আমরা সবাই আঁকিয়ে

মানুষ কি?

হাজার উত্তর দেওয়া যাবে এ প্রশ্নের। বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন চিন্তাধারা থেকে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিভিন্ন উত্তর আসবে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে।

কোন বিজ্ঞানী হয়তো বলবেন, ‘মানুষ Animalia Kingdom-এর Hominidae Family-র Homo Sapiens নামক জীব।’ কোন সাহিত্যিক হয়তো বলবেন, ‘মায়া।’ কোন ধার্মিক ব্যক্তি বলবেন ‘সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।’ দার্শনিক বলবেন, ‘এক অদ্ভুত বস্তু।’

কত জন কত কিছু বলবে।

আসলে মনে হয় মানুষ একটা স্কেচ। সে একটা ছবি। জগতটা একটা বিশাল খাতা, তার উপরে আমরা নিজেদের ছবি আঁকছি।

“কিন্তু তা তো অসম্ভব।”


মানুষ কি?

হাজার উত্তর দেওয়া যাবে এ প্রশ্নের। বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন চিন্তাধারা থেকে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিভিন্ন উত্তর আসবে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে।

কোন বিজ্ঞানী হয়তো বলবেন, ‘মানুষ Animalia Kingdom-এর Hominidae Family-র Homo Sapiens নামক জীব।’ কোন সাহিত্যিক হয়তো বলবেন, ‘মায়া।’ কোন ধার্মিক ব্যক্তি বলবেন ‘সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।’ দার্শনিক বলবেন, ‘এক অদ্ভুত বস্তু।’

কত জন কত কিছু বলবে।

আসলে মনে হয় মানুষ একটা স্কেচ। সে একটা ছবি। জগতটা একটা বিশাল খাতা, তার উপরে আমরা নিজেদের ছবি আঁকছি।

“কিন্তু তা তো অসম্ভব।”

আচ্ছা চলুন দেখি জগত একটা বিশাল খাতা হলে মানুষ কিভাবে কিভাবে কি ছবি আঁকত। সময় বেশিক্ষণ নষ্ট না করার চেষ্টা করব।

জগতটা একটা বিশাল খাতা, তার উপর হাত চালাচ্ছে মানুষ। বেশিরভাগ মানুষই একটা ধুসর পেন্সিল নিয়ে হাত চালাচ্ছে। তাদের হাতে পেন্সিল দিয়ে দিয়েছে এর আগের মানুষেরা। আগের মানুষেরা নিজেদের পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করতে করতে এক সময়ে ভেবেছিল যে পরের মানুষদের হাতে তো কিছু একটা দিতে হবে। তখন তারা নিজেদের পেন্সিলগুলো ভেঙে পরের মানুষদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। এখন যারা ছবি আঁকছে তারাও এক সময়ে তাদের পরের মানুষদের হাতে পেন্সিল ধরিয়ে দেবে।

তাহলে কি মানুষ শুধুই ছবি একে চলেছে?

না। তারা মাঝেমধ্যে ছবির উপর রঙ লাগাচ্ছে। কেউ কালো রঙ, কেউ লাল রঙ, কেউ সবুজ রঙ, কেউ নীল রঙ, কেউ হলুদ রঙ, কেউ ধুসর রঙ। রঙ অবশ্য মাঝেমধ্যে ছবির বাইরে চলে যাচ্ছে। তখন মানুষ তাড়াহুড়ো করে রাবার দিয়ে রঙ মুছছে। কেউ রঙ মুছতে গিয়ে নিজেকে মুছে ফেলছে, কেউ নিজের ছবির কয়েকটা দাগ মুছে ফেলছে, কেউ আবার খাতার কাগজ ছিঁড়ে ফেলছে। কাগজ যখন ছিঁড়ে যাচ্ছে তখন জগত নিজেই আবার নিজেকে নতুন করে জোড়া লাগাচ্ছে।

নিজের ছবির উপর যে মানুষ নিজেই রঙ লাগাচ্ছে তা কিন্তু না। একজন আরেকজনের ছবিতেও রঙ ঢেলে দিচ্ছে।

সবাই চেষ্টা করছে নিজের ছবি গাড় করে আঁকতে। সবাই চাচ্ছে যে তার নিজের স্কেচটাই খাতায়ে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে থাকুক। সেজন্য কোন মানুষ জোরে জোরে চাপ দিয়ে পেন্সিল ঘুরাচ্ছে। কিন্তু তার পেন্সিলের শিষ যে হঠাৎ ভেঙে গেল। এখন সেই মানুষ কাটার খুঁজছে। জগত বড় নিষ্ঠুর। সে তার কাগজের ভিতরে কাটারটা লুকিয়ে রেখেছে। মানুষটা কাটার খুঁজে না পেয়ে শেষে তার সাথীদের দিকে একটু আশা নিয়ে তাকাল। সাথীরা নিজেদের স্কেচ নিয়ে ব্যস্ত। তার দিকে কেউই ফিরে তাকাল না।

কোন মানুষ আবার রঙে রঙে ভরিয়ে তুলছে নিজের স্কেচটা। কত ধরনের রঙ। নীল, হলুদ, সবুজ, কালো, সাদা, খয়েরী, বেগুনী, গোলাপি; রঙের শেষ নেই। কিন্তু রঙ যে তার ছবি থেকে বের হয়ে গেল। এতো রঙ যে তার মধ্যে ধরছে না। এখন সে রাবার দিয়ে রঙ মুছার চেষ্টা করছে। কিন্তু রঙ উঠছে না। কোনদিন উঠবে কি না সন্দেহ।

কোন মানুষ চেষ্টা করছে সুন্দর করে স্কেচ করার। একেবারে ঠিকঠাক হিসাব মতো তার দাগগুলো পড়ছে খাতার উপর, ঠিকঠাক জায়গা-মতো তার শেডিং। কিন্তু তার পেন্সিলের শিষ যে খারাপ। তার আগের মানুষেরা তাকে নষ্ট একটা পেন্সিল দিয়েছে। তার এতো সুন্দর ছবিটা কিছু না করতেই মুছে যাচ্ছে। সে বারবার নতুন করে লাইন টানছে; বারবারই লাইনগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে বাতাসে।

কেউ কেউ আবার নিজের স্কেচটা মনের মতো করতে পেরেছে। তাদের ছবি এখন কাগজ থেকে মুছে গিয়েছে, কিন্তু ছাপটা রয়ে গেছে। সেই ছাপের উপর অনেকে চেষ্টা করছে নিজের স্কেচ করার; হচ্ছে না। কেউ কেউ আবার তাদের স্কেচ দেখে নিজের ছবি আঁকার চেষ্টা করছে; তাও হচ্ছে না।

জগতের এই সুন্দর খাতাটার দিকে তাকালে কয়েকটা ছবি, কয়েকটা স্কেচ চোখে আবছা আবছা ভাবে ধরা দেয়। ছবিগুলো কত বছর আগে মুছে গিয়েছে। তবু এখনো দেখা যাচ্ছে ছবির রেখাগুলো।

এরকম অনেক ছবিই তো ফুটে আছে, কার কথা বলা যায়?

মুহাম্মদের কথা বলব? আইনস্টাইনের কথাও তো বলা যায়। জিয়ার স্কেচটা নিয়েও বলা যায়। হিটলারের লাল সবুজ কালো ছবিটা এখনো আবছা দেখা যাচ্ছে। জাহানারা ইমামের সাদা সবুজ লাল নীল স্কেচটা কই গেল?

আচ্ছা, আমি যেটা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেটার কথা বলি।

আটত্রিশ বছর আগে ছবিটা মুছে গিয়েছে। আঁকিয়ে নিশ্চয়ই দাগগুলো গভীর করে টেনেছিল, কারণ আজও সে ছবি বোঝা যাচ্ছে। রঙ হালকা হালকা বোঝা যায়। চেহারাটা মোটামুটি স্পষ্টই আছে। কোটের রঙ যে কালো সেটা বলে দিতে হয় না। স্কেচটার আশেপাশে অনেক লাল রঙ। মনে হয় কেউ লাল রঙ দিয়ে ছবিটা মুছে দিতে চেয়েছিল।

মুজিবুর রহমানের মতো অনেক ছবিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাতার উপরে। কোনটা কম স্পষ্ট, কোনটা বেশি। আব্রাহাম লিংকনের ছবিটা বেশ দেখা যাচ্ছে।

হুমায়ুন আহমেদের ছবিটা তাকালেই দেখি চোখে পড়ে। এতো রঙ দিয়ে ভরা ছিল ছবিটা, মুছে যাওয়ার পরও রংগুলো রয়ে গেছে। লাল নীল হলুদ সবুজ লাল কালো কমলা খয়েরী বেগুনী; সব অদ্ভুত অদ্ভুত রঙ।

সব সাহিত্যিকের ছবিই দেখছি একইরকম। পার্থক্য একটাই, এক-এক জনের রঙ এক-এক রকম। যেমন নজরুলের স্কেচে লাল রঙটা আর গাড় নীল রঙটা অনেক বেশি। তাকে তো আর শুধু শুধু বিদ্রোহী কবি বলা হতো না। রবীন্দ্রনাথের ছবি আবার রামধনুর সাত রঙে সাজানো; জটিল।

আইনস্টাইনের স্কেচ রুপালী, ধুসর আর কালো রঙে ভরা। নিউটনের লাল আর নীল।

সব ছবিই অবশ্য আজ মুছে গিয়েছে। বারবার আমার আন্দাজ করতে হচ্ছে যে কার ছবি আসলে কেমন ছিল।

পুরনো সব স্কেচের উপর আজ নতুন করে স্কেচ হচ্ছে। উপায় নেই তো, জগতের খাতায়ে আর জায়গা নেই। পুরনো সব হারিয়ে যাচ্ছে, নতুন সব আসছে। এরকমই হওয়ার কথা। তাও একটু কষ্ট লাগে। একটা সময়ে মানুষ ভুলে যাবে কে নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছিলেন। তখন শুধু তার নামটাই থাকবে, আর মানুষ মনে রাখবে যে তিনি একজন নবাব ছিলেন। তার কীর্তি তারা ভুলে যাবে। আমি নিজেই তো নবাবের পুরো পরিচয় ভুলে গিয়েছি।

কিছু কিছু জায়গায়ে পেন্সিলের শুধু কয়েকটা আঁচড় কাটা। কারা কেটেছে? কেটেছে কতগুলা ছেলেমেয়ে, যারা নিজের পায়ের উপরে দাড়াতে পারে নি। যারা পৃথিবীতে এসেছে, আর তার পরমুহুর্তেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছে।

মাঝে মাঝে শুধু কষ্টই লাগে। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ‘এতো কষ্ট করে কি লাভ?’

তাও কষ্ট করছি, করব।

আচ্ছা কারো কি জানতে ইচ্ছা করছে আমার স্কেচ কিরকম দেখতে? আমার মনে হয় না কারো ইচ্ছা করছে। সমস্যা হচ্ছে আমার বলতে ইচ্ছা করছে। তাই একটু সময় নষ্ট করে শুনেন।

আমার হাতে কোনদিন পেন্সিল আসে নি। আমার হাতে আমার আগের মানুষেরা দিয়েছে একটা সুন্দর কালো সাইন-পেন। কালো সাইন-পেনটা দিয়ে আমি আস্তে নিজের স্কেচ করছিলাম। আমার আগের মানুষরা অবশ্য আমার হাতটা ধরে খুবই সুন্দর করে ঠিক করে ছবিটা এঁকে দিয়েছে; আমাকে একা একা কষ্ট করে আঁকতে দেয় নি। আঁকার পরে আমার একটু বিরক্ত লাগছিল, ‘আমি নিজে তো কিছুই করলাম না।’ তখন আমি খুবই সাবধানে আমার ছবির অর্ধেকটা কালো রঙ করে দিয়েছি। অর্ধেক কালো, অর্ধেক সাদা। অর্ধেক শয়তান, অর্ধেক ভাল। ছবিটা শেষ হওয়ার পরে আমার শুধু একটাই ইচ্ছা ছিল, চুপচাপ জীবনটা পার করে দেওয়া। কিন্তু এখন অন্য সব মানুষ এসে আমার ছবির উপরে এই রঙ ফেলছে, সেই রঙ ফেলছে। ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর। আমি শুধু বসে বসে রঙ মুছছি, আর ছবিটা আরও ভাল করে আঁকার চেষ্টা করছি।

এক সময়ে এই ছবির উপরে এক গাদা পানি পড়বে, আর আমি মুছে যাব চিরদিনের জন্য। আমার কথা তখন কেউ মনে রাখবে না।

আসলে আমার ছবিটা খুবই সাধারণ একটা স্কেচ। এর একমাত্র বিশেষত্ব হল এটা একটা সাইন-পেন দিয়ে আঁকা।

এ রে। কে জানি এক গাদা কালো রঙ ফেলে দিয়েছে আমার স্কেচের উপর। দেখি, পরিষ্কার করি।

আসলে আমরা সবাই আঁকিয়ে, সবাই নির্মাতা। আমরা সবাই Artist, সবাই Engineer। আমরা সবাই আঁকছি, আমরা সবাই তৈরি করছি।

বুঝলেন না?

লেখকের মন্তব্যঃ অ্যাহেম… খুক খুক… অনেক দার্শনিক টাইপের কথা বার্তা বললাম… দুঃখিত। টা টা।

পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

৫ thoughts on “আমরা সবাই আঁকিয়ে

  1. আমার কোন স্কেচ বলতে পারেন
    আমার কোন স্কেচ বলতে পারেন আপনি? :অপেক্ষায়আছি:

    লিখাটা অনেক মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। ভাল লাগলো খুব। আসলেও দার্শনিক টাইপ। :ভাবতেছি:

    1. কেউ মরার পরে তার স্কেচ বলতে
      কেউ মরার পরে তার স্কেচ বলতে পারি। কারন মরার আগ পর্যন্ত মানুষ বদলায়। অতএব, আপনি আপনার জীবন কাহিনী পান্ডুলিপি আকারে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন; তারপর সুইসাইড করুন। আপনার স্কেচ কি তা বলতে পারব। :ভাবতেছি:

      যাই হোক, পড়ার জন্য ধন্যবাদ। :নিষ্পাপ:

  2. “লেখকের মন্তব্যঃ অ্যাহেম…
    “লেখকের মন্তব্যঃ অ্যাহেম… খুক খুক… অনেক দার্শনিক টাইপের কথা বার্তা বললাম… দুঃখিত। টা টা।
    পড়ার জন্য ধন্যবাদ।”— এইসব ফুটনোট দিয়েন না আর।।

    এমনিতে আপনার লিখা পরে পাঠককে কিছুক্ষণ ভাবতে হবে!!
    আপনার দুইটা লিখা আমার অসধারন লেগেছে..
    আপনার একটা আলাদা স্টাইল আছে!!
    :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

    1. আপনার উপদেশ আমি মাথা নত করে
      আপনার উপদেশ আমি মাথা নত করে মেনে নিলাম।

      Not joking. Seriously, মাথা নত করে গ্রহন করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *