অনুরাধার প্রেম গল্প

আমার গাঁয়ের সাহসি হিন্দু অনুরাধা স্কুলে, পথে, বিলে, নদীতে সর্বত্রই সাহসের পরিচয় দিতো খুব। অন্ধকার অমাবশ্যার রাতে যেখানে ছেলেরা সাধারণত ঘুটঘুটে অন্ধকারে বের হতোনা ভয়ে, সেখানে অনুরাধা একাই ছুটে যেতো এ বাড়ি, সে বাড়ি জল-কাদা ভেঙে। মধ্যবিত্ত কৃষক বাবা রমণী ঘোষ আকস্মিক মারা গেলে, পুরো সংসারের ভার পরে ১৬-বছরের অনুরাধার উপর। বাকি ছোট এক বোন, আর ৬-বছরের একদম ছোট ভাইটি মুলত পুরোই মান্য করতো অনুরাধাকে। বিধবা মা-ও মুলত সব দায়িত্ব অনুরাধাকে দিয়ে নিশ্চিত ছিলেন হরিনাম জপ আর পুজা-অর্চণা নিয়ে।
:
নানা কাজে অনুরাধাদের বাড়ি আসতো পাশের বাড়ির ২-সন্তানের জনক মোস্তফা কামাল। কামালের বউ নার্সের চাকুরিসূত্রে থাকতো জেলা হাসপাতালে। তাই স্কুল পড়ুয়া দুটো সন্তানকে নিয়ে গাঁয়ের বাড়িতেই অবস্থান করতো কামাল। ১০/১৫ দিন পরপর নার্স স্ত্রী নাসিমা বাড়ি আসতো সন্তান আর স্বামীর টানে। মোস্তফা কামাল শহরে যেতো প্রতি সপ্তাহে স্ত্রীর কাছে। সেই সুবোদে নানা জিনিসপত্র সদাই আনতে দিতো অনুরাধা মোস্তফাকে। পরোপকারী মুস্তফাও অনুরাধার কোন ফরমাস ফেলতে পারতো না কখনো। দাদা বলে ডাকা মোস্তফার সাথে এভাবে ক্রমে সম্পর্ক হাসিঠাট্টা, ক্রমে হাত ধরাধরি এবং পরবর্তীতে গভীরতর সম্পর্ক হয় অনুরাধার, যা কালক্রমে ঘন প্রেমে রূপান্তরিত হতে সময় লাগেনা একদিন। এক সময় মোস্তফা বিয়ে করতে চায় হিন্দু সুশ্রী অনেক জমি ছেড়ে যাওয়া বাবার সাহসি কন্যা অনুরাধাকে। অনুরাধাও মনেপ্রাণে চায় মোস্তফাকে। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। সাহসি অনুরোধা প্রেমের জন্যে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে চায় বিনা সঙ্কোচে।
:
মা কোনক্রমেই রাজি হয়না অনুরাধার ধর্মত্যাগের প্রস্তাবে। ভাই বোনও প্রবল আপত্তি তোলে মোস্তফার সাথে এ সম্পর্কে। প্রথমত মোস্তমা অন্য ধর্মের, তারপর সে বিবাহিত ২-সন্তানের জনক, স্ত্রী এখনো বর্তমান এবং সেও এ গ্রামেরই মেয়ে। কাজেই এ সম্পর্ক কোন ক্রমেই মানতে পারেনা মা, বোন আর ছোটভাই। কিন্তু মোস্তফাকে ভুলতে পারেনা অনুরাধা। সাহসি অনুরাধা প্রতিদিন প্রতিরাতে স্ত্রীহীন মোস্তফার খালি ঘরে গিয়ে দেখা করে প্রেমিক মোস্তফার সাথে। বুদ্ধি চায় তার কাছে কি করবে সে। প্রেমিক মোস্তফা বলে, “স্ত্রী নাসিমাকে ম্যানেজ করতে পারুম আমি, কিন্তু প্রধান বাঁধা তোমার মা, বোন আর ভাই। তাদেরকে ঠান্ডা করতে পারলেই আমাদের বিয়ের পথে আর কোন বাঁধাই থাকেনা”।
:
আবার বোঝাতে চায় সাহসি অনুরাধা মাকে তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারটি। কিন্তু বিধবা মা হরি, রাধা, কৃষ্ণ সব দেবতার নামে শপথ করে বলে, “ইসলাম গ্রহণ করলে আর বিবাহিত মোস্তফাকে বিয়ে করলে আত্মহত্যা করবে মা তার সামনেই”। এবং দৃঢ়তায় বলে নরম প্রকৃতির মা- “আমি বাইচা থাকতে এটা কখনো হইতে দিমুনা, আমি আর আমার ২-সন্তান মরলেই তুই বিয়া করিস মোস্তফাকে, আর ত্যাগ করিস তোর মা বাবার সনাতন ধর্ম”। প্রেমে উন্মাদ অনুরাধা এবার রাতে শুয়ে শুয়ে একক পরিকল্পনা করে মোস্তফার সাথে তার ভবিষ্যত সুখ-স্বপ্নের। কেবল এ সুখের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বিধবা মা, বোন সবিতা আর ভাই নিরঞ্জন। হঠাৎ এ পথের ৩-কাঁটা সরাতে মন বিদ্রোহ করে ওঠে অনুরাধার মদন দেবতার তীরে।
:
পরদিন মোস্তফাকে অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট এনে দিতে অনুরোধ করে প্রেমিকা অনুরাধা। এবং রাতে নিজ পরিকল্পনায় খাবারের সাথে মা, বোন আর ছোট ভাইকে কৌশলে এ ট্যাবলেট খাওয়ায় সে। গভীর ঘুমে অচেতন ৩-জনকে বড় দা দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে অনুরাধা। হ্যা প্রেম পাগল অনুরাধা হত্যা করে নিজ মা, আপন বোন আর ছোট ভাইকে। হত্যার পর ডেকে আনে পাশের বাড়ি থেকে মোস্তফাকে। এবং লাশ দেখিয়ে বলে- “তোমাকে পেতে সবাইকে হত্যা করেছি মোস্তফা, কেবল তোমাকে পেতে”। অনুরাধার এ কান্ড দেখে বাকরহিত হয় মোস্তফার। বলে-“কি করছো তুমি অনুরোধা? এখন এই লাশ মানুষে দেখলে কি হবে তোমার আর আমার? বিয়েতো দুরের কথা ফাঁসি হইবো তোমার আমার। আমি গেলাম আমার ঘরে, এই পাগলামির মধ্যে আমি নাই”।
:
মোস্তফার সহযোগিতা না পেয়ে একে একে মা, বোন আর ভাইর লাশ টেনে খরস্রোতা মেঘনার জলে ভাসিয়ে দেয় তাদের ৩-জনকেই। রাত ফর্সা হওয়ার আগেই ঘর পরিস্কার করে এবার পুনরায় যায় মোস্তফার ঘরে। অনুরাধার এ কান্ড দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকা মোস্তফা বলে- “একজন বিবাহিত পুরুষের জন্যে যে মেয়ে তার নিজ মা, বোন আর ভাইকে খুন করতে পারে, তারে কিভাবে বিয়া করুম আমি? সেই মাইয়া কি মানুষ নাকি রাক্ষসি”? “তোর কারণে রাক্ষস হইছি আমি, এইবার ক বিয়া করবি নাকি তোরেও পাঠামু যমের ঘরে”? লাল টকটকে চোখে এবার কালীরূপী মোস্তফার দিকে তাকায় অনুরাধা। দরজা খুলে মোস্তফা ধানক্ষেতের আল ধরে দৌঁড়াতে থাকে নদীর পাড় ঘেষে। মোস্তফা জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে সে। সে কেবল অন্ধ প্রেমুিকিা অনুরাধা থেকে নিজের জীবন বাঁচাতে প্রাণপণে দৌঁড়ুতে থাকে বিল-মাঠ-ফসলের ক্ষেত ভেঙে অজানার পথে। মোস্তফার মনেও থাকেনা, বিছানায় তার ২-সন্তান অঘোরে ঘুমুচ্ছে, পাশে বড় দা হাতে লাল রক্ত-চোখে মহাকালীরূপী প্রেমিকা অনুরাধা!

১ thought on “অনুরাধার প্রেম গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *