হিযবুত তাহরীর


হিযবুত তাহরীরের বাংলা অর্থ ‘মুক্তির দল’। ইসলামি মতাদর্শভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হিযবুতের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংগঠনটিকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে সংগঠনটি। হিযবুত তাহরীরের অন্যতম টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের টার্গেট করে দল ভারী করার কাজ এখনও চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে হলগুলোতে গোপনে, অনেক সময় প্রকাশ্যেও চলছে সংগঠনটির কার্যক্রম। দেশের শ্রেষ্ঠ এ বিদ্যাপীঠ থেকেই মনিটরিং করা হচ্ছে সংগঠনটির দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক।

কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নামে-বেনামে গোপনে-প্রকাশ্যে চলছে সংগঠনটির কার্যক্রম। অব্যাহত রয়েছে তাদের দাওয়াতি কর্মসূচিও। ইন্টারনেটের মাধ্যমেও অব্যাহত রয়েছে দলীয় প্রচারণা। দেয়ালে সাঁটানো হচ্ছে সরকারবিরোধী পোস্টার।

হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। অতীতে জামায়াতের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোকে একত্রে কাজ করতে দেখা গেছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় তারা ‘হিযবুত তাহরীর উল্লাই’য়াহ বাংলাদেশ’, ‘হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামি বাংলাদেশ’ (হুজি)সহ অনেক জঙ্গি সংগঠনকে তাদের পতাকাতলে একত্রিত করেছে। আর কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মগজ ধোলাই করার জন্য ধর্মভিত্তিক বিচিত্র কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম কর্মসূচি হলো সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো; ধর্মের নামে ভুুল শিক্ষা দিয়ে সশস্ত্র কর্মকান্ডে উদ্দীপনা জাগানো।

হিযবুত নেতাদের বেশিরভাগ সমাজে উচ্চ ও সম্মানজনক পেশাজীবী। এদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী। পাশাপাশি হিযবুত সদস্যদের স্ত্রীরা নিষিদ্ধ সংগঠনটির মহিলা শাখার দায়িত্ব পালন করছেন। হিযবুতের মহিলা শাখার প্রায় অর্ধশত সদস্য রয়েছে। তারাও বিভিন্ন সম্মানজনক পেশায় সংশ্লিষ্ট।

পূর্বেই বলেছি ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং এটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরপর সারা দেশে হিযবুত তাহরীরের প্রায় ৭শ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও সংগঠনটির কার্যক্রম থামেনি। গ্রেপ্তারকৃত হিযবুত তাহরীর সদস্যদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ জন জামিনে ছাড়া পেয়েছে। জামিন পেয়ে তারা নীরবে সদস্য সংগ্রহ ও লিফলেট বিতরণ চালিয়ে যাচ্ছে। থেমে নেই তারা। নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারের পর মামলা হলেও তাতে ত্রুটি এবং প্রশাসনিক মনোযোগের অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা।

সন্ত্রাসকে লালন ও উৎসাহিত করার মতো পরিবেশ সৃষ্টিকারী হিযবুত তাহরীর ১৯৫৩ সালে ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধীরে ধীরে আফ্রিকা, ইউরোপ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু আরব দেশ এবং রাশিয়া ও তুরস্কসহ বিশ্বের ২০টির মতো দেশে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটির বিরুদ্ধে পৃথিবীর কয়েকটি দেশের সরকার উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০০১ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে। একই সালের ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে হামলায় ব্যবহৃত বিমান ছিনতাইকারীদের মধ্যে জায়াদ জারাহ, মারোয়ান আলশেহী ও মোহাম্মদ আতা জার্মানিতে হিযবুত তাহরীর সদস্য ছিল। অবশ্য এর আগে থেকেই দলটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ ওঠে।

বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি ও হিযবুত তাহরির এবং অন্যান্য ইসলামি দলগুলো একই সূত্রে বাঁধা। অর্থাৎ এদের মূল লক্ষ্য সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে তালেবানি রাষ্ট্র বা খিলাফতের ব্যবস্থা কায়েম করা। সন্ত্রাসবাদের কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে দলগুলো। যেমনঃ হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামি বাংলাদেশ (হুজি) ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (আইডিপি) নামে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আবার কখনো তারা ইসলামি দাওয়াতি কাফেলা, কখনো ইসলামি গণআন্দোলন নামে গোপনে একত্রিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ‘আইডিপি’ নামে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জেএমবির পাশাপাশি হিযবুতরাও ব্যাপক ছাড় পেয়েছিল। জরুরি অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জেহাদি জোশে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মিছিল ও লিফলেট বিলি করে, পত্রিকা পুড়িয়ে এবং কুশপুত্তলিকা দাহ করে জঙ্গিপনার পরিচয় দেয় দলটি। এদের সঙ্গে যোগ দেয় ইসলামি ঐক্য আন্দোলন, ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামি ছাত্র মজলিসসহ কয়েকটি জঙ্গি দল। নিষিদ্ধ দলটি বর্তমানে এসএমএস, ই-মেইল ও ফেইসবুকের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো অফিস ছাড়াই গোপনে নিজেদের মধ্যে এভাবে যোগাযোগ হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে লিফলেট, বুকলেটসহ নানা ধরনের পুস্তিকা। শিক্ষিত ও মেধাবী শিক্ষক-ছাত্ররা নেশার মতো তাদের পেছনে ছুটছে। যাদের সাধারণ মানুষ ঘৃণা করে; যাদের ন্যূনতম নীতি-আদর্শ নেই; যারা মানবতাবোধে উজ্জীবিত নয় তাদের কর্মকান্ডকে সমর্থন দিয়ে উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-ছাত্ররা বাংলাদেশকে গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

হিযবুতের শেকড় অনেক গভীরে। দেশ-বিদেশে তাদের শক্ত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। একাধিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও অন্যান্য নানান উৎস থেকে তারা অর্থ পেয়ে থাকে। হিযবুত তাহরীর ইসলাম সঠিক ইসলাম নয়। তারা মানুষকে প্রথমেই খিলাফতের দাওয়াত দেয়; মুসলিম হয়েও মানুষটির ইমান না থাকলে চলে; এমনকি শিরক-বিদআতে লিপ্ত থাকলেও তাদের সমস্যা নেই। তারা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা হাস্যকর। জামায়াত ও অন্য মৌলবাদী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিগণিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হিযবুত তাহরীর।

মানবতাবিরোধী চক্র যারা নাশকতার মাধ্যমে দেশকে পাকিস্তান বানানোর শপথ নিয়েছে, তাদের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাদের অপকৌশল রুখতে হবে। তাদের জন্য জীবন যেন ধ্বংস না হয় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আর তাহলেই দেশে জঙ্গি তৎপরতা সমূলে উৎপাটিত হবে।

খোরশেদ আলম
@M.KhurshadAlam

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *