মিথ্যা কিভাবে বলবেন কিংবা কিভাবে সফলভাবে মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করবেন?

আমি দু একজন মনোবিজ্ঞানীদের বক্তব্যের প্রায় সরাসরি অনুবাদের ভিত্তিতে লেখাটা লিখতে চাচ্ছি। অনলাইন পাঠকদের মনোযোগ ধরে রাখার কথা বিবেচনা করে লেখাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

শুরুতে বলে রাখা দরকার প্রতারণা কেবল মাত্র মানুষের জন্য কোনো বিশেষ ব্যাপার ভেবে বসলে ভুল করবেন। সমুদ্রে নিচের প্রাণীরাও একে অন্যকে শিকার করার জন্য ছদ্দবেশী বা প্রতারণার আশ্রয় নেয় । কেউ শিম্পাঞ্জিকে যখন হুমকি দেয় তখন নিজের শরীর প্রশস্ত করে দাঁড়ায় যাতে অন্যরা তাকে বড় বা শক্তিশালী ভেবে ভয় পেয়ে যায়। বিবর্তনের পরিক্রমায় তাদের অস্তিত্ত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এই ভনিতা তাদের সাহায্য করছে বলেই হয়তো এগুলো টিকে আছে।

তবে মানুষের প্রতারণা বা deception এর তরিকা এবং মাত্রা উচ্চ পর্যায়ের। দীর্ঘ বিবর্তন পরিক্রমায় অস্তিত্ত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মানুষ নামক সামাজিক জীব বা প্রজাতিটি একই সঙ্গে দুইটি ক্ষমতাই সুদৃঢ় হয়েছে – মূলত সমাজে টিকে থাকার জন্য ই।
ক.-সফল ভাবে মিথ্যা বলতে পারা
খ.-মিথ্যা বলা ধরতে পারা।

প্রতারণা প্রক্রিয়ায় আমাদের অবচেতন মন বিশেষ ভাবে সাহায্য করে। সবচেয়ে সফল মিথ্যা হইল যে মিথ্যা আমরা নিজেদেরকে বলি। আপনি সবেচেয়ে ভাল ভাবে মিথ্যা বলতে পারবেন যদি আপনি যে মিথ্যাটি বলবেন তা নিজে বিশ্বাস করতে পারেন।

১।
হলিউডের একজন বিখ্যাত ফিল্ম ডিরেক্টর ছিলেন আলফ্রেড হিজকক। তিনি শিশু অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতে বিরক্ত বোধ করতেন। কারণ তাদের প্রায়শই যা অভিনয় করতে বলা হয়তো তা তারা পারতোনা। একবার একটা দৃশ্যে একটা শিশু অভিনেতার কান্নাকাটি করার কথা যদিও সে কিছুতেই কাঁদবার অভিনয় করতে পারছিলনা। তারপর হিজকক উপায়ন্তর না দেখে ঐ শিশুর কানে এসে বিড়বিড় করে বললেন
– “তোমার মা বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছেন, তারা আর তোমাকে নিতে আসবেনা। ”

সাথে সাথেই শিশু অভিনেতাটি কাঁদতে শুরু করলো- অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। ডিরেক্টর সাহেব ক্যামেরামেনকে নির্দেশ করলেন রেকর্ড করে নিতে। আপনি যদি তখন ঐ শিশু অভিনেতাটিকে দেখতেন আপনার মনে হইত যেন সে অভিনয় করছেনা বাস্তবেই কাঁদছে।
-বলা বাহুল্য শিশুটি আসলেই কাঁদছিল ।

২।
আমি যদি একটা প্রতিযোগিতা আয়োজন করি যেখানে এক লাখ ডলার পুরুষ্কার দিবো তাকেই যে এমন মুখভঙ্গি দেখাতে পারবে যে সে আসলেই কষ্টে আছে-
আমার মনে হয় খুব ভাল হবে আপনি আপনার কলমটি নিয়ে জোড়ে নিজেই নিজের রানের মধ্যে বিঁধিয়ে দিন। এরফলে আপনি হয়ত অন্য সবার চেয়ে ভাল কষ্ট পাবার অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভনিতা প্রকাশ করে পুরষ্কার জিতে নিতে পারবেন।

৩।
আপনি যদি কাউকে বিশ্বাস করাতে চান যে আপনি তাকে ভালবাসেন, আপনি তাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না কিংবা সে আপনাকে সর্বস্ব দিয়ে আস্থা করতে পারবে তাহলে সবচেয়ে ভাল কৌশল হবে আপনি যদি নিজে সত্যিকার অর্থে তা বিশ্বাস করেন।

অবচেতন মনের এই বর্ননাটা থেকে আমরা বোঝতে পারি যে কিছু কিছু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য – বিশেষ করে অশোভ গুলো অবচেতন রাখাই শ্রেয় যাতে প্রতারক নিজেও যেন অনুভব করেন যেন সে জানে না যে তার এই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য আছে।

স্টিভেন পিঙ্করের মতে পৃথিবীর সব জায়গার (আদিবাসী সমাজ সহ) বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতারা কতটা আন্তরিক বিশ্বাসী বা কতটুকু সিনিকাল হয় তা বোঝবার জন্য গবেষণামূলক নৃবেজ্ঞানীদের ইম্পিরিকাল টেস্ট চালানো উচিৎ। এমনও হতে পারে তারা তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যের স্তর থেকে আন্তরিক কিন্তু বিবর্তনমূলক উদ্দেশ্যের স্তর থেকে সিনিকাল। কারন আন্তরিকতা মানুষকে বোকা বানাবার খুবি ভাল একটি তরিকা।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানের থিউরি অফ সেল্ফ ডিসেপশন বা আত্মবিভ্রমের মতবাদ অনুযায়ী বিবর্তন বাদী অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিযোগিতায় যেখানে প্রতারণা করা কিংবা প্রতারণা ধরতে পারার প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ প্রতারণাকারী হবে সে যে এক অর্থে নিজেই নিজের মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে যাতে সে তার ভয়াবহ সত্য মনের ভূলে, স্ব-বিরোধিতা (self contradiction) বা অসতর্ক নার্ভাসনেস ইংগিতকারক (যেমন ধরুন ঘামতে শুরু করা ইত্যাদি ) ঘটনার কারনে কোন ভয়াবহ সত্য প্রকাশ করে না ফেলে।

বড় বড় নেতারা যদি সিনিকাল হতেন বা নিজেদের মিথ্যায় নিজেরা বিশ্বাস না করতেন তাহলে কেউ তাদের বিশ্বাস করতোনা। কিংবা তাদের সিনিসিজম তাদের আচরণ থেকে ধরা পরে যেত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *