বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা ও কিছু বিভ্রান্তি

বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধী দালাল ও রাজাকারদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়।১৯৭৩সালের ৩০নভেম্বর থেকে কার্যকর সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের দালাল ও রাজাকারদের ক্ষমা করা হয়েছে।হত্যা, লুটপাট, ধর্ষন এবং স্বাধীনতা বিরোধী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং নেতৃস্থানীয় কোনো দালাল ও ঘাতককে এই ক্ষমা ঘোষণার আওতায় নেওয়া হয়নি।ঐ সময় গোলাম আযম থেকে শুরু করে নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, খান এ সবুর, মাহমুদ আলী, খাজা খয়েরুদ্দিন, রাজা ত্রিদিব রায়ের মতো নেতৃস্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে তাদের ফেরার ঘোষণা করা হয় (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২,দৈনিক বাংলা)।

এই ব্যাপারে ১৯৭৩ সালের ৩০নভেম্বর স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে নিম্নোক্ত প্রেসনোটটি ইস্যু করা হয়।
প্রেসনোট :
যারা ১৯৭২ সালের দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ(পি.ওনং-৮,১৯৭২সালের)বলে আটক রয়েছেন অথবা সাজাভোগ করছেন তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের প্রশ্নটি সরকার আগেও বিবেচনা করে দেখেছেন।সরকার এ সম্পর্কে এখন নিম্নোক্ত ঘোষণা করছেন:
১/২নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিদের ও অপরাধসমূহের ক্ষেত্র ছাড়া:
(ক) ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী দন্ডবিধি ৪০১ নং ধারা অনুযায়ী উল্লিখিত আদেশবলে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রেহাই দেওয়া হচ্ছে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনবলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
(খ) কোনো বিশেষ ট্রাইবুনালের সম্মুখে অথবা কোনো বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উক্ত আদেশবলে বিচারাধীন সকল মামলা সংশ্লিষ্ঠ ট্রাইবুনাল ও ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে প্রত্যাহার করা হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে তাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকলে তাদের হাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
(গ)কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্লিখিত আদেশবলে আনীত সকল মামলা ও তদন্ত তুলে নেওয়া হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচার বা দন্ডযোগ্য আইনে সে অভিযুক্ত না হলে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।উল্লিখিত আদেশবলে ইস্যু করা সকল গ্রেফতারী পরোয়ানা, হাজির হওয়ার নির্দেশ অথবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুলিয়া কিংবা সম্পত্তি ক্রোকের নোটিশ দেয়া থাকলে তা প্রত্যাহার বলে বিবেচিত হবে এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা অথবা হুলিয়ার বলে কোনো ব্যক্তি ইতিপূর্বে গ্রেফতার হয়ে হাজতে আটক থাকলে তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।অবশ্য সে ব্যক্তি উল্লিখিত দালাল আদেশ ছাড়া কোনো বিচার বা দন্ডযোগ্য অপর কোনো আইনে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা না থাকে তবেই।
যাদের অনুপস্থিতিতেই সাজা দেওয়া হয়েছে অথবা যাদের নামে হুলিয়া বা গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছে তারা যখন উপযুক্ত আদালতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা ও বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করবে কেবল তখনই তাদের বেলা ক্ষমা প্রযোজ্য হবে।
২/দন্ডবিধির ৩০২ নং ধারা(হত্যা), ৩০৪ নং ধারা(হত্যার উদ্দশ্যে), ৩৭৬ধারা(ধর্ষণ), ৪৩৫ধারা(গুলি অথবা বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন),৪৩৬ধারা(ঘর জ্বালানো)ও৪৪৮ ধারায় (নৌযানে আগুন বা বিস্ফোরণ) অভিযুক্তও সাজাপ্রাপ্তগণ এক নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ক্ষমার আওতায় পড়বেনা”।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত, বঙ্গবন্ধু তার সরকারের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের কথা ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন,মুক্ত হয়ে দেশ গঠনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ সুযোগ তারা গ্রহণ করবেন এবং তাদের অতীতের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তিনি এটাই কামনা করেন।বঙ্গবন্ধু বলেন,বহুরক্ত,ত্যাগ তিতিক্ষা আর চোখের পানির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। যেকোনো মূল্যে এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে,এবারের বিজয় দিবস বাঙালীর ঘরে ঘরে সুখ,শান্তি,সমৃদ্ধি ও কল্যাণের এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত করবে।
তিনি বলেন,স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু লোক দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। পরে বাংলাদেশ দালাল আদেশ বলে তাদের গ্রেফতার করা হয়।এদের মধ্যে অনেকেই পরিচিত ব্যক্তি।স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দখলদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা নেমে এসেছিল।বঙ্গবন্ধু বলেন,এসব লোক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন।তিনি মনে করেন এতদিনে তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চয়ই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনায় রয়েছেন। তিনি আশা করেন তারা মুক্তিলাভের পর তাদের সকল অতীত কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশ গঠনের নতুন শপথ নিয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।(সুত্রঃদৈনিক বাংলা ১ডিসেম্বর ১৯৭৩)

১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর পরই
পাকিস্তানি দালাল, রাজাকার,আল-বদর,আল-
শামস তথা মওদুদী জামাতীদের বিচার করার
জন্য জারিকৃত হয় রাষ্ট্রপতির আদেশ
নম্বর-৮ “স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল অর্ডার
১৯৭২”।ওই আদেশের আওতায় বঙ্গবন্ধুর
নৃশংস হত্যাকান্ডের পরও ১১ হাজার আল-
বাদর,আল-শামস-এর
বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল।এদের মধ্যে ছিল ছাত্রসংঘের তৎকালীন
সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী(মইত্যা রাজাকার),শীর্ষস্থানীয়
জামাতী রাজাকার আব্বাস আলী খান সহ অনেকে।এরা কেউই
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় তো দূরের কথা;
ধারে কাছেও ছিল না।শুধু তাই নয়,১৯৭২
সালের ৪ঠা নভেম্বরে সংবিধানের ১২ এবং ৩৮
নম্বর ধারা অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক সকল
রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৭৩ সালের
১৮ই এপ্রিল ইংরেজি তারিখে একটি গেজেট
জারির মাধ্যমে গোলাম আযম সহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী কয়েকজনের নাগারিকত্ব বাতিল করা হয়(বিশদভাবে জানতে লিংক দেখুন… http://www.somewhereinblog.net/blog/Hariblog/28807986)।এ সময়ই
পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
জন্যও জারি হয় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন
১৯৭৩’এবং সে সময় কয়েকজনের বিচারের রায় ও হয়।ঐ সময়ে ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ তারিখে “বাংলার বাণী” পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম ছিল, “দালাল মন্ত্রী ইসহাকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড”। চারদলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের একাংশের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ই সেই ‘দালাল মন্ত্রী।

ইতিহাসে মিথ্যার কোন ঠাঁই নেই

৩ thoughts on “বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা ও কিছু বিভ্রান্তি

  1. বিঃদ্রঃ এ ধরনের পোস্টে প্রচুর
    বিঃদ্রঃ এ ধরনের পোস্টে প্রচুর রেফারেন্স ও ডকুমেন্টের প্রয়োজন হয় ।কিন্তু বর্ণ সংখ্যার লিমিটের কারনে বিশদভাবে বর্ননা ও রেফারেন্স দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।উল্লেখ্য যে, মোবাইল দিয়ে নেট ইউজের কারনে প্রতিটি পোস্টে ৫০০০ এর বেশি বর্ণ ব্যবহার করা যায় না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *