ধর্মের মানসিক বিশ্লেষণ পর্ব ১

আমার আরো একটা কাঁচা হাতের লেখা তবে এর উদ্দেশ্য ধর্ম বিশ্বাসের অযৌক্তিকতা প্রমান নয়। তবে যাদের ধর্মে বিশ্বাস নেই এবং এইটা বুঝতে হিমশিম খান যে এই রকমের অযৌক্তিক ভিত্তিহীন বিশ্বাস কিভাবে সমাজে জন্মায় বা সমাজে টিকে থাকে তাদের হয়তো আগ্রহ উদ্রেক করবে। এই পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্ম বিশ্বাস হাজারো রকমের সামাজিক প্রথা আগেও ছিল এখনো কিছু আছে। এমনকি কোনো নির্জন দ্বীপে বিচ্ছিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পাওয়া গেলে তাদের মধ্যেও কোননা কোনো ধরণের ধর্ম বিশ্বাস পাওয়া গিয়েছে । কিন্তু কেন বা কিভাবে ?

ধর্ম বিশ্বাস গুলো বিশ্লেষণে রিচার্ড ডকিন্সে প্রস্তাবিত মিম বিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে আজ আমি মোমেটিকসের আলোচনায় যাবোনা। কারো আগ্রহ থাকলে মুক্তমনার এই লেখাটি দেখে নিতে পারেন। আমার এই লেখাটি জনপ্রিয় হারভার্ড মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কারের বক্তব্যের ভিত্তিতে লেখা। স্টিভেন পিনকারের এই বক্তব্যটি মানুষের অযৌক্তিক ভিত্তিহীন ধর্মবিশ্বাস গুলো কিভাবে মানুষের মনকে প্রভাবিত করে তা বুঝতে সাহায্য করে ।

ডক্টর পিঙ্কার মনে করেন ধর্ম বিশ্বাস কে সরল ভাবে বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে কেউ যদি সরাসরি বায়লজিকাল এডাপ্টেশন (জৈব অভিযোজন) দাবি করে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বরং এটাকে মানব মগজের অন্যান্য জ্ঞানীয় অনুষদ (কগনিটিভ ফ্যাকাল্টিস) সমূহের বাই প্রোডাক্টে বা উপজাত হিসেবে দেখাই বেশি গ্রহণযোগ্য । ধর্ম বিশ্বাস কিছু জটিল ধরণের আচরণ এবং বিশ্বাস আর তাই যদি কোনো মতবাদ দিয়ে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এইটাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে সেটাও জটিল হবে কেউ যদি মানুষের মগজে গড মডিউল স্থাপন করা আছে দাবি করে বিষয়টাকে সরল ভাবে বিশ্লেষণ করতে চায় তা মোটেও গ্রহণ যোগ্য হবে না। বরং আমরা বলতে পারি নানান ধরণের চিন্তাভাবনা এবং অনুভব করার ক্ষমতাকে একত্র করে বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ভাবে বা হরেকরকমের সংমিশ্রনে পাওয়া যাচ্ছে যাদের আমরা ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি।

ধর্মগুলোর মৌলিক উপাদান

আলোচনার শুরুতেই ধর্ম বিশ্বাসের একটা মৌলিক উপাদান বুঝতে হবে তাহল প্রতিটা মানুষের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন (অশরীরী) আত্মা কল্পনা ক্ষমতা।

এই রকম শরীর থেকে আলাদা করা সম্ভব এমন আত্মা বা soul বিশ্বাস প্রবণতা বেশ কয়েকটি কগনিটিভ ক্ষমতার কারণে হয়ে থাকে যা সম্ভব হয়েছে মানুষ যে নিজের ভিতর কিংবা অন্য মানুষের ভিতর আত্মা (অন্য পরিভাষায় মনের) অস্তিত্ব কল্পনা করে বসে তার কারনে। মানুষের এই প্রবণতাকে তাকে অত্যন্ত সহজাত প্রবণতা বলে চিহ্নিত করা হয়- মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে বলে থিউরি অফ মাইন্ড। দার্শনিক ড্যানিয়েল ডোনেট এটাকে “ইচ্ছাকৃত ভঙ্গিমা” হিসেবে নামকরণ করেছেন। সহজ ভাবে বলতে চাইলে এটা হল অন্য মানুষদের আচরণ ব্যাখ্যা করার উদ্দ্যেশে তাদের সম্পর্কে অদৃশ্য মন / আত্মা আরোপ করার সহজাত প্রবনতা।

ধর্মবিশ্বাস গুলোর ক্ষেত্রে শুধু এই সুস্পষ্ট সত্য বিষয়টাকে বাদ দিয়ে দেয়া হয় যে মন বাস্তবে শরীরের সাথে সংযুক্ত কিছু।

 

অন্যদিকে তাই অদৃশ্য মন (আত্মা) কল্পনা করা গেলে তা থেকে একটু এগিয়ে গেলেই মানুষ সহজেই কল্পনা করতে পারে এমন অদৃশ্য মন যা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও টিকে থাকে যেমন প্রেত আত্মা। এর সাথে মিল রেখেই মানুষের কল্পনা বেড়ে চলে অশরীরী আত্মার মতোই অশরীরী ভুত, অশরীরী জীন, অশরীরী ফেরেস্তা বা অশরীরী ঈশ্বর কল্পনা। মানুষের intuative psychology / স্বজ্ঞাত মনস্তত্ব নিজে নিজেই কাজ করে কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না।

অধিকাংশ ধর্ম বিশ্বাস হচ্ছে সাধারণত জাগতিক জীবনের মতোই- কেউ শিখিয়ে না দিলেও আমরা ধরে নেই যেমন খৃস্ট ধর্মের সেইন্ট বা ইসলামের মাজারে শায়িত মৃত পীরের মন (আত্মাকে) মানুষের মতোই চরিত্র সম্পন্ন মনে করা হয়। যাকে খুশি করতে হলে এইটা যা চায় তেমন কিছু গিফট (ঘুষ) দেয়া যেতে পারে, শুধু একটা সত্য অবজ্ঞা করা হয় যে সাধারণত মন বা আত্মা শরীরের সাথে জোড়া লাগানো থাকে।

তারপর ও গবেষনায় দেখা গেছে মানুষের তাবিছ (মাদুলি) কবজের উপর বিশ্বাস, অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন পাথরের প্রতি অযৌক্তিক আস্থা যারা হয়ত আমাদের কথা শুনতে পারে না তবে আমাদের রোগ নিরাময় করতে পারে, বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে যারা এগুলাতে বিশ্বাস করে তারা এদেরকে দৈনন্দিন জীবনের অন্যসব কিছুর মতোই কিছু মনে করেনা – এমন তো নয় যে তারা পুরোপুরি ভাবে বিভ্রমগ্রস্থ (deluded)- এই অর্থে যে তারা আশা করছে মহাবিশ্বর আইন বার বার চাওয়া মাত্রই অলৌকিক ভাবে ভঙ্গ করা হবে বা তাবিজের (বা পিরের মাজারে দানের) উপকারিতা পাওয়া যাবে। আর তাই ধর্মিয় ধারনার সাথে জড়িয়ে থাকে এক ধরনের বিশেষত্ব, ভীতি, আতংক বা রহস্যময়তা l (কখন ভাল ফল পাওয়া যাবে কেউ বলতে পারেনা, তবু তাবিজ গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে।)

Scott Atran এর In Gods We Trust: The Evolutionary Landscape of Religion (Evolution and Cognition) বইতে ধর্মের চমৎকার বিশ্লেষণ দেয়া আছে।

ধর্মের রহস্যময়, অলৌকিকতার ধারনা সাথে মানুষ তার অস্তিত্ব সংকটের সাথে সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের সংযুক্তি করে ফেলে। প্রতিটা মানুষকেই এই জাতীয় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন এই নিশ্চিত সত্য যে আমরা অবশ্যই মারা যাব, কিংবা অত্যধিক সম্ভাব্যতা (high probability) যে আমাদের কোননা কোন অঘটন যে কোন সময় ঘটতে পারে -যেমন অসুস্থতা, পরাজয় বা বিশ্বাসঘাতকতা হতে পারে। আর তাই মানুষের তীব্র ইচ্ছা যাগে এই সব অনিশ্চয়তার কমিয়ে আনার আশায় এই জাতীয় কল্পনার জগতের সরণাপন্ন হওয়া – যেমন প্রেত আত্মাকে ব্যবহার কিংবা যাদুকরী ক্ষমতা সম্পিন্ন বস্তুর কিংবা সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য কাল্পনিক ঈশ্বর ব্যবহার।

তৃতীয় উপাদান হচ্ছে যেহেতু এই সব কাউন্টার ইন্টুইটিভ ধারনা গুলো বা এই জাতীয় অস্তিত্ব সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি যেহেতু বিজ্ঞানের নিয়মে ফলসিফাইড বা ভুল প্রমান, বা যাচাই করা যাবে না, তাই এই সব বিষয়ের উপর বিশ্বাস চাংগা করার জন্য আনুষ্ঠানিক আয়োজনে ঐক্যবদ্ধ ভাবে সবাই মিলে সুদৃঢ় কন্ঠে, গানের সুরে বা নিজেদের প্রার্থনা মূলক আচরণের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস জাহির করা করার বা দলগত অন্ধ বিশ্বাস পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়া চালু আছে। এই তৃতীয় উপাদানের মধ্যে আছে ধর্মিয় অনুষ্ঠানাদি (প্রার্থনা, অর্চনা, নামাজ, ঈদ, জুম্মা, পূজা, গির্জা গমন ইত্যাদি) যার মধ্যে কিছু লোক একত্রে নিজের ধর্ম বিশ্বাস বা আস্থা একে অন্যকে প্রদর্শন করার মাধ্যেমে দলগত ভাবে নিজেদের বিশ্বাস সুদৃঢ় আত্মস্থ করেন। একই সংগে দলের সদস্য হিসেবে নিজেদের সংহতি প্রদর্শন বা মানসিক ভাবে তা পাকাপোক্ত করেন। আপনি পরীক্ষা নিরিক্ষা বা প্রমানের মাধ্যমে করে করে ধর্ম বিশ্বাসের বিশ্বাসযোগ্যতা বা আস্থা বাড়াতে পারবেন না তবে আপনি ধর্মিয় আনুষ্ঠানিকতা বা (কিছু সাইকোলোজিকাল টেকনিক এর number of psychological techniques) মাধ্যমে নিজের বিশ্বাস বাড়াতে পারবেন।

বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে ধর্ম টিকে থাকার কারন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গ্রুপ সেলেকশনের ধারনা যেমন “যাদের ধর্মে অন্ধ বিশ্বাস ছিল তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তি যাদের সুদৃঢ় ধর্ম বিশ্বাস ছিলনা তাদের অস্তিত্ব বিলীন করেছে আর তাই ধর্ম টিকে আছে” এই জাতীয় সরল বিশ্লেষনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞগন (Scott Atran, Richard Dawkins, Steven Pinker) সন্দেহ পোষণ করেন।

একটি দলের সদস্যর হিসেবে দলের প্রতি সংহতি প্রদর্শন করা ততটাই লাভজনক কাজ হবে যতটা ডিফেক্টর বা প্রতারক (মুনাফেক) ঠেকানো যায়। একদল মানুষ একসাথে থাকার কারনে কিছু সুবিধাদি ভোগ করতে পারে তবে তাদের সব সময়েই এই জাতীয় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে এমন কিছু সদস্যাদের কারনে জন্য যারা সুবিধা ভোগ করবে ঠিক কিন্তু দলের জন্য ন্যায্য ত্যাগ স্বীকার করবে না। এই ধরনের প্রবনতা প্রতিহত করার উপায় খোঁজা আসলে যে কোন অনাত্মীয়দের মধ্যে ঘটিত দলগত কর্মকান্ডের একটা সাধারণ সমস্যা। ধর্মগুলোতে এই ধরণের প্রবণতা প্রতিহত করতে আমাদের আবেগিক (emotional) বা জ্ঞানীয় অনুষদ (cognitive faculties) বিশেষ ভাবে ব্যবহার (exploit) করে যাতে কেউ ভণ্ড (যুদ্ধের ক্ষেত্রে ডিফেক্টর বা ইসলামিক পরিভাষায় “মুনাফেক”) হিসেবে থাকতে না পারে যাতে যারা একটি দলে থাকার সুবিধা ভোগ করছে তাদের মূল্য প্রদান যেন নিশ্চিত করা যায়।

উদারহণ হিসেবে একটা ধর্মীয় দলের সম্মানিত সদস্য হতে হলে পাবলিকলি মূল্যবান প্রতিশ্রুতি দেয়া যাতে আপনি প্রমান করতে পারেন যে আপনি ধর্মের জন্য মূল্য প্রদান করছেন যেমন প্রকাশ্যে কিছু কোরবানি দেয়া যা কিনা আসলেই ব্যয়বহুল এবং সত্যিকার অর্থে ভণ্ডামি করে পার পাবার উপায় নাই। দামী পশুকে ঈশ্বরের নামে পশু কুরবানী দেয়া কিংবা শস্যাদি উৎসর্গ করা, ইব্রাহীম আ: এর ঘটনায় নিজ সন্তান কে কুরবানী দেয়া বা সত্যিকারের ইহুদি সমাজ ব্যবস্থায় আপনি নিজের নবজাত পুরুষ শিশুকে এনে বলতে হবে- নেন তার পুরুষাঙ্গর অগ্রভাগ কেটে ফেলুন। আর মোসলমানির নামে মুসলিম সমাজেও চালু আছে এই চর্চা। আর শিয়াদের রক্তাক্ত মাতম করার উৎসবের কথা সবারই জানা আছে। যারা আসলেই ধর্মিয় দলের প্রতি সিরিয়াস এই রকম ত্যাগ স্বীকার করতে রাজী হবে। এই ধরনের রক্তারক্তির চর্চা ধর্মগুলোর কম্মিটমেন্ট ডিভাইস হিসেবে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি।

  • তারপরও আছে বিবিধ ধর্মীয় উৎসব যাতে মানুষের মনকে দলগত সংহতি বাড়াতে বিবিধ উপায় কাজ করে।

মানুষের মনকে ধর্মের নামে নিজ স্বার্থ বিসর্জন করে দলিয় স্বার্থ কাছে নতি স্বীকার করারবার জন্য এত ধরনের ধর্মিয় টেকনিক সামাজিক প্রেসার প্রদান করবার তরিকা দেখলে এইটা পরিষ্কার হয় যে মানুষ সহজাত ভাবেই ধর্মিয় উম্মার কাছে নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে না বা বিশ্বাসী হয়ে উঠেনা জন্ম থেকে সামাজিক জীব হিসেবে এই জাতীয় অনেক প্রক্রিয়া মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই ধর্ম বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়।

সাইকোলজিস্ট এলেন ফিস্ক বেশকিছু এই জাতীয় টেকনিক চিহ্নিত করেছেন। যেমন একটা পরিবারের মধ্যে যে ধরনের সংহতি থাকে (বলা বাহুল্য: জীন বিস্তার যে সব জীন পরিবারের সংহতি রক্ষা করবে তারাই তারা জীনের কপি করে তা বংশ বিস্তারে সফল হবে।) আমাদের মা বাবা ভাই বোন বা আত্মীয় স্বজন দের প্রতি অনুভূতি দিয়ে বিষয়টা অনুভব করতে পারি। ধর্মিয় পপ্রেক্ষাপটে একে অন্যের আত্মীয় না হয়েও মানুষ যখন এই রকম দলগত সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে যা কি না নিজে নিজে আসবে না। তাই তাদেরকে নিপুন ভাবে মানুষিক মেনিপুলেশনের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যাতে একে অন্যেকে নিজে ফেমিলি মেম্বারের মতোই ট্রিট করে।

  • ইসলামে সবাই ভাই ভাই বলা হয়
  • খৃষ্টানরা পাদ্রীকে ফাদার বলে
  • নানদের সিস্টার
  • ইত্যাদি ইইত্যাদি

আর তাই একটি ধর্মিয় জনগোষ্ঠী গুলো ক্ষেত্র বিশেষে আন্তর্জাতিক বর্ডার অবজ্ঞা করে নিজেদের একই পরিবার হেসেবে নিজেদের একিভূত হিসেবে অনুভব করতে পারে।

(চলবে) 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *