বৃক্ষ ধর্ম ২০৩৫

১।
– স্যার, ভালো আছেন?
বোধহয় একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। স্বপ্ন দেখছিলেন কি? একটু চমকে গেলেন মোজাম্মেল সাহেব। চারপাশে খুঁজে দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নাহ, কেউ নেই আশেপাশে।
-স্যার, কেমন আছেন? ভালো তো?
স্পষ্ট শুনলেন তিনি। কিন্তু এখনো আশেপাশে কাছাকাছি কোন জনমানব চোখে পড়লো না। ভুত-পেত্নি নাকি? একটু ভয়ই পেলেন তিনি। জীবনের এই প্রান্তে এসে অশরীরী কিছুর সাথে সাক্ষাৎ হবে, কোনদিন কল্পনাও করেননি।
-কে? কে কথা বলে?
-স্যার, আমি। বটবৃক্ষ।
-বটবৃক্ষ? বটবৃক্ষটা কে? এটা আবার কোন ধরনের ফাজলামি?
-স্যার, আমি বটবৃক্ষ। আপনার প্রিয় বনসাই। আপনার সাথে পঁচিশ বছরের সম্পর্ক। আপনিইতো আমার নাম দিলেন – বটবৃক্ষ। বনসাইয়ের নাম বটবৃক্ষ! কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন! আমি সেই নামের জন্যে খুব লজ্জায় ছিলাম। তবে এই পুকুরপাড়ে এনে খোলা মাটিতে লাগানোর পরে খুব খুশি হয়েছি। ইচ্ছামতো ডালপালা মেলে ধরতে পারছি, এটা আমার জন্য একটা মুক্তি পাওয়ার মতো অবস্থা । চেষ্টায় আছি, সত্যি সত্যিই বটবৃক্ষ হওয়ার ।
মোজাম্মেল সাহেব গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন । এসব কি হচ্ছে ? একটা গাছ কথা বলছে তার সাথে ! কিন্তু কিভাবে ? তার মাথায় কোন সমস্যা হচ্ছে নাকি? হেলুসিনেশন? কোথায় যেন পড়েছিলেন, লোকমান হাকিম নামের এক কবিরাজ গাছের সাথে কথা বলতেন। কিন্তু তিনি তো আর লোকমান হাকিম কবিরাজ না।
-স্যার, গাছের সাথে কথা বলার জন্যে লোকমান হাকিম কবিরাজ হওয়া লাগে না। সব গাছই মানুষের সব কথা বুঝতে পারে। এমনকি, মানুষের মনের কথা, চিন্তা ভাবনাও বুঝতে পারে। তবে মানুষ গাছের কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা বুঝতে পারে না।
-তাহলে তুমি কিভাবে আমার সাথে কথা বলছ? আমি কিভাবে তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি?
-এইটা স্যার এক ধরনের টেলিপ্যাথি। গাছরা চাইলে মানুষের সাথে কথা বলতে পারে। তবে সহজে বলে না। কারণটা খুব সহজ। এই আপনিই যদি আপনার পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদেরকে গিয়ে বলেন, আপনি গাছের সাথে কথা বলতে পারেন, একটা গাছের সাথে গল্প-গুজব করছেন, তাহলে কি হতে পারে? প্রথমেই ওরা আপনাকে নিয়ে যাবে মানসিক ডাক্তারের কাছে। আপনার নাম হয়ে যাবে বৃক্ষ-পাগল। আবার ইচ্ছা হলে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে পীর-দরবেশ হয়ে যেতে পারেন। নাম হবে বৃক্ষ-বাবা। তবে আমি নিশ্চিত, আপনি সেইরকম কিছু করবেন না।
-তাহলে আমার সাথে কথা বলছ কেন?
-স্যার, আপনি চুপচাপ মানুষ। পঁচিশ বছর ধরে আপনাকে দেখছি। বেশী কথাবার্তা বলেন না। ভালো ভালো বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। সেই জন্যে আপনার সাথে একটু গল্পগুজব করার ইচ্ছা হলো। ইচ্ছাটা অনেক দিনের। কিন্তু তেমন পরিবেশ পাচ্ছিলাম না। এখানে মনে হয় পরিবেশ ভালো। কথাবার্তার মধ্যে অন্য কেউ এসে পড়বে না। আর আপনিও আমার সাথে আপনার কথাবার্তার কথা কাউকে বলবেন না। সেইজন্যেই…
-তা আমার সাথে কি নিয়ে গল্প-গুজব করার ইচ্ছা তোমার?
-এই যেমন ধরেন, আপনি চিন্তা করেন, আমি কে? কোথা থেকে আসলাম? কোথায় যাচ্ছি? জীবনের মানে কি? – এইসব আরকি।
-বলো তাহলে, আমি কে?
-আপনি কে, ওটা অনেক পরের কথা। আগে এটা বলি, আপনি নিজেকে কি মনে করেন। আপনি জানেন, আপনি হলেন একজন মানুষ। পুরুষ মানুষ। আপনার একটা নাম আছে। সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান যে প্রাণী, সেই মানুষ, প্রথম যে ভুলটা করে, তা হলো নিজের একটা আলাদা নাম রাখে। এই নামটার কারণেই এক একটা মানুষ নিজেকে অন্য সব কিছু থেকে আলাদা একজন, একলা একজন মনে করা শুরু করে। অন্য সবকিছুর সাথে তার কি সম্পর্ক, অন্যদের তুলনায় সে কোনকোন দিক দিয়ে আলাদা, সেটা খুঁজতে থাকে। অন্য সবকিছুর সাথে নিজের যত বেশী পার্থক্য খুজে পায়, ততোই তার একাকীত্ব বাড়তে থাকে। এই যেমন আপনি কে, এই বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, আপনার নাম মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন। আসলে, আকিকা দেওয়া নাম ছিল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন, ক্লাস নাইনে উঠার পর, এস এস সি পরীক্ষার ফরম ফিল-আপ করার সময় আপনাদের স্কুলের নুর মোহাম্মদ স্যার বললেন, “মোহাম্মদ” বইলা কোন শব্দ নাই। আমাদের নবিজীর নাম ছিল “মুহাম্মদ”। তার কথামত ক্লাসের যত ছাত্রের নামের সাথে “মোহাম্মদ” ছিল, সব হয়ে গেলো “মুহাম্মদ”। আর এস এস সি পরীক্ষার পর আপনারা আলাদা হওয়া শুরু করলেন। কেউ ঢাকায়, কেউ ময়মনসিংহে, কেউ আনন্দ মোহন কলেজে, কেউ নটরডেম কলেজে, কেউ সায়েন্স, কেউ কমার্স, এভাবেই আলাদা হয়ে গেলেন আপনারা।
এইচ এস সি পরীক্ষার পর আরও ছড়িয়ে পড়লেন সবাই। কেউ ঢাকা মেডিকেলে, কেউ চট্টগ্রাম মেডিকেলে। কেউ বুয়েটে, কেউ কুয়েটে, কেউ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে, কেউ ঢাকা ভার্সিটিতে, কেউ আবার খুলনা ভার্সিটিতে, কেউ কেউ রয়ে গেলেন আনন্দ মোহন কলেজেই। কয়েকজন আবার আর্মি-এয়ারফোর্সে ঢুকে গেল। সবাই যে তার নিজ নিজ পছন্দমতো লাইনে গেলো, তা না। বরং, বেশিরভাগিই আসলে মেডিকেল অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স না পেয়ে বিকল্প কিছু একটা পড়তে হবে, সেজন্যেই যেখানে পারল, ভর্তি হয়ে পড়াশুনা চালিয়ে গেল। সে যাই হোক, আসল বিষয় হলো আপনারা আরও আলাদা, আরও একা হতে থাকলেন।

পেশাগত জীবনের শুরুর পর আপনারা আলাদা হয়ে গেলেন আরও বেশী। একেজন একেক পেশায়। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ টিচার, কেউ কন্ট্রাক্টার, কেউ বড় ব্যাবসায়ী, কেউ মুদির দোকানদার। কেউ গায়ক, কেউ কবি, কেউ আবার লেখক কিংবা সাংবাদিক। কেউ বেকার, মাদকসেবী, কেউ আবার মাদক- ব্যাবসায়ী। কেউ কেউ দেশের সীমানা পার হয়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সুইডেন অথবা আরও অন্য কোন দেশে ঘাঁটি গেড়ে বসলেন। আসল ব্যাপার হল, আপনারা শিকড় ছিঁড়ে একেকজন একেকদিকে ছড়িয়ে পড়লেন। গাছের শিকড় থাকে, দেখা যায়। একজায়গা থেকে তুলে নিয়ে আরেকজায়গায় লাগিয়ে দেয়া যায়। তাতে খুব একটা সমস্যা হয় না। মানুষেরও শিকড় থাকে, কিন্তু সেটা দেখা যায় না। আর সেই শিকড় একবার ছিঁড়ে গেলে সহজে আর কোথাও লাগানো যায় না। আপনারাও যে যেখানেই যান না কেন, আপনাদের সবার শিকড় রয়ে গেল ময়মনসিংহের মাঠে-ঘাটে, ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে, টাউন হল, গাঙ্গিনার পাড় কিংবা জিলা স্কুলের মোড়ে।

-তা নাহয় হল। কিন্তু তোমার সাথে আমার সম্পর্ক তো হলো আরও অনেক পরে। তোমার বয়স ত্রিশ পার হয়নি। তুমি এসব জানলে কিভাবে?
-গাছেরা আসলে সবাই একই নেটওয়ার্কে যুক্ত অবস্থায় থাকি। আমাদের জ্ঞান, তথ্য, অভিজ্ঞতা যুগ যুগ ধরে এই নেটওয়ার্কের তথ্যভাণ্ডারে জমা হতে থাকে। আমরা যে কেউ এই তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য দেয়া-নেয়া করতে পারি। শুধু অতীত আর বর্তমানই না, আমাদের নেটওয়ার্কে ভবিষ্যতের তথ্যও আছে।
-বল কী? তারমানে আজকে বিকালে, বা আগামী দিনগুলোতে কি ঘটতে যাচ্ছে তোমরা সবাই জানো?
-অবশ্যই জানি। কিন্তু ভবিষ্যতের ব্যাপারটা মানুষদেরকে জানানো নিষেধ আছে। কারণ, জেনে গেলেই, মানুষ চাইবে আলাদা কিছু একটা করে ফেলতে। সেটা সম্ভব না। যা কিছু ঘটার, অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে, তার সবকিছুই আসলে ঘটে গেছে। আমরা শুধু সেই ঘটনাগুলি আমাদের চোখের সামনে মঞ্চনাটকের মতো ঘটে যেতে দেখি। আমাদের যে যার ভূমিকায় সফলভাবে অভিনয় করে যাই।
-কিন্তু তাহলে যে বলে, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির কথা?
-এটা একটা জটিল ব্যাপার, অথবা বলতে পারেন স্রেফ ভাঁওতাবাজি। এই ইচ্ছাশক্তিটা আসে কোথা থেকে? একই পরিস্থিতিতে একেকজন মানুষ একেকভাবে রিঅ্যাক্ট করে কিসের ভিত্তিতে? রিঅ্যাক্ট করে তার জেনেটিক স্ট্রাকচার অনুযায়ী। সেজন্যেই, কখন কি ঘটবে, তা যখন আগেই ঠিক করা থাকে, তখন মানুষও কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সেটাও তার জেনেটিক স্ট্রাকচারে লিখে দেয়া আছে। এজন্যেই সাধু সন্ন্যাসীরা বলতো, ঘটনা যা ঘটার, তাই ঘটছে, আমি নিমিত্ত মাত্র।
-তাহলে পাপ-পুণ্য? শেষ বিচার? স্বর্গ-নরক এসব আসলো কিভাবে? ঘটনা যা ঘটার, তাই ঘটেছে, তাই ঘটবে। মানুষের তাহলে দোষ কি?
-এগুলোও আসলে ভাঁওতাবাজি। দুর্বল মানুষদেরকে কন্ট্রোলে রাখার এক-একটা টেকনিক। আপনারাই বলেন, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। তাহলে মানুষের কি ক্ষমতা আছে কিছু করার? মানুষ মনে করে সে-ই করছে। আসলে সে বুঝতেই পারে না, তাকে দিয়ে আসলে সবকিছু করিয়ে নেয়া হচ্ছে। পাপ, পুণ্য, পুরষ্কার, শাস্তি – সবই আসলে সাজানো নাটক।
-সবই যদি সাজানো নাটকই হয়, আর আমরা যদি সেই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রী হই, তাহলে সেই নাটকের নাট্যকারটা কে?
-তাকেই আপনারা কেউ বলেন ঈশ্বর, কেউ বলেন স্রষ্টা, কেউ ভগবান, কেউ উপরওয়ালা। কেউ বলেন মহাচেতনা, কেউ মহাপ্রকৃতি। কেউ বলেন তিনিই সবকিছু, কেউ কেউ মনে করেন আমি ছাড়া আর সব কিছুই তিনি। আসলে, মানুষের যুক্তি, বুদ্ধি, চেতনা এতোটাই সীমাবদ্ধ যে তার একক জ্ঞান বা বোধশক্তি দিয়ে তার সরূপ বোঝা বা ধারণ করা অসম্ভব। একটা পিপড়ার কথাই ধরেন। তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তার পক্ষে কি বোঝা সম্ভব, একটা মানুষ কিভাবে একটা বিল্ডিং তৈরি করে, অথবা উড়োজাহাজ বানিয়ে তাতে চড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে যায়? এই জিনিষগুলো যেমন তাকে বোঝানো যাবে না, সেইরকম মানুষও তার স্রস্টার সরূপ অথবা তার কর্মপদ্ধতি কোনদিনও বুঝতে পারবে না।
-তাহলে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যটা কি? কি জন্যে চারদিকের এতসব আয়োজন? এত দুঃখ – কষ্ট, পরিশ্রম?
-অভিজ্ঞতা অর্জন। নানা রকম দুঃখ-কষ্ট, সাফল্য-ব্যার্থতা, মিলন-বিচ্ছেদ, জন্ম-মৃত্যু, এসবের ভিতর দিয়ে গিয়ে মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে। স্রস্টার মতো বিশাল একটা সত্ত্বার পক্ষে সম্ভব না, ধুলা-মাটির এই পৃথিবীতে কোন প্রাণী অথবা জীবের জীবনের আনন্দ, বেদনা, সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান, সফলতা কিংবা ব্যার্থতার পরিপূর্ণ উপলব্ধি নেয়া। তাই স্রষ্টা তৈরি করেছেন মানুষ। আর মানুষের প্রকৃতি আর পরিবেশ সাজিয়ে দিয়েছেন পাহাড়, সমুদ্র, গাছপালা, জীবজন্তু দিয়ে। এসব কিছুর মধ্যেই স্রষ্টা তার নিজের সত্ত্বাকেই ছড়িয়ে দিয়েছেন। সব মানুষের ভিতরেও একই স্রষ্টার সত্ত্বার কিছু কিছু অংশ জুড়ে দেয়া আছে। সেটাকেই আপনারা বলেন আত্মা বা প্রাণ। আত্মা বা প্রাণই কোন না কোন শরীর ধারণ করে এই পৃথিবীতে ঘুরে ফিরে অনেক রকমের অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভ্রমন শেষে একদিন ফিরে যায় তার উৎসে। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্রষ্টার সাথে তার সম্পর্ক খুঁজে বের করা। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার স্রষ্টাকে খুঁজে চলেছে। নানা ভাবে তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে। সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত সেই অনুসন্ধান চলতেই থাকবে।

মোজাম্মেল সাহেব খেয়াল করলেন, তার খিদে পেয়েছে। দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেছে। তিনি বড়শি গুটিয়ে খাবার ঘরের দিকে রওয়ানা দিলেন।

২।
চাইনীজদের সবকিছুই ছোটখাটো। তাদের আকার আকৃতি ছোটখাটো। তাদের চোখ ছোটছোট। নাক চ্যাপ্টা। তাদের তৈরি জিনিসপত্রও ছোট ছোট। এই যেমন ধরেন চাইনিজ কমলার কথা। কিছুদিন হল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। খুবই ছোট সাইজ। চাইনিজ বটগাছও সেইরকম ছোটখাটো। কোনরকম কাটছাঁট না করলেও দুইতিন বছর বয়সের একটা গাছের সাইজ হবে বড়জোর একফুট। সেই গাছের ডালপালা থেকে আবার শিকড় ঝুলে পড়বে। খুব একটা আদর যত্ন ছাড়াই দেখার মত বনসাই হয়ে যাবে। সেইরকমই একটা তিন বছর বয়সী চায়না বটের বনসাই ছয়শ টাকা দিয়ে আগারগাওএর এক নার্সারি থেকে কিনেছিলেন মোজাম্মেল সাহেব। সেটা ছিল ২০১১ সালের মার্চ মাসের এক সন্ধ্যা।

বনসাই লাগাতে হয় একটু কম উচ্চতার চওড়া ধরনের টবে। ওগুলোকে টব না বলে প্লেট বা ট্রে বলাই ভাল। ইন্টারনেটে নানা ধরনের বনসাইয়ের ছবি দেখে মোজাম্মেল সাহেব লক্ষ করলেন, ওগুলো লাগানো হয়েছে সুন্দর সুন্দর চীনামাটির ট্রেতে। কাজেই, বাসায় ফিরেই তিনি খুঁজতে শুরু করলেন তেমন কোন ট্রে বা প্লেট আছে কিনা। থালাবাসনের শোকেসে রাখা চীনামাটির সালাদ বাটিটাই পছন্দ হল তার। তার স্ত্রী মনোয়ারা গাছ-গাছালি অপছন্দ করেন না। বারান্দার কোনে দুএকটা গোলাপ গাছ, তিন-চারটা পাতাবাহারের গাছ, বাতাসে ঝুলে থাকা কয়েকটা এয়ার প্ল্যান্ট, কয়েক জাতের ক্যাকটাস – এসব তিনি পছন্দই করেন। মাঝেমধ্যে পানি দেয়া, শুকনো পাতাগুলো পরিষ্কার করা, ছোটখাটো আগাছা গজালে ওগুলো উপড়ে ফেলা – এসব করতে তার ভালোই লাগে। কিন্তু ছোটখাটো বনসাইয়ের চারাটা লাগানোর জন্যে তার শখের চীনামাটির সালাদ বাটিটাকে টব হিসাবে ব্যাবহার করার বিষয়টা তার মোটেই পছন্দ হল না। মোজাম্মেল সাহেব কথা দিলেন, তিনি নিজে নিউ মার্কেট থেকে এর চেয়েও দামী একটা পোর্সেলিনের সালাদ বাটি কিনে দেবেন। মনোয়ারা তার স্বামীকে ভালভাবেই চেনেন। একবার যেটা তার মাথায় ঢোকে, সেটা যে কোন ভাবে হোক, করেই ছাড়েন। কাজেই, মোজাম্মেল সাহেব যখন একটা ড্রিল মেশিন দিয়ে সালাদ বাটিটার তলায় একটা ফুটো করে, একটা ঝিনুকের টুকরো তার উপর রেখে বনসাইটিকে তাতে লাগিয়ে দিলেন, মনোয়ারা নির্লিপ্তভাবে সেটা শুধু দেখে গেলেন।

অনেক বিখ্যাত বনসাইয়ের আলাদা একটা নাম দেয়া হয়। ‘ট্রি-হাউস’ নামের এক বিখ্যাত বনসাই, কাঁচের একটা বাক্সে করে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার ছবিও দেখলেন, ইন্টারনেট-এ। মোজাম্মেল সাহেবও তার বনসাইটির একটা নাম দিয়ে দিলেন। “বটবৃক্ষ”। পরবর্তী প্রায় দশ বছর চাকরিজীবনের নানা চড়াই-উৎরাই পার হলেন তিনি। খুব একটা উন্নতি করতে পারলেন না কখনই। কারণ, কোন চাকরিতেই স্থির থাকতে পারলেন না। কোনটা উনি ছেড়ে দিতেন, কোনটা থেকে তাকে বিদায় করে দেয়া হত। কিন্তু বনসাইটি তার সাথে সাথেই রয়ে গেল। মাঝে মধ্যে তিনি মনে মনে কথা বলতেন বনসাইটার সাথে। ঢাকা শহরে তার মতো একজন মধ্যবিত্ত মানুষের হিসাব করে করে এক একটা দিন পার করা, আর ভিনদেশী এক বনসাইয়ের ছোট্ট একটা টবে সীমিত মাটি-পানি-সার-আলো-বাতাসের মধ্যেও কোনমতে বেঁচে থেকে জীবনটাকে টেনে নেয়ার মধ্যে আদ্ভুত এক মিল খুঁজে পেতেন তিনি। তিনি মনে মনে কথা দিয়েছিলেন, তার যদি কোনদিন নিজের একখণ্ড জমি হয়, তাহলে বনসাইটিকে তিনি মুক্ত করে দেবেন। সেই জমিতে তিনি বনসাইটিকে মুক্তভাবে লাগিয়ে দেবেন। ইচ্ছামত বড় হতে দেবেন। তিনি তার কথা রেখেছিলেন। আটচল্লিশ বছর বয়েসে তিনি তার স্কুল-জীবনের কয়েকজন বন্ধুসহ নেত্রকোনার কলমাকান্দায় প্রায় পাঁচ একর জমি কিনে একটা বৃদ্ধ-নিবাস গড়ে তুললেন। পাঁচ একর জমির মধ্যে দুই একর হল বিরাট এক দীঘি। সেই দীঘির পূর্ব দিকের এক কোনে স্থায়ী জায়গা হল বনসাইটির।

তারপর কেটে গেলো আরও প্রায় পনর বছর। ততদিনে চাকরি-বাকরির লাইন ছেড়ে ছোটখাটো কিছু ব্যাবসা-বাণিজ্য করে কিছুটা উন্নতির মুখও দেখেছিলেন মোজাম্মেল সাহেব। এক সময় সেই ব্যাবসা বাণিজ্যের কিছুটা গুটিয়ে এনে, বাকিটুকুর দেখাশোনার ভার তার ছেলের হাতে দিয়ে চলে আসলেন তার নিজের হাতে গড়া বৃদ্ধ নিবাসে। তখন তার বয়স তেষট্টি। তিনি কথাবার্তা খুব একটা বলতেন না কোনকালেই। ইদানীং আরও বেশী চুপচাপ হয়ে গেছেন। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে দীঘির পূর্বদিকের কোনে লাগানো বনসাইয়ের তলায় শুয়ে-বসে। বনসাইটিকে এখন অবশ্য আর বনসাই বলা যাবে না। “বটবৃক্ষ” বলা যায়, তেমন বিশাল কিছু না হলেও মাঝারি আকারের একটা ছায়াদায়ী গাছে পরিণত হয়েছে সেটা। মোজাম্মেল সাহেব সেই ছায়ায় একটা পাটি বিছিয়ে বসে থাকেন। দীঘিতে একটা বড়শি ফেলে রাখেন। তার উদ্দেশ্য মাছ ধরা না। এটা তার একটা ক্যামোফ্লাজ। কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে, সেজন্যেই বড়শিটা কাজ করে একটা সাইনবোর্ডের মতো – “এখানে কথা বলা নিষেধ।” সাইনবোর্ডটি তার কাজ ভালোভাবেই করছে। কেউ তাকে বিরক্ত করতে আসে না। তিনি চুপচাপ বসে থাকেন। আর নিজের মনেই ভাবেন। নির্দিষ্ট কোন কিছু না। তেমন গভীর, গুরুতর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে না। খুব সাধারণ কিছু বিষয় নিয়েই নিজের ভাবনাতেই ডুবে থাকেন তিনি। আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাচ্ছি? ঈশ্বর বলে সত্যিই কেউ আছে কি না, থাকলেও তিনি আসলে কি করছেন, এসব অতি সাধারণ ভাবনাতে ডুবে থাকতে ভালোই লাগে তার। ভাবতে ভাবতে কখনো কখনো ঝিমুনি এসে যায়। ইচ্ছে হলে পাটির উপরই শুয়ে পড়েন। মাঝে মধ্যে সেখানেই ঘুমিয়েও পড়েন তিনি ।

সেইরকম এক ঘুমের মধ্যে গাছের সাথে তার কথা-বার্তা বলার ব্যাপারটা শুরু হল ।

৩।
মোজাম্মেল সাহেবদের বৃদ্ধাশ্রমের নাম “গন্তব্য”। মধ্য বয়সে এসে স্কুল জীবনের কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে গড়ে তুলেছিলেন এই জায়গাটিকে। চাকরিজীবনের শুরুর দিকে প্রথমে ইয়াহু মেইলে একটা গ্রুপ তৈরি করে কামরুল আর শাওন। তারপর একসময় শুরু হয় ফেসবুকের যুগ। ফেসবুক-এর গ্রুপ নাম দেয়া হয় “স্কুল-টাইজ-৮৯”। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ১৯৮৯ সালে এস এস সির ব্যাচের পঞ্চাশ-ষাট জন ছেলে যুবক বয়সে এসেও ছেলেমানুষি তর্ক-বিতর্ক, সামাজিক আড্ডা চালিয়ে যেত, সেইসাথে পারষ্পরিক যোগাযোগ এবং খোঁজখবর চলতো ফেসবুকের মাধ্যমেই। কোন কোন বছর পিকনিকের আয়োজন হতো। সেইরকম এক পিকনিকের দিন জসীম নামের তাদের এক আর্মি অফিসার বন্ধু তার স্বপ্নের কথা প্রকাশ করলো। তার স্বপ্ন একটা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা। তারপর কয়েক বছর কেটে গেল। এই বিষয়ে কেউ কোন আলাপ আলোচনা করেনি।

মোজাম্মেল সাহেবের জন্ম যদিও দিনাজপুরে, তার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহে। তার বাবা ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যাপক। এই কলেজ থেকেই এইচ এস সি পাশ করে মোজাম্মেল সাহেব কি মনে করে যেন এয়ার ফোর্সে ঢুকে পড়লেন জি ডি পাইলট হিসাবে। কয়েক মাসের ট্রেনিংএর পর তার স্বপ্নভঙ্গ হল। নানান কায়দা কানুন করে বেরিয়েও আসলেন সেখান থেকে। সেইসময় তার মধ্যে একটা নতুন ধরনের বোধ জন্ম নিলো। তখন তার কাছে লেখাপড়ার উদ্দেশ্য মনে হল একটা ভালো বেতনের চাকরি পাওয়া। অনেক চিন্তা ভাবনা করে, সায়েন্স থেকে এস এস সি আর এইচ এস সিতে স্টার মার্কস পাওয়া মোজাম্মেল সাহেব বি কম পাস করে চার্টার্ড একাউন্ট্যান্সি পড়তে শুরু করলেন। পাশাপাশি জগন্নাথ কলেজ থেকে এম কম টা পাশ করে ফেললেও সিএ – র তেমন কিছুই পাশ করতে পারলেন না। অবশ্য সেজন্যে চাকরি পেতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। একটার পর একটা চাকরি ধরলেন, কোনটা ছেড়ে দিলেন, কোনটা তাকে ছেড়ে দিলো। এভাবেই সতের বছরে একত্রিশটা চাকরি করার পর তার বোধোদয় হল। চাকরি বাদ দিয়ে ব্যাবসা করার চিন্তা মাথায় ঢুকল।
সেইরকম একটা সময়ে, যখন তার বয়স পঁয়তাল্লিশ, তিনি একবার ময়মনসিংহে গেলেন, তার ছেলেবেলার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার জন্যে। দীর্ঘদিন পরে যাওয়া। তার ছেলেবেলার বন্ধুদের কেউ কেউ তখনো মাঝে মধ্যে গাঁজা টানে। বন্ধুদের আড্ডায় মোজাম্মেল সাহেবও কয়েক টান দিলেন গাঁজা ভর্তি সিগারেটে। গাঁজায় টান দিলে কারো কারো মনে অতি উচ্চশ্রেণীর চিন্তা ভাবনা চলে আসে। মোজাম্মেল সাহেবের মনেও তেমনি একটা চিন্তা খেলতে শুরু করলো। তার মনে হল, অনেক বয়স হয়ে গেছে। এখন বৃদ্ধ বয়সের জন্যে চিন্তা ভাবনা শুরু করা উচিৎ। একটা বৃদ্ধাশ্রম করলে কেমন হয়! সাধারণত, গাঁজা খাওয়া অবস্থায় জন্ম নেয়া চিন্তা বাস্তবে রূপ দেয়া খুব সহজ মনে হয় । আবার, নেশা কেটে যাওয়ার পর সেসব চিন্তা মাথা থেকে উধাও হতেও সময় লাগে না । কিন্তু, সেদিনের আড্ডার সেই চিন্তাটা কিভাবে যেন মাথায় থেকেই গেল। সেযাত্রায় ময়মনসিংহের কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সাথে আলাপ আলোচনা করলেন। ময়মনসিংহের আশেপাশে জমিজমার দরদাম সম্পর্কেও খোঁজ খবর নিলেন। তারপর, দীর্ঘদিন ফেসবুকে নীরব মোজাম্মেল সাহেব হঠাৎ একদিন একটা পোস্ট দিলেন। বৃদ্ধাশ্রম করার ব্যাপারে কে কে তার সাথে থাকতে রাজী আছেন, কোথায় সস্তায় জমি পাওয়া যেতে পারে, কি পরিমাণ খরচ হতে পারে, তারই কিছু বিবরণ দিয়ে পোস্ট-টা দিলেন। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও কেউ কেউ বেশ উৎসাহ দেখাল। জসীমের প্রায় ভুলে যাওয়া স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠল। নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকার সাবেক এম পি রুহীও তাদের গ্রুপ-এর একজন সদস্য। তারই উৎসাহ, উদ্যম আর কাজে লেগে যাওয়ার ফল হিসাবে কলমাকান্দার লেঙ্গুরা এলাকায়, ইন্ডিয়ার বর্ডারের কাছে বেশ সস্তায় জমি কেনা হয়ে গেল।

বছর তিনেকের মধ্যে কেনা জমির মত পরিমাণ পাঁচ একর ছাড়িয়ে গেল। তার মধ্যে দুই একর জুড়ে বিশাল এক দীঘি খুঁড়ে ফেলা হল। বাকি জায়গায় পাঁচ ইঞ্চির গাঁথনি আর প্লাস্টিকের রঙ্গিন টিনের ছাদ দিয়ে কয়েকটা সিঙ্গেল রুম, কয়েকটা ডবল রুম, আর একটা বড়সড় রুম-এ ঢালাও বিছানার বেবস্থা। সামনে টানা বারান্দা। দীঘির একপাশে হাঁস মুরগির ছোটখাটো একটা খামার, তিনটা দুধেল গাইগরু, কিছু ফুলফলের গাছ, কিছুটা সবজি বাগান, সবমিলে চমৎকার একটা ছবির মতো। সে সময় জায়গাটার নাম রাখা হল “গন্তব্য”। চাকরি কিংবা বেবশার ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ সপরিবারে বেড়াতে আসতো। মাঝখানে কয়েক বছর পিকনিক হয়নি। কিন্তু, “গন্তব্য” টা মোটামুটি দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর প্রতিবছর শীতকালে একবার তো বটেই, মাঝেমধ্যে গ্রীষ্মকালীন, কখনো কখনো বর্ষাকালীন পিকনিকের আয়োজনও হতে লাগল। প্রথম প্রথম যাতায়াতের বেবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিল না। কিন্তু রুহীর সরকারি যোগাযোগ আর উদ্যোগে ভালো রাস্তাঘাট তৈরি হল। নৌকায় পার হয়ে আস্তে হতো, তেমন একটা জায়গায় ব্রিজও তৈরি হয়ে গেল। রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ তৈরির সময় থেকেই এলাকায় জমির দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সেসময় মাঝে মধ্যে বিরিশিরি, শুশং দুর্গাপুর আর সোমেশ্বরী নদী দেখতে নেত্রকোনায় আসা পর্যটকদের জন্য ভালো কোন থাকার জায়গা ছিল না। তাই, পর্যটকদের থাকাখাওয়ার ব্যাবস্থা করেও কিছু লাভ হতো। সে টাকা দিয়েই একজন সার্বক্ষণিক ম্যানেজার, একজন বাবুর্চি আর দুজন পাহারাদার রাখা হল।

আজ ২০৩৫ সালে তেষট্টি বছর বয়েসে এসে সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো মনে হয় মোজাম্মেল সাহেবের। গল্পের মতো মনে হয়। একটা সময় ছিল যখন অনেকেই বৃদ্ধাশ্রম বিষয়টাকে সাপোর্ট করত না। তরুণ বয়সে তারাও চাইতেন, যেন তাদের মা-বাবারা তাদের সাথেই থাকে। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারের ব্যাপারটাও দিনদিন বিলুপ্ত হতে লাগল। মা-বাবাদের সাথে তাদের কিছুটা জেনারেশন গ্যাপ ছিল। কিন্তু তাদের সাথে তাদের ছেলে-মেয়েদের জেনারেশন গ্যাপটা হল অনেক বড় ধরনের। প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের উন্নতি আর আবিষ্কারের দ্রুততার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে হিমশিম খেতে লাগলেন তারা। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তারা প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ হিসাবে গণ্য হতে শুরু করলেন। সেরকম একটা সময়ে তারা খুঁজতে শুরু করতেন তাদের সমসাময়িক বন্ধুবান্ধবদের। নিজেদের মধ্যে আড্ডা আর গল্প শুরু হলে মনে হতো যেন নিজ ভুবনে ফিরে আসলেন। এদেরকেই মনে হতো সবচেয়ে আপন। অন্য কোথাও গেলেই যেন মনে হতো, এ কোন জামানায় এসে পড়লাম!, অনেকটা এলিয়েনের মতো।

৪।
মোজাম্মেল সাহেব দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেন। আজকে তাঁর সেই ঘুম ভাঙল সন্ধ্যার পর। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন আজিজ সাহেব। আজিজ সাহেব রিটায়ার্ড প্রফেসার। তার পড়ানোর বিষয় ছিল বোটানি। মোজাম্মেল সাহেবের ঘনিষ্ট বন্ধু তিনি, কিছুটা ভাবুক প্রকৃতির। বিয়ে-শাদী করেননি। মাঝে মধ্যে “গন্তব্যে” এসে থাকেন তিনিও। কথা বার্তা তেমন একটা বলেন না কারো সাথে। যাবতীয় গ্যানের কথা, ভাবের কথা আলাপ আলোচনা করেন মোজাম্মেল সাহেবের সাথে। শৈশব থেকেই তাদের তুইতোকারির সম্পর্ক। আজকে তাকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে।

-মোজাম্মেল, ভুত পেত্নী কি সত্যিই আছে নাকি?
-ঘটনা কি? এই বয়সে ভুত-পেত্নী পেলি কোথায়?
-ভুত পেত্নী না থাকলেও জিন-পরী তো আছে নিশ্চয়ই! কোরান শরীফে স্পষ্ট বলা আছে “জীন” আর “ইনসান।”
-“জীন”-টাই বা তুই পেলি কোথায়?
-দেখি নাই। দেখি নাই, কিন্তু স্পষ্ট শুনলাম। একটু আগেই। মাগরিবের আজানের একটু আগে। আমি পুকুরের পাড় ধরে হাঁটছিলাম। খুব প্রস্রাবের বেগ পেল। তুই যেখানে বসে মাছ ধরিস, ওইখানে, তোর ঐ চাইনিজ বটগাছের গোড়ায় বসে কাজ সারতে গেলাম। কে যেন বলল, ‘স্যার, এইখানে প্রস্রাব করা কি ঠিক হচ্ছে?’ শুনে তো আমি বিরাট ভয় পাইসি।
-ও! এই কথা! আমার মনে হয়, জীন-ভুত না। ঐ গাছটা তার গোঁড়ায় তোর ছোট কাজটা করা পছন্দ করে নাই।
-তাই বলে, গাছ কি আবার কথা বলবে? আমি বোটানির প্রফেসার। আমাকে তুই বলছিস গাছের কথা বলার কথা?
-আচ্ছা, তোর বোটানি কি বলে? গাছপালা কি কারো সাথে কমিউনিকেট করতে পারে? মানুষ বা অন্য প্রাণী বা গাছের সাথে? তাদের কি কোন ভাষা আছে?
-না। তেমন কোন কথা শোনা যায়নি। অন্ততঃ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। গাছপালার প্রাণ আছে, সেইটা প্রমান করেছেন আমাদের ভারতবর্ষের বৈজ্ঞানিক। জগদীশ চন্দ্র বসু। কিন্তু তাদের কমিউনিকেট করার ক্ষমতার কথা কখনো প্রমাণ করা যায়নি।
-ওঃ! তাহলে হয়তো মনের ভুল। তোর অবচেতন মনের কথা শুনে মনে হয়েছে অন্য কারো কথা। বাদ দে।
মোজাম্মেল সাহেব তার নিজের ‘গাছের সাথে গল্প করা’র অভিজ্ঞতার কথা আজিজ সাহেবকে বলবেন কি না, মনে মনে অনেক ভেবেও কুলিয়ে উঠতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত বলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। আজকে সকালে ঘটে যাওয়া গাছের সাথে তার কথোপকথনের বিষয়টা খুলে বলার পর আজিজ সাহেবের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেল।
– বিষয়টা তো তাহলে সিরিয়াস। আর কারো সাথে আলোচনা করার আগে বিষয়টা আরেকটু যাচাই করে দেখে নেওয়া দরকার।
– ঠিক আছে, কালকে সকালেই ব্যাপারটা দেখা যাবে।

তারপর, আজিজ সাহেব, মোজাম্মেল সাহেব, তরফদার সাহেব, সোহেল সাহেব, খলিল সাহেব – এই পাঁচ জনে মিলে তাদের প্রাত্যাহিক রুটিন অনুযায়ী তাস খেলতে বসলেন। তারা খেলেন, লাসা। এই খেলায় বেশ বুদ্ধি খরচ করে কার্ড সাজিয়ে নিয়ে খেলতে হয়। একেকটা গেম খেলতে প্রায় একঘণ্টা কেটে যায়। এরকম তিনচার গেম খেলার পর রাতের খাবার খেয়ে কেউ ঘুমোতে যান, কেউ টেলিভিশন দেখেন, কেউ ইন্টারনেটে ছেলে-পুলে আর নাতি-নাত্নি দের সাথে ভিডিও চ্যাট করেন । কারো ডাক্তারি পরামর্শের দরকার হলে, তাৎক্ষনিকভাবে, পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে বিনা মুল্যে পাওয়া যায়। ওষুধপত্রের ব্যাবহার অনেক কমে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি আর যোগাযোগ ব্যাবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে মানুষ এখন রোগ-শোক থেকে অনেকটাই মুক্ত। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর উন্নতির কারনে মানুষ এখন তার নিজের জেনেটিক পরিবর্তন করে অসুখবিসুখমুক্ত জীবন কাটাচ্ছে। তবে অনেকের মধ্যে একঘেয়েমি, হতাশা, মান-অভিমান, কিংবা জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা এসে যাওয়ায় আত্মহত্যা প্রবনতা কিছুটা বেড়ে গেছে। এক্সিডেন্টের হার কমে গেছে সমস্ত যানবাহন ব্যাবস্থা প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ায়। মানুষে মানুষে সশরীরে দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। কারন, মানুষ এখন সবাই সবার সাথে সার্বক্ষণিক ভাবে যুক্ত থাকতে পারে, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সফটঅয়ারের মাধ্যমে। সেদিক থেকে মোজাম্মেল সাহেবদেরকে কিছুটা প্রাচীনপন্থীই বলা যায়। তারা বাইরের জগতের উৎকর্ষ আর দ্রুততার সাথে তাল না মিলিয়ে এই আশ্রমটিতেই বছরের বেশীরভাগ সময় কাটান। তাদের তাশ চক্রের পাঁচজন ছাড়াও আরও ছয়-সাতজন আছেন যারা এই আশ্রমের মোটামুটি স্থায়ী বাসিন্দা। এর বাইরেও অনেকেই আছেন, যারা বছরের কোন একটা সময় মাস খানেকের জন্য, অথবা দু’চারদিনের জন্য হলেও একবার ঘুরে বেড়িয়ে যান । তাছাড়াও বছরে অন্তত একবারের জন্য হলেও একটা বড় ধরনের পিকনিক অথবা পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়। সেসময় শুধু দেশী বন্ধুরাই না, প্রবাসী কিছু বন্ধুও হাজির হয়ে যান।

৫।
সে রাতে তাদের ঘুম হল কিছুটা কম। এর কারন, কিছুটা হলেও, ঐ গাছ বিষয়ক। তাই ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর প্রাতঃষ্ক্রিয়াদি সেরে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করে এসে অন্যান্য দিনের চেয়ে কিছুটা আগেভাগেই নাস্তার টেবিলে হাজির হলেন। তারপর দেরী না করে মোজাম্মেল সাহেব আর আজিজ সাহেব চলে গেলেন, দীঘির পূর্ব দিকে, সেই বটবৃক্ষের কাছে। মোজাম্মেল সাহেব যথারীতি তার মাদুরটা বিছিয়ে তার উপর বসে পানিতে বড়শী ফেললেন। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের দিনটির পার্থক্য একটাই, আজকে তার পাশে বসে আছেন আজিজ সাহেব।
-স্লামালেকুম, স্যার।
-আজিজ সাহেব কিছুটা চমকে গিয়ে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তাকালেন। মোজাম্মেল সাহেবই প্রথম উত্তর দিলেন। সশব্দেই।
মোজাম্মেলঃ ওয়ালাইকুমাসসালাম। বটবৃক্ষ নাকি?
বটবৃক্ষঃ জী, স্যার। গতকাল সন্ধ্যায় আজিজ স্যারকে একটু ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম বোধহয় । তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমি আসলে চেয়েছিলাম, আজিজ স্যারও যেন আমাদের সাথে আলোচনায় অংশ নেয় । উনি জ্নিঞা মানুষ। তার ডাক নামই ছিল ‘পণ্ডিত’।
মোজাম্মেলঃ তাহলে আজিজও তোমার কথা শুনতে পাচ্ছে ?
বটবৃক্ষঃ অবশ্যই শুনতে পাচ্ছেন । তবে, আপনাদের একজনের কথা অন্যজন শুনতে হলে শব্দ করেই বলতে হবে । আমরা, গাছেরা মানুষের সাথে টেলিপ্যাথিক উপায়ে কথা বলতে পারি, কিন্তু আপনাদের নিজেদের মধ্যে টেলিপ্যাথিক ভাবে কথা বলতে পারেন না। তবে আমারা বিশেষ ব্যবস্থায় এক ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করে দিতে পারি।
মোজাম্মেলঃ তাহলে তো ভালোই হল । কি বল, আজিজ ?
আজিজ সাহেবের প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কাটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। একটু সামলে নেয়ার পর বললেন,
আজিজঃ আমি তাহলে সত্যি সত্যিই গাছের কথা শুনতে পাচ্ছি ? কি আচানক ব্যাপার ! এইটা কিভাবে সম্ভব ?
বটবৃক্ষঃ এইটা স্যার অসম্ভব কোন ব্যাপার না । বহু প্রাচীন কাল থেকেই কিছু কিছু মানুষ গাছের সাথে কথা বলত । বেশিরভাগই ভয় পেয়ে সেই গাছের কাছেই যেতো না, কেউ কেউ আবার গাছই কেটে ফেলত, অথবা মনের ভুল মনে করে, অন্নেরা শুনলে আবার পাগল সাব্যস্ত করে কিনা, সেই ভয়ে কাউকে কিছু বলত না । তারপরও চার পাঁচশ বছর পরপর দুএকজন করে মানুষ সাহস করে গাছের কাছে তাদের সেইসব কথাবার্তা লিখে রাখতেন । বেশীরভাগ কথাবার্তাই হতো সমাজে শান্তি – শৃঙ্খলা বজায় রাখার নিয়ম কানুন, আর উল্টা পাল্টা কিছু করলে তার শাস্তির ভয় দেখানো, আর মানুষের চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান কিছু একটা কল্পনা করে নিয়ে তাকে খুশি রাখার জন্য কিছু উপাসনা বা এবাদতের বুদ্ধি দিয়ে দেয়া হল । মাঝে মধ্যে কোন কোন পশুপখিকে সেই অদৃশ্য শক্তিমানকে খুশি করার জন্য বলি বা কোরবানি দেওয়ার সিস্টেম করা হল। পার্থিব জীবনের অভাব অভিযোগ কমানোর জন্য, যেন অভাবেও স্বভাব নষ্ট না হয়, তার জন্য বেহেশত বা স্বর্গের মুলা ঝুলিয়ে দেয়া হল। আর উল্টা পাল্টা কাজ করলে দোজখ বা নরকের ভয়ভিতি দেখানো হল। আপনারা, যারা যত ধর্মের কথাই জানবেন, দেখবেন, সব কয়টা ধর্মের মুল বানী একি ধরনের। যখন যেযুগে যেমন নিয়ম কানুন দরকার হয়েছে সেই যুগের উপযোগী নিয়ম কানুন সহ একটা করে ধর্মীয় পুস্তক ধরিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের হাতে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী পালিত ধর্মগুলোর কথাই ধরেন, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইসলাম, হিন্দু, সব ধর্মই মানুষ বানিয়েছে সেইসব যুগের চাহিদা অনুযায়ী। সেইসব ধর্মের মুল আইডিয়া মানুষ পেয়েছিল গাছের কাছ থেকে। গাছের কাছে মুল আইডিয়াটুকু নিয়ে, তার সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ভাষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রব্যাবস্থা, সবকিছু মিলিয়ে একেকটা ধর্মের মুল পুস্তক লেখা হল। পাপ-পুন্যের সীমা নির্ধারণ করা হল। তবে, যুগের উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে আরও আধুনিক ধর্মের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রায় পনরশ বছর ধরে নতুন কোন ধর্মও তৈরি হয়নি, নতুন কোন ধর্মীয় পুস্তকও কেউ লেখার সাহস পায়নি।

আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? দুনিয়াতে কি করছেন? কেন করছেন? শেষ পর্যন্ত আপনি কোথায় যাবেন অথবা আপনার আদৌ কোন আল্টিমেট ডেসটিনেশন আছে কি? জীবনের কি কোন অর্থ আছে? নাকি শুধু আসলেন, খেলেন, হাগলেন, বিয়ে করলেন, সেক্স করলেন, বাচ্চা-কাচ্চা পয়দা করলেন, এক সময় পটল তুললেন, এটাই জীবন? এইসব প্রশ্ন নিয়ে বহু আগেই বাঘা বাঘা দার্শনিকরা অনেক কচলা-কচলি করেছে, মাথা ঘামিয়েছে, উত্তর খুঁজেছে। কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর কেউ দিতে পারেনি। কেউ কেউ হয়তো পেরেছে কিন্তু সবাই সেই উত্তরে সন্তুষ্ট হয়নি। তবে এইসব প্রশ্নের খুব সহজ কিছু উত্তর আংশিকভাবে হলেও তারা দিয়েছে, যদিও এইসব উত্তরেও সবাই কনভিন্সড না। যেহেতু এইসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, তাই মানুষ এগুলো নিয়ে এখনো কচলায় এবং ভবিষ্যতেও কচলাতে থাকবে।

আপনারা মানেন আর না মানেন, আপনাদের জীবনের প্রতিটা মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রিত। এবং আপনারা যা চিন্তা করেন সেগুলোও আপনাদের নিজের না। আপনারা হলেন এক-একটা পুতুল, আমিও। আপনাদেকে প্রতিদিনই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বোঝানো হয়, আপনাদের যা আছে তা যথেষ্ট না। আরও লাগবে। কিন্তু ঠিক কতটুকু হলে যথেষ্ট হবে সেটা কখনই বলা হয়না। আর আপনারা এটা নিয়ে ভাবেনোনা। খালি দৌড়ান আরও টাকা, আরও সম্পদ, আরও খ্যাতির পিছনে। সেই দৌড়ের কোন শেষ নাই। জীবনে কখনো একটু বসে জিরানোর সময় পাননা। জীবনটাকে উপভোগ করা অথবা তা না পারলেও জীবনকে প্রশ্ন করার সময় আর মগজও আপনাদের অবশিষ্ট থাকেনা। দৌড়ান আর দৌড়ান। একটা পর্যায়ে জীবন হয়তো আপনাদেরকে বোঝায় আপনারা আসলে কতটা বড়। আপনারা যে এই বিশ্ব সংসারের একেকটা খেলার পুতুল, কিন্তু একি সাথে এই পুরো নাটকের একেকটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যে যার জায়গা থেকে নিজ নিজ ভুমিকায় শুধু অভিনয় করে যাচ্ছেন, এইটুকু বুঝতে বুঝতেই জীবন পার করে দিচ্ছেন । আপনার মধ্য দিয়েই কৌতুহলি স্রষ্টা জেনে নিচ্ছেন, মানব জীবনের খুঁটিনাটি, দুঃখ- কষ্ট, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না রাগ অভিমান। কৌতুক কিংবা ট্রাজেডির অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় আপনাদের ইমোশনাল রেসপন্সটুকুর ব্যাপারেই স্রষ্টার যত কৌতূহল। এজন্যেই আমাদের এতো সব আয়োজন, এতো ঘটনা দুর্ঘটনা। আর আপনারা প্রত্যেকেই সেই মহা-নাটকের এক একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আপনাদেরকে ছাড়া এই নাটক অসম্পূর্ণ। এই ব্যাপারে সুফি কবি রুমি বলছিলেন, “তুমি মহা সমুদ্রে এক ফোঁটা জল নও, তুমি আসলে এক ফোঁটা জলে আস্ত একটা সমুদ্র”।

গাছের মুখ থেকে এসব কথা শুনে মোজাম্মেল সাহেবের খুব একটা প্রতিক্রিয়া হলনা। তার কারন হচ্ছে, তিনি আসলে ধর্ম-কর্মের ব্যাপারে বরাবরই একটু উদাসীন। তার কাছে স্রষ্টার ধারনাটাই পরিষ্কার না। সেরকম কেউ থাকলে থাকতেও পারে, কিন্তু সেজন্য দিনরাত তার উপাসনা করতে হবে, তা তার মনে হয়না। তাছাড়া প্রাচীন সেইসব ধর্মপুস্তক এই আধুনিক সমাজে কতটুকু যুগোপযোগী, সেটা নিয়েও তার মনে অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর কোন ধর্মগ্রন্থই দিতে পারেনি। সব কিছুতেই একটা না একটা গোঁজামিল। আর ধর্মীয় পুস্তকই যদি পুর্নাঙ্গ জীবন বিধান হয়ে থাকে তাহলে দেশে দেশে আলাদা আলাদা সংবিধানেরই বা প্রয়োজন হল? ‘শয়তান’ ব্যাপারটা সম্পর্কেও তার মনে একটু খটকা আছে। ঈশ্বরই যদি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি এই ‘শয়তান’ জিনিষটাকে কেন ছেড়ে দিয়ে রেখেছেন, তাকে মেরে শেষ করলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় । তাকে নিয়ে এতো পরীক্ষা নেয়ার কি আছে? আর স্রষ্টার কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেন, সৃষ্টির ব্যাপারটাতে তিনি এতো ভুলভাল করেছেন কেন? সঠিক একটা ধর্মের লোক ছাড়া অন্য সব ধর্মের লোক কি কারনে সৃষ্টি করেছেন, এবং এখনও করে চলছেন? সেই বেচারাদের কি দোষ অন্য ধর্মের লোকের ঘরে জন্ম নেয়ার অপরাধে সে কেন বেহেশতে যেতে পারবে না?

এদিক দিয়ে আজিজ সাহেবকে বলা যায় মোটামুটি ধার্মিক একজন লোক। ধর্ম-কর্ম খুব একটা না পালন করলেও কথা বার্তা বলার সময় বিসমিল্লাহ্‌ , আলহামদুলিল্লাহ্‌, ইনশাল্লাহ ইত্যাদি অনেকবার করে উচ্চারন করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, স্রষ্টা বলে কেউ একজন অবশ্যই আছেন। সেটা ইসলাম ধর্মের ‘আল্লাহ্‌’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তাই তিনি ফরজ, সুন্নত, ওয়াজিব, ইত্যাদি যতটুকু পারেন, মেনে চলার চেষ্টা করেন। তার কাছে গাছের এইসব কথা বার্তা মোটামুটি ‘নাস্তিক’ এর বিশ্বাসের মতই মনে হল। কাজেই তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন,
আজিজঃ তাহলে সব ধর্মই কি মানুষেরই তৈরি? সব ধর্মীয় পুস্তক মানুষেরই লেখা?
বটবৃক্ষঃ অবশ্যই।
আজিজঃ তার মানে বলতে চাচ্ছ, পবিত্র কোরান শরিফও মানুষের লেখা?
বটবৃক্ষঃ অবশ্যই। কোরান শরিফ হচ্ছে মুহাম্মদ নামের একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদের লেখা বই, যেটা সে সময়ে প্রচলিত কবিতার ছন্দ ও ভাষায়, অনেক ধরনের অস্পষ্ট হেঁয়ালিপূর্ণ বানীর মাধ্যমে মুহাম্মদকে নতুন একটি ধর্মের প্রধান হিসাবে ঘোষণা করে অন্যান্য ধর্মের লোকদেরকে বশে এনে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শাসনকর্তার ভুমিকায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি বই ছাড়া আর কিছুই না। আর ধর্মীয় বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রতিক্রিয়াশীল, আক্রমণাত্মক এবং স্ববিরোধীতাপূর্ণ বই হচ্ছে এই কোরান শরিফ। এই বইতে কোন জায়গায় বলা হচ্ছে, যার যার ধর্ম তার তার কাছে, এবং অন্য ধর্মের কাউকে অসন্মান বা ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ না করতে। আবার সেই কোরান শরিফেই অন্য ধর্মের লোকদেরকে মূর্খ, বোকা, বেজন্মা, ইত্যাদি গালি দিয়ে তাদেরকে প্রথমে হেদায়েতের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে, আর হেদায়েতের যোগ্য না হলে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। অনেক বিবেকহীন মুসলিম আবার নিজেই সেই দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে অন্য ধর্মের লোককে মেরে ফেলার জন্য প্রয়োজনে আত্মঘাতী হতেও পিছপা হয় না। এই একটি বইতেই ধর্ম নিয়ে খুব বেশী তর্ক-বিতর্ক না করে অন্ধ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
আজিজঃ তাহলে বলতে চাচ্ছ, কোরান শরিফ কোন আসমানি কিতাব না? এইটা আমাদের রসুলুল্লাহর লেখা বই? মানে, উনি মিথ্যা কথা বলে, তার লেখা বইকে আল্লাহর লেখা বই হিসাবে চালিয়ে দিয়েছিলেন? আজিজ সাহেবের গলায় রীতিমতো ক্রোধ এবং উত্তেজনা।
বটবৃক্ষঃ আমরা সেটাই জানি। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির অনেক আগেই গাছপালা জন্মানো হয়েছিল পৃথিবীর আবহাওয়া ঠাণ্ডা করে, প্রাণীকুলের খাদ্য এবং অক্সিজেন তৈরি করে গ্রহটিকে বাসযোগ্য করার জন্য। তাই আমরা আমাদের সামগ্রিক গ্যান ভাণ্ডারের তথ্য থেকে পৃথিবীর সব মানুষের সত্যি ইতিহাস জানি। মুহাম্মদ, যাকে মুসলিমরা জানেন শেষ নবী এবং রসুল হিসাবে, তিনি আসলে ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান একজন মানুষ। তিনি একজন ভালো যোদ্ধাও ছিলেন। একি সাথে তিনি একজন কবিও ছিলেন। আর এই সবগুনের সদ্ব্যবহার করে, পিতৃ-মাতৃ হীন একজন সাধারন এতিম মেষপালক থেকে ধীরে ধীরে একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতায় পরিনত হতে পেরেছিলেন। আর তার সেই ধর্ম আর কোরান শরিফকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এক ব্যাক্তিতে পরিনত হয়েছিলেন। তার সময়কার সেইসব মূর্খ আর বোকা লোকদেরকে নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য সেই ধর্ম আর সেই কিতাব খুবই কাজে লেগেছিল। কিন্তু আজকের আধুনিক পৃথিবীতে সেই ধর্মটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গেলে আপনাকে প্রতিটি পদক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হতে হবে। সেজন্য আসলে দরকার হয়ে পড়েছে একটি নতুন আধুনিক ধর্ম এবং একটি নতুন ধর্মীয় বিধিমালার বই।
আজিজঃ তাহলে বলতে চাচ্ছ তোমরা, মানে গাছেরা মিলে আমাদের জন্য নতুন একটা ধর্ম তৈরি করে দিবে? আর আমাদেরকে তা মেনে চলতে হবে?
বটবৃক্ষঃ আপনারা চাইলে আমরা এ ব্যাপারে আপনাদেরকে সহযোগিতা করতে পারি। কিন্তু আপনাদেরকে ঠিক করতে হবে আপনারা সেই দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন কি না।
আজিজঃ তা সেই ধর্মের নাম কি হবে? ধর্মীয় কোন পুস্তকও বলে দেবে নাকি?
বটবৃক্ষঃ সেই ধর্ম হবে ‘সত্য ধর্ম’। অথবা, যেহেতু সত্যি সত্যিই এই ধর্ম বৃক্ষদের কাছ থেকে গ্রহন করবেন, তাই, এর নাম আপাতত ‘বৃক্ষধর্ম’ও রাখতে পারেন। আর আমি প্রতিদিন আপনাদেরকে যা যা বলবো, আপনারা সেটা লিখতে থাকবেন। তাহলে সেটাই হয়ে যাবে আপনাদের ধর্মীয় পুস্তক, যার নাম দিতে পারেন, বৃক্ষ শরিফ।
আজিজঃ সেই ধর্মে ঈশ্বর হিসাবে কাকে মানতে হবে, অথবা, কার উপাসনা করতে হবে ?
বটবৃক্ষঃ সেই ধর্মের ঈশ্বর হিসাবে একটা সর্বশক্তিমান, সবকিছুই যার নিয়ন্ত্রনে, তেমন একটি উৎস বা সত্তার কথা থাকবে, তবে তিনি কারো উপাসনার ধার ধারেন না। তেলবাজী একেবারেই পছন্দ করেন না। যেহেতু, সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রনে চলে, কাজেই পাপ পুণ্য বলে কিছু থাকবে না। বেহেস্ত-দোজখের মতো কিছু থাকবে না। বরং সেই ধর্মের কাজ হবে পৃথিবীটাকেই স্বর্গে রূপান্তরিত করা। উপাসনা করতে চাইলে করতে পারেন, বৃক্ষ-পূজা, অর্থাৎ গাছপালার যত্ন নিবেন ঠিকমতো। তাহলেই আপনা আপনি পৃথিবীর পরিবেশ, আবহাওয়া, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা-সবকিছুই উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।
আজিজঃ সেই ধর্মে নবী- রসুল থাকবে না?
বটবৃক্ষঃ সেইটা থাকলে ভালো হতো, কিন্তু আপনাদের মুহাম্মদ সাহেবতো আবার বলে গেছেন, তিনিই শেষ নবী। আর কোন নবী বা রসুল আসবেন না। কাজেই নতুন কেউ নবী রসুল হতে চাইলে তাকে বিরাট বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। কারন, মুসলিমরা তার পিছনে লেগে যাবে চাকু – চাপাতি – দা – কুড়াল নিয়ে। কাজেই, নবী রসুল না থাকাই ভালো। তবে, আপনারা চাইলে নিজেদেরকে বার্তা বাহক হিসাবে পরিচয় দিতে পারেন, যদিও তাতেও অনেক রিস্ক আছে।
মোজাম্মেলঃ ধর্ম – টর্ম চালু করতে হলে তো কিছু অলৌকিক ক্ষমতার দরকার হবে। কিছু ম্যাজিক অথবা যুক্তির বাইরে অন্যরকম কিছু ঘটনা না ঘটালে মানুষ তো পাত্তাই দেবেনা।
বটবৃক্ষঃ সেটা কোন সমস্যাই না। বিজ্ঞানের এতো উন্নতির পরও মানুষ এখনও কিছু কিছু জিনিশ আবিস্কার করতে পারেনি। যেমন ধরেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, কিংবা, টাইম ট্রাভেল করে অতীত বা ভবিষ্যতে চলে যাওয়া, কিংবা টেলি-পোর্টেশন, মানে মুহুর্তের মধ্যে এক জায়গা থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়া। আমরা কিন্তু সেইসব প্রযুক্তি জানি। প্রয়োজন হলে আপনাদেরকে সেইরকম দুএকটা ট্রিক্স শিখিয়ে দিব। তাহলে মানুষ ঠিকই আপনাদেরকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করবে, আপনাদের কথাকেও গুরুত্ব দেবে।
মোজাম্মেলঃ ঠিক আছে, কিছুটা ধারনা পেলাম। বাকিটাও ধীরে ধীরে বুঝে নেয়া যাবে। তারপর দেখা যাবে, কি করা যায়। আজকে বরং কথাবার্তা এখানেই শেষ করি।
আজিজ সাহেবের যদিও ইচ্ছা ছিল, আরও বিস্তারিত কিছু জানার, কিন্তু এক দিনের কথা বার্তা আর আলোচনার পর তার বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে আঘাত লেগে, যাকে বলে ঈমান দুর্বল হয়ে যাওয়া – তেমন অবস্থা বোধ করায় আপাতত যেটুকু শুনলেন, তাই হজম হওয়ার জন্য তিনিও বিরতিতে চলে যাওয়াটাকেই স্রেয়তর মনে করে ওখান থেকে বিদায় নিলেন। তবে, ঘরে ফেরার পর তার মনে হল, এই ঘটনা মাহবুবকে জানানো দরকার। মাহবুব সাহেব, তাদের বাল্যবন্ধু, পেশায় সাংবাদিক, একাধারে একজন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং একজন কট্টর নাস্তিক। গাছের সাথে কথা বলার বিষয়টা তাকে বলতে গেলে হেঁসে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু কোনভাবে এখানে নিয়ে আসতে পারলে নিজের কানে গাছের কথাবার্তা শুনলে তার কি অবস্থা হয়, ভেবেই তার মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেল। সমস্যা হচ্ছে মাহবুবকে কি বলে এখানে আনা যায়? সে বিষয়ে পরামর্শের জন্য তিনি মোজাম্মেল সাহেবের দ্বারস্থ হলেন। মাহবুবকে ডেকে এনে গাছের সাথে সরাসরি কথা-বার্তা বলিয়ে দিতে পারলে তার কি অবস্থা হয়, দেখার কৌতূহল হল তারও। কাজেই, বুদ্ধিও একটা বের করে ফেললেন। মাহবুব ‘গন্তব্য’তে শেষবার এসেছিলেন বছর খানেক আগে। কাজেই, মোজাম্মেল সাহেব তাকে ঢাকা থেকে কিছু নতুন প্রজাতির বিদেশী ফুলের চারা এনে দেয়ার অনুরোধ, সেইসাথে, পারলে যেন এসে একবার ঘুরে যান, সেই অনুরোধ জানানোর সাথে সাথে একটু রহস্য করে বললেন, ‘একটা চমক আছে তোর জন্যে। একটা ঘটনা ঘটেছে। যেজন্যে আজিজের ধর্ম বিশ্বাস পালটে যাচ্ছে। বা, বলতে পারিস, আলরেডি পাল্টে গেছে।’ সারাজীবন আজিজ সাহেবের সাথে মাহবুবের বন্ধুত্বের বাইরেও একটা তর্ক-বিতর্কের সম্পর্কও রয়ে গেছে। সেটা ধর্ম বিশ্বাস সংক্রান্ত। আজিজ সাহেব পুরোপুরি ধার্মিক মনোভাবের মানুষ, মাহবুব সাহেব পুরোপুরি নাস্তিক আর মাঝখানে মোজাম্মেল সাহেব – ঈশ্বর আছেন নাকি নেই, কোনটাই তিনি নিশ্চিত হতে না পেরে এবিষয়ে দোটানার মধ্যে দুলোদুলি করেন।

যাইহোক, শেষপর্যন্ত মাহবুব সাহেবও পরদিনই সন্ধ্যায় ‘গন্তব্যে’ এসে হাজির। সাথে নতুন ঢাকায় আসা কয়েকটা অর্কিড আর একটা বাওয়াব গাছের চারা। সবার সাথে কুশল বিনিময়ের পর আলাদাভাবে তিনজনে মিলে বসলেন বারান্দার একপাশে। আজিজ সাহেব আর মোজাম্মেল সাহেব তাকে খুলে বললেন তাদের বৃক্ষ সংক্রান্ত আলাপ আলোচনার বিষয়টা। সেইসাথে সেদিন পর্যন্ত বটবৃক্ষের সাথে কথোপকথনের বিষয়ে বিস্তারিত লিখে রাখা একটা নোটবুকও দেখালেন। সবকিছু দেখেশুনে মাহবুবের প্রতিক্রিয়া হল, ‘আমি নিজের কানে না শোনা পর্যন্ত কিছুই বলতে পারব না। দেখি, কালকে সকালে কি ভেল্কি দেখাতে চাস। তখনই বোঝা যাবে বিষয়টা কি।’

৬।
পরের দিনের কথোপকথনের মাধ্যমে যেসব বিষয়ে আলোচনা হল, তার বেশিরভাগই গাছের কথাবার্তা। এখানে ব্যাক্তি মোজাম্মেল সাহেব, আজিজ সাহেব কিংবা মাহবুব সাহেব আলাদা করে কে কি বলেছিলেন, তা বলা ঠিক হবে না। কারন, এরই মধ্যে আমাদের এই বৃক্ষ যা বলেছে, কোন কট্টর ধার্মিকের কানে গেলে সেই গাছের কপালে যে চাপাতি কিংবা চাইনিজ কুড়ালের কোপ পড়বেনা, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বলা বাহুল্য, এই জাতীয় কথা বার্তা অনেক আগে থেকেই বই-পুস্তকে, ব্লগে কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে বহুবার বলা হয়ে গেছে, এবং তার জন্য অনেককেই চাপাতির কোপ খেয়ে মরতেও হয়েছে, অনেকে আবার এসব বিতর্কিত কথাবার্তা বলে, চরমপন্থিদের হুমকি-ধামকি খাওয়াটাকেই সুযোগ হিসাবে ব্যাবহার করে অন্য কোন উন্নত দেশে অ্যাসাইলাম নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস এবং বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে দিয়েছে। আমাদের এই গল্পের লেখক, বৃক্ষের সাথে মানুষের কথাবার্তাগুলিকে কল্পগল্প হিসাবে মেনে নিয়ে, এর কোন দায়দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। এবং, এই ফাঁকে মনে করিয়ে দেয়া ভাল, ঘটনাটা ২০৩৫ সালের, মানে ভবিষ্যতের কোন একটা সময়ে ঘটার সম্ভাবনা হিসাবে গ্রহন করে, প্রকাশিত প্রস্তাবনাগুলির যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মাথা ঘামাতে চাইলে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু যুক্তি ও বিশ্লেষণগুলিকে নির্দিষ্ট কোন ধর্মের অনুসারি তাদের ধর্মের অবমাননা কিংবা কোন ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী, সন্মানিত এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্বের প্রতি অসন্মানজনক এবং আক্রমণাত্মক মনে করলে, তাকে ঠাণ্ডা মাথায় নিজের বিবেক এবং যুক্তি দিয়ে বিচার করে, এসব যুক্তি বা তথ্য গ্রহন বা বর্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হল।

#এস্কিউ
– শুভ্রনীল ঈশা
(istishon.com)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *