জবিরুল

সেইদিন, বাসায় ছিলাম একা। শুয়ে শুয়ে ধ্যান করতেছিলাম নাকি ঘুমায়ে গেছিলাম, মনে নাই।

“স্যার! ভালো আছেন?”

আমি বিরক্ত মেজাজে চোখ মেলে দেখি অন্ধকার ঘরের দরজার কাছে হাতে সিকিউরিটি চেক করার লোকদের হাতে যে লাইট জ্বালানো লাঠির মত জিনিষটা থাকে, সেটা নিয়ে এক বৃদ্ধ দাঁড়ায়ে আছে। আমি বেশ রাগী রাগী গলায় বললাম,

– কি চাও! এতো রাতে তুমি আমার ধ্যান না ঘুম, যাই হোক, সেটা ভাঙালে কোন সাহসে? আর ঘরে ঢুকলে কিভাবে? আর নীচে দারোয়ান ছিল না?
– স্যার! মাপ কইরা দিয়েন। আমার নাম জবিরুল। আমি একজন দেবদুত। আমারে দেবরাজ অম্নি মশাই আপনার জন্য কিছু সংবাদ দিয়ে আমাকে পাঠাইছেন।
– অম্নি! সে আবার কে? কোথায় থাকে? সে আসলোনা ক্যান! আর তুমি কে?
– স্যার, অম্নি একজন ব্রিদ্ধ বোকাশোকা কিন্তু জ্ঞানী লোক। তিনি বাতব্যাথা, ডায়াবেটিস, হারটের সমস্যায় জর্জরিত। তাই আমাকে পাঠায়ে দিলেন। আমি তার ডাকপিয়ন।
– লোক মারফত খবর না পাঠায়ে তাকে আমার ফেইজবুকে ফ্রেন্ড লীষ্টে ঢুকে, বা ম্যাসেঞ্জারের ইনবক্সে অডিও ভিডিও কল করতে বলেন। আমি এইসব ডাকপিয়ন পছন্দ করিনা।
– স্যার, আমরা পুরানা আমলের লোক। তিনি, বা আমি ইন্টারনেট, মোবাইল কিছুই চালাইতে পারিনা।
– আচ্ছা, ঠিক আছে, কি চিঠিপত্র নিয়ে আসছে, টেবিলের উপর রেখে তাড়াতাড়ি ভাগো। আমি উত্তর লিখে রাখব। তুমি কালকে এসে নিয়ে যেও। আর খবরদার! রাত দশটার পরে সকাল দশটার আর কোনদিন আমার সামনে আসবে না। তাইলে তুমি বুড়া হও আর চ্যাংড়া হয়, হাতের কাছে পেলে চড়ায়ে চাপার দাত ফেলে দিব!
– জি আচ্ছা, আমার ইয়াদ থাকবে, স্যার। কিন্তু তিনি তো কোন চিঠিপত্র দেন নাই। তিনি বা আমি লেখাপড়া করি নাই। আমি স্যার মুখে মুখে খবরগুলি বলব, আপনি লিখে রাখবেন।
– মুশকিলে ফেললে। আমিতো কাগজে কলমে কিছু লিখিনা। মোবাইলে টাইপ করি। টাইপ করে রাখলে চলবে?
– বুঝতে পারতেছিনা! মানে এভাবে লিখলে কি লেখাগুলি মুছে যাওয়ার, ছাগলে খেয়ে ফেলার, পুড়ে যাওয়ার বা ভেঙে যাওয়ার ভয় আছে নাকি? এর আগে, এরকম খবরাখবর দেওয়ার পর আসল খবরগুলি ছাগলে খেয়ে ফেলেছিল, আর ভুলভাল টুক্লিফাই করে লেখা গল্পের বই নিয়ে নানার ফিতনা ফ্যাসাদ হয়েছে, হচ্ছে। এজন্য, অম্নি মহাশয় চাচ্ছেন, একটু ভালো পড়ালেখা জানা একজন নবী টাইপের লোক। কমপক্ষে এম এ পাশ।
– আমি তো এম এ পাশ না, এম কম পাশ, টাইন্যা টুইন্যা সেকেন্ড ক্লাশ।
– ক্লাশ কোন ব্যাপার না, পাশ হলেই হবে। আর শুনেছি, “এম কম” আসলে “এম এ”র চেয়ে কম না, আসলে বেশীই। টাকা পয়সা ব্যাবসা নাকি আপনেরা ভালো বুঝেন।
– ও আচ্ছা। ঠিক আছে, এখন তোমার খবর বল!
– “পড়েন!”
– অই মিয়া! কি পড়ব! তুমি চিঠিপত্র কিছুই আনো নাই, পড়বো কি?
– আচ্ছা, তাইলে স্যার, “লেখেন!”
– অই মিয়া, কইলাম না, আমি লেখালেখির মধ্যে নাই। বলতে পারো, “টাইপ করেন!”
– জি আচ্ছা, স্যার, “টাইপ করেন।” “টাইপ করেন অম্নির নামে।”
– অই মিয়া, তিনি নিজেই টাইপ করতে পারেন না, লেখাপড়াও জানেন না, তার নাম নিয়ে টাইপ করতে হবে কেন? তুমি পরের লাইন বল!
– “যিনি তোমাদেরকে কলম দিয়ে লিখতে শিখিয়েছেন!”
– অই মিয়া! একটু আগেই কইলা তিনি লেখাপড়া জানেন না, তিনি কেমনে আমারে কলম দিয়ে লিখতে শিখাবেন! ফাইজলামির আলাপ বাদ দিয়ে আসল খবর কিছু থাকলে বল!
– আসল খবর হইল, আমাগোর মহানবীসাব লোক ভালোই ছিল। আমি তারে কিছু খবর আইন্যা দিসিলাম। সে তো প্রথম দিনে হেরা পাহাড়ের গুহায় আমারে দেইখ্যা অজ্ঞান হয়া গেল। পানি ছিটা দিয়া, জ্ঞান ফিরানীর পর তারেও বলছিলাম “পড়!” সে কান্নাকাটি করে, উলটা আমারে “স্যার” ডাইক্যা বলে, “স্যার, আমি পড়েলেখা শিখি নাই! গরীব এতিম ছিলাম। এখন না বিবির ব্যবসা দেইখ্যা ইট্টু টেকা পয়সার মুখ দেখতাসি। তা, যা বলার বলেন, আমার ইয়াদ রাখার ক্ষমতা খারাপ না। আমি মনে মনে পড়তে পড়তে আমার বিবির কাছে গিয়ে বলব। সে লিখে রাখবে।”

আমি তারে যেসব খবর দিসিলাম, সে ভয়ের চোটে আসলে বেশীরভাগ খবর ভুইল্যা যাইত। সেইদিনও, আমার খবর লয়া তার বিবির কাছে দউড়ায়া গিয়া থরথর করে কাপতেছিল। সে সমানে ঘামতেছিল, কিন্তু তার বিবিরে বললো, “আমারে একটা চাদর দিয়া মুড়ায়া দেও। আমার খুব ঠান্ডা লাগতেছে। আমি বিরাট ভয় পাইছি। হেরা গুহায় ধ্যান করার সময় একটা ভুত আসছিল! সে আমারে পড়ালেখা জানিনা শুইন্যা বিরাট ধমক দিসে। আমি কালকে থাইক্যা নাইট ইস্কুলে যামু।”

যাইহোক, তার পরেও কিছু খবরা খবর দিয়ে গেছিলাম। কিন্তু সে সেইসব খবর না লেইখ্যা সে কয়টা বিয়া করবে না করবে, পালক ছেলের বউকে বিয়ে করতে পারবে কিনা, এই সব খবর অম্নীর নামে চালায়ে দিত। তার আয়েশা বিবি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছিল, এইসব চাপাবাজির কথা। সে তখন তারে ধমক দিসিল, “রাখো তোমার আল্লাহু কথা! চাপাবাজি ছাড়ো! তোমার আল্লাহ্‌র কি খায়াদায়া কাম নাই, একটা কইরা বিয়া করবা, আরেকটার লগে ইটিশ পিটিশ করবা, আর ওহী আনবা, – নবীরা জত খুশী বিয়া করবে – আর আমরা তুমি মইরা গেলেও কারো লগে বিয়াও বইতে পারমু না, শুকনা কাঠ হয়া যামু, এইসব ওহী টহী বাদ দেও। আর একটা বিয়ার কথা যদি কানে আসে, আমার আব্বাজানরে দিয়া এমন পিটনি দিমু, বিয়াশাদীর কথা ভুইল্যা তখন বনবাসে জাইতে হবে।”

তখন থাইক্যাই আসলে আমি আর কোন খবরাখবর আনা বাদ দিয়া দিসিলাম। আল্লাহ মহাশয়ও তার উপরে রাগ করেছিলেন। সেইজন্যে শেষ জিবনে তিনি খুব শাস্তি পায়া মরছেন। তার কুনো দোয়াই কবুল হয় নাই।

আরে স্যার, বুঝেন না, আল্লায় নাকি ঈশা নবীরে সশরীরে ঊড়ায়া লয়া গেছিল, যেন তারে মারতে না পারে! সেই নবী নাকি মরা লাশ জ্যান্ত করতে পারতেন। তাইলে আমাগর মহানবী সাবে আল্লাহর এতো পেয়ারের লোকেরে ক্যান বাচাইলেন না? আর এইটা কেমন নবী, জ্বরের ধাক্কায় মইরা গেল, কিন্তু নিজেরেই সুস্থ্য করতে পারল না? আসলে শুধু তিনি না, তার দলবল সবাই ছিল দুষ্ট, আর অভিশপ্ত। দেখলেন না, একশো বছরের মধ্যে এক্কেবারে নির্বংশ হয়া গেলেন!

– হুম! কথা তুমি মন্দ কও নাই। তা আমি এখন কি করতে পারি?
– স্যার, আপ্নে ত পড়ালেখা, ইন্টারনেট এইসব ভাল বুঝেন। আপ্নে একটু এইসব খবরা খবর মাইনষেরে জানান। কারন এই মহানবীর কান্ডকীর্তি এখন লোকের মুখে মুখে। তার কারনে আল্লাহসহ অনেক ভাবে বেঈজ্জতি হচ্ছেন। মানুষ তারে ভুল বুঝতেছে। তিনি আসলে লোক ভাল। তিনি সরমে, তার আরেকটা আকিকা করে, এফিডেভিট করে নতুন নাম ধারন করেছেন। তার বর্তমান লীগ্যাল নাম “অম্নি।” অম্নিপয়েন্ট নামের একটা শব্দ থেকে তার নাম হয়েছে অম্নি। বাংলায় ভুল উচ্চারনে কেউ তারে যদি “এমনি এমনি” বলে, তাতেও তিনি মাইন্ড করবেন না। কারন, যা হওয়ার, এমনি এমনি হয়। তিনি তার জন্যে দায়ি নয়। মানুষকে বা কাউকেই তিনি কিছু দেননা, কারও কাছে তিনি কিছু চানও না। তিনি সবাইকে, সবকিছুকেই ভালবাসেন, শর্তহীন ভাবে, সমানভাবে। তার কাছে কেউ ছোট বড় না, সবাই সমান।

#এস্কিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *