কিংবা অন্তরীক্ষে নিশ্চল এবং নিয়ন্ত্রনহীন করে দেবেন। তোমরা কেউ কাউকে দেখতে পাবে না, কারো কথা শুনতে পাবে না। তোমাদের সকল ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সকল অর্থ, সম্পদ, কাগুজে মুদ্রা বাজেয়াপ্ত করা হবে । ধাতব মুদ্রার শুধু ধাতব মূল্য থাকবে। লৌহ, তাম্র, দস্তা, স্বর্ণ, রৌপ্য, হীরক, পান্না কিংবা অন্য কোন বস্তু বা ধাতব মুল্যের মধ্যে কোন রকম বৈষম্য থাকবে না, যেমন পৃথিবীর কোন মানুষের সাথে অন্য কোন দেশের কোন মানুষের কোন ভেদাভেদ নেই, ‘অম্নি’র কাছে । সেদিন কারো কোন ব্যাক্তিগত কোন সম্পদ অথবা সম্পত্তি বলে কিছু থাকবে না। নিশ্চয়ই ‘অম্নি’ই সবকিছুর মালিক ছিলেন, এবং নিশ্চয়ই তিনি চাইলে তাঁর সবকিছু নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারেন, আবার যাকে খুশী তাকে সেই সম্পদের সাময়িক নিয়ন্ত্রনের ভার তুলে দিতে পারেন। সাতশ কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে তিনি সবার মধ্যে সবকিছু সুবন্টন করে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেবেন। তিনি তাঁর সকল বিশ্বাসীদের প্রতি তৈরি থাকার জন্যেই আমাকে আপনাদের সামনে পাঠিয়েছেন। আপনাদের ব্যাক্তিগত যোগাযোগ এবং নিরাপত্তার জন্যে সবাইকে একটি করে মোবাইল বা স্মার্ট ফোন অথবা ল্যাপটপ কিংবা ট্যাব চালু অবস্থায় রাখার জন্য অনুরোধ করছি। যেসব দেশের নাগরিকেরা এখনো তাদের দেশের নাগরিকত্বের পরিচয় পত্র কিংবা মেশিন রিডেবেল পাসপোর্ট নেয়নি, তাদেরকে যথাশিঘ্র সম্ভব, সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এবং তাঁর এই বানী গুরুত্বের সাথে নেয়ার জন্যে মানব জাতির সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রয়োজনে সময়মত আপনাদের সাথে আবার দেখা হবে, কথা হবে। নিশ্চয়ই ‘ওম্নি’ সবকিছু দেখেন, শোনেন এবং বুঝতে পারেন।”
মার্ক ইউলিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যা কিছু বলেছি, তাঁর অনেকটাই এখন নির্ভর করছে তোমার ওপর।”
ইউলিয়া হাসতে হাসতে বললেন, “মহাজ্ঞানী ‘অম্নি’ সব জানেন। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ – কোন কিছুই তাঁর অজানা নয়। নিশ্চয়ই তিনি মহাপরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারি। কোনোকিছুই তাঁর পরিকল্পনার বাইরে ঘটেনি, ঘটছেনা এবং ঘটবেনা। তাছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের হাতে দেখে যাওয়া ছাড়া কোন কিছু করার আছে বলে মনেও হয়না। আর আমার বরং নির্ভার লাগছে, উপদেষ্টা কমিটির আসার কথা শুনে। তারা নিশ্চয়ই সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটলেও কোন উপায় বলে দিতে পারবেন। এতদিন তো ওরাই আমাদেরকে পথ দেখিয়ে এতদূর নিয়ে এসেছেন। এর সবকিছু বৃথা যেতে পারেনা। আমার তো কখনো কখনো মনে হয়, স্রষ্টা বা একজন গ্র্যান্ড ডিসাইনার কেউ আছেন, তিনিই কোন না কোনভাবে আমাদেরকে দিয়ে সব করিয়ে নিচ্ছেন। হতে পারে আমাদের উপদেষ্টাদের সাথে কিংবা আরও উপরের লেভেলের কারো সাথে সত্যিই তাঁর যোগাযোগ আছে। হয়তো তাঁর নাম ‘অম্নি’-ই। কে জানে!”
“এমন একটা বিশেষ দিনের মিীটিং-এও কি শুধু ‘অম্নি’র গুনগানই হবে, নাকি পানাহার কিংবা স্বাস্থ্য বিষয়ক দুয়েকটি বিষয়ক দু’একটি কথাও বলা যাবে?” ক্রিস জানতে চাইলেন।
“অম্নিভার্সে খাদ্য-পুষ্টি-স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ চ্যাপ্টার আছে যেখানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সবার জন্য অবশ্য পালনীয় নিয়মকানুনগুলো বিস্তারিত বলে দিয়েছেন ‘ওম্নি’। আপনার সাথে পরামর্শ করেই তো সেই চ্যাপ্টারটা লিখলাম, যে নিয়মকানুনগুলো আমাদের সবার জন্যেও প্রযোজ্য। এর বাইরে আর কিই বা বলার থাকতে পারে! তবুও, বলতে যখন চাচ্ছেন, বলুন। আমাদের সবারই নিজস্ব মতামত জানানোর অধিকার আছে।” বললেন মার্ক।
“আমি আসলে একটা সুসংবাদ দিতে চাচ্ছিলাম। আপনারা সবাই জানেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতেও মানবজাতির মধ্যে আনন্দ উৎসব এবং এর সাথে অবশ্যই পানাহারের আয়োজনও থাকবে। বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনে ‘অম্নি’র পক্ষ থেকে উন্নত মানের খাবার দাবারের সাথে এক ধরনের তরল পানীয়, এবং ধূমপানের জন্য নতুন এক ধরনের সিগারেট সরবরাহ করা হবে। আমাদের আজকের সন্ধ্যার এই মীটিংটি অবশ্যই একটি বিশেষ মীটিং। সেই উপলক্ষে উপদেষ্টা কমিটির অনুমতিক্রমে আজকের সন্ধ্যার মিটিং-এ সেই ধরনের কিছু খাদ্য, পানীয় এবং ধূমপানের ব্যাবস্থা আছে। আপনারা অনুমতি দিলে আমি ওগুলো পরিবেষণ করতে বলে দিতে পারি।”
সবার অনুমতিক্রমে খাবার এবং পানীয় টেবিলে এসে গেল। হাল্কা আর প্রায় অস্পষ্ট একটা সুর ধীরে ধীরে স্পষ্টতর, আর জোরালো হতে থাকলো। ঘরের আলোর রং-ও কিছুটা পাল্টে যাচ্ছে।
রাত নটায় তাদের পাঁচজনের সেই উৎসব শেষ হল। তাদের মধ্যে যদিও কোনোরকম ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও নেই, তবু নিজ নিজ রুমে ফিরলেন একটু একলা হওয়ার জন্যে, শেষবারের মতো পুরাতন এই পৃথিবীকে মন থেকে বিদায় করে দিয়ে আগামীকালের নতুন এক পৃথিবীর জন্য মনে মনে তৈরি হওয়ার জন্য এই একাকীত্ব, নির্জনতা আর নিস্তব্ধতাটুকুরও প্রয়োজন ছিল।
১০-৫৫ উপদেষ্টা কমিটির পাঁচজন বয়স্ক ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা মীটিং রুমে ঢুকলেন। তাদের সবার বয়স ষাট পঁয়ষট্টিরও বেশী। একজনের বয়স মনে হচ্ছে আশিরও ওপরে। পাঁচজন বিশেষজ্ঞই মিটিং রুমে আগেই চলে এসেছেন। তারা উপদেষ্টা কমিটির আগমনে দাঁড়িয়ে গেলেন। উপদেষ্টাদের সাদর সম্ভাষণ জানালেন।
সবার সামনে, টেবিলের অপর ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে সরাসরি দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর বেশ কয়েকটি বড় শহরের তাৎখনিক খবরের দৃশ্য বারটা বাজতে আর কয়েক সেকেন্ড বাকি। সবাই কেন যেন একসাথে লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলেন। একটু ভয় ভয় ভাব, অথবা অনিশ্চয়তাজনিত টেনশনও অনুভব করছেন কেউ কেউ কিংবা সবাই। সবকিছুই বিস্তারিত পরিকল্পনা করা আছে। কি ঘটতে পারে, অস্বাভাবিক কি ঘটলে কি করনীয়, সবকিছু আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা আছে, রাত বারোটায় প্রগ্রামটি চালু হয়ে যাবে। গত পাঁচ বছর ধরে পৃথিবীতে যতগুলো কম্পিউটার, ট্যাব কিংবা মোবাইল ফোন একবারের জন্য হলেও ইন্টারনেট অথবা কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক এর সাথে যুক্ত হয়েছে, তাদের সেই সব যন্ত্রেই ‘দাজ্জাল’ নামের ভাইরাস-টা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাইরাস প্রোগ্রামটি এতদিন ঘুমিয়ে ছিল। তার ঘুম ভাঙবে ঠিক বারটায়। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যাবে সব রকমের কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ভিত্তিক যোগাযোগের সব যন্ত্রপাতি এবং যোগাযোগ ব্যাবস্থা। তার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর সবগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং মোবাইল হ্যান্ড সেট গুলো। তারপর…… দেখাযাক, কি হয়, আর, যা কিছুই হোক, মানব সভ্যতার উত্তরনের ইতিহাসে, মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার যাত্রাপথে একটা বড় মাইল ফলক হয়ে থাকবে এই মুহুর্তটি।
বারোটা বাজল অবশেষে। ওরা দশজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে সামনের হলোগ্রাফিক স্ক্রীনের দিকে। একে একে প্রায় সবকটি টি ভি চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেল। মিটিং রুমের একপাশে ছটা ল্যাপটপ রেখে দেয়া আছে। দুটি অফ করা আছে আর চারটা চালু ছিল। চালু ল্যাপ টপ গুলর দুটাতে ইন্টারনেট কানেকশন দেয়া ছিলো আর অন্য দুটা অফ-লাইনে চলছিল। কিন্তু বারটা বাজার সাথে সাথে সবকটা চালু ল্যাপটপই অফ হয়ে গেল। একেবারে অফ। মাঝখানে শাটংডাউন অথবা ক্লোজিং প্রোগ্রাম নোটিশের কনো চিহ্ন দেখা গেলনা। যেন মুহুর্তের মধ্যে সচল একএকটা যন্ত্র সেকেন্ডের ব্যাবধানে ধপ করে মরে গেল। তবে দু’চারটা কম্পিউটার বন্ধ হওয়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয়। এমনকি সবকটি টি ভি চ্যানেল কিংবা মোবাইল ফোনও যে বন্ধ হয়ে গেল, তারো তেমন কোন গুরুতর প্রভাব পড়ার কথা না। এটা কেবল লম্বা একটা চেইন রিয়্যাকশনের সূচনা মাত্র।
এই পর্যায়টিতে বাইরের পৃথিবীতে কি কি ঘটছে তার কোন বিবরন পাওয়া যাচ্ছে না, কারন, সবকটি টিভি চ্যানেলই বন্ধ হয়ে গেছে। আর যেসব স্মার্ট টিভি সেটগুলো অ্যান্ড্রয়েড বা অন্য কোন অপারেটিং সিস্টেমে চলতো, সেগুলোও আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেল। আর এদের সবার মধ্যে এবিষয়ে সবচেয়ে ভালো ধারণা দিতে পারবেন ইউলিয়া । তিনি তার ট্যাবলেট কম্পিউটারটি চালু করে একটা লিস্ট থেকে পড়তে শুরু করলেনঃ
১২-০০ টোটাল সিস্টেম শাট ডাউন। পৃথিবীর সব কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যাবে। কম্পিউটার চালিত সব ধরনের পাওয়ার স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যাবে আধ ঘণ্টার জন্যে। কাজেই ইলেক্ট্রিসিটি চালিত সব যন্ত্রপাতিও বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যাক-আপ পাওয়ারে জরুরী সাধারন কিছু কাজ যেমন আলো জ্বালানো কিংবা ………..

একসময় সবকিছু চালু হবে, আর মানবতার জন্যে প্রথম বারতা হিসেবে প্রচার করা হতে থাকবেঃ

ওম্নিভার্সেস

১। পড়। যতই পড়িবে, ততই তোমার মন, মস্তিষ্ক এবং চেতনা শানিত হইবে, আলোকিত হইবে এবং আমার সহিত তোমার দূরত্ব কমিতে থাকিবে। আমি এই পুস্তকে তাহাই তোমাদিগকে জানাইব, যাহা তোমাদের মধ্যে বিভেদ আর বিষমের দেয়ালকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া তোমাদিগকে আরও ঐক্যবদ্ধ করিবে। তোমাদের ঐক্যবদ্ধতাই তোমাদিগকে আমার নিকটে লইয়া আসিবে। আর তখনই তোমরা আমাকেও তোমাদের মধ্যেই আবিষ্কার করিবে। তোমাদের আত্মজ্ঞ্যান পূর্ণতা পাইবে। আত্মজ্ঞ্যানের পূর্ণতা অর্জন করাই মানবজীবনের প্রধান উদ্দেস্য। মানুষ প্রথমে নিজেকে জানার চেষ্টা করিবে, এবং জানিবে, তোমাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই, তোমরা মনুষ্য জাতির সবাই সমান, তোমরা ঐক্য বদ্ধ হইবে, এবং জানিবে, তোমাদের স্রষ্টাও তোমাদের মতোই, অতি সাধারন একজন, সেদিন তোমাদের নিজ নিজ স্রষ্টার অনুসন্ধান শেষ হইবে। যেদিন জানিতে পারিবে তোমাতে আর আমাতে কোন ভেদাভেদ নাই, তুমিই আমি, আমিই তুমি, সেইদিন তোমাদের আত্মজ্ঞ্যান হইবে, তোমরা আলোকিত হইবে।
২। মানবজাতির জন্মের সূচনালগ্ন হইতেই, তাহাদের মস্তিষ্ক ভাবনা- চিন্তার উপযোগী হওয়ার পর হইতেই, তোমরা নানান ভাবে আমার সন্ধান করিতে শুরু করিয়াছিলে। আমার স্বরূপ কল্পনা করিতে চেষ্টা শুরু কর। কেহ কেহ ধারণা করিয়া লও যেন আমি এক সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত অতিশিপর বৃদ্ধ, সপ্ত-আসমানের ঊর্ধ্ববর্তি কোন স্থানে একটি সিংহাসনে বসিয়া তোমাদের উপর কড়া নজরদারি বজায় রাখিতেছি এবং তোমাদের প্রতিটি ভালো- মন্দ কাজের হিসাব কষিতেছি । তোমাদের বিশ্বাস, আমি পরম করুনাময়, অসিম দয়ালু এবং তোমাদিগকে অত্যন্ত ভালবাসি। আবার সেই আমার সম্পর্কেই আবার তোমরা মনে কর, আমি তোমাদিগকে একটির পর একটি কষ্টকর পরীক্ষায় ফেলিয়া দিতেছি। আমি একজন অত্যন্ত কঠোর পরীক্ষক এবং সময়বিশেষে একজন অতি পরাক্রারমশালী এবং রাগী একটি স্বত্বা, তোমাদের সামান্য ত্রুটি – বিচ্যুতি হইলেই কাউকে কাউকে পৃথিবীতেই কঠিন শাস্তি দেই,
এবং তাহাদিগক মৃত্যুর পরবর্তি আরেকটি জীবনেও তোমাদিগকে আবার পুনর্জাগরিত করিয়া জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করিব, কিংবা সর্প এবং বিচ্ছু পরিপূর্ণ একটি খাঁচায় বন্দি করিয়া রাখিব? বস্তুত পক্ষে আমার সম্পর্কে তোমাদের এই বিভ্রান্তি আমাকে প্রতিনিয়তঃ ব্যাথিত এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত করে, কোন কোন ক্ষেত্রে বিক্ষুব্ধও করে। তবে নিশ্চিত জানিয়া রাখো, তোমাদের উপর আমি কখনোই বিক্ষুব্ধ হইনা।
৩। আমি বিক্ষুব্ধ হই তাহাদের উপর, যাহারা ইতিপূর্বে আমার বার্তা বহনের দায়িত্ব পালন করিতেছে বলিয়া দাবি করিয়া তাহারা তাহাদের বানীগুলোকে আমার বানী হিসাবে প্রাচার করিয়াছে। তাহাদের ভাষাও ছিল অনুন্নত, হেঁয়ালিপূর্ণ, এবং এসব বানী তাহারা তোমাদের ভাষায় পরিপূর্ণভাবে বুঝাইয়া দিয়া আসিতে পারে নাই। এতে অবশ্য তাহাদের খুব বেশী দোষ দেওয়াও যায় না। কারন সেই সব যুগে মানুষের ভাষা তেমন উন্নত ছিলনা । তাহাদের সেইসব বানীকে তোমাদের বোধের উপযোগী করিবার উদ্দেশ্যে তাহারা নানান ধরনের উদ্ভট ঘটনা এবং কল্পকাহিনীর উদাহরন সংযোজন করিয়া আমার প্রেরিত পবিত্র গ্রন্থ হিসাবে প্রচার করিতে গিয়া তাহারা ধর্ম বা শান্তি অনায়নের নামে যুদ্ধ বিগ্রহ, প্রাণহানি আর সম্পদ ধ্বংস করিয়াছে। গ্রন্থগুলি সংকলন, ভাষান্তর কিংবা আধুনিকিকরনের নামে ঐগুলিকে আরও দুর্বোধ্য এবং বিতর্কিত করিয়া তুলিয়াছে মাত্র। আর প্রতিটি পুস্তকই তৎকালীন এবং পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, রূপান্তরিত এবং কলুষিত হইয়া শাসক গোষ্ঠীর শোষণ আর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হইয়াছে। বস্তুত পক্ষে সেসকল পুস্তক যেযুগে যেসকল জাতির জন্য প্রয়োজন ছিল, তাহাদের উপরই অবতীর্ণ হইত বলিয়া অনেকেই সেই নতুন পুস্তকের প্রচারনা চালাইত। যুগের পরিক্রমা এবং স্থানভেদে তাহারা হালনাগাদ বানী সম্বলিত নতুন নতুন কিতাব প্রদান করিয়াছে। যাহারা, ইতিপূর্বে আমার বার্তা তোমাদের নিকট উপস্থাপন করিয়াছিল বলিয়া দাবি করিয়াছিলান, তাহাদের প্রত্যেকেই যদিওবা তাহারা তাহাদের নিজেদের কথাগুলিই বলিতেন, তাহারাও তোমাদের মতই মানুষ মাত্র, ক্ষেত্রবিশেষে হয়তোবা কেউ অন্যদের তুলনায় কিছুটা বেশী বুদ্ধিমান, উচ্চমাত্রার নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন, উন্নত বাচনভঙ্গির অধিকারী, দক্ষ জাদুকর কিংবা কিছুটা সৌভাগ্যবানও ছিলেন। কিন্তু তোমরাই তাদের মৃত্যুর পর প্রমান ব্যাতিরেকে তাদের সম্পর্কে নানান ধরনের উদ্ভট রুপকথা কিংবা কল্পকাহিনী তৈরি করিয়া তাহাদিগকে অলৌকিক ক্ষমতাবান হিসাবে প্রচার করিয়া বস্তুতপক্ষে আমার অস্তিত্ব, আমার স্বরূপ, আমার বানী, আমার প্রেরিত মহাপুরুষ ইত্যাদি লইয়া নিজেদের মধ্যে বিভেদ, মতভেদ বিতর্ক আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি করিয়াছ।
৪। আমার প্রেরিত বার্তাবাহক হিসাবে সর্বশেষ যিনি দাবি করেছিলেন, সেই মুহাম্মদ, আমার সর্বশেষ কিছু ঐশী বানী লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিয়াছিলেন। সেই বানীগুলি তাঁর অসাধারন কাব্য প্রতিভা আর মনের সকল মাধুরী মিশাইয়া তাহার বন্ধুবান্ধবগণের মধ্যে আবৃতি করিতেন। তা লেখা হইত গাছের পাতা, বাকল, চামড়া, কাপড় কিংবা মোটা কাগজে। তিনিও নিজে সর্বদা সবাইকে বলিতেন, তিনিও অন্য সবার মতো একজন সাধারন মানুষ মাত্র। বহুবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য, উপহাশ কিংবা অনুরোধ করার পরও তিনি অলৌকিক কোন কিছুই প্রদর্শন করেন নাই। তিনি তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি, কৌশল, চাতুর্য এবং কিছুটা ভাগ্যগুনে, আরব অঞ্চলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাইয়া গিয়াছিলেন। তাহার অলৌকিকত্বের প্রমান হিসাবে ‘কুরআন’ নামক যে পুস্তকটি বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে আমার বানীগুলি সামান্যই স্থান পাইয়াছে। আর বেশীরভাগ অংশই তাহার কৌতূহলী, খেয়ালি, ভাবুক মনের কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আর জীবিত অবস্থায় সে তাহার মুখনিঃসৃত যেকোনো অদ্ভুত কিংবা উদ্ভট বিষয়েও তাঁর নিজের মতামতকে আমার ঐশী বানী হিসাবে চালাইয়া দিতো। এবিষয়ে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা তাকে মস্করা করিয়া বলিয়াছিলেন, “আপনার স্রষ্টার তো আর কোন কাজ নেই, আপনার ছোট খাটো বিষয়েও দরকার পড়লেই ওহী নাজিল করিতে তাহার বিন্দুমাত্রও সময় লাগে না!” তাহার অসাবধানতায় তাহার প্রতি ওহী নাজিল হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত একটি বানী ছিল, “যদি কেহ তাহার নিজের মনগড়া কথা বা বানী আমার ওহী হিসাবে চালাইয়া দিতে চায়, তাহা হইলে তাহার মৃত্যু হইবে তাহার হৃৎপিণ্ডের রক্তনালী বন্ধ হইয়া।” নিয়তির কি পরিহাস, এক ইহুদি মহিলার বাড়িতে দাওয়াত খাইবার সময় বিষমিশ্রিত ছাগলের মাংশ খাইয়া তার বিষক্রিয়ায় কয়েক ম্যাস শয্যাশায়ী থাকার পর মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাঝে মধ্যে বলতেন, তাঁর হৃৎপিণ্ডের রক্তনালী যেন বন্ধ হইয়া আসিতেছে। তিনি মৃত্যুর পূর্বে সেই কোরআন সংকলনের কোন ব্যাবস্থা করিয়া যাইতে পারেন নাই, কিংবা এর সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কোন পরামর্শও দিয়া যান নাই। তাহার মৃত্যুর পর কে হইবেন তাঁর পরবর্তী আরব জাহানের নেতা, তাহাও বলিয়া যাইতে পারেন নাই। অতঃপর, আরও প্রায় দুইশত বছর পর নিজেদের মধ্যে খেলাফতি লইয়া অনেক মতভেদ, বিবাদ, যুদ্ধ এবং হানাহানির পর, ইমাম উসমান তাঁর শাসনামলে কুরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহন করেন। তিনি তাঁর বিবেচনা ও পছন্দ অনুযায়ী সাজাইয়া গুছাইয়া, কাটছাঁট করিয়া যে গ্রন্থখানা দাঁড় করাইলেন, তা কোনক্রমেই সার্বিকভাবে আমার প্রেরিত ওহী নয় । আমি যদি তোমাদের জন্য কোন নীতিমালা, পুরনাঙ্গ জীবন বিধান, অথবা ঐশী গ্রন্থ প্রেরন করি, তখন তাতে কোন দুর্বোধ্যতা বা হেঁয়ালি থাকার কথা নয়। যাহা বলার, আমি তাহা স্পষ্ট ভাষায় মানুষের নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখিতাম।
৫। কাজেই আজ অতীব প্রয়োজন পড়িয়াছে এবং সুযোগ হইয়াছে বর্তমান বিশ্বের আধুনিকতা ও গতিশীলতার সহিত মানানসই এবং আধুনিক জীবন যাপনের জটিলতা থেকে মুক্তির পথ প্রদর্শনের উপযোগী একটি যুগোপযোগী বিশ্বজনীন পবিত্র পুস্তকের যা মানুষে মানুষে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে গোটা মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ্ করিবে । আমার স্বরূপ আর অস্তিত্বের প্রকারভেদ তোমাদের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার জন্যেও তোমাদের আরও আগেই আরও পুস্তক ও বানী পাঠানোর চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু মুহাম্মদের কিছু বানীর কারনে, বিভ্রান্ত- বিবেকবোধহীন কিছু মানুষের উগ্রপন্থী এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ পর্যালোচনা করিয়া বর্তমান পৃথিবীতে আমার বার্তাবাহক হইতে কাউকে রাজী করানো যাইতেছিল না। মুহাম্মদ ঘোষণা করিয়া গিয়াছিলেন, তিনিই শেষ বার্তা বাহক, তাহার পর আর কোন বার্তা বাহক আসিবেন না, আর কোন প্রকার ঐশী বানী আসিবে না। কিন্তু ইহা কি অত্যন্ত হাস্যকর বিষয় নহে যে আমি পৃথিবীর পরিবর্তনের সাথে সাথে মানানসই দিক নির্দেশনা বা ঐশী বানী না পাঠাইয়া আমি নিষ্কর্মা দর্শকের ভুমিকা লইয়া পড়িয়া থাকিব?
৬। মুহাম্মদ অবশ্য একটি রাখিয়া গিয়াছিল। ঈশা নামের তাহার পূর্ববর্তী একজন ঐশী বার্তাবাহককে যখন সেই অঞ্চলের শাসনকর্তার সৈন্যরা ক্রুশ বিদ্ধ করিতে লইয়া যাইতেছিল, তখন আমি নাকি তাকে সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে তুলিয়া লইয়া গিয়াছিলাম । তখন সৈন্যের দল ঈশার সহিত সাদৃশ্যপূর্ণ আরেক নিরপরাধ ব্যাক্তিকে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করে । মুহাম্মদ বলিয়া গিয়াছিল, কিয়ামত বা পৃথিবীর ধ্বংস হইবার আগে ঈশা নবী পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করিবেন। তিনি আসিবেন মুসলিম জাহানের নেতা ইমাম মাহদিকে সহযোদ্ধা হিসাবে সহায়তা করার জন্য, যিনি পৃথিবীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করিবেন। মুহাম্মদের ভবিষ্যৎবানীকে সন্মান করতঃ আমি পৃথিবীর এক ছোট্ট দেশ বাংলাদেশে ইমাম মাহদি আর ঈশাকে চল্লিশ বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রেরন করিয়াছিলাম । তাহারা এখন তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করিয়া যাইতেছে। তাহারা প্রয়োজনে যথোপযুক্ত সময়ে সশরীরে জনসন্মুখে আবির্ভূত হইবেন ।
৭। আমার সম্পর্কে তোমাদের কৌতূহলের শেষ নাই। আমার বিষয়ে তোমাদের কল্পনাপ্রবনতা আমাকে মুগ্ধ, বিস্মিত এবং আবেগাকুল করে। আমি কে, কি প্রক্রিতির, তাহা সমর্পকএ তোমাদের কল্পনাবিলাসেরও অন্ত নাই। যে যাহা বলে বলুক, ভাবে ভাবুক, যে নামেই দাকে ডাকুক, তাহাতে আমার কিছুই যায় আসে না। তোমরা আমার যত গুণগান, প্রশংসা এবং যে ভাবে খুশি আমার ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে তৈলমর্দন কর না কেন, তাতে আমার কোনপ্রকার ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না, বরং ওইসকল অর্থহীন কাজকর্মে যে সময়ের অপচয় কর, আমার প্রার্থনা করার জন্যে প্রার্থনালয় নির্মান করিয়া যে পরিমান অর্থের অপব্যায় কর, সেই অর্থ-সম্পদ দ্বারা শিক্ষালয়, গ্রন্থাগার এবং জ্ঞান চর্চাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করিলে তোমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরো অগ্রসর হইতে পারিতে।
৮। তোমরা মনে কর, আমি অতীত, বর্তমান এমনকি ভবিষ্যতেও যাহা ঘটিবে আমি সবকিছু সম্পর্কেই সম্যক অবগত রহিয়াছি এবং কেহ কেহ বল, সবই আমার পুর্বনির্ধারিত। আবার তোমরাই আমার নিকট নানান প্রকৃতির চাহিদা, আবদার এবং সমস্যার সমাধান প্রার্থনা কর। তোমাদের তবে কেন মনে হয় যে আমি তোমাদের প্রার্থনার ভিত্তিতে আমার সেই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার পরিবর্তন করিয়া তোমাদের জন্য নতুন কিছু নির্ধারণ করিব?
৯। তোমরা বল, তোমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। তোমরা তোমাদের ইচ্ছা মোতাবেক যা খুশী করিতে পার। আবার সেই তোমরাই তবে কি করিয়া বল, আসমান জমিনের সবকিছুই আমার নিয়ন্ত্রণাধীন? আমার হুকুম ছাড়া নাকি গাছের একটি পাতাও নড়ে না। সেইক্ষেত্রে আমার নিয়ন্ত্রণাধীন তোমাদের কোন কৃতকর্মের জন্যে কোন যুক্তিতে তোমাদিগকে ইহকালে কিংবা মৃত্যুর পর শাস্তিভোগ করিতে হইবে, বলিতে পার কি? বস্তুতপক্ষে, তোমরা আমাকে কোনদিনই সম্পুর্ন রুপে দেখিতে, শুনিতে এবং অনুধাবন করিতে পারিবে না। কাজেই, আমার সম্পর্কে না জানিয়া, না বুঝিয়া কোনরুপ গুন বা দোষ আরোপ করিওনা।
১০। সৃষ্টির শুরু কোথা হইতে, কিভাবে, তাহা লইয়া তোমাদের চিন্তার শেষ নাই। তোমরা বল, সবকিছুই আমার সৃষ্ট। কিন্তু তোমরা কেন প্রশ্ন করোনা, তোমাদের স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করিল? সৃষ্টির আদিতে যখন কিছুই ছিলোনা, তখনো নাকি আমি ছিলাম একাই। সেই আমিই বা কোথা হইতে আসিলাম? আর কি কারনেই বা একসময় খেলা ভঙ্গ করিয়া সবকিছু ধ্বংস করিয়া আবার একলা হইয়া যাইব?
ধর্ম আর ঈশ্মাবর লইয়া তোমাদের এই হিংসাত্মক কার্যকলাপ দেখিয়া, এতো অসাম্য আর ভেদাভেদ দেখিয়া বিন্দুমাত্রও ক্ষমতা থাকিলে এক মুহূর্তেই আমি সব সমসস্যার সমাধান করিয়া দিতে পারিতাম। কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নাই। সেই অক্ষমতা প্রকাশ করতঃ রাগে দুঃখে অক্ষমতার ক্ষোভে আমি অদ্য ৩১ শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১২ঃ০০ ঘটিকায় সম্পূর্ণ সেচ্ছায়, সগ্যানে, কড়ি কাষ্ঠে ফাঁসি লইয়া আত্মহনন করিলাম। পহেলা জানুয়ারি, ২০১০ সাল হইতে মানব জাতি আমাকে ছাড়াই চলিতে পারিবে, যেইরুপ চলিয়া আসিতেছে লক্ষাধিক বছর ধরিয়া আমার কোনপ্রকার হস্তক্ষেপ ব্যাতিরেকেই। সমগ্র মানবজাতি, সকল জীব, আর বিশ্ব-ভ্রম্মান্ডের সকল সৃষ্টির জন্য রইল আমার শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *