শ্রমিকের প্রতিঃ রাষ্ট্রের, মালিক শ্রেণীর ও সুদখোর ইউনুসের দরদ কতখানি?

ভুমিকাঃ সাভারে শ্রমিক গণহত্যায় সুদূর ভ্যাটিকান সিটির পোপ থেকে শুরু করে দেশের সরকার, সুদখোর ইউনুস, মালিক শ্রেণী সবাই যেন নড়েচড়ে বসেছে, মন্তব্যের ফুলঝুরি নিয়ে হাজির হচ্ছে। অন্যদিকে সাভারের ভবন ধ্বসের শোকাবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৩-৫-২০১৩ তারিখে মন্ত্রীসভার বৈঠকে “বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন), ২০১৩” এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে যা আসলে শ্রম বান্ধব কোন নীতি নয় বরং চূড়ান্ত বিচারে শ্রমিক বিরোধী।এছাড়া ১২-৫-২০১৩ তারিখে সরকার একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। যেহেতু উৎপাদনের সাথে আমাদের সবার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নাই, তাই আপাত দৃষ্টিতে এসমস্ত পদক্ষেপকে আমরা ইতিবাচক ধরে নেই এবং রাষ্ট্রকে গনরাষ্ট্রের আয়নায় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। গত কয়েক দিনে গন মাধ্যমে প্রকাশিত সুদী কারবারি ইউনুসের সাম্প্রতিক একটি লেখা ও রাষ্ট্রের নতুন শ্রম আইন ও মজুরি বোর্ড গঠনের বেশ কয়েকটি সংবাদ বিশ্লেষণ করতে গিয়েই এ লেখার অবতারণা। তবে প্রথমেই বলে নেয়া ভাল যে প্রস্তাবিত শ্রম আইন সকল শিল্পীয় শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য হলেও আমার লেখায় গার্মেন্টস শ্রমিক যারা তাঁদের কথাই বারবার উঠে আসবে। এর দুইটি কারণ, প্রথমত একে একে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং বেসরকারি পুঁজি সস্তা শ্রমের গার্মেন্টস সেক্টর ছাড়া অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ না হওয়ায় বাংলাদেশে এখন শিল্পীয় শ্রমিক বলতে কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দিহান! দ্বিতীয়ত, এখন এই শিল্পীয় শ্রমিকের স্থলে আমরা শ্রমিক বলতে মূলত এই গার্মেন্টস শ্রমিক বুঝে থাকি এবং এই সেক্টরের শ্রমিকেরা বর্তমানে নিপীড়নের চরম সীমায় পৌঁছেছে।

“সংশোধিত শ্রমনীতি , ২০১৩

ট্রেড ইউনিয়ন ও দৈনিক শ্রম ঘণ্টা: অনুমোদিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে এই ইউনিয়ন গঠন না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটিই ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে গণ্য হবে। এই ইউনিয়নই যৌথ দর-কষাকষি কার্যক্রম (সিবিএ) পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার কোন বাধ্যবাধকতা নাই। ফলে অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটি বা এরূপ মালিক ও মালিকের আস্থাভাজন শ্রমিকের সমন্বয়ে যে অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটি রয়ে যাবে বৈধ ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প রূপে। ট্রেড ইউনিয়ন আর গড়ে তোলা হবে না। ২০০৬ সালের শ্রম আইনেও ট্রেড ইউনিয়নের বিধান ছিল। কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতার জন্য এই আট বছরে হাতে গোনা ২-৩ টি ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়া কোথায় কোন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠে নি। অথচ মোট গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা ৪৭০০ এর অধিক। ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সংশোধিত শ্রমনীতিতে পরিবর্তন যা এসেছে সেটা হল আগের নিয়মে ট্রেড ইউনিয়নের শ্রমিকের তালিকা মালিক পক্ষকে সরবারহ করার বিধান ছিল বর্তমান আইনে এটা তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই তালিকা যে মালিক পক্ষের সংগ্রহের বাইরে থাকবে বিষয়টি এমন নয়। তারা সহজেই শ্রম পরিচালক বা রেজিস্টার অফ ট্রেড ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে এই তালিকা সংগ্রহ করে নিতে পারবে। ফলে ১মত, মালিক পক্ষকে তালিকা প্রদানের বিধান বাতিলের ফলে গার্মেন্টস শ্রমিক শ্রেণীর বিশেষ কোন উপকার আসবে না। ২য়ত, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের পথ দুরূহ করে অর্থাৎ যেখানে ট্রেড ইউনিয়নই গঠন অসম্ভব সেখানে এরূপ বিধান করে রাষ্ট্র নিজেকে শ্রমিক শ্রেণীর দরদী প্রমাণ করতে পারে না। এছাড়া অনুমোদিত শ্রম নীতিতে শ্রম পরিচালক বা রেজিস্টার অফ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যালয়ের অসীম ক্ষমতা থাকায় ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়াও কঠিন।

পার্টিসিপেটরি কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধি (ক্রমিক নং ৭২ ধারা-২০৫) বা ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের চাকুরীর সুরক্ষা কোন বিধান প্রস্তাবিত শ্রম আইনে নাই। ইউনিয়নের কর্মকর্তা চাকরীচ্যুত হলে তার ইউনিয়নের সদস্যপদ তাৎক্ষনিকভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই বিষয়ে কোন প্রতিকার শ্রম আইনে অনুপস্থিত। ফলে পার্টিসিপেটরি কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধি যারা হবেন স্বাভাবিকভাবেই তারা মালিকের তাবেদার হবেন , শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ তাঁদের দ্বারা হবে না।

বাস্তবে দেখা যায় একজন শ্রমিক শোষণ ও নিপীড়নগত নানা কারণে একটি কারখানায় এক দুই বছরের বেশি শ্রমদান করতে পারে না। যখনই একজন শ্রমিকের স্থায়িকরন সহ নানা বৈধ সুবিধা আদায়ের সময় হয় তখনই মালিক পক্ষ তাকে অপসারণ বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করে। ট্রেড ইউনিয়ন হলে এর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের নিপীড়ন , অপসারণ, স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করার মত ঘটনা ঘটবে বস্তুত যার কোন প্রতিকার রাখা হয় নাই।

আই,এল,ও (ILO) বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা হল মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে গঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা , বাংলাদেশ এই সংস্থার সদস্য। আজ থেকে ১২৭ বছর আগে আট ঘণ্টা কাজের দাবীতে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছিল এবং শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শিকাগোর রাজপথ। আই,এল,ও কনভেনশন অনুযায়ী এতে স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশ সমূহ শ্রমিকদের জন্য ন্যুনতম দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মহান মে দিবসের ১২৭ বছর পরও আমাদের দেশের শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবীতে মিছিল মিটিং করতে হচ্ছে। ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইন অনুসারে দৈনিক ন্যুনতম শ্রম ঘণ্টা ১০ ঘণ্টা ( ১ ঘণ্টা বিরতি সহ) যা আইএলও কনভেনশনের পরিপন্থী। অনুমোদিত শ্রম আইনে এর কোন সংশোধন করা হয় নি।

আইএলও কনভেনশন নং ৮৭ অনুযায়ী শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং ৪৫ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সহ অনুমোদন দান বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে।

এছাড়া ৯৮ নং কনভেনশনে যৌথ দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৪৮ ইং সালে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৩(ঘ) ধারায়ও শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আইএলও এর সদস্য রাষ্ট্র সমূহ আইএলও এর নীতিমালা মানতে বাধ্য। গঠনতন্ত্র মোতাবেক সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্র অনুসমর্থনকৃত কনভেনশন মেনে চলতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে যে কোন অনিয়মে রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু এ সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে সংশোধিত শ্রম নীতি অনুমোদিত হয়েছে যা আন্তর্জাতিক রীতি নীতি ও আইএলও কনভেনশান নং ৮৭ এর পরিপন্থী।

সম্প্রতি পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে ‘অনধিকার চর্চা’ বলে সমালোচনা করেছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। ক্ষমতালোভী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা লাভের জন্য যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকম্পা প্রার্থনায় রাষ্ট্রদূতের দূতাবাসে ধর্না দিতে পারে সেখানে এমন মন্তব্যের দ্বারা বুঝা যায় যে এরূপ মন্তব্য চর্চার পশ্চাতে মালিক শ্রেণীর সমর্থন ও চাপ দুটোই আছে।

ক্ষতিপূরণ ও গ্রাচ্যুইটিঃ ক্ষতিপূরণের আইন অনুযায়ী, “যদি কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে দুই বছরের বেশি কাজ করেন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যান, তাহলে মালিক মৃত শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর কোনো পোষ্যকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এক বছর বা ছয় মাসের বেশি সময় কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর জন্য ৪৫ দিনের মজুরি অথবা গ্র্যাচুইটি (যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে) দিতে হবে। এই টাকা মৃত শ্রমিক চাকরি থেকে অবসর নিলে অবসরের যে সুবিধা পেতেন, তার অতিরিক্ত হিসেবে পাবেন”। এখন একটু অংক কষে দেখা যাক, মাসিক ৩ হাজার টাকা যে শ্রমিকের মজুরী আসে; সে যদি কর্মকালীন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করে, তবে ৪৫ দিনের মজুরি হিসাবে তার ক্ষতিপূরণ আসে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টাকা!! রাষ্ট্রের কাছে কত সস্তা শ্রমিকের মৃত্যু ও মৃত্যু জনিত ক্ষতিপূরণ!! অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, মালিকের অবহেলা বা আইন লঙ্ঘনের কারণে যদি কারও প্রাণহানি হয়, তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছর কারাদণ্ড। মালিকের অবহেলায় শত শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটলেও এটাই সর্বোচ্চ শাস্তি। তবে বাস্তবতা হল, এ পর্যন্ত অবহেলাজনিত কারণে হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হলেও বাংলাদেশের কোনো কারখানা কর্তৃপক্ষ এই শাস্তি এখনও পায়নি।

নতুন শ্রমনীতি অনুযায়ী কোনো শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ ১২ বছর হলে এক মাসের মজুরির সমান এবং ১২ বছরের বেশি হলে দেড় মাসের মজুরির সমান গ্রাচুইটি পাবেন। সুন্দর আইন!!! কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন শ্রমিকের পক্ষে কোন মালিকের অধীনে চাকুরী ৬ মাস, বড়জোর এক বা দুই বছরের বেশি করা হয়ে উঠে না। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যখন একজন শ্রমিকের চাকুরী স্থায়ী করন বা অন্যান্য সুবিধার প্রশ্ন চলে আসে, ঠিক তখনই তাকে ছাটাই করার নানা চেষ্টা করা যায়। ছাটাই সম্ভব না হলে নিপীড়ন নির্যাতন চলে। তখন সেই শ্রমিকের জন্য অবস্থাটা হয় ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। তখন ঐ শ্রমিক চলে যায় অন্যত্র এবং মালিক তার স্থলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ করে; এতে মালিকের কিছু টাকা বেঁচে যায়।

তাই চাকুরীর ১২ বছর মেয়াদের গ্রাচ্যুইটির দরকার নাই, চাই ক্ষতিপূরণের হার বৃদ্ধি। ক্ষতি পূরণের হার বৃদ্ধি না করে সংশোধিত শ্রমনীতির ক্রমিক নং ২ ধারা ২ (১০) এ গ্রাচুইটির সংজ্ঞার পরিবর্তন বা সংশোধন একটি আলঙ্কারিক সংশোধন। এ বিষয়ে ছাটাই, ডিসচার্জ, টারমিনেশন, ইস্তফা সংশ্লিষ্ট ধারা সমূহেরও প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা দরকার।

অস্থায়ী বা চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ: শ্রমনীতির ক্রমিক নং ২৩ ধারা ৪ (১১) মোতাবেক “ জরুরী কাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে বা অপরিহার্য কারণে ‘স্থায়ী ধরনের’ কাজের শুধু মাত্র সাময়িক সময়ের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে বা চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ বা ঠিকা দেয়া যাবে”। এই বিধানের ফলে মালিক শ্রেণী পর্যায়ক্রমে দীর্ঘস্থায়ীভাবে শ্রমিক নিয়োগের অপচেষ্টা চালাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।

অপসারণ ও অসদাচারনঃ অপসারণ আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলে তাঁকে ১৫ দিনের মজুরি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ এক বছর হতে হবে। তবে অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত হলে তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। ক্রমিক নং ৩০ ধারা ২৩(৩) ও ৪ (ছ) অনুযায়ী এই অসদাচরণকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে – “ প্রতিষ্ঠানে ‘উশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা হাঙ্গামামুলক আচরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, অন্যের কাজে বাধা অথবা ‘শৃঙ্খলা হানিকর কোন কর্ম’ অসদাচরণ গণ্য হবে এবং আগেই বলা হয়েছে এক্ষেত্রে কোন ক্ষতিপূরণ নাই। এই যে ‘শৃঙ্খলা হানিকর কোন কর্ম’ এর কোন সংজ্ঞা নাই, মালিক নিজেই এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন। “তুই পাদ দিলি ক্যান”, “ এই কথা কইলি ক্যান”, “বিড়ি ধরাইলি ক্যান” বা বিড়ি ধরানোর জন্য ম্যাচ বের করা মাত্রই “ তুই আগুন দিতে চাইছিলি ক্যান” ইত্যাদি অনেক খোরা যুক্তির দ্বারা মালিক পক্ষ এই ‘শৃঙ্খলা’ জনিত অসদাচরণের সুযোগে বিনা ক্ষতি পূরণে, সার্ভিস বেনিফিট থেকে বঞ্চিত করে শ্রমিককে অপসারণ করতে সক্ষম হবে এবং বাস্তবে তাই হচ্ছে। এই আইনের অপব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের ক্ষোভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চরমে উঠবে এবং শ্রমিক শ্রেণিকে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে উৎসাহ যোগাবে।

কিন্তু এর বিপরীতে মালিকদের জন্য আইন আছে, যে কোন মালিক শ্রমিকদের দাবী দাওয়ার মুখে যে কোন সময়ে বিনা পারিশ্রমিকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দিতে পারবে। এই আইনের আওতায় গত সপ্তাহে গাজীপুরে মালিক শ্রেণী বিনা নোটিশে শ‘ খানেক কারখানা বন্ধ রেখেছিল।

ইস্তফা, চাকুরীর অবসান: অনুমোদিত শ্রম নীতির ক্রমিক নং ৩২, ধারা ২৭(৩)(খ) অনুযায়ী, “ কোন শ্রমিক বিনা নোটিসে চাকুরী হতে ইস্তফা দিলে কিংবা চাকুরী পরিত্যাগ করলে অথবা বিনা অনুমতিতে ১০ দিনের অধিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে মালিক উক্ত শ্রমিককে ১০ দিনের সময় দিয়ে এই সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করতে এবং চাকুরীতে পুনরায় যোগদানের জন্য নোটিস প্রদান করবেন। এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত শ্রমিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান ও চাকুরীতে যোগদান না করিলে মালিক লিখিত আদেশ দ্বারা তাহার চাকুরীর অবসান ঘটাতে পারবে। এভাবে চাকুরী অবসানের ক্ষেত্রে শ্রমিক কোন প্রকার ক্ষতি বা সার্ভিস বেনিফিট দাবী করতে পারবে না”।

প্রথমত বাস্তবে যা দেখা যায়, কোন শ্রমিক ৩০ দিন বা তারও বেশি দিন আগে চাকুরী হতে ইস্তফার নোটিস দিলে, মালিক পক্ষ তার ইস্তফা দেয়ার আগেই তাকে বরখাস্ত করার হীন প্রয়াস চালায়। ফলে নোটিস দিয়ে ইস্তফা দেয়াটা শ্রমিকের জন্য বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকের জন্য হয়ে উঠে না। এরা কি করে? অন্যান্য বেনিফিট কি এরা কোনদিন চোখে দেখে নাই এবং এই সুযোগ সুবিধার আশাও করে না তাই এসব পাওনা ত্যাগ করে শুধু মাত্র বিগত মাসের বেতন নেয়ার পরদিন থেকে আর আসে না। এটাতো গেল ট্র্যাডিশনের একটা দিক। কিন্তু এই আইনের ফলে মালিক পক্ষ যদি চায় কোন প্রকার ক্ষতি বা সার্ভিস বেনিফিট ছাড়াই একজন শ্রমিককে “ ফায়ার” করবে তবে তাকে বেশি কিছু করতে হয় না, নিরাপত্তা কর্মীদের বলে দিলেই হল অমুক শ্রমিককে কাল থেকে কারখানায় ঢুকতে দেয়া যাবে না। অতঃপর ১০ দিনের মাথায় ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি এবং চাকুরীর অবসানের লিখিত আদেশ। তবে ঐ দশদিন পর্যন্ত সাধারণত মালিককে অপেক্ষা করতে হয় না, কারণ কোন শ্রমিকের ক্ষেত্রে এরূপ কিছু ঘটলে সে আগেই আঁচ করে এবং নিরাপত্তা কর্মীর কাছে অপমানিত হওয়ার জন্য আর কারখানামুখী হয় না। হয় না আদালতমুখীও, কারণ তার মামলা করার সামর্থ্য যেমন নাই তেমনি মামলা যদি করেও মামলা নিষ্পত্তির জন্য ৩ বছর- ৫ বছর শ্রম আদালতে ধর্না দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এ সমস্ত বাস্তব প্রতিবন্ধকতা মালিক শ্রেণী বেশ ভালই জানে। ফলে মোটা দাগে যা বলা যায়, এই আইন বিশেষ করে “কোন প্রকার ক্ষতি বা সার্ভিস বেনিফিট দাবী করতে পারবে না” অংশটুকু শ্রমিকের জন্য একটি নিপীড়ন মূলক বঞ্চিত করার আইন।

উল্লেখ্য যে , এই আইনের ধারা ২৩ (৪) (ঘ) অনুযায়ী ১০ দিনের বেশি অনুপস্থিতি ‘ অসদাচরণ’ রূপে গণ্য হয়, যার জন্য কোন ক্ষতিপূরণ দাবী করা যায় না।

মাতৃত্বকালীন ছুটি: মাতৃত্বকালীন ছুটির আইনটি শ্রমিক শ্রেণীর বিশেষ করে নারী শ্রমিকের জন্য আরও বেশি অবমাননাকর। সরকারি ও আধা সরকারি সেক্টরে কর্মজীবী নারীর মাতৃত্ব কালীন ছুটি ৬ মাস। সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকলেও এখানে রাষ্ট্র নিজেই এই বৈষম্যমুলক আইনের প্রণেতা। এই আইন করা হয়েছে বিজিএমই এর চাপে( মূলত শুধু এটা নয়, অনেক কিছুই করা হয়েছে বিজিএমই বা মালিক শ্রেণীর চাপে)। বিজিএমই এর মতে যদি গার্মেন্টস সেক্টরে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা হয় তবে দেশে জন্ম হার বেড়ে যাবে। রাষ্ট্র দরজিওয়ালাদের এই অদ্ভুত অপমানকর যুক্তিতে সায় দিয়ে ৪ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির আইন করেছে। এখানে দুঃখজনক ভাবে যা লক্ষণীয় সেটা হল, শ্রমিক শ্রেণীর মা বোন নিয়ে দর্জিওয়ালাদের এই স্পর্শকাতর ও ন্যক্কারজনক মন্তব্য এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় শ্রম আইন শ্রমিক শ্রেণিকে মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তবে আইনে যাই থাকুক, এই আইন যে মানা হয় না তার প্রমাণ সাভারের ধ্বংসস্তূপের মাঝে কর্মজীবী প্রসূতি মায়ের চাপাপড়া এবং নবজাতকের মৃত্যু।

৫ % লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিতকরণঃ অনুমোদিত শ্রম নীতিতে ক্রমিক নং ৭৮ ধারা ২৩২ (৩) ও ২৩৩ মোতাবেক কোম্পানির মুনাফার ৫ % লভ্যাংশ বাদ দেয়া হয়েছে এবং এর বিপরীতে বিভিন্ন শতাংশ হারে নানা ধরনের কল্যাণ তহবিলের কথা হয়েছে । অথচ ১৯৬৮ সাল থেকে এই লভ্যাংশ প্রদানের আইনটি প্রযোজ্য ছিল, যদিও গার্মেন্টস মালিকেরা এই আইনটিকে কখনই সম্মান প্রদর্শন না করে শ্রমিকের ‘হক’ কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। অন্যদিকে আইনের একটি সাধারণ ন্যায়পরায়ণতার নিয়ম হচ্ছে একবার যে অধিকার ভোগ করা যায়, সে অধিকার রহিত বা বাদ দেয়া যায় না। কিন্তু রাষ্ট্র এই কাজটি করল এমন এক সময়ে যখন শ্রমিক শ্রেণীর পাশাপাশি বিদেশি বায়াররা পর্যন্ত ৫ % লভ্যাংশ প্রদানে মালিক শ্রেণিকে চাপ প্রদান করে আসছিল। নিঃসন্দেহে মালিক শ্রেণীর চাপের মুখে এই আইনের দ্বারা রাষ্ট্র, শ্রমিক শ্রেণীর পিঠে ছুরিকাঘাত করে বসল।

৫ % লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করে বায়ারদের সম্পৃক্ত করে “শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড’ এর যে বিধান যুক্ত করা হয়েছে এটা কার্যকর করা অনিশ্চিত হবে এবং শ্রমিকের কোন কাজে আসবে না। উপরন্তু, এই বিধানের ফলে এরূপ কল্যাণ ফান্ডে শুধু শ্রমিক নয়, শ্রমিকের সাথে সাথে ‘মালিক সংজ্ঞাভুক্ত কর্মকর্তারাও’ সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন ফলে , পূর্বের আইনের চেয়ে বর্তমান আইনের অধীনে শ্রমিকদের প্রাপ্ত সুবিধা মোটের উপর হ্রাস পাবে। আবার, ট্রেড ইউনিয়ন না থাকলে এসব কল্যাণ তহবিল বা ফান্ড যে কার্যকর হবে না এবং কোথায় কোথায় কার্যকর হলেও শ্রমিকের পক্ষে যে বিশেষ কোন সুবিধা বহন করবে না, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি: এখানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বলতে শ্রমিক যে ইউনিয়নভুক্ত সে ইউনিয়নের কোন ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিনিধি বুঝতে হবে। শ্রমিক সাধারণত যে কোন মামলা মোকদ্দমার ক্ষেত্রে তার ইউনিয়নের উপর নির্ভর করে এবং ইউনিয়নের সাহায্য সহযোগিতা নিয়েই মামলা করে থাকে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনে ২২০ ধারা অনুযায়ী আইনজীবীদের পাশাপাশি ‘ ক্ষমতা প্রাপ্ত’ প্রতিনিধিকে মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু অনুমোদিত সংশোধনীতে ( ক্রমিক নং ৭৭ ধারা ২২০) এই ক্ষমতা কর্তন করতঃ শ্রমিক , শ্রমিকশ্রেণী ও তাঁদের ইউনিয়নের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে।

বাড়ি ভাড়া বাদ দেয়াঃ মজুরীর সংজ্ঞা থেকে বাড়ি ভাড়া বাদ দেয়া ( ক্রমিক নং ৭ ধারা-২(৪৫) দেয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে ছুটিতে থাকাবস্থায় শ্রমিক বাড়ি ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবেন। এই আইন প্রচলিত অন্যান্য আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং আইন প্রণেতারা যে বাসস্থান সংস্থান ও বাড়ি ভাড়া সম্পূর্ণ পৃথক বিষয় এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজ্ঞরা মনে করেন। তাঁদের মতে এই আইনের ফলে মজুরী বোর্ড কর্তৃক ন্যুনতম মজুরী নির্ধারণকালে ‘বাড়ি ভাড়া’ এর বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা সম্ভবপর হবে না।

সংশোধিত শ্রম আইনে বীমা নিষ্পত্তি সংক্রান্তে বলা হচ্ছে, শ্রমিকের বীমা দাবির টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজ উদ্যোগে আদায় করবে। কোনো কারণে শ্রমিক যদি মারা যায় বা তার মৃত্যু হয় তাহলে তার পোষ্যদের বীমার টাকা মালিকদের আদায় করে দিতে হবে। যারা শ্রমিকের মাসের বেতন ঠিক মত দেয় না , সে ক্ষেত্রে এই আইন অনেকটা “শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেয়া”র মত। এখানে শ্রম অধিদপ্তর, সরকারী বিমা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে বিকল্প কোন বিধান থাকা উচিত ছিল।

এছাড়া আরও কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও মোটা দাগের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলি উপরে বর্ণিত হল।

নতুন এই শ্রম নীতি বাস্তবায়ন করার আগে সরকার, মালিক শ্রেণী ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করার মাধ্যমে মত বিনিময় করেন। বস্তুত এই কমিটিতে যারা শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন তারা সরকার ও মালিক পক্ষের চাপের মুখে অসহায় ছিলেন। এই কমিটির কয়েকজন সদস্য তাঁদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা দাবী করেছি যে সংশোধনীতে শ্রমিকের সুযোগ সুবিধা অধিকার কর্তিত হওয়ার লক্ষণ সুস্পষ্ট হয় সেক্ষেত্রে এরূপ কোন সংশোধনের প্রয়োজন নাই, তার চেয়ে ২০০৬ সালের শ্রম নীতিই বহাল থাকুক”। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার কর্তন করতে করতে রাষ্ট্র এমন একটি সংশোধিত শ্রমনীতি শ্রমিক শ্রেণীর উপর চাপিয়ে দিল, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে খোদ সরকারই মালিক শ্রেণীর চাপের মুখে অসহায়। উল্লেখ্য যে বর্তমান সংসদে কম করে হলেও ৩১ জন গার্মেন্টস মালিক আছেন।

নিঃসন্দেহে বলা প্রণীত শ্রম নীতি মেহনতি শ্রমিক –জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। এ লেখা যখন লিখছি তখন আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্যান্য সেক্টরেও শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন জারি থাকবে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি সহিদুল্লাহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান গত ১৫-৫-২০১৩ তারিখে এক বিবৃতিতে বলেন, আইএলও কনভেনশনের সঙ্গে সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩ সংগতিপূর্ণ নয়, তাই টিইউসি আইএলও কনভেনশনের আলোকে শ্রম আইনের সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।

“ন্যূনতম মজুরি”

এবারে আসি ন্যুনতম মজুরী প্রসঙ্গে । সাভারে শ্রমিক গণহত্যা এবং এর পর পরই সংগঠিত সংঘবদ্ধ অসন্তোষের পরিপেক্ষিতে সংশোধিত শ্রমনীতির সাথে সাথে একটি মজুরী বোর্ড গঠনের ঘোষণা নিয়ে (১২-৫-২০১৩ তারিখে) রাষ্ট্র হাজির হয়েছে। রাষ্ট্র সাধারণত ৫( পাঁচ )বছর পর পর শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরী কত হতে পারে এটা বিবেচনা করার জন্য একটি মজুরী বোর্ড গঠন করে। উল্লেখ্য যে সর্বশেষ ২০১০ সালের ২৭ জুলাই মজুরি বোর্ডের সুপারিশে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে রাষ্ট্রের এই মজুরী বোর্ডের ঘোষণা অনেকটা আগাম মনে হলেও, আমাদের স্মরণে আছে নিশ্চয়ই সর্বশেষ যে ৩০০০ টাকা মজুরী যখন নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেই মজুরী কাঠামো নিয়েও শ্রমিক অসন্তোষ ছিল। উল্লেখ্য যে সরকার ,একজন শ্রমিকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৪ (চার) জন এরূপ বিবেচনা করে মজুরী নির্ধারণ করা হয়। দুই ডিজিটের মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়ে যেখানে মধ্যবিত্তের জীবনে নাভিশ্বাস উঠে, সেখানে এই নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের কথা সহজেই অনুমেয়। ফলে মজুরী বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকরা যে অব্যাহত আন্দোলন করে আসছিল তারই ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র এই ন্যুনতম মজুরী বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিল।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেছেন, “আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই বোর্ড পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করবে। যখনই মজুরি নির্ধারণ করা হোক না কেন, শ্রমিকদের জন্য মজুরি কার্যকর হবে ১ মে থেকে। অন্যদিকে, বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম ও বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান ঐ সভায় সাংবাদিকদের জানান , ১ মে থেকে মজুরি কার্যকরের বিষয়টি তারা মেনে নিবে না।

লক্ষণীয় যে একদিকে মন্ত্রী যা বলছেন, তার বিপরীতে মালিক শ্রেণী তার বিরোধিতা করছেন। মালিক শ্রেণীর সংগঠনের কর্তা ব্যক্তিরা মন্ত্রীর কথার বিরোধিতা করতে গিয়ে কোন রূপ ভণিতার আশ্রয় না নিয়ে যা বলেছেন, তাতে তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ধরে নিলাম ৫ মাস পরে নতুন মজুরী কাঠামো বাস্তবায়নের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসা গেল, কিন্তু কথা হল, যারা বেতন দেয় না ঠিক মত; তারা ৫ মাসের বকেয়া বাড়তি টাকা সহ মজুরী পরিশোধ করবেন সে নিশ্চয়তা কোথায়? কোন শ্রমিক যদি এটা নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তবে সেটা ‘অসদাচরণ’ ট্যাগ লাগিয়ে মালিক তাকে ছাঁটাই করবে না – এমন নিশ্চয়তা কি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মন্ত্রী দিতে পারবে? না পারবে না। কিন্তু শ্রমিকের সাথে সখ্যতা তৈরিতে তারা অনেক মনভোলানো সুন্দর কথাই বলে থাকেন।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মত, এই ন্যুনতম মজুরী বোর্ড স্থায়ী কোন বোর্ড নয়। রাষ্ট্র যখন প্রয়োজন মনে করে ( সাধারণত ৪/৫ বছরের মাথায়) তখন এই বোর্ড গঠন করা হয় এবং বোর্ডের সদস্যরা হন সরকার কর্তৃক নির্বাচিত । এখানে মালিক প্রতিনিধি, শ্রমিক প্রতিনিধি থাকলেও শ্রমিক প্রতিনিধির ক্ষেত্রে; যখন যে রাজনৈতিক দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠনের একজন প্রতিনিধি বোর্ডের সদস্য রূপে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। রাষ্ট্র, নিজ দল ও মালিক শ্রেণীর চাপের মুখে ঐ নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধিত্বকারীর পক্ষে সম্ভব হয় না শ্রমিক শ্রেণীর জন্য ন্যায্য মজুরী দাবী ও তা বাস্তবায়ন করা। আবার যেহেতু মজুরী বোর্ড স্থায়ী কোন বোর্ড নয় তাই নিজেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারে না। একটি স্থায়ী মজুরী বোর্ড ও তাকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হল হয়ত শ্রমিকের মজুরী সংক্রান্ত দাবী দাওয়ার উপস্থাপন এবং এ সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত যথাযথ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ সহজ হত।

বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী একজন শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরী কমপক্ষে ৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত। এটা বর্তমান মজুরী থেকে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তবুও আমি এই দ্বিগুণ বিষয়টিকে যদি স্ট্যান্ডার্ড ধরি এবং তবে প্রশ্ন আসে, একজন শ্রমিকের মজুরী বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করতে হলে একটি পোশাকের বাড়তি মূল্য কত হতে পারে? “একজন শ্রমিকের মজুরী বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করতে হলে একটি পোশাকের বাড়তি মূল্য কত হতে পারে” – সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা চালায় যুক্তরাজ্যের দ্য ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি)।টিইউসির তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন) এর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাকর্মীদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ করতে যুক্তরাজ্যে প্রতিটি পোশাকের দাম বাড়তে পারে মাত্র তিন সেন্ট(http://www.samakal.net/economics/2013/05/11/3077)।

এখানে উল্লেখিত সিএনএনের ৩ সেন্টের সংবাদটি খুবই সিগনিফিকেন্ট দুটি কারণে প্রথমত বারগেনিং প্রাইজের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়ত ডাঃ ইউনুসের সাম্প্রতিক প্রস্তাব প্রসঙ্গে। তবে ডাঃ ইউনুসের প্রস্তাবে পরে আলোচনায় আসছি। প্রথমোক্ত বারগেনিং প্রাইজ নিয়ে আলোচনা করি। বারগেইনিং প্রাইজে যদি পোশাক প্রতি ৩ সেন্ট যোগ করে কোন রপ্তানি আদেশ গ্রহণ করা হয় তবে মজুরি দ্বিগুণ বৃদ্ধির সুযোগ আছে। অর্থাৎ মালিক যদি লাভের অংক থেকে ৩ সেন্ট ছেড়ে দেয় শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি করা অসম্ভব কিছু নয়। মজুরী বোর্ড বা রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে চাপ দিয়ে মজুরি দ্বিগুণ করে দিতে পারে। রাষ্ট্র মালিক শ্রেণীকে রেয়াত দেয়, ঋণ দেয়, কর মওকুফ করে দেয়; কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে মালিক শ্রেণীকে কোন চাপ দেয় না। শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রের এই মজুরী বৃদ্ধির পদক্ষেপে নিজেকে কতটুকু সন্তুষ্ট রাখতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।


বিনা পুঁজির বিপরীতে কত মুনাফা:

পোশাক শিল্পের বিকাশে ১৯৮২ সালে প্রণীত শিল্পরীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এবং শুল্ক মুক্ত- শুল্ক ছাড়, নগদ আর্থিক সহায়তা সহ রাষ্ট্রের নানা ধরনের সহযোগিতা পোশাক শিল্পকে বিনা পুঁজির ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছে। মুলতঃ এই খাতে রপ্তানি এলসি (রপ্তানির কার্যাদেশ) পাওয়ার পর প্যাকেজিং পর্যন্ত মালিকের কোনো বিনিয়োগের টাকার দরকার হয় না। সবই ব্যাংক করে দেয়। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পোশাকমালিকেরা দাবি করেন, তাঁদের মুনাফা কম থাকে। কিন্তু তাঁরা ‘জিরো ক্যাপিটাল’ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে যাত্রা শুরু করার পড় পর্যায় ক্রমে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা যেমন বৃদ্ধি পেয়ে এরা বিত্তশালী হয়েছে তার বিপরীতে রাষ্ট্রকে দিয়েছে অনেক কম।

রাষ্ট্রকে প্রদান করা ও এর বিপরীতে রাষ্ট্র কাছ থেকে গ্রহণ করাঃ

পোশাক খাত সর্বোচ্চ কর সুবিধা ভোগ করে । রপ্তানির সময় উৎসে কর হিসেবে মাত্র দশমিক ৮০ শতাংশ (০.৮০%) দিলেই সব ধরনের কর থেকে দায়মুক্তি সুবিধা পাচ্ছে পোশাক খাত।গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে পোশাক খাতে কর আদায় হয়েছে মাত্র ৮৮৬ কোটি টাকা কিন্তু এর বিপরীতে একই অর্থবছরে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘নগদ সহায়তা’ নিয়েছে এক হাজার ৪১২ কোটি সাত লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্যান্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ কর দেয়, পোশাক কারখানার মালিক তার দশ ভাগের এক ভাগ কর দেয় না। এছাড়া বন্ড সুবিধার আওতায় প্রয়োজনীয় সুতা, কাপড়,কাঁচামাল, কার্টুনিং, প্যাকেজিং, এক্সেসরিজ আনতে কোনো শুল্ক মালিককে দিতে হয় না। এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, পোশাক কারখানার মালিকেরা ২০০৭-০৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বন্ড-সুবিধা নিয়েছে অথচ এই বন্ড-সুবিধা না থাকলে সমপরিমাণ অর্থ শুল্ক-কর হিসেবে দিতে হতো। ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে পোশাক খাতকে কোনো ধরনের মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় না।

তিন দশক ধরে পোশাক খাতকে কর অবকাশ সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) দিয়ে এই শিল্পটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পোশাক খাতের মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হয় আর অন্য খাতের যন্ত্রপাতি আনতে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। মালিকেরা ৭ শতাংশ হারে রপ্তানি ঋণ হিসাবে ব্যাংকের অর্থায়ন পান। এমনকি ‘এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটায়’ রপ্তানি করে যত ডলার আয় করেন, তার ১০ শতাংশ নিজের ব্যাংক হিসাবে রাখতে পারেন এবং এই অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছেমত খরচও করতে পারেন।

বিদেশ থেকে কাপড় বা সুতা ক্রয় অথবা দেশের মধ্য থেকে তা সংগ্রহ করতে ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে স্থানীয় ব্যাংক। ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র সুদ গুনতে হয় ১৩ %, যেখানে অন্যান্য শিল্প খাতকে ১৭-১৮% সুদ দিতে হয়। গার্মেন্টস মালিক অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ (এক্সেসরিজ) আনতে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। আবার ইসিসি বা এক্সপোর্ট ক্যাশ ক্রেডিটের (রপ্তানির জন্য নগদ ঋণ) নামে শ্রমিকের মজুরির টাকাও তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন।

খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন ঋণ প্রদানঃ

সমস্ত শিল্প খাতের মধ্যে একমাত্র পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কোনো এককালীন জমা (ডাউন পেমেন্ট) নেওয়া হয় না। আবার রুগ্ন শিল্পের আসল ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং ঋণকে ব্লক (একটি হিসাবে রেখে) করে রেখে নতুন ঋণ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয় , “অন্যরা সরকারকে যে পরিমাণ কর দেন, তার দশ ভাগের এক ভাগও পোশাক খাত থেকে সরকার পায় না। পোশাকমালিকদের কাছ থেকে সরকার আয়করও পায় সামান্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ পোশাকমালিক অল্পই আয় করেন। আয়করও দেন অনেক কম। পোশাকমালিকদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকিরও নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে এনবিআরে”। (সূত্র – http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-05-18/news/353079)। ঐ একই সূত্রে বলা হয়,অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে পোশাকমালিকদের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, ‘অধুনা আমাদের দেশে একটি লক্ষণীয় বিত্তশালী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সরকার সব সময় তাদের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব বা কর আদায় করতে পারে না।

জালিয়াতি:

ব্যাংক খাতে যেসব বড় বড় অনিয়ম-জালিয়াতি হয়েছে, তার বেশির ভাগ ঘটনার কারণ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার। পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিল। এসব জালিয়াতির ঘটনায় সর্বশেষ সংযোজন হল ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা হল-মার্ক গ্রুপ।

২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী রশীদ পোশাক খাত নিয়ে গবেষণা(বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) এবং বিশ্বব্যাংকের জন্য তৈরি এই গবেষণাপত্রটির নামই ছিল ‘বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের উত্থান: উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনকুশলতা অথবা সরকারি নীতি’) করেছিলেন। সেই গবেষণায় উঠে এসেছে কীভাবে পোশাক মালিকদের একটি বড় অংশ বন্ড সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে ‘রপ্তানি’ করা হবে এই মর্মে নিশ্চয়তা দিয়ে কাপড় আমদানি করে; সেই কাপড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মুনাফা করেছিলেন। একটি রপ্তানি আদেশের বিপরীতে যে গ্রস কঞ্জাম্পসন ধরা হত এর সাথে ওয়েস্টেজের কারণে ও রপ্তানি আদেশের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য ১৫ % বেশি কাপড় আনার বৈধতা ছিল। প্রায় সকল গার্মেন্টস মালিকেরা বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ প্রদান করে ১৫ শতাংশের বেশি কাপড় আনত, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এই বাড়তি ১৫ শতাংশ কাপড়ও কাটিং করা ছাড়াই রপ্তানি আদেশের পরিমাণ পূর্ণ হয়ে যেত। এই বাড়তি কাপড় গার্মেন্টস মালিকেরা খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়ে অসাধু উপায়ে কোটি টাকার মালিক বনে গেল। বর্তমানে যারা বিশাল রপ্তানিকারক রূপে পরিচিত তাঁদের অধিকাংশই সে সময়ের খোলা বাজারে কাপড় বিক্রির অসাধু হোতা ছিল। উল্লেখ্য যে সাধারণ কাপড় আমদানিকারককে আশির দশকে কাপড় আমদানিতে ১৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। (সূত্র-http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-05-18/news/353084)
আয় ও লাভের পরিসংখ্যান:

বুর্জোয়া কিছু অর্থনীতিবিদ ও বিজিএমই এ দাবী করে গার্মেন্টস সেক্টর এই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। কথা একটা মিথ্যে প্রচারণা, এই প্রচারণার মুলে রয়েছে মালিক পক্ষের রাষ্ট্রের নিকট থেকে উপরে উল্লেখিত নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা আদায়ের কৌশল । অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন এখনো কৃষিই হল অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। এই সেক্টরে কাপড়, সুতা, জিপার, বুতাম থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে বিদেশ থেকে বা দেশে স্থাপিত বহুজাতিক কোম্পানি থেকে আমদানি বা ক্রয় করতে হয় । ফলে গড়ে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসির পেমেন্ট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিলে অর্ধেক অর্থাৎ ১০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। যাইহোক, রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা ছারাই এই সেক্টরে লাভের পরিমাণটা কেমন?

এই সেক্টরে প্রবাদের মত প্রচলিত একটি ধারনা আছে যে, ২৫০ জন শ্রমিকের একটি কারখানায় বাৎসরিক মজুরী বাবদ খরচের সমান হয় মালিকের বাৎসরিক লাভ। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশের এক গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য পোশাক রপ্তানি কারক দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশী মালিকদের মুনাফার হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার যেখানে ৪৩.১০ শতাংশ, সেখানে কম্বোডিয়া ৩১.০%, ভারত ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়া ১০%, ভিয়েতনাম ৬.৫%, নেপাল ও চীনে ৩- ৪ %।

অর্থনীতি বিষয়ক একটি জাতীয় দৈনিকের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রফতানি বাবদ দেশে আসা আয়ের (এক্সপোর্ট রিয়েলাইজেশন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ে ১০০ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) ওপরে যাদের আয়, এ রকম প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৭টি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— কুয়ান টংঅ্যাপারেলস, পুলম্যান নিটওয়্যার, সোয়েটারটেক, ডেনিম্যাক, নিউস্টার ফ্যাশনস, রিফাত গার্মেন্টস, দ্য ডেল্টা কম্পোজিট, আজিম অ্যান্ড সন্স, নিট কনসার্ন, জে কে নিট কম্পোজিট, ডি অ্যান্ড এস প্রীতি ফ্যাশনস, ভিয়েলাটেক্স, ইউনিভার্সাল জিন্স, জিএমএস কম্পোজিট নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ, স্কয়ার ফ্যাশনস, তাহের সন্স ফ্যাশনস ও ফকির নিটওয়্যার। (সূত্র – http://www.bonikbarta.com/new/first-page/2013/05/19/598)

একই সূত্রে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, “সংসদ সদস্য ও শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের বিত্ত-বৈভবের কথা। তিনি একটি কারখানা নিয়ে ব্যবসা শুরু করে তিন দশকের মধ্যেই অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে যান। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা ২৬ হাজারের বেশি। ফজলুল আজিমের বিভিন্ন কোম্পানির সম্মিলিত বার্ষিক আয় প্রায় ২০ কোটি ডলার। তবে শ্রমিকদের দুর্দশার জন্য নিজেদের দায়িত্বহীনতার চেয়ে ফজলুল আজিম বেশি দোষ দেন পশ্চিমা ক্রেতাদের। তিনি বলেন, পশ্চিমা ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো উপযুক্ত অর্থ দিতে চায় না। তারা কেবল উৎপাদন বাড়ানোর ওপরই গুরুত্ব দেয়”।

উপরে উল্লেখিত নানা তথ্যকে আমরা দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি। এক, রাষ্ট্রকে পোশাক মালিক শ্রেণির কি কি দিতে হবে না এবং দুই, রাষ্ট্রের নিকট থেকে পোশাক মালিক শ্রেণিকে কি কি দিতে হবে। সেইসাথে নিবন্ধের পাঠকেরা নিশ্চয় বিনা পুঁজির বিপরীতে কত ধরনের মুনাফা, লাভ হতে পারে, এতক্ষণে নিশ্চয় অনুমান করতে পেরেছেন। তবুও এদের ক্ষুধা কমে না, সম্প্রতি এক গার্মেন্টস মালিক জনৈক আনিসুল হক গার্মেন্টস পল্লীর জন্য রাষ্ট্রের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা দাবী করে বলেছেন এতে এই সেক্টরের সমস্যা নাকি অনেকাংশে সমাধান হয়ে যাবে। এই দর্জি ব্যবসায়ীরা শুধু নিতে পারে, সর্বদাই এদের লকলকে লালায়িত জিহ্বা বের করা থাকে নেওয়ার জন্য, কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য মজুরী দিতে গেলে এরা প্রমাদ গুনে। এছাড়া ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায়, ১০% গার্মেন্টস মালিক কানাডিয়ান এবং ১০% অস্টেলিয়ান; এদের দ্বারা শ্রমিকের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয় না, তার কি গ্যারান্টি আছে?

“সুদখোর ডাঃ ইউনুসের প্রস্তাব, Workers’ well being Managed by Grameen”

নিবন্ধের এ পর্যায়ে ‘নো’বেইল জয়ী ইউনুস সাহেবের প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তার “সাভার ট্র্যাজেডি, পোশাক শিল্প ও বাংলাদেশ” নামক নিবন্ধটি (http://www.samakal.net/opinion-/2013/05/08/2927)পড়লাম এবং নিবন্ধে এই সুদী ভদ্রলোক গার্মেন্টস রক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষ, বিদেশি সংগঠন, এনজিও, নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে ‘সিটিজেন্স অ্যাকশন গ্রুপ ফর প্রটেক্টিং গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি‘ এবং ‘নাগরিক ওয়াচ ডগ প্রতিষ্ঠান’ ইত্যাদি গঠনের কথা বলেছেন, কিন্তু তার নিবন্ধের কোথাও শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা, ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক বিরোধী শ্রমনীতি উঠে আসে নি বরং এড়িয়ে গিয়েছেন।

তবে তিনি দুটি প্রস্তাবের মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সেটাও মালিকের কাছে থেকে নয়, পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ মালিক বর্তমানে যা লাভ করে সেখান থেকে মজুরি বাড়ানো যায় না, তার লেখায় ভাল কথার আচ্ছাদনে এই বিষয়টি ফুটে উঠেছে যা সহজেই ধরা পড়েছে।

ইউনুস সাহেবের ১ম প্রস্তাবটি ছিল -আন্তর্জাতিক মানের মজুরি কাঠামোর আওতায় মজুরি নির্ধারণ করে বিদেশী পাইকারি ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা। কিন্তু এই প্রস্তাবের ফলে যে উচ্চ মূল্যের (৫০ সেন্ট/ ঘণ্টা) শ্রমবাজার সৃষ্টি হবে, তার বিপরীতে যে লোকসান ও অর্থ দণ্ড মালিক শ্রেণী ও ক্রেতাকে গুনতে হবে; সেটা পুষিয়ে দিতে হবে ঐ শ্রমিককেই। কিভাবে? শ্রমিক তার উৎপাদনশীলতা ও কর্ম দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ আস্থা অর্জন এবং কোনোরূপ বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না-হয় তার নিশ্চয়তা দেয়ার মাধ্যমে।

ইউনুস সাহেব ভাল করেই জানেন পণ্যের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ১ম শর্তই হচ্ছে মালিকের সর্বোচ্চ পুঁজির বিনিয়োগ,সে অনুযায়ী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং কর্মী ব্যবস্থাপনা। এসবই নির্ভর করে মালিক শ্রেণীর মর্জির উপর। যেখানে এ দেশের অধিকাংশ মালিকের কারখানায় পুরানো মেশিনের জন্য ঘণ্টায় ঘণ্টায় সুই ভাঙ্গে এবং অদক্ষতা ও অনুৎপাদনশীলতার নামে সমস্ত ভাঙ্গা সুইয়ের টাকা সেই শ্রমিকের মজুরি থেকে কেটে নেয়া হয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির দায় এবং কোনোরূপ বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না হয় সেই মুচলেকার ভার ইউনুস সাহেব চাপালেন শ্রমিক শ্রেণীর উপর! শ্রমিক শ্রেণীর সাথে সম্পর্কহীন এই সুদী মানুষটি তাই একদিকে যেমন শ্রমিক শ্রেণীর জন্য মজুরি ৫০ সেন্ট করতে বলেছেন তেমনি এই ৫০ সেন্টের জন্য যে অর্থদণ্ড বিদেশী খুচরা ক্রেতাকে গুনতে হবে সেটা পুষিয়ে দেয়ার দায়ও শ্রমিক শ্রেণীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

ওনার ২য় প্রস্তাবটি ছিল, পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্য ৫০ সেন্ট বাড়িয়ে, খুচরা ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য ছিনিয়ে নিয়ে মজুরি আকারে মালিকের মাধ্যমে পরিশোধ করা। ক্রেতা কেন বাড়তি মূল্যে কিনবে? ওনার যুক্তি From the Happy Workers of Bangladesh, with Pleasure. Workers’ well being Managed by Grameenঅথবা BRACইত্যাদি সুন্দর সুন্দর একটা লোগো ট্যাগ করা থাকলেই বিদেশি খুচরা ক্রেতা বাড়তি মূল্যে পোশাক ক্রয় করবে। বাহ: কি সুন্দর প্রস্তাব!! সাম্রাজ্যবাদের দালাল ইউনুস সাহেবের এই প্রস্তাবে মালিক ও বিদেশি পাইকারি ক্রেতারা নিরাপদ। আবার সূদের ব্যবসা থেকে আন্তর্জাতিক দর্জির ব্যবসায় আগমন করে নিজের ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির স্বপ্ন, যা ফুটে উঠেছে তার চটকদার কথায়- ‘Workers’ wellbeing being Managed by Grameen’!

স্বপ্ন দেখা ভাল, কিন্তু এই প্রস্তাবের বিপরীতে প্রশ্নও থাকে এভাবে বাড়তি দামে যদি খুচরা ক্রেতারা পোশাক ক্রয় করলেও, এই বাড়তি মূল্য যে শ্রমিকের পকেটে আসবে এর নিশ্চয়তা কি? এই অর্থ মালিক কেড়ে নিয়ে তার ভোগ বিলাসে ব্যয় করবে না তার নিশ্চয়তা কি? আসলে সমস্যাটা কি ঐ ৫০ সেন্ট বাড়তি দামে? কারণ খুচরা বিক্রয় মূল্যে প্রতিটি গার্মেন্টস পোশাক ৫০ সেন্ট নয় কয়েক ডলার বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। এই কয়েক ডলার বাড়তি দামে বিক্রয় হওয়ার পরও লাভ যা হয় সেটা ঐ মালিক শ্রেণী ও বিদেশি পাইকারি ক্রেতার ভাগেই থেকে যাচ্ছে, সেখানে আরও ৫০ সেন্ট কেন ৫০ ডলারও যদি বাড়তি দাম দেয়া হয় সেটা ঐ মালিক শ্রেণীরই থেকে যাবে। প্রকৃত পক্ষে উনি ভাল করেই জানেন শ্রমিকের রক্তচোষা মালিকেরা কত লাভ করে , তিনি সেই লাভের অংক বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেছেন কৌশলে কিন্তু এর বিপরীতে শ্রমিক দরদী সেজেছেন প্রকাশ্যে।

এই দুটি প্রস্তাবের বিপরীতে আসল যে প্রশ্ন, সেটা হল বর্তমানে যে বারগেইনিং প্রাইসে পোশাক রপ্তানির চুক্তি হচ্ছে; এর সাথে কত সেন্ট যোগ করলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরী নয়, এক লাফে মজুরী দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ বিষয়ে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দ্য ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের (টিইউসি) একটি সমীক্ষা পূর্বে উল্লেখ করেছি, সেই সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাকর্মীদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ করতে যুক্তরাজ্যে প্রতিটি পোশাকের দাম বাড়তে পারে মাত্র তিন সেন্ট।।

ইউনুস সাহেব মালিকদের উদ্দেশ্যে নিশ্চয় বলবেন না, আপনারা মালিকেরা রপ্তানি চুক্তি সম্পাদনের সময় মাত্র বারগেইনিং প্রাইজে মাত্র ৩ সেন্ট যোগ করে নিন অথবা আপনার লাভের অর্থ থেকে ৩ সেন্ট ছেড়ে দিন এবং শ্রমিকের মজুরী দ্বিগুণ করে দিন। সাম্রাজ্যবাদ ও মালিক শ্রেণীর দালাল ইউনুস সাহেব ৩ সেন্টের বিপরীতে অবাস্তব নানা প্রস্তাবে নানা মায়া কান্নায় শ্রমিক শ্রেণীর শুভাকাঙ্ক্ষী রূপে নিজেকে জাহির করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ সামনে ইলেকশন!! নিবন্ধের শুরুতে আছে সেই সুর, তিনি বলেছেন “সাভার আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি। অপরাজনীতি যে আমাদেরকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে”। আপাত দৃষ্টিতে তার কথা সত্য মনে হলেও এই কথার মাঝে লুকিয়ে আছে তার বাসনা- রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। সে ইচ্ছা তিনি করতেই পারেন।

কিন্তু শুধুই সাভার কি আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি? এনজিও কি আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি নয়? জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়, রাষ্ট্রের অপরাজনীতি আজ সেই দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে এনজিও এর উপর। আমরা দেখি এই অপরাজনীতিকে আরও নেতিবাচক ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনীতিতে এন জি ও র ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাছে। যার ফলশ্রুতিতে এর আগে আমরা দেখেছি আবদুল জলিলীয় ৩০ সে এপ্রিলের থিওরি ও আল্টিমেটামের সাথে প্রশিকার সংশ্লিষ্টতা। তারই ধারাবাহিকতায় এখন আবার দেখা যাচ্ছে ইউনুস সাহেবের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কথাবার্তা ও রাজনীতিতে আগমনী পদধ্বনি এবং শ্রমিক শ্রেণীর দরদী সাজা। অপরাজনীতিই তাকে সুদী কারবারি রূপে স্থায়িত্ব দিয়েছে, অপঃরাজনিতিই তাকে রাজনীতিতে আগমনকে উৎসাহিত করছে; কিন্তু ওনার রাজনীতি আগমন রাজনীতিতে কোন উৎকর্ষতা নিয়ে আসবে এটা তার সাম্রাজ্যবাদী দালালীর নমুনা দেখেই আন্দাজ করা যায়।

উপসংহার: “সর্বাধিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও শ্রমিক শ্রেণীর একমাত্র পরিণতি শ্রম দাসত্ব”- লেনিন। আমরা লেনিন বর্ণিত তেমন কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নই, আমাদের আছে তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্র। সেক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিক শ্রেণীর দাসত্বের নমুনা, পরিণতি যেমনটি প্রত্যক্ষ করা যায়, নিবন্ধে তার কিছুই স্পর্শ করেনি। ১৯৭৯/৮০ থেকে যে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা তাকে রাষ্ট্র, এই মালিক শ্রেণী কখনই শিল্পের মর্যাদা দেয়নি। ব্যাক ওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা পশ্চাৎপসারণ শিল্প স্থাপনে যদি রাষ্ট্র ও মালিক শ্রেণী বিনিয়োগ করত তবে মৌলিক শিল্প বলতে যা বুঝি তার কাছাকাছি আমরা যেতে পারতাম। কিন্তু মালিক শ্রেণী, রাষ্ট্র সেদিকে মনোযোগ দেয় নি। কিভাবে মুনাফা করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিয়েছে। পুঁজি ও প্রযুক্তির স্বল্প ব্যবহারের পাশাপাশি শ্রমঘন শিল্প হওয়ায় এখানে মুনাফা যেমন বেশি তেমন শোষণের মাত্রাও অত্যধিক। দিনে দিনে এই শিল্প, শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি শোষণ নিপীড়নকে এক দিকে যেমন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে; তেমনি দর্জি-গিরি করে কিছু লোক রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাচ্ছে। এদের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের কোন দাম নেই, শ্রমের কোন দাম নেই।

রাষ্ট্রের ভূমিকা ও গার্মেন্টস শ্রমিকের অসংগঠিত রূপ এই শোষণ নিপীড়নকে আরও উৎসাহিত করেছে। ফলে জন্ম নিয়েছে নানা সংকট ও সমস্যা। কিন্তু সমস্ত দায় যেন ঐ শ্রমিক শ্রেণীর। আগুনের ধোঁয়ায় মালিক মারা গেলে হয় নাশকতা আর অব্যবস্থাপনায় শ্রমিক মরলে হয় দুর্ঘটনা। আমরা এই নাশকতা আর দুর্ঘটনার গল্প শুনে আসছি বহুকাল ধরেই।

এই খাতে “কমপ্লায়েন্স” নামক বহু চর্বিত একটি শব্দ আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। বস্তুত শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার ও সচেতনতাকে রুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কমপ্লায়েন্স নামক শব্দটি মালিক শ্রেণী ও পুঁজিবাদী ঘরানার লোকজন ব্যবহার করে থাকে। মালিক শ্রেণী ট্রেড ইউনিয়ন দিবে না, আই এল ও এবং প্রচলিত শ্রম আইনে যেটুকু সুযোগ সুবিধা আছে সেগুলো দিবে না কিন্তু কমপ্লায়েন্স দিবে। আজকাল আই এস ও সার্টিফিকেটও টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায়। মালিকের স্বার্থ , মালিকের ব্যবসা কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সর্বত্র সেই চেষ্টা!


সর্বশেষ যে রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ল, এখানেও আমরা দেখছি শুধু মাত্র রানাকে একক ব্যক্তি রূপে দোষী সাব্যস্ত করার রাষ্ট্র যন্ত্রের এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র যন্ত্রের হাতে এমন অনেক রানা আছে, এমন অনেক রানা তৈরি করা যাবে কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রগত কারণেই রাষ্ট্রকে ‘মালিক’ শ্রেণীকে বিপদমুক্ত রাখতে হয়। এরাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, এরাই দলের অর্থ ও চাঁদার জোগান দাতা। ভেবেছিলাম, এবারে ১লা মে তে শ্রমিক শ্রেণী অনেক বেশি জঙ্গি রূপ ধারণ করবে, দর্জিওয়ালাদের অবৈধ বিজিএমই ভবনকে গুড়িয়ে দেয়া না হোক, অন্তত বাইরের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলবে।কিন্তু এই দর্জিওয়ালাদের ও রাষ্ট্রের ভাগ্য ভাল যে শ্রমিক শ্রেণী সেরূপ কোন জঙ্গি রূপে আবির্ভূত হয় নি। এতে যে জিনিসটি বুঝা যায় তা হল এখনো গার্মেন্টস শ্রমিকেরা সংগঠিত রূপে আসতে পারে নি, নেতৃত্ব নির্বাচনে দ্বিধাবিভক্ত এবং শ্রমিক রূপে সত্যিকার শ্রমিক শ্রেণী হয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু যেভাবে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে তাতে এসকল সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লবী চরিত্র ধারণ করতেই হবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি ঘটে শ্রমিক শ্রেণীর জন্য ততই মঙ্গল। জেগে উঠতে হবে তাঁদের! সমাজ পরিবর্তনের নেতা হয়ে উঠতে হবে তাঁদেরই!

জয় হোক এ দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের।

(এ লেখার জন্য নানা তথ্য উপাত্তের জন্য আমি গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন ( Movement for Peoples Law and Constitution) এবং শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডঃ এ, কে, এম নাসিমের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *