স‌েনা ও স‌েটেলার কর্তৃক পাহাড়ীদ‌ের উপর নারকীয় গনহত্যার ইত‌িহাস।

হৃদয়ে বেদনার স‌েই দ‌িনের কথা শুনলে মন এখন‌ো ভারাক্রান্ত হয়‌ে যায়।পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ে ন‌িপীর‌িত আদ‌িবাসীদ‌ের উপর শাসকগ‌োষ্টী রক্ত প‌িপাসু হায়‌েনা স‌েনা বাহ‌িনী ও সেটেলার বাঙালী কর্তৃক গনহত্যা, ধর্ষন, দখল, লুটপাট, উচ্ছেদ সহ সকল রাস্ট্রীয় অন্যায়-অবিচার-নিপীড়ন-শোষন-শাসনের পীষ্ট জুম্মজাতির বেদনার ইত‌িহাস করুণ। সবুজ পাহাড়‌ে জুম্মদের জীবনের এমন করুণ ইত‌িহাস যুগযুগ ধর‌ে চলমান! আজ স‌েই ভারাক্রান্ত হৃদয় ন‌িয়ে স‌েইসব ইতিহাসকে স্মরন করতে বাধ্য হচ্ছি। প্রথমে এই প্রশ্নটুকু রাখত‌ে চাই। আপন‌ি কি জান‌েন পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ে সেনা ও স‌ে‌টেলার কর্তৃক পাহাড়ীদ‌ের উপর কতট‌ি গণহত্যা সংঘটিত হয়‌েছে? একটা স্বাধীন দ‌েশের জন্য খুবই লজ্জাজনক। যারা সম্প্রীত‌ির চ‌েতনা ন‌িয়ে দেশক‌ে স্বাধীন কর‌েছিল তারাই নাক‌ি ন‌িরীহ পাহাড়ীদ‌ের উপর গণহত্যা কর‌েছিল। পাহাড়ে এযাবত কালে কয়টি গনহত্যা হয়েছে উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি গনহত্যার ইতিহাসের কথা আজকে নতুন প্রজন্ম তথা প্রগত‌িশীল দ‌েশবাসীর কাছ‌ে জানান দিতে হয়।

১)কাউখালি গনহত্যাঃ পার্বত্য ইতিহাসে বাংলাদেশ সেনাবাহীনি আর সেটেলার দ্বারা সর্ব প্রথম গনহত্যা হয়েছিলো রাংগামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার কলমপতিতে ২৫শে মার্চ ১৯৮০ সালে , সেখানে ৩০০ জুম্ম ভাই-বোনদের মিটিংএর মধ্যে ডেকে গুলি করা হয়েছিলো এবং ১০০০ এর বেশি পাহাড়ী মানুষ রিফিউজি হিসেবে ভারতের ত্রিপুরয়ায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় আজ ঐ স্থানগুলো বাঙালিদের দখল করেছে, বৌদ্ধ মন্দিরের জায়গায় আজ মসজিদ বানানো হয়েছে।

২)বানরাইবারী,বেলতলী ও বেলছড়ি গনহত্যাঃ ২৬শে জুন ১৯৮১ সালে ঘটে ২য় গনহত্যা। বানরাইবারী, বেলতলী ও বেলছড়িতে বাঙালি সেটেলারা প্রতক্ষ্য সেনা মদদে ৫০০ পাহাড়ি হত্যা ও গুম করে ছিলো প্রায় সাড়ে চার হাজার পাহাড়ি জুম্ম ভারতে পালিয়েছিলো। ঐ অঞ্চল আজ সেটেলার লোকালয় আর সেনা ক্যাম্প।

৩)তেলাফং,আসালং,গৌরাঙ্গ পাড়া, তবলছড়ি, বরনালা গনহত্যাঃ ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ সেনা এবং সেটেলার মিলিত বাহীনি তেলাফং,আসালং,গৌরাঙ্গ পাড়া,তবলছড়ি,বরনালা (ফেনীর কাছে) মোট ৩৫ টি পাহাড়ি গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো।এটে ১০০০ জুম্ম নিহত হয়েছিলো, অগনিত পাহাড়ি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো আর বাংলাদেশ সরকার আজও ও ঘটনা অস্বীকার করে এবং পরবর্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেয়া হয়েছিলো মাত্র ১৫০০ টাকা করে। আজ সেই জায়গাগুলি বাঙ্গালী বসতিতে পরিনত হয়েছে।

৪)গোলকপতিমা ছড়া,মাইচ্যেছড়া , তারাবনছড়ি গনহত্যাঃ ১৯৮৩ সালের জুন মাসের ২৬ তারিখ জুলাই মাসের ১১, ২৬ ও ২৭ তারিখ এবং আগষ্ট মাসের ৯, ১০ ,১১ তারিখ সেনা সেটেলার বাঙ্গালীরা গোলকপতিমাছড়া,মাইচ্যেছড়া , তারাবনছড়াতে পাহাড়ি-জুম্মদের গ্রামগুলোতে অগ্নি সংযোগ লুটতরাজ হত্যা ধর্ষণ , নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো। এই গনহত্যায় ৮০০ জুম্ম নিহত হয়েছিল। নিহতদের সিংহ ভাগ বৃদ্ধ, নারী ও শিশু। গনহত্যার পর সরকার সেখানে বাঙ্গালী বসতি স্থাপন করে।

৫)ভুষণছড়া গনহত্যাঃ ৩১ মে ১৯৮৪ সেলে ভুষণছড়া গনহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমে শান্তিবাহীনির সেনা ক্যাম্প আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে বাঙালি সেনা সেটেলার হায়েনার দল ৩০৫ সেনা ব্রিগেড, ২৬ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও বি ডি আরের ১৭ নং ব্যাটালিয়ন মিলে নিরস্ত্র পাহাড়ি গ্রাম ( হাটবাড়িয়া, সুগুরী পাড়া, তেরেঙ্গা ঘাট, ভূষণছড়া, গোরস্তান, ভূষণবাঘ) জালিয়ে ছিলো। ৪০০ পাহাড়ি নিহত হয়েছিলো যার উল্লেখ যোগ্যা সংখ্যক ছিলো শিশু ও নারী। অনেক পাহাড়ি নারী সেনা দ্বারা গন ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছিলো। আর ৭০০০ পাহাড়ি রিফিউজি হয়েছিলো ভারতে।

৬)পানছড়ি গনহত্যাঃ ১ মে ১৯৮৬ সালে এই গনহত্যা সংঘটিত হয় পানছড়িতে। ২৯শে এপ্রিল শান্তিবাহীনি বি,ডি,আর ক্যাম্প আক্রমণ করেছিলো। তার ফলশ্রুতিতে সেনা আর সেটেলার বাঙ্গালীরা যৌথভাবে সেখানকার পাহাড়ি গ্রাম গুলোর মানুষজন কে ডেকে একটা মাঠে জড়ো করে নির্মমভাবে জবাই ও গুলি আর হত্যা। এতে ১০০ জুম্ম ভাইবোন মারা পড়েছিল।

৭)মাটিরাঙা গনহত্যাঃ পানছড়ির ঘটনার রক্ত শুকাত‌েই না শুকাত‌ে ঠিক একদিন পর ২রা মে ১৯৮৬ সালে মাটিরাঙা তে পাহাড়ি রিফিউজি যারা ভারতে পালাচ্ছিলো, সেই নিরস্ত্র দেশত্যাগী মানুষের উপর এলোপাথারি গুলি চালিয়েছিলো বর্বর নরপশু সেনারা এতে ৭০ জন পাহাড়ি বৃদ্ধ,, শিশু, নারী, নিহত হয়েছিলো।

৮)তাইন্দং গনহত্যাঃ ১৮ মে ১৯৮৬তে, আগের গনহত্যাগুলির ক্ষত না শুকাতেই মাটিরাঙা থেকে প্রায় ২০০ জন ত্রিপুরা নারী পুরুষের দল যারা বাঁচার আশায় শিলছড়ি থেকে ভারতীয় সীমান্তের দিকে পার হচ্ছিলো কিন্তু তাইদং , কুমিল্লাটিলা গ্রামের মাঝামাঝি এক সরু পাহাড়ি পথ পাড়ি দেবার সময় বাংলাদেশ বি ডি আর এর ৩১ ব্যাটালিয়নের নর পশু জোয়ানরা তাদের উপর হামলা চালায় যার ফলে প্রায় ১৬০ জন নিহত হয় , এমনকি বর্বর পশু জোয়ান বাহীনির গুলির হাত থেকে বেচে যাওয়া আহত দেরকে সেটেলার বাঙালী এনে বেয়নেট খুচিয়ে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ ঘটনার বেচে যাওয়া অল্প কিছু সাক্ষী আজও আছে।

৯)হিরাচর,সার্ব‌োতলী, খাগড়াছড়ি, পাবলাখালী গনহত্যাঃ ৮, ৯, ১০ আগস্ট ১৯৮৮ সালে হিরাচর,সার্ব‌োতলী, খাগড়াছড়ি, পাবলাখালী তে আনুমানিক ১০০ পাহাড়ি জুম্ম কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অনেককে গুম করা হয়।গণধর্ষণ করা হয় পাহাড়ি নারীদেরকে।

১০)লংগদু গনহত্যাঃ ৪ঠা মে, ১৯৮৯ সালে জুম্ম জাত‌ির আর‌েক রক্তাক্ত দ‌িন।তৎকালীন লংগদু তে ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ অজ্ঞাত নামা লোকের হাতে খুন হন। এর দায় চাপানো হয় শান্তিবাহীনির কাঁধে। এর জের ধরে সেনা সৃষ্ট ভি,ডি,পি ও সেটেলারদের দল সেনা পাহাড়ী গ্রামে হামলা করে। এতে নিহত হয় ৪০ জন আদীবাসি নারী পুরুষ শিশু। তাদের মৃতদেহ পর্যন্ত ফেরত দেয়া হয়নি। পুড়িয়ে দেয়া হয় বৌদ্ধ মন্দির। এমন কি তৎকালীন সাবেক চেয়ারম্যান অনিল বিকাশ চাকমার স্ত্রী , সন্তান ও নাতি কে পর্যন্ত নির্মম হত্যা যজ্ঞের শিকার হতে হয়। সেটেলার হায়েনা রা আজও পাহাড়ীদ‌ের সমস্ত জমি দখল করে রেখেছে।

১১)মাল্যে গনহত্যাঃ ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২ তে মাল্য গনহত্যা সংঘটিত হয়। ঐ দিন মারিশ্যা থেকে রাঙ্গামাটি গামী যাত্রীবাহী লঞ্চে এক গ্যাস স‌িলিন্ডার বিস্ফোরনে এক যাত্রী ও চালক নিহত হন।এই ঘটনাক‌ে বোমা বল‌ে বাংগালী আধ্যুষিত মাল্যেতে লঞ্চ পৌছা মাত্র সেখানে ঔত পেতে থাকা সশস্ত্র সেটেলারা জুম্মযাত্রীদের উপর হামলা করে। এত‌ে ৩০ জন জুম্ম নিহত হন যার মধ্যে ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এটে অনেক যাত্রী রাংগামাটি হয়ে ঢাকা যাচ্ছিল। প্রতক্ষ্যদর্শীদের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে এই ঘটনাটি আর্মিদের সাজানো পরিকল্পিত হত্যা কান্ড যা পরে গনমাধ্যমে শান্তিবাহিনীর উপর চাপানো হয়।

১২)লোগাং গনহত্যাঃ ১০ই এপ্রিল,১৯৯২ সালে লোগাং-এ জুম্ম জাতির বিরুদ্ধে নির্মম হত্যা যজ্ঞ চলে। সেই দিন এক পাহাড়ী মহিলা তার গবাদি পশু চড়াতে গ্রামের অদূরে গিয়েছিলো সেখানে দুই জন সেটেলার বাঙালী দ্বারা সে ধর্ষিত হয়। এতে এক পাহাড়ি যুবক বাধা দিলে সেটেলাররা তাকে সেখানেই হত্যা কর‌ে পরে পাল্টা হামলা হল‌ে এই ঘটনা শান্তিবাহীনির উপর চাপানো হয় এর জের ধরে সেনা-সেটেলার দল প্রায় ১৫০০ পাহাড়ি জনসংখ্যা অধ্যুষিত গ্রামে হামলা চালিয়ে হত্যা করে প্রায় ৪০০ পাহাড়িকে।এটে ৮০০ পাহাড়ি বাড়ি ঘরে লুটপাট অগ্নিসংযোগ করা হয়। পাশের গ্রামগুলো থেকে প্রায় ২০০০ হাজার পাহাড়িকে শরনার্থী হয়ে ভারতে পালাতে হয়।

১৩)নানিয়াচর গনহত্যাঃ ১৭ নভেম্বর ১৯৯৩ সালে নানিয়াচর বাজারে আদিবাসিদের শান্তিপুর্ন মিছ‌িলে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বাঙ্গালি সেটেলার ও সেনারা হত্যা করে নিরীহ পাহাড়ীদেরকে। এর নেতৃত্বে ছিলো সেটেলারদের সংগঠন পার্বত্য গনপরিষদ যা নেতৃত্বে ছিলো মোঃ আয়ুব হোসাইন নামক হায়েনা নেতা এবং তৎকালীন বুড়িঘাট ইউ,পি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ। এতে নিহত হয় ২৯ জন জুম্ম নাগরিক আহত হয় শতাধিক। এতে জুম্ম ছাত্ররা যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে তখন সেনা ক্যাম্প হতে জুম্ম ছাত্রদের উপর উন্মুক্ত এলোপাথারি গুলি চালানো হয়।

এর পরবর্তীও পাহ‌াড়ীদ‌ের উপর স‌েনা ও স‌েটেলার বাঙালী কর্তৃক সাম্প্রদায়‌িক হামলা করা হয়‌েছে ।যা এখনও অব্যাহত রয়‌েছে। গত ২০১৭ সাল‌ে ২ জুন লংগদুত‌ে ৩০০ অধ‌িক পাহাড়ীদ‌ের ঘরবাড়‌িতে অগ্ন‌িসংয‌োগসহ ২ জনক‌ে হত্যা করা হয়‌েছে।এভাবে একের পর এক গনহত্যায় রঞ্জিত হয়েছে পাহাড়ী মানুষের পার্বত্য চট্টগ্রাম।
জুম্ম জাত‌ির ত্যাগ‌ের ফসল পার্বত্য চুক্ত‌ি ১৯৯৭ সাল‌ে ২ রা ড‌িসেম্বর স্বাক্ষর‌িত হয়‌েছিল। ক‌িন্তু, চুক্ত‌ি বাস্তবায়ন‌ে বাধা প্রদান করার জন্য সরকার ন‌িজেই ষড়যন্ত্র চালাচ্ছ‌ে । ক‌িন্তু, জুম্ম জনগণ জীব‌িত অবস্থায় মৃত‌ের মত ব‌েচে থাকত‌ে চাইনা। পার্বত্য চুক্ত‌ি বির‌োধী ও জুম্ম স্বার্থ পর‌িপন্থী য‌েকোন‌ো ষড়যন্ত্র প্রত‌িরোধ করত‌ে আজ প্রত‌িজ্ঞাবদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *