আমার আধ্যাত্মিক জীবন

আমার মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনা জাগার আগেই সামাজিক পরিবেশের কারনে ধর্মের ধ – ও বুঝে ওঠার আগেই আমি ধার্মিক হয়ে গিয়েছিলাম। ক্লাস ওয়ান টুতে পড়ার সময় থেকেই পরপর দুবার গোটা রমজান মাসজুড়ে খতম তারাবি সহ সবকটা রোজা রেখে ফেলেছিলাম। তারপর থেকে যদিও রোজা সবকটি রাখতাম না, আমার ক্ষীন স্বাস্থ্যের কারনে, অন্য নামাজ না পড়লেও জুম্মা মিস দিতাম না, ইন্টারমেডিয়েট পর্যন্ত। কারন সমবয়সী সঙ্গী সাথীরা যেত। কিন্তু সেসবের পিছনে কোন প্রকার ধর্ম বিশ্বাস কাজ করেনি এটা নিশ্চিত।

ক্লাস থ্রীতে পড়ার সময় কায়দা সিপারা শেষ করে কোরান শরীফ ধরেছিলাম, ফোর পাশ করার আগেই এক খতম দেয়া হয়ে গিয়েছিল। তবে হুজুরের কথাবার্তা ছিল অতি কাল্পনিক। সে কায়দা সিপারা পড়ানো আর ফীজিক্যালি সহীভাবে নামাজ পড়তে শেখানোর পাশাপাশি বেহেস্ত দোজোখ আর কবরের আজাবের বিস্তারিত বিবরন, নবিজির জীবনী ইত্যাদি অতি আবেগময় ভাষায় তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলতে চাইতেন, শুনে আমার মনে হল, সেইসব জায়গায় তিনি নিজে গিয়েছিলেন কিনা। জিজ্ঞাসা করায় ধমক দিয়ে বলে, এইগুলি কোরান হাদিসে আছে, আমাদের নবীজী বলে গেছেন। আমি জানতে চাইলাম, নবিজী কি বেহেস্ত দোজখে ঢুকে নিজে এই সুখসুবিধা আর শাস্তি ভোগ করে এসেছেন? তিনি কি জীবনের মাঝপথে মরে গিয়ে কবরবাস করে তারপর উঠে এসে বলেছিলেন, কবরের আজাব কেমন? হুজুর চেতে গিয়ে বললেন, নবীজী সব জানতেন। আল্লাহ্‌ তাকে এসব বিষয়ে শিখায়েছেন জিব্রাইল ফেরেস্তার মাধ্যমে। আমি বললাম, নবীজী আল্লাহকে দেখে নাই, জীবরাইলকে দেখেছিল? তখন হুজুর সেই ছয়হাজার ডানাওাআলা ফেরেস্তার একটা বর্ণনা দিলেন। তিনি নাকি আলোর তৈরী, আলোর গতিতে চলেন। আর খবরাখবর, কোরানের আয়াত, সুরা, আদম হাওয়া থেকে শুরু করে সব নবীদের ইতিহাস, পৃথিবী কিভাবে তৈরী হল, মানুষ কিভাবে তৈরী করা হল, পৃথিবীতে আসল, শয়তান কিভাবে মানুষের মনে সন্দেহ আরর খারাপ কাজ করার বুদ্ধি দিতে থাকে সব ভালোমত বুঝিয়ে দিলেন।

আমি একটু ত্যান্দড় টাইপের ছেলে ছিলাম। একটু অন্যভাবে সবকিছু চিন্তা করতাম। কারন আমি ততদিনে তাজকেরাতুল আম্বিয়া আর ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে না পেয়ে শার্লক হোমস আর তিন গোয়েন্দা টাইপ গল্পের বই পড়ছি আর সবকিছু নিয়ে একটা সন্দেহ প্রবনতা তৈরী হচ্ছিল আমার মধ্যে। এক বিকেলে, খেলা বাদ দিয়ে হুজুরের কাছে পড়তে পড়তে সেইসব আজগুবি বিবরন শুনে বিরক্ত হয়ে হুজুরকে বললাম, আচ্ছা, জীব্রাইলকে যেহেতু আর কেউ দেখেনি, কাজেই হতে পারে কিনা, সেটা আসলে নবীজীর মনের ভুল, অডিটরি বা ভিসুয়াল হেলুসিনেশন, বিভ্রম, ধান্দা লাগা, অথবা, নবীজী কিছুই না দেখেই আসলে বানিয়ে বানিয়ে জীবরাইলের গল্প বলছিলেন? জাষ্ট ইন কেস! হুজুর চেতে গিয়ে প্রায় মারেন আমাকে আরকি। তিনি আবার একটা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে পড়াতে বসতেন। অতি কষ্টে রাগ চেপে বললেন, নবী ছিলেন আল- আমিন। তিনি কোনদিন মিথ্যা কথা বলতেন না। তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না। আমি ঘাড় গুঁজে বললাম, জীব্রাইলের আওয়াজওতো কে শোনেনি। মেরাজের ঘটনাটারও তো কোন সাক্ষ্য প্রমান কিছুই নাই। খালি তিনি বললেন, চার পাওয়ালা পাখাওয়ালা খচ্চরের মত দেখতে একটা প্রানীর পিঠে চড়ে উড়ে চলে গেলেন! এমনতো হতে পারে, তিনি বানিয়ে বানিয়ে বলেছেন! কারন গল্পটাতেও কিছু ফাঁক আছে। অঙ্ক মিলানো যাচ্ছে না। ডাল মে কুছ কালা হ্যা। হুজুর আর রাগ থামাতে পারলেন না গুনে গুনে পাঁচটা বেতের বাড়ি দিয়ে বললেন, এইজাতীয় কথা বলা মানেই কুফরি। বলা তো দূরে, মনেও আনা যাবে না। মনের আসামাত্র পড়ার জন্য “লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা” নামের একটা শয়তান তাড়ানোর দোয়া মুখস্ত করিয়ে সাতবার পড়ালেন।

বেতের বাড়ির শোধ নেয়ার জন্য আমি তখন তাজকেরাতুল আম্বিয়া রিসার্চ করে আদম হাওয়ার গোঁজামিলের গল্প, নুহ নবীর কিস্তির ভূয়া কাহিনী আর মেরাজের ঘটনার গাঁজাখুরি গল্পগুলির সন্দেহজনক অযৌক্তিক বাড়াবাড়ি রকমের অবিশ্বাস্যতার দিক, মুহাম্মদ কর্তৃক মিথ্যা কথা বলা, বানিয়ে বানিয়ে বলা কথা, আর মুহাম্মদ কোরানের রচয়িতা, এধরনের কিছু পয়েন্ট একটা কাগজে লিখে, পরের দিন হুজুরের কাছে পড়ার শুরুতেই তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এই গোঁজামিলের জায়গাগুলি, এই সন্দেহজনক প্রশগুলির উত্তর আমাকে লিখিত ভাবে জানানোর পর আমি আপনার কাছে পড়ব। আমি আমার আম্মাকে বলেছি, কিছু বিষয় আপনি একেবারেই জানেন না, ভুল বলেন, বকেন, উত্তর না দিতে পেরে মারেন। কাজেই, আমার প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারা মানে হচ্ছে আপনি আমাকে পড়ানোর বা শেখানোর মত সঠিক জ্ঞান রাখেন না। বলে তার হাতে সেই লিষ্ট ধরিয়ে বাইরে চলে গেলাম।

কিছুক্ষন পর দেখি, হুজুর বারান্দায় এসে বালতিভর্তি পানি থেকে মগে করে তুলে তুলে নিজের মাথায় নিজেই পানি ঢালছেন। কিছুক্ষন পর তার সাদাকালো ডোরাকাটা ঘাড়ের গামছা বা ওড়নাটা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে চলে গেলেন। তিনি এরপর আমাদের বাসার আশেপাশেও আর আসেননি। আমি হুজুরমুক্ত হয়েও জুম্মার নামাজ চালিয়ে গেলাম। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় পাড়ার আরো কিছু শিশুকিশোরের সাথে শবেবরাতের রাতে সারারাত ধরে দলবেঁধে শহরের মসজিদে মসজিদে ঘুরে ঘুরে নামাজ পড়তে বেরিয়েছিলাম। মধ্যরাতে ময়মনসিংহের বড় মসজিদের ছাদে মোটামুটি আশি রাকাত নামাজ পড়ার পর ঘুম পেল। আমি টুপি-স্যান্ডেল পরা অবস্থাতেই সেখানেই ঘুমিয়ে গেলাম। ঘন্টা তিনেক পর ঘুম ভেঙ্গে টুপি স্যান্ডেল কিছুই না পেয়ে সরাসরি আল্লাহর উপর রাগ করে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরলাম।

আমাদের বাসার পাশেই ছিল বুড়া পীরের মাজার। সেখানে নানান ধরনের সাধু সন্যাসী ফকির দরবেশ মাসের পর মাস ধরে পড়ে থাকতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাড়াও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সাপ্তাহিক বড় আকারের মিলাদ হয়। বছরে দুএকবার সারারাত ধরে কাওয়ালী আর কবিগানের আসর হয়। তখন মাইক বাজিয়ে গায়কদের গানের ফাঁকে ফাঁকে অস্লীল গালিগালাজ আর বাজনার চোটে ঘুমানো মুশকিল হয়ে যেত। বছরে দুতিনবার টানা তিনচারদিন ধরে মাইক বাজিয়ে কোরান খতম করার পর ঔরস অনুষ্ঠান হত। ঔরসের মহা মিলাদের দিন খুবই সুগন্ধি আর সুস্বাদু বিরিয়ানির টোপলা দেয়া হত। আমি একবার সেই টোপলার লোভে একবার বাইরে স্যান্ডেল রেখে মিলাদ পড়লাম, বের হওয়ার পথে বিরানির টোপলা বুঝে নিয়ে এসে দেখি আমার নতুন কেনা স্পঞ্জের স্যান্ডেল উধাও। ফলে সেই মৃত বুড়া পীর সাহেবের উপরও আমার ভক্তি শ্রদ্ধা উবে গেল। রাগ করে, আমার পায়ের সাইজের চেয়ে একটু বড় অন্য আরেকজনের দামী চামড়ার স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে বাসায় চলে এলাম। পরবর্তী জীবনে আমি একজোড়া স্যান্ডেল খুব বেশীদিন ধরে পরিনি। যখনই কিছুটা পুরাতন হয়ে যেত, তখনই জুম্মার দিনে পুরনো স্যান্ডেলটি রেখে নতুন আর ভালো দেখে একজোড়া স্যান্ডেল পরে বাসায় ফীরে বলতাম, আমার স্যান্ডেল কে যেন নিয়ে চলে গেছে, সবাই যাওয়ার পর এই স্যান্ডেলগুলি পড়ে ছিল। তাই এগুলি পরেই চলে আসলাম।

ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ার সময় রোজার মাসে একেবারেই রোজা রাখার ইচ্ছা হত নয়া। কিন্তু সেই বয়সী একজন বালক সাড়া রমজানে একটা রোজাও রাখছেনা, এটা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেবেনা কেউই। কাজেই ঘোষনা দিয়ে কোনমতে দশটা করে রোজা রাখতাম বটে, কিন্তু সেই রোজার দিনগুলিতে ক্ষুধা বা তৃষ্ণার ব্যাপারটা মোটেই আমাকে কষ্ট দিতে পারেনি। আমি আমার নিজস্ব প্রয়োজন মনে করলেই বাথরুমে ঢুকে ইচ্ছামত পানি খেতাম, চুরি করে বন্রুটি, কলা, বিস্কুট, পেয়ারা, বাদাম এসব খেতাম। হঠাৎ হঠাৎ কেউ দেখে ফেলে যদি বলত, এই তুমি না রোজা! আমি তখন “হায় যায়! ভুলেই গিয়েছিলাম” এরকম ভাব দেখিয়ে তখনকার মত খাওয়া বন্ধ করে দিতাম। পেটে ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর ঘরে খাবার বা পয়সা রেখে যে আল্লাহকে খুশী করতে হয়, সেই আল্লাহকে খুশী করার যোগ্যই মনে হতনা আমার কাছে তখন থেকেই।

সেই সময়টাতে আমি আত্মসন্মোহন জাতীয় একটা বই পড়ে সেলফ হিপ্নোটিসম আর অটসাজেশন দেয়া প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছিলাম। তাছাড়া হস্তরেখা, নিউমারোলজি, এ্যষ্ট্রোলজি, প্ল্যানচেট, সোলেমানী যাদুটোনা, খাবনামা সংক্রান্ত কীরো অমনিবাস, শ্রীভ্রিগুরাজ, এম ইউ আহমেদ এবং মহাজাতকের লেখা কিছু বই পড়ে মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। তবে এসএসসি পরীক্ষার আগে আগে একবার জটিল ধরনের প্যারানয়েড এপিসোডে আক্রান্ত হয়ে মানসিক বিপর্যয়ের মুখে হিপ্নোটিজম, এষ্ট্রোলজি, নিউমারোলজি পড়া আর প্র্যাকটিস করা বাদ দিয়ে যোগ ব্যায়াম, ধ্যান মেডিটেশনের দিকে ঝুঁকে গেলাম। সমস্যা হচ্ছে, আধ্যাত্মিক সাধনা বা ধ্যান / মেডিটেশন / মুরাকাবা টাইপের সাধনার ক্ষেত্রে মুসলিমেরা খুব গোপনীয়তাপ্রিয়। এরা অল্পস্বল্প অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা হওয়ার সাথে সাথে মাজার খানকা খুলে ব্যাবসায় নেমে যায়। অন্য কাউকে কিছুই শেখাতে চায়না, বলে, এসব নাকি গুপ্তবিদ্যা।

কাজেই, ধ্যান বা যোগ ব্যায়াম করার জন্য ভারতীয় হিন্দু টাইপের সাধু সন্যাসীদের বাংলায় লেখা বই পড়তে শুরু করতে হল। এক্ষেত্রে, সবচেয়ে সহজে পাওয়া যায় স্বামী বিবেকানন্দ নামের শ্রী রামকৃষ্ণের চ্যালার লেখা বই। এছাড়া রাম কৃষ্ণ মিশনগুলিতে নানান নামের স্বামীদের লেখা বই পাওয়া যেত। এদের আশ্রমগুলিতে কিছু গেরুয়া পোষাক পরা জ্যান্ত সন্যাসী পাওয়া যেত যাদেরকে মহারাজ বলা হয়। আমি নানান বই পড়ি – রাজযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, ধর্মযোগ, ইত্যাদি, আর হাতেকলমে অভ্যাস চলতে থাকে। ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজের পাশে ছিল এক খিষ্টান মিশনারী। সেখানে লুঙ্গী পরা ফাদার ব্রাদার জাতীয় কিছু বিদেশী থাকত। সময়ে অসময়ে আমি তাদের সাথেও নানান গল্পগুজব করতে যাই। এদিকে রহস্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে এম এ ওয়াহাব নামের এক খ্রীষ্টান লোক “মসিহী জামাত” নামের অফিস থেকে বিনা খরচে খ্রিষ্টান ধর্মের উপর বই-ক্যাসেট-কলম ইত্যাদি পাঠাতে শুরু করলো। আমি তখন তাকে চিঠিতে পামপট্টি দেয়ার জন্যে লিখে পাঠালাম, “নবী হিসাবে মুহাম্মদ একজন যুদ্ধবাজ লোক ছিলেন, আমার পছন্দ না। সেই তুলনায় ঈশা নবী কত ভালো। মার খেতে খেতে মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কোন মারামারি করেন নাই।” এই পামপট্টী শুনে তারা আমাকে একগাদা খ্রীষ্টীয় গানের ক্যাসেট পাঠিয়ে দিল। আমি সেই ক্যাসেট গুলি একবারো না শুনে সবগুলিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত আর ইংরেজী প্রেমের গান রেকর্ড করিয়ে ফেললাম।

একসময় ধ্যানের পাশাপাশি ক্রিস্টাল বল রীডিং শেখার সাধনাতেও লিপ্ত হয়ে গেলাম। তবে আমাদের দেশে খাঁটি ক্রিষ্টাল বল পাওয়া দুরূহ, দামও অনেক বেশী। তাই আমি কালো কাপড়ের উপর সাদা চীনামাটির বাটিতে পানি নিয়ে, ঘরের আলো কমিয়ে সেইদিকে একদৃষ্টিতে আধাঘন্টা থেকে শুরু করে কখনো কখনো একঘন্টারও বেশী পার করে দিতাম। পঞ্চাশ ষাট দিন এই কাজ নিয়মিত করার পর, গুরু মহাজাতকের লেখা বই অনুযায়ী কিছু অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতাও হল। কিন্তু অন্যদিকে মাথা হয়ে গেল খারাপ। সিজোফ্রেনিয়া টাইপের সমস্যায় পড়ে নিজে নিজেই সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার দেখাতে গেলাম। অষুধ পত্র খাওয়ার পর ভাবলাম, আর উরাধুরা ভাবে না, আসল একজনের কাছে ভালোমত এই জিনিষ শিখতে হবে। তাই কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বই পড়ে আর ক্যাসেট শুনে শুনে গভীর লেভেলের কিছু মেডিটেশন করতে করতে কিছু আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে শুরু করল। কিন্তু মাথা হয়ে গেল আগের চেয়েও ভয়াবহ রকমের আউলা। বাধ্য হয়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে গিয়ে অর্ধেক ফী দিয়ে মেডিটেশনের ফাউন্ডেশন কোর্স করে ফেললাম।

ততদিনে শুনি ইন্টারনেটেও আরো আধুনিক কিছু পদ্ধতি বের হয়েছে। অনলাইনে ফ্রী বই পাওয়া যায়, ফ্রী মেডিটেশনের অডিও রেকর্ড ডাউনলোড করা যায়। আলফা, থিটা, ডেল্টা লেভেলের মিউজিক পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সীর সাউন্ড ট্র্যাক আর মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়ার পাওয়া গেল কয়েকটা। হাওয়াই দ্বীপের ডক্টর ই হালাকালাই নামের এক গুরুর হু’পুনুপুনু নামের এক পদ্ধতিও বেশ পছন্দ হল। এছাড়াও, সিল্ভা মেথড, ইএফটি, টেপ্পিং, সীথ, ইত্যাদি যখন যে পদ্ধতির বৈ বা ইউটিউব পেয়েছি, সেটাই বাস্তবে প্র্যাকটিস করতে থাকলাম।

এক পর্যায়ে, কিছু ইরানী ঈমাম বংশের লোকের লেখা বইয়ের বাংলা অনুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ঈমাম গাজ্জালীর কয়েকটা বৈ, জালাল উদ্দিন রুমীর লেখা কিছু বই পড়ে তাদের শেখানো পদ্ধতিতে ধ্যান বা মুরাকাবা সাধনায় নেমে গেলাম। সাথে অনুষঙ্গ হিসেবে থাকত কীটারো, এনিগমা, এলিমেন্টস অফ ওয়াটার, আর্থ, স্পেস, ইত্যাদি মিউজিক। আমার সাধনা যখন প্রায় তুঙ্গে, এক দিন আমার চুড়ান্ত লেভেলের এক অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা হল। এটাকে আলোকায়ন, জাগরন নাকি ঈশ্বর দর্শন বলব, বুঝতেই পারলাম না। তবে তার পর থেকে আমার মাথা আগের চেয়েও খারাপ হয়ে গেল।

মাথা খারাপের লক্ষন হিসেবে আমি গভীর বিষন্নতায় আক্রান্ত হলাম। আত্মহত্যার প্রবনতাও দেখা গেল। শুধু মরে টরে যাই কিনা, এই ভয়ে আত্মহত্যার ডিসিশনটা পেন্ডিং রেখে সোজা চলে গেলাম ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে। বছর খানেক সেখানকার ওষুধ পত্র খেয়ে বিষন্নতা কেটে গেল বটে, কিন্তু সেই জায়গায় শুরু হল আরেক নতুন ঝামেলা। আমার মধ্যে অত্যধিক ফুর্তিভাব দেখা গেল। সেই ফুর্তিভাবের কারনে আমার ভীতরের সমস্ত ভয়, এমনকি মৃত্যুভয়ও কেটে গেল। সেই জায়গা দখল করে নিল সীমাহীন সাহস আর ড্যাম কেয়ার ভাব। কোন বিষয়েই কোন দুশ্চিন্তা করছিনা দেখে আমার আশেপাশের সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। তারা তখন আমাকে সাথে নিয়ে গেল আরেক সাইকিয়াট্রিষ্টের কাছে। সেই সাইকিয়াট্রিষ্ট সব কিছু শুনে, আমাকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, তার চিকিৎসা দরকার বলে মন্তব্য করে, তার খাওয়ার জন্য কিছু ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করে দিল। শেষ একটা আক্রমন আসল, আমার ফেইজবুকিং নিয়ে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল আরেক ডাক্তারের কাছে। আমি নাকি ফেইজবুকে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছি। শুধু তাই নয়, আমি নাকি খুবই স্পর্শকাতর কিছু বিষয় নিয়ে ধুমায়ে লিখে যাচ্ছি। ডাক্তার সাহেব সেই লেখাগুলির কিছু নমুনা পড়ে দেখলেন। তারপর, যিনি আমাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাকে তার ধরমান্ধতার বিষয়ে কিছু সদুপদেশ দিয়ে আমার ফ্রেন্ডলিষ্টে যোগ দিয়ে, সেই ডাক্তার আমার মুরিদ হয়ে গেলেন। আমি লেখালেখি কমিয়ে দিলে সেই ডাক্তার আমাকে ফোন করে বলেন, “গুরু, লেখা কমে যাচ্ছে কেন, কোন সমস্যা? কেউ সমস্যা করলে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসেন। তার ব্রেইন ওয়াশ করে দিব।”

আমার চেনাজানার মধ্যে কেউ ব্রেইনওয়াশড হতে চায় না। কেউ আর কোনরকম আওয়াজও দেয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *