বই চোর

১৯৯১ মার্চ মাসের ১৮ তারিখ। এইচ এস সি’র টেষ্ট পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। আমি থাকি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের ষ্টাফ কোয়ার্টারে। সেদিন খুব ভোরে, ফেলে দেয়া যায়, এরকম কয়েকটা রাফ খাতা একটা কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগে ঢুকিয়ে, আমার ক্লাসমেট আর ক্লোজ ফ্রেন্ড জুয়েলের বাসায় যাওয়ার কথা বলে আমার বাসা থেকে বের হলাম। তার সাথে আমি অংক আর ফিজিক্সের কিছু জটিল বিষয় একসাথে সারাদিন ধরে পড়াশুনা করব। তবে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কেওয়াটখালি, অর্থাৎ, তার বাসার দিকে না গিয়ে আমি ময়মনসিংহ রেলষ্টেশনে উপস্থিত হলাম। জুয়েলের বাসায় যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারন, টেষ্ট পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর জুয়েল তার বাবার সাথে ঢাকায় গেছে, তার বড় ভাইয়ের বাসায়। আমি তাই টিকেট না কেটে পদ্মা এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনে চেপে বসলাম। কমলাপুর ষ্টেশন পৌঁছানোর আগেই তেজগাও ষ্টেশনে কোন কারনে ট্রেনটি থামায় সেখানেই নেমে গেলাম। তারপর, জুয়েলের বড় ভাইয়ের বাসার দিকে না গিয়ে প্রথমে গেলাম আজিজ সুপার মার্কেটে। সেখানেই দিনের প্রথম অপারেশনটা চালাবো।

এইফাঁকে বলে রাখা ভালো, আমি তখন ময়মনসিংহ কেন্দ্রীক আন্তঃজেলা বইচোর বাহিনীর প্রধান এবং ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বইচোর। অবশ্য, বিষয়টাকে চুরি বললে কম বলা হয়, কারন আমাদের কাজকারবার করতাম প্রকাশ্য দিবালোকে, জনসন্মুখে। তবে একে আবার ডাকাতি বা ছিনতাইও বলা যায় না, কারন আমরা কাউকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে, বলেকয়ে, ভয় দেখিয়ে বইপত্র হাপিশ করতাম না। আমরা নিয়মিত দলবেঁধে শহরের পাবলিক লাইব্রেরী, মুসলিম ইন্সষ্টিটিউট লাইব্রেরী, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, শিশু একাডেমী লাইব্রেরী থেকে আমাদের পছন্দ এবং প্রয়োজনমত যে কোন বাংলা এবং ইংরেজী বই, কাউকে না বলে, কিছু গোপন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ায় যে যার মত করে সাথে নিয়ে বাসায় চলে আসতাম। সেসব বই ফেরত দেয়ার প্রশ্নই আসে না। এভাবে সেই লাইব্রেরীগুলি থেকে প্রচুর রচনাবলী, উপন্যাস সমগ্র, ঈদসংখ্যা, ব্যডমিন্টন, দাবা খেলা বা সাঁতার শিক্ষা পর্যন্ত বহুবিধ বিষয়ে নেয়ার, পড়ার এবং জ্ঞান অর্জনের মত যত বই ছিল, সব নিজেদের মালিকানায় নিয়ে সেই ক’জন বিশিষ্ট চোর একসাথে মিলে “প্রত্যাশা পাঠাগার” নামে একটা লাইব্রেরী খুলে ফেললাম, কলেজের মাঠের কোনে, আমাদের মুরুব্বী বিয়াস ভাইদের বাসার সামনের দিকের ছোট্ট একটা টিনশেড ঘরে। পাড়ার পড়ুয়া ছেলেপুলে এমনকি বৃদ্ধরাও ত্রিশ টাকা ভর্তি ফী আর মাসিক দশ টাকা চাঁদা দিয়ে যত খুশী বই ধার নিয়ে পড়তো। এক পর্যায়ে হুমায়ুন আহমেদ স্বয়ং ত্রিশ টাকার চেক পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন এবং তার ব্যাক্তিগত সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু বই আমাদেরকে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

যাইহোক, পাঠাগার বা লাইব্রেরীতে যখন পড়ার মত আর কোন ভালো বই পাওয়া যাচ্ছিলনা, তখন শেষ একটা অপারেশন হিসেবে মার্ক টোয়েনের চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা রচনাসমগ্রটি হস্তগত করে পুরাতন বই সংগ্রহের কাজে ইতি টানলাম। ততদিনে শিশু একাডেমী লাইব্রেরীতে শিশুদের জন্যে রাখা কিছু শিশুতোষ বই ছাড়া কিশোর বা বড়দের পড়ার জন্যে যত বই ছিল, সেগুলির শক্ত মলাটগুলি খুলে সেই আলমারীতে সাজিয়ে রেখে অন্য পৃষ্ঠাগুলি খুলে এনে নতুন করে বাধাই করে আমাদের লাইব্রেরীতে জড় করেছি। সমসাময়িক কোন বই সে সব জায়গায় আর পাওয়া যায়না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা নজর দিলাম শহরের নামীদামী বইয়ের দোকান কবীর লাইব্রেরী, পারুল লাইব্রেরী, শাহজাহান লাইব্রেরী, সংকলন, ইত্যাদি দোকান থেকে তো বটেই, বিদ্যাময়ী স্কুলের পাশের গলির প্রগতি লাইব্রেরীতেও নিয়ম করে ঢু মারতে লাগলাম। প্রগতি লাইব্রেরীর রথীন্দ্রদাদা আমাদের অত্যাচারে একপর্যায়ে তার লাইব্রেরী ব্যাবসায় ধ্বস নামায় ব্যাবসা বন্ধ করে হাড়ি-পাতিল- তৈজসপত্রের দোকান খুললেন। অন্য লাইব্রেরীগুলি অবশ্য টিকে গিয়েছিল, আমাদের আক্রমনের প্রকোপ বা ঘনত্ব কিছুটা কমিয়ে দেয়ায়। একটা সময় পর্যন্ত আমাদের নিজেদের মধ্যে কিছুটা অলিখিত প্রতিযোগিতাও ছিল। যেমন, একদিন সকালের দিকে চোর বাহিনীর মোটাসোটা সদস্য প্লাবন পারুল লাইব্রেরী থেকে ঈমদাদুল হক মিলনের বিশাল মোটা প্রেমের গল্প সমগ্র সংগ্রহ করে সবাইকে গর্বের সাথে দেখিয়ে বেড়াতে লাগল। তাই বাধ্য হয়ে, দুপুরের পরপর, যখন লাইব্রেরীগুলিতে বিক্রেতারা কিছুটা ঝিমুতে থাকে কাউন্টারে বসে বসে, তখন সংকলন লাইব্রেরী থেকে সেই একই বই, সাথে বাড়তি হিসাবে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান সংগ্রহ করে এনে তাকে মানতে বাধ্য করলাম, এই লাইনে আমিই সবার ওস্তাদ।

এইচ এস সি সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর, ১৯৯০ সালের জুলাই আগষ্ট মাসের দিকে আমি ঢাকার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট আর নিউ মার্কেট পরিদর্শন করে হাবভাবে যা বুঝলাম, তাতে মনে হল, আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি-অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে ঢাকা হতে পারে একটা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র। আমরাও গভীরভাবে ভাবছিলাম, ময়মনসিংহ শহরের সীমিত গন্ডিতে কাজ করে এদের ব্যাবসার উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া ঠিক না। জেলাশহরের সীমানা পার হয়ে আমাদের দলটিকে আন্তঃজেলা বইচোর বাহিনীতে উন্নিত করা যায় কিনা, সেই চিন্তাভাবনা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সেই যাত্রায় সুনীলের পূর্ব-পশ্চিম (দুই খন্ড), সৈয়দ শামসুল হকের শ্রেষ্ট উপন্যাস, গল্প এবং কবিতা, হুমায়ুন আহমেদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, শীর্ষেন্দুর দূরবীন, সমরেস মজুমদারের কালবেলা সহ গোটা দশেক বই নিয়ে ময়মনসিংহে ফীরে ঢাকার অবারিত কর্মক্ষেত্র আবিষ্কারের কাহিনী আর ঢাকার লাইব্রেরীর সেলস ম্যানদের সীমাহিন উদাসীনতার সুবর্ণ সুযোগ নেয়ার ব্যাপারে জুয়েলকেও উদ্বুদ্ধ করে ফেললাম।

১৯৯০ সালেই আমি আর জুয়েল মিলে দুইবার অভাবনীয় সফলতার সাথে আমাদের যৌথ অভিযান চালালাম। আমি আমার বাসায় বলি, আজ জুয়েলের বাসায় বোটানী পড়তে যাচ্ছি, জুয়েল তার বাসায় জানায়, সে আমার বাসায় সারাদিন ইংলিশ গ্রামার শিখবে। আর সেরকম দিনের বিকেলবেলা আমি আর জুয়েল নিজেদেরকে খুঁজে পাই ঢাকার শাহবাগের জাতীয় যাদুঘরের সামনে। নানান ধরনের গল্প, উপন্যাস আর কবিতার বইবোঝাই দুটি করে ব্যাগ মাথার নীচে রেখে, খোলা মাঠে শুয়ে আছি, আর ভাবছি, দেশের সাহিত্যের উন্নতির জন্যে, মানুষের বই কেনা এবং বই পড়ার আগ্রহ বাড়ানোর জন্যে কি কি করা যায়। এইচ এস সি টেষ্ট পরীক্ষা আর মূল পরীক্ষার মাঝের কিছু দিনে সেরকম একটা অপারেশন সফলভাবে শেষ করার পর এলো সেই কালো দিন।

যা বলছিলাম, সেই ১৮ই মার্চের সকালে আজীজ সুপার মার্কেটে সংক্ষিপ্ত, প্রাথমিক এবং গা গরম করা হামলার ফলাফল ছিল যথেষ্ট উৎসাহব্যাঞ্জক। উল্লেখযোগ্য কোনরকম ঝামেলা ছাড়াই দুইখন্ড সাতকাহন, কালপুরুষ (সমরেশ মজুমদার), নীললোহিত সমগ্র আর ছোট সাইজের কয়েকটা বই নিয়ে চলে গেলাম আসল জায়গা, নিউ মার্কেটে। আবহাওয়া মন্দ না। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে আমার ব্যাগ ভর্তি হয়ে ছিঁড়ে পড়ার মত অবস্থা। এর মধ্যে নগদ উনত্রিশ টাকায় কেনা বই দুইটা। বইগুলি ব্যাগসহ জাদুঘরে ঢোকার সময় যেখানে ব্যাগপত্র জমা রাখা হয় সেখানে রেখে দুপুরের পর নাহয় আরেক দফা অভিযান চালাবো, চিন্তা করতে করতে এগুচ্ছি। হঠাৎ করে চোখে পড়লো, খান ব্রাদার্স নামের এক লাইব্রেরীর কাউন্টারে বসে দোকানের বৃদ্ধ মালিক পত্রিকা পড়ছেন। কাজেই একটা ফিনিশিং টাচ দেয়ার জন্যে বইয়ের ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে কাউন্টারের সামনে রেখে বই বাছাই করতে নেমে গেলাম। নীল লোহিতের লেখা “তিন সমুদ্র সাতাশ নদী” বইটা পেয়ে মনে হল, যাক, পাওয়া গেল তাহলে! অনেক দিন ধরেই খুঁজছিলাম, কিন্তু কোথাও পাইনি।

বইটা আমার প্যান্টের পিছন দিকে শার্টের নীচ দিয়ে ঢুকিয়ে সারতে পারিনি পুরোপুরি, এমন সময় সেই বৃদ্ধ দেখি চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। আর সেইসাথে আশেপাশের কয়েকজন দোকানদারকেও হাঁক দিলেন। আমি গা ছেড়ে দিলাম। যা হয় হবে! মেরে তো আর ফেলবে না! দেখি না, কোথাকার পানি কতদূর গড়ায়, এই ভাব নিয়ে খাম্বার মত দাঁড়িয়ে থাকলাম, যদিও পরে অনেকবার মনে হয়েছিল, সেই সময়টুকুতেই সম্ভবত ঝেড়ে একটা দৌড় দেয়া উচিৎ ছিল।

এরপর কিছুক্ষনের মধ্যে দোকানের আশেপাশে ভীড় জমে গেল। সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু আমি – পরিষ্কার জামাকাপড়, দেখে ভদ্র পরিবারের ছেলে বলেই মনে হয়। কিন্তু সে কিনা বই চুরি করেছে! তাও আবার একটা দুইটা না, আমার ব্যাগভর্তি চুরি করা বই! সংখ্যায় একত্রিশটা। তার মধ্যে রশিদ সহ মাত্র দুইটা!

শুরু হল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ। নাম বললাম, সাইফুল ইসলাম। এইচএসসি পড়ি। পিতার নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি ময়মনসিংহ শহরের ছোট বাজারে সিমেন্ট রডের ব্যাবসা করেন, সেটাও বললাম। বই চুরির অভ্যাস কতদিনের জানতে চাওয়ায় সত্য কথাই বললাম, চার বছর। বই চুরি করে কি করি জানতে চাওয়ায় অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, কি আবার করবো! পড়ি। তাদের একজন আমার হাতে কোনরকম ইঞ্জেকশনের দাগ আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করল। সম্ভবত ভেবেছিল, চুরি করা বই বিক্রি করে নেশাটেশা করি কিনা। হাতে তেমন কোন দাগ না পেয়ে, কিন্তু আমাকে যথেষ্ট পরিমানে ভয় পেতে না দেখে, হুজুর টাইপের এক তরুন আমার বাম গালে কষে এক থাপ্পড় দিয়ে জানতে চাইলো, শিক্ষিত ছেলে হয়ে, এই বয়সেই এতো বড় চোর হয়ে গেলাম কিভাবে! ভাবটা এমন, যেন শিক্ষিত লোকের চুরি করার অধিকার নাই। শুধু অশিক্ষিতরাই নাকি চুরি করবে! উত্তরে, আমি সত্যি কথাই বললাম – বইয়ের অনেক দাম। আমি প্রচুর বই পড়ি। কিন্তু এতো বই তো আর কিনে পড়া সম্ভব না। সেইজন্যেই, নিতান্ত বাধ্য হয়ে … এবার তিনি আমার ডান গালে আগের চেয়েও জোরালো একতা থাপ্পড় বসালেন। আমার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা! কিছুক্ষন কানে কিছুই শুনতে পারছিলাম না। চোখে তারা দেখছিলাম।

এমন সময় ভীড়ের এক ফাঁকে দেখি চোখেমুখে অপার বিস্ময় আর বেদনা নিয়ে আমার অবস্থা দেখছে, আর কেউ না, জুয়েল! সেও সম্ভবতঃ একই কাজে নিউ মার্কেটে এসেছিল। কিন্তু এভাবে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেও পারেনি। আমি একফাকে চোখাচোখি হওয়ার পর, ওকে ঈশারায় চুপ থাকতে বললাম। এদিকে আশেপাশে গুঞ্জন শুনলাম, আমাকে নাকি পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হবে, তবে তার আগে বইয়ের ব্যাগসহ আমার একটা ছবি তোলার জন্যে টেনে হিঁচড়ে, আশপাশ থেকে কিল, চড়, থাপ্পড় দিতে দিতে একটা ষ্টুডিওতে নিয়ে গেল। সেটা নাকি পরের দিন পত্রিকায় ছাপানো হবে। ভাবলাম খারাপ না, বিখ্যাত বই চোর হিসাবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা পেয়ে যাবো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, লোডশেডিং এর কারনে ছবি তোলা গেল না।

তখন নতুন বুদ্ধি দিল আরেকজন। আমি যেসব দোকান থেকে বইগুলি চুরি করেছিলাম, প্রত্যেকটা দোকানে গিয়ে তাদের কাছ থেকে চুরি করা বইগুলি ফেরত দিতে হবে। আর শাস্তি হিসাবে, দোকানের মেঝেতে থুতু ফেলে তা আবার চেটে খেতে হবে। শুনেছিলাম, গ্রামগঞ্জে চোর ধরতে পারলে তাকে নাকি এরকম শাস্তি দেয়া হয়। ভাবলাম নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে। তাই সময় নষ্ট না করে, পবিত্র একটা কাজ করছি, সেরকম ভাব নিয়ে, দোকানগুলির সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে প্রথমে অল্প একটু জায়গা হাত দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে, একদলা করে থুতু ফেলি, তারপর জিভ দিয়ে চেটে কিছুটা খেয়ে নেই। খুব একটা খারাপ না, শুধু একটু আধটু ধুলাবালি ঢুকে মুখে কিচকিচ করছিল। তারপরও তা গিলে খেয়ে ফেলছিলাম। গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ কৌতুককর মনে হচ্ছিল, আর আমি চোখেমুখেও যথেষ্ট পরিমানে আমোদিত এবং পুলকিত একটা ভাব ফুটিয়ে তুলছিলাম। এতে সম্ভবত কাজ হল। মারধোরের পরিমান কমে আসল। আমার কাছে জানতে চাইলো, আমি পলিটিক্স করি কিনা, অথবা আমার পরিচিত কোন বড় রাজনীতিবিদ বা ছাত্রনেতা আছেন কিনা। আমি না সূচক মাথা নাড়ালাম। এদিকে খেয়াল করে দেখি জুয়েল কোনফাঁকে যেন উধাও হয়ে গেছে।

ঠিক সেই সময় এক যুবক আমার কাছে জানতে চাইলো, বল দেখি, কোন বিখ্যাত লোক বই চুরি করে বিশাল একটা লাইব্রেরী গড়ে তুলেছিলেন? আমি উত্তরটা ভালোভাবেই জানতাম। বললাম, মার্ক টোয়েন। এটা তার ছদ্মনাম। আসল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লীমেন্স। তার লেখা টম সয়ার আর হাকলবেরী ফীন, বইদুটি বাংলা এবং ইংরেজীতে পড়েছি শুনে তাকে বেশ ইম্প্রেসড মনে হল। তিনি তখন বললেন, ঠিক আছে। তুমি চুপচাপ থাক, আমি ব্যাপারটা দেখছি। পরে জেনেছিলাম, তার নাম আরিফ। এলাকার একজন ছাত্রনেতা। কথাবার্তায় যথেষ্ট ভদ্র বলেই মনে হল। তিনি কাকে কাকে কি কি যেন বললেন। তারপর আমাকে সেই ভীড় থেকে বের করে নিয়ে গেলেন নীলক্ষেতের এক তেহারীর দোকানে। দু’জনে লাঞ্চ করলাম। চা খেলাম। তারপর সেখান থেকে বের হয়ে উনি একটা সিগারেট ধরালেন। আমি কাঁচুমাচু মুখ করে তাকে জানালাম, মাস চারেক হল, আমিও সিগারেট খেতে শুরু করেছি। তিনি কিছুটা বিরক্ত ভাব নিয়ে তার প্যাকেট থেকে একটা গোল্ডলীফ সিগারেট আর দেশলাই বের করে দিলেন। রাখঢাক না করে বলেই ফেললেন, তিনি নাকি জীবনেও ভাবতে পারেননি, একটা হাতেনাতে ধরা পড়া চোরকে লাঞ্চ করাতে হবে, চা খাওয়াতে হবে, এবং শেষ পর্যন্ত সিগারেটও খাওয়াতে হবে! অকল্পনীয় ব্যাপার!

সিগারেট শেষ করে তিনি বললেন, অসুবিধা নাই, নিউ মার্কেট ব্যাবসায়ী সমিতির নেতারা সব তার চেনা। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টা কনফার্ম করে বিদায় করবেন। নিশ্চিন্তে থাকতে বললেন।

কিন্তু, নিশ্চিন্ত হওয়া দূরের কথা। কিছুক্ষনের মধ্যে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কারন, একটা বইয়ের দোকানে ফোন আসলো। আমাকে খুঁজছেন পুস্তক প্রকাশক সমিতির সভাপতি। ফোন ধরার পর শুনলাম, তাকে নাকি স্বয়ং হুমায়ুন আহমেদ ফোন করেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদকে ফোন করেছিলেন আনন্দ মোহন কলেজের প্রফেসার মনিরুজ্জামান, যিনি আবার আমাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। মনিরুজ্জামান চাচা ঘটনাটা জেনেছেন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের কাছ থেকে। ভাইস প্রিন্সিপালকে ফোন করেছিল ঢাকা থেকে, জুয়েলের আব্বা। কারন, আমাকে মারধোর করতে দেখে আর থুতু চেটে খেতে দেখে জুয়েল নাকি অন্য কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে বাসায় ফীরে তার বাবার পা চেপে ধরে মাটিতে সোজা শুয়ে পড়েছিল, যেন কোন না কোনভাবে আমাকে উদ্ধারের একটা ব্যাবস্থা করেন। সেই ব্যাবস্থা করতে গিয়ে তিনি যতজনকে সম্ভব ফোন করতে শুরু করেছিলেন। আমি বুঝলাম, খবরটা এখন মোটামুটি গোটা ময়মনসিংহ শহরে প্রচার হয়ে গেছে!

পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে, আমাকে একটা মুচলেকা দিতে হল – “আমি মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম, অদ্য ১৮ই মার্চ, ১৯৯১ সাল সকাল সাড়ে এগারোটায় বই চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ি। ধরা পড়ার পর আমার উপর কোন প্রকার শারিরীক কিংবা মানসিক নির্যাতন করা হয় নাই। আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে আজকে থেকে জীবনে আর এজাতীয় অপরাধমূলক কাজ করব না।” তারপর, আরিফ ভাই আমাকে একটা মহাখালি বাস টার্মিনালগামী টাউন সার্ভিস বাসে তুলে দিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি বাসায় ফীরতে। আর, আমার বইয়ের ব্যাগে তখন নিউ মার্কেট থেকে কেনা দুটি বই আর আজীজ সুপার মার্কেট থেকে চুরিকরা বইগুলি। পকেটে দুইশ আটচল্লিশ টাকা। বাসটা কিছুদুর এগুনোর পর ভাড়া চাইতে আসা কন্ডাক্টরের কাছে জানতে চাইলাম, কমলাপুর ষ্টেশনে যেতে হলে কোথা নামতে হবে? সে আমাকে একতা ধমক দিয়ে শাহবাগের মোড়ে নামিয়ে দিল। সেখান থেকে আরেকটা বাসে উঠে মতিঝিল, সেখান থেকে রিকশায় করে কমলাপুর।

সেই অবস্থায় বাসায় ফেরার কোন মানেই হয়না। কারন কে কে কি পরিমানে মারধোর করবে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন। আর কে কে কি কি উপায়ে অপমান করবে, সেটা তার চেয়েও বড় প্রশ্ন। আমি কমলাপুর ষ্টেশনে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখি একটা আন্তঃনগর ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে। ট্রেনের নাম “ঊর্মি গোধুলী।” গন্তব্য চট্টগ্রাম। জীবনে যাইনি। আমি সেই চলতি ট্রেনেই উঠে পড়লাম। আর টয়লেটের উল্টো দিকের একটা ফাঁকা সীটে বসে পড়লাম। কিছুদূর যাওয়ার পর টিকেট চেকার আসলো। বললাম, দুই কম্পার্টমেন্ট পরে আমার আম্মা আছে। তার কাছে আমার টিকেট আছে। আর সেইসাথে পকেটের সিগারেটের প্যাকেট দেখিয়ে ঈশারায় বোঝালাম, সিগারেট খাওয়ার জন্যে একটু অন্য যায়গায় এসে বসেছি। টিকেট চেকার বুদ্ধিমান। আমার ঈশারা বুঝে চুপচাপ চলে গেল। আমি “সাতকাহন” বইটির মধ্যে ডুবে গেলাম, একসময় ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙ্গলো চট্টগ্রাম পৌঁছানোর পর। ষ্টেশন থেকে বের হওয়ার মুখে আবার টিকেট চেকিং। আমি আমার বেশ কিছুটা পিছনের এক মহিলাকে দেখিয়ে বললাম, উনি আমার আম্মা। উনার কাছে আমার টিকেট। বলতে বলতে বেরিয়ে পড়লাম। ষ্টেশন থেকে বের হয়ে ঘড়িতে দেখি রাত দেড়টা।

ষ্টেশনের ঠিক উল্টোদিকে দেখি এক সাইন বোর্ডঃ আলী বোর্ডিং, এখানে কম খরচে থাকার সুব্যাবস্থা আছে। সেই বোর্ডিং – এ ঢালাও বিছানা পাতা ছিল, ভাড়া বিশ টাকা, আর সিঙ্গেল রুমের ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। আমি একটা সিঙ্গেল রুম ভাড়া করে, পাশের দোকান থেকে পাউরুটি আর কলা কিনে খেয়ে দেয়ে বাসায় পাঠানোর জন্য একতা চিঠি লিখে ফেললাম, যার সারমর্ম – এই জীবনে আর বাসায় ফেরার কোনরকম ইচ্ছা নাই। তবে আর যাই করি না করি, আত্মহত্যাও করবোনা। কারন কমসে কম পঁচাত্তর বছর বাঁচার ইচ্ছা আছে। সেই চিঠি পোষ্ট করলাম পরদিন দুপুরে। আর তারপর একটা লোকাল ট্রেনে উঠে পড়লাম, গন্তব্য অনিশ্চিত। সেই ট্রেন নরসিংদী আসার পর মনে হল, ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ময়মনসিংহেই যেতে হবে, কিছু জরুরী কাজ আছে। কাজেই নরসিংদী থেকে উল্টো পথে ব্রাহ্মমনবাড়িয়া, সেখান থেকে গৌরীপুর হয়ে ময়মনসিংহ শহরে ঢোকার একটু আগে শম্ভুগঞ্জের কাছে কিছুটা স্লো চলার সময় ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। উদ্দেশ্য কেওয়াটখালির কাছে এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করা, জুয়েলের কি অবস্থা, আর আমার কোন খবর তার কানে পৌঁছেছে কিনা। কিন্তু সে তখন বাড়িতে নেই। আমি তার বাড়ির পাশের মসজিদে হাতমুখ ধুয়ে, মাথার নীচে বইয়ের ব্যাগটা রেখে, মসজিদের বারান্দায় শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার পর। সেই বন্ধুটি তখনো বাড়ি ফেরেনি দেখে কিছুটা ভেবে আমার বাসার দিকেই এগুলাম। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাসার সামনে এসে দেখি বাসার ভিতরে মরাকান্না চলছে। একজন দূর থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে ধরে নিয়ে বাসায় ঢোকালো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি কিছুটা উদ্ভ্রান্ত অথবা স্মৃতিভ্রষ্টের মত আচরন করতে শুরু করলাম। আর ভাব দেখালাম, আমার কাছে কেউ একজন আমার বাসার ঠিকানা লেখা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বাসার সামনে ফেলে রেখে গেছে। আমাকে আমার আম্মার সামনে হাজির করার পর উদভ্রান্তের মত প্রশ্ন করলাম, “এই মহিলা কে? উনি এত কান্নাকাটি করছেন কি কারনে?”

এভাবেই প্রাথমিক ধাক্কাটা পার করার পর শুনি, কে যেন বলছে, ইত্তেফাক অফিসে ফোন করে যেন জানিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তী দিন তাদের পত্রিকায় প্রকাশিতব্য “বাবু – তুমি যেখানে যে অবস্থায় থাকো না কেন, বাড়ি ফীরে এসো। তোমার মা মৃত্যুশয্যায়। তোমাকে বাসার কেউ বকবেনা।” – জাতীয় নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিটি আর প্রকাশ করার দরকার নাই।

বাসায় ফেরার পর আমাকে বকাবকি দূরের কথা, এ সংক্রান্ত তীব্র বা মৃদু তীরষ্কারও কোনদিন শুনতে হয়নি। বরং যারাই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসত, সবাই আমার বইয়ের সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত। আর বইগুলির প্রত্যেকটাই আমার পড়া, কিছু কিছু আমার পনর বিশবারেরও বেশী পড়া, এবং প্রায় মুখস্থ শুনে অবাক হত। এখনো সেইসব বইয়ের অনেকগুলিই অক্ষত আছে, বিশেষ করে, সাতকাহন প্রথম আর দ্বিতীয় খন্ড।

#এস্কিউ

(আমি লেখালেখি জাতীয় কিছু করিনা। সাহিত্য আমার কর্ম না। আমি আসলে যা মনে আসে, যা খুশী, আমার মোবাইলে টাইপ করি। বানান বা ভাষা নিয়ে মোটেই ভাবিনা। লেখালেখি করে আয় রোজগারের কোন রকম পরিকল্পনা কোনকালেই ছিলোনা, এখনো নাই। আমার যা কিছু পড়া, জানা, বোঝা, তার মধ্যে যখন যে বিষয় মাথায় আসে, মাথার ভিতর হুটোপুটি করতে থাকে, মাথা থেকে না নামানো পর্যন্ত, সেই বিষয়গুলি মাথা থেকে ঝেরে ফেলার জন্যে টাইপ করতে থাকি। এসব পড়ে কেউ আরাম বা অস্বস্তি বোধ করলে সেটা সম্পূর্ণ তার দায়িত্ব। আমার দেয়ালে আমার খুশীমত টাইপিং প্র্যাকটিস করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মত ক্ষমতা বা অধিকার কারো আছে বলে আমি মনে করিনা।)

ছবিঃ ঘটনার সাতদিন আগের ছবি। এই পোষাকেই ঘটনা ঘটেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *