টকিং স্নেক

আজকালকার বাচ্চারা যে কত বজ্জাত, তা টের পেলাম ক’দিন আগে। তারা প্রশ্ন বেশী করে। আমরা ছোট থাকতে এতো প্রশ্ন আমাদের মনে জাগতোই না। এদেরকে সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝানো যে কত কঠিন হয়ে গেছে!

যাইহোক, আমি একদল বাচ্চাকে বোঝাচ্ছিলাম, কিভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হল। সেটা ছিল মরাল সায়েন্সের ক্লাস। সৃষ্টির শুরুর ইতিহাস মোটামুটি সবাই যেভাবে জানতাম, সেভাবেই বলছিলাম। স্রষ্টা, যাকে সবাই ঈশ্বর, ঈয়াহ ওয়েহ, ক্রাইস্ট, জিহোভা, এবং সর্বশেষে জানা গেল, তার নাম আল্লাহতালা, মোটামুটি একজনই। তার কিছু আজ্ঞাবহ ফেরেশতা ছিল, যারা দিনরাত তার উপাসনা আর গুনগান করতো। আর ছিল জীন সম্প্রদায়। তারাও সেই একই কাজ করতো। জীনদের মধ্যে সবচেয়ে নিবেদিতপ্রান ছিল ইবলিশ, যে একপর্যায়ে জীনদের সর্দার হয়ে গেল। এরকম সময়ে আল্লাহতালার ইচ্ছা হল, মানুষ বানানোর। পৃথিবী নামের গ্রহে তখন মানুষের নাম গন্ধও ছিলোনা। অন্য কিছু প্রানী আর গাছপালা ছিল। কয়েকজন ফেরেশতা পৃথিবী থেকে মাটি আনতে গিয়ে ব্যার্থ হল। শেষ পর্যন্ত আজরাইল নামের অতি নির্দয় ফেরেশতা পৃথিবীর বুক থেকে মাটি নিয়ে যেতে পারল।

– অন্য ফেরেশতাগুলো কেন পারলো না? তারা তো আল্লাহর কথামতই মাটি আনতে গিয়েছিল। পৃথিবী কি আল্লাহর হুকুম মানতে চায়নি?

সে আমি জানিনা। যাইহোক, আল্লাহ্‌ তার নিজের আদলে আদম বা এডামকে তৈরী করে তাতে প্রাণ দিয়ে দিলেন। আর তাকে দিলেন স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি। সব ফেরেশতা আর জীনদেরকে ডেকে সেই আদমকে সেজদা করতে বললেন। সবাই সেই আদেশ বিনাপ্রশ্নে মেনে নিল। মানলোনা শুধু ইবলিশ। তার অহংকার বেশী। সে আল্লাহ্‌ ছাড়া কাউকেই সেজদা করতে রাজী না। এটা শুনে আল্লাহ্‌ রাগ করে ইবলিশকে বেহেস্ত থেকে বের করে দিলেন। ইবলিশ মন খারাপ করে বেহেস্ত থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু বলে গেল, মানুষকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে যেভাবেই হোক, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করানোর চেষ্টা করে, মানুষ তৈরী করা যে আল্লাহর একটা ভুল ডিসিশন ছিল, সেটা প্রমান করেই ছাড়বে। আল্লাহতালাও সেটা চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে, ইবলিশকে না মেরে, ছেড়ে দিলেন।

এদিকে আদম একা একা বেহেস্তের বাগানে ঘুরতে থাকল। তার মন খারাপ। একা একা ভালো লাগেনা। সেটা বুঝে, আল্লাহ্‌ আদমের পাজরের একটা হাড় খুলে নিয়ে সেটা দিয়ে ইভ বা হাওয়া নামের একজন মেয়ে মানুষ বানিয়ে ফেললেন। তারা বেহেস্তে মনের সুখে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তবে আল্লাহ্‌ তাদেরকে বলে দিলেন, গন্দম নামের একটা গাছের ফল যেন তারা কিছুতেই না খায়। খেলে তিনি ভীষন রাগ করবেন। এদিকে ইবলিশ তক্কে তক্কে ছিল। একফাঁকে ছোট্ট একটা ফুটা দিয়ে, সাপের চেহারা নিয়ে বেহেস্তে ঢুকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে আদম হাওয়া দুজনকেই সেই ফলটি খেতে উদ্বুদ্ধ করে ফেলল। সেটা দেখে, আল্লাহ্‌ রাগ করে আদম আর হাওয়া দুজনকেই বেহেস্ত থেকে বের করে পৃথিবীতে ফেলে দিলেন। আদমকে ফেলে দিলেন শ্রীলংকায়, আর হাওয়াকে ফেলে দিলেন ইন্তাম্বুলে।

– আচ্ছা, গন্দমের গাছটা শুধু শুধু কেন বেহেস্তে লাগিয়ে রেখেছিলেন?
– শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়ার পর সে কিভাবে বেহেস্তে ঢুকল?
– সাপ আবার কিভাবে মানুষের ভাষায় কথা বলত?
– সাপটা যখন মানুষের ভাষায় কথা বলে গন্দম খেতে রাজী করিয়ে ফেলল, তখন আল্লাহ্‌ সেটা দেখেও কিছু বলল না?
– আচ্ছা, বেহেস্ত কত উপরে? সেখান থেকে ফেলে দেয়ার পর আদম হাওয়ার হাত পা ভাঙ্গেনি?
– আদম আর হাওয়া একজন আরেকজনকে কিভাবে খুঁজে পেল?
– শ্রীলঙ্কা থেকে সাঁতার দিয়ে ইন্ডিয়ায় এসে তারপর হাঁটতে হাঁটতে হাওাকে খুঁজে বের করে ফেলল?
– আচ্ছা, ইবলিশ তো প্রথমেই আদমকে ফুসলিয়ে গন্দম খাইয়ে চ্যালেঞ্জ জিতে গেল। আল্লাহ্‌ হেরে গেলেন। সেই হারের শাস্তি আদম-হাওয়াকে কেন দিলেন?
– আল্লাহ্‌ আগে থেকেই কি জানতেন, ইবলিশ আদম-হাওয়া কে ফুসলিয়ে গন্দম খাওয়াবে? তাই আগে থেকেই পৃথিবী বানিয়ে রেখেছিলেন?

প্রশ্ন আসতেই থাকল।

আমি এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, আসলে দিতে না পেরে, সব আমার নোট বুকে টুকে নিলাম। আরো প্রশ্ন আসছিল। ক্লাস শেষের ঘন্টা বেজে যাওয়ায়, পরের ক্লাশে সব উত্তর দিব, বলে কোনমতে ইজ্জত নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসলাম। গত সপ্তাহে সেই ক্লাসের ভয়ে ছুটি নিলাম। এসপ্তাহে কি করব, বুঝতে পারছিনা।

শেষে বুদ্ধি করে, প্রশ্নগুলি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। দেখেন, কেউ কোন উত্তর জানেন কিনা।

সেজন্যেই বলছিলাম, আজকালকার বাচ্চাকাচ্চারা খুবই বজ্জাত। এদেরকে দিয়ে আসলে ইবলিশই এসব প্রশ্ন করাচ্ছে।

আর আমার মনেও একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে – টকিং স্নেক! হাউ ক্যান স্নেক টক লাইক হিউম্যান!

#এস্কিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *