যাত্রাপথ

আমি এ পর্যন্ত যতগুলো গল্প লিখেছি আমার নিজের কাছে সবচেয়ে প্রিয় গল্প যাত্রাপথ। আমি জানি না সাহিত্যিক দিক থেকে এ গল্পের মান কিরকম। এটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। একভাবে চিন্তা করলে মনে হয় – এটা কোন গল্পই হয়নি, গল্প এরকম না। আবার আরেক সময় মনে হয়,- না! এটা একটা গল্প। আমার গল্প। আমার বিশ্বাসের গল্প।
আমার খুবই ভাল লাগবে আপনারা ধৈর্য ধরে আমার এই প্রিয় গল্পটা পড়লে। এবং এটাই।

ঘটনা ১ কঃ

তারিখ ১২-৮-০৮।

সময় ১১ টা ।

রুদ্র বাসা থেকে বের হল । বাইরে আগুন গরম । এখন রুদ্রের মনে হচ্ছে সে শীতের দেশে জন্মালে ভাল হত । রুদ্র প্রায় প্রায় ই ভাগ্য কে গালি দিতে পছন্দ করে । যদিও তথাকথিত ভাগ্যে তার বিশ্বাস নেই । তার কাছে ভাগ্য একটা ঘটনা । যে ঘটনার উপড় তার নিয়ন্ত্রন নেই । তার একটা ডাইরি আছে যেখানে সে যত্ন করে নিজের ধারনা গুলো লিখে রাখে । ভাগ্য সম্পর্কে সেখানে অগোছালো ভাবে যা লিখা আছে তা হুবহু তুলে ধরা হলঃ “ভাগ্য স্বাভাবিক ঘটনার বাইরে কিছু না। ভাগ্য স্বাভাবিক ঘটনারই ফল এবং সেখানে নায়কের হস্তক্ষেপ থাকে না ;থাকে অন্য কিছুর বা অন্য কারও । ধরা যাক টেবিলের উপড় একটা কলম পড়ে আছে। আমি কলম টি জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম, তাহলে এটি আমার ভাগ্য না; কিন্তু কলমটির জন্যে ভাগ্য । কারণ ঘটনাটি কলমটির নিয়ন্ত্রনে না । কলমটি যদি কোন মানুষের মাথায় পড়ে তাহলে সেটি সেই মানুষের জন্যে ভাগ্য । আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে ফেললে এটা দু’জনের জন্যেই ভাগ্য । কারণ ঘটনাটাটা আমরা সরাসরি কেউ ই নিয়ন্ত্রন করি নি । এবং এর জন্যে দায়ী আমাদের দুজনের অন্যমনস্কতা । সুতরাং ভাগ্য হচ্ছে সেই ঘটনা যার কারণ ব্যাক্তি নিজে না, অন্য কেউ বা অন্যকিছু ।”

রুদ্র যাবে নীলক্ষেত । ইয়েস্তেন গার্ডারের যতগুলো বই পাবে ততগুলো কিনে নিয়ে আসবে । গতরাতে ‘hallo, not det neo’ পড়ে সে মুগ্ধ হয়েছিল । রুদ্র ভাবে, ভাল তো পড়া শেষ করেছিলাম ! প্রথমে কচি কাঁচাদের বই মনে করেছিলাম ।

রুদ্র বের হয়ে একটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে । নিকোটিনের জন্যে রক্ত চঞ্চল । সিগারেট ধরাবে নাকি ধরাবে না সে বুঝতে পারছে না । যদি ত্রিশ সেকেন্ডের ভেতর গাড়ি এসে যায় তাহলে মহা ঝামেলা । সিগারেট ফেলে হুরমুর করে উঠতে হবে । এটা একটা বাজে ব্যাপার হবে তখন । রুদ্রের ইনট্যুশন বলল আড়াই মিনিটের মধ্যে বাস আসবে না । সে এর উপড় ভরসা করে সিগারেট ধরাল । ভাল মত দু’টান না দিতেই দশ সেকেন্ডের ভেতর একটা বাস এসে পড়ল । রুদ্রের ভেতর ঘটে সিদ্ধান্তহীনতা । একদিকে সিগারেট আরেকদিকে বাস । বাস ধরলে সিগারেট মিস করবে , সিগারেট খেলে বাস মিস করবে । একবার সময় বাঁচানোর তাগিদ আরেকবার নিকোটিনের ক্ষুধা মেটানোর তাগিদ । এই রুটে বাসের অবশ্য অভাব নেই । তিন মিনিটের মাঝে আরেকটা এসে পড়বে । এই বাসটা ছাড়লে খুব একটা ক্ষতি হবে না । রুদ্র একটু দূরে মুঈনকে দেখল । মুঈনের সাথে তার সামান্য কথা ছিল । এখনই বলবে কিনা বুঝতে পারছে না । সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট বাজে ব্যাপার । রুদ্র চট করে সামনে ক্ষানিক্ষনের জন্যে দাঁড়ানো বাসে উঠে পড়ল । বাকি কাজ গুলো না হয় পরে করা যাবে । তখন সময় ১১.২০ ।

বাসের পেছনের দিকে একটা সিটই খালি আছে । রুদ্র বসে পড়ল । তার পাশে জানালার ধারটাতে একটা মেয়ে । কলেজ পড়ুয়াও হতে পারে আবার ভার্সিটি পড়ুয়াও হতে পারে । মৃদু বডি-স্প্রের একটা ঘ্রান । রুদ্র ভাবল শেষ সে কবে বডি-স্প্রে দিয়েছিল ! এক বছর ? দু’ বছর ? সে এটা অন্তত নিশ্চিত স্ব-ইচ্ছা তে যত্ন নিয়ে সে কখনো বডি-স্প্রে দেয় নি । রুদ্র কতক্ষণ নিজের মনে কথা বলল, “আমি জামা কাপড়ের ব্যাপারে সচেতন না । বেশি প্রয়োজন না হলে শার্ট স্ত্রি-ও করি না । মানবজীবনের স্রেফ অলংকারিক ব্যাপার গুলো আমার কাছে বোঝা লাগে । আবার একদিক থেকে দেখতে গেলে অলংকার মানুষের সৃজনশীলতার একটি বহিপ্রকাশ”। রুদ্রের চিন্তায় ছেদ পড়ল । পাউলো কোয়েলহো এর বইটা পড়া দরকার । অনুবাদ এনেছিল । কেমন হয়েছে কে জানে ! কোলে রাখা ছিপছিপে ব্যাগটা থেকে সে বের করল ‘পঞ্চম পর্বত’ । বইয়ে মনোযোগ দেয়া যাক ।

“ঈশ্বর কে ? পূর্ব পুরুষের ধর্ম অনুসরণ করার অপরাধে আমার উপর যে তলোয়ার উঠে তার কারণ ও কি ঈশ্বর ? আমাদের পূর্ব-পুরুষের ধর্ম ধ্বংস করবার জন্যে সিংহাসনে ঐ যে ভিনদেশের রানী বসেছে তাও কি ঈশ্বরের ইচ্ছে ? যারা তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল , নিষ্পাপ এবং মোজেসের নীতি মেনে চলেন ঈশ্বর কি তাদেরও বিনাশ করেন ?”

এর উত্তরে পুরোহিতের কথাটা নিয়ে সে বেশ কিছুক্ষন চিন্তা করল । “ঈশ্বর যদি সর্বদা মঙ্গলের চিন্তা করেন তাহলে তাকে সর্বশক্তিমান বলা চলে না”। এই বাক্যটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে । পাশ থেকে একজন বলল, পাউলো কোয়েলহো ?

রুদ্র একটু হকচকিয়ে গেল । কিছুটা সময় নিয়ে মাথা ঝাকিয়ে বলল, হ্যাঁ… হ্যাঁ … পাউলো কোয়েলহো ।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

ঘটনা ১ খ

তারিখ ১২.০৮.০৮

সময় ১০.৩০

– কোথায় বের হবি ?

– এইতো , কয়েকটা বই কিনতে হবে । নীলক্ষেত যাব ।

– আজকে তোর বাসায় মামারা আসবে ।

– মা, প্রথম কথা আমার মামা একটাই । একাধিক মামা আসা অসম্ভব ।

– ওই একই তো । ভাবি সহ আসছে ।

– আসুক, আমি দুইটার ভেতর এসে পড়ব ।

ক্যামেলিয়া তার ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে কথা বলছিল । আজ একটা ঘোর লাগা দিন । ক্যামেলিয়া বেরিয়ে পড়ল । ইদানিং খুব বেশী কথা বলে বের হতে হয় না । ইন্টার পরীক্ষা শেষ করার এটা একটা ভাল দিক । ক্যামেলিয়া বাসস্ট্যান্ডে যথাসম্ভব ছায়াতে গিয়ে দাঁড়াল । মাঝে মাঝে এখানে দাঁড়িয়ে সে জীবনের গতিশীলতা দেখে । জীবন কত ব্যাস্ত ! কিভাবে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যায় বাস, ট্রাক, সিএনজি আর মানুষগুলো । সবার চোখে মুখে ব্যাস্ততা । অথচ সবাই কেমন যেন উদাস ! বাসের সিটে বসে , রাস্তার ফুটপাথে ব্যাস্তভাবে হাটতে হাটতে তারা কি এক চিন্তা করে ! সে নিজেও তো কি চিন্তা করে এত ? সে বাস দেখে, মানুষ দেখে আর দেখার পাশাপাশি চিন্তা করে । চিন্তা করে জীবনের, জীবনের অর্থের । যেভাবেই সে ভাবুক জীবনটা কোনভাবে তার অর্থময় লাগে না । এত গতিশীলতার অর্থ কি ? কোথায় পৌঁছাতে চাই আমরা ? এত গতিশীলতার মানে কি দ্রুত স্থিরতা অর্জন ? বাস রুদ্ধশ্বাসে ছুঁটে দ্রুত পৌঁছে স্থির হবার জন্যে ? ছোট ছোট করে চুল কাটা লোকটা দ্রুত হাটছে বাসায় গিয়ে বসার জন্য ?

যা কিছু মানুষ করছে যতটা না নিজের জন্যে , বেশিরিভাগটুকু পরবর্তিদের জন্যে । যতটা না নিজের জন্যে এর চেয়ে অনেক বেশি সন্তান-সন্ততির জন্যে । তারা আবার তাদের সব কিছু করবে পরবর্তি প্রজন্মের জন্যে । জীবন গড়তে গড়তে মারা যাবে । সমাজের বিকাশ হবে, সভ্যতার বিকাশ হবে মাঝখান থেকে ব্যাক্তিজীবন অর্থহীন । কার্ল মার্ক্স , চে গুয়েভারা, লেলিন এত কিছু করল! কেন? সমাজ গঠন ? কাদের জন্যে? মানুষ বেঁচে থাকে পরবর্তীদের জন্যে।

“এই শাহবাগ…এই শাহবাগ…”

এই ডাকে ক্যামেলিয়া সাড়া না দিয়ে পারলনা। সে বাসে উঠে পড়ল । ক্যামেলিয়া একটা জিনিস টানা চিন্তা করতে পারে না । চাপ চাপ লাগে । সে প্রায় এক বছর হল জীবনের অর্থ খুঁজছে । তার চিন্তা একটা লাইনেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে , সে আর আগাতে পারছেনা।

এ দেশের ড্রাইভার গুলোর সিদ্ধান্তের কোন জড়তা নেই। হুটহাট বাস থামিয়ে দেয়। একবার ক্যামেলিয়ার কপাল ফেঁটে গিয়েছিল। এখনো দাগ আছে। তবে লাভ এতটুকুই, দাগটা তার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। সামনের একটা লোক ড্রাইভারকে ধমকাচ্ছে। এভাবে বাস ব্রেক করা খুব খারাপ, আবার এরকম ভাষায় গালাগালি করাও চরম অশোভন। আশেপাশের মানুষ একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখালেই অন্যরকম হতে পারত সমাজটা। হয়তো দরিদ্রতা থাকত কিন্তু সমাজটা হত অসম্ভব সুন্দর। আস্তে করে তেইশ-চব্বিশ বছরের ছেলে বসল তার পাশের সিটে। বসার মধ্যে সংকোচ আছে কিন্তু সেটা চোখেমুখে বের হয়নি। ক্যামেলিয়া দেখেছে তার পাশে কোন পুরুষ বসলে সংকোচিত হয়েই বসে। লক্ষ্য রাখে গায়ের সাথে যাতে গা না লাগে। অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। বাসে অন্য সিট গুলো খালি থাকলে বসার জন্যে সেই সিটগুলোকেই প্রেফার করে। আবার দেখা যায় খুব ভিড়ের ভেতর শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা গুলোতে তারাই হাত চালিয়ে যায়। বাসের ভিড়ে, বইমেলার গেইটে, বানিজ্যমেলার ভিড়ে, ফ্যান্টাসি কিংডমের ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে… তারা কারা? গত বইমেলার গেইটে তার পেছনের লোকটা আর পাশে সংকুচিত হয়ে বসা ছেলেটা কে? তারা কি একই ব্যক্তি? পাশে আর সামনে সবাই মহাপুরুষ আর পেছনে সবাই শরীরে হাত বুলানো ব্যক্তি?

এভাবে চিন্তা করাটা খুব অন্যায়। জাতিগত ভাবে কোন একটা শ্রেণীকে বিচার করা অন্যায্য। খুব বড় ধরনের বর্ণবাদ। পাশে সংকুচিত হয়ে বসা ছেলেটি আর বইমেলার ভিড়ে তার পেছনের কাপুরুষ লোকটি অবশ্যই আলাদা। তার বাসার গেইটে সারাক্ষণ উদাসভঙ্গিতে বসে থাকা দারোয়ানটি আলাদা। তার বাসার পাশের এক চটপটিওয়ালা যে ক্যামেলিয়াকে দেখে বলে, ‘আপা এতদিন পর দেখছি!’ সেও আলাদা। পাশের বাসায় কবুতর নিয়ে ব্যস্ত থাকা ছেলেটি আলাদা।

ক্যামেলিয়া মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হল। পাশের ছেলেটি পাউলো কোয়েলহোর একটি বই বের করল।কিছুক্ষণ পড়ে আবার কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকল। ক্যামেলিয়া ঠাণ্ডা স্বরে জিজ্ঞাসা করল,

– পাউলো কোয়েলহো?

– হ্যাঁ… হ্যাঁ পাউলো কোয়েলহো

– খুব ভাববাদী লেখক।

– হুম। মনে হয় সর্বেশ্বরবাদী… প্যানথেইস্ট।

ক্যামেলিয়া মুচকি হাসল। ছেলেটি আবার বইয়ে মনোযোগ দিল।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

কিছুক্ষণ পর পাশের মেয়েটি বলল, কালরাতেই আমি ‘দ্য আলকেমিস্ট’ পড়েছি।

রুদ্র বইটা বন্ধ করে ফেলল। এভাবে পড়া যায়না। সে আস্তে করে বইটা ব্যাগে রাখল।

– দ্য আলকেমিস্ট অসাধারণ। কেমন ঘোর লেগে থাকে।

– আমি ঘোরে আছি। এখনো। আমি পাউলো কোয়েলহোর কয়েকটা বই পেলে নিয়ে আসব।

– নীলক্ষেত পাবেন।

– সেখানেই যাচ্ছি।

– ও…

– আপনি কোথায় যাবেন?

– নীলক্ষেত…

– ও… দ্য আলকেমিস্ট বইটা পড়ার পর মনে হয়না সব কিছু কথা বলছে?

– হুম । মনে হয়। আমি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে বইটা পড়ি। তবে জানিনা এখন পড়লে অনুভূতিটা কি রকম হত।

ক্যামেলিয়া আবারো একটি মুচকি হাসি দিল। জিজ্ঞাসা করল, কেন?

– বিশ্বাস আর অনুভূতি তো এক থাকেনা। সময়ের সাথে উপভোগও পরিবর্তন হয়। তাই সময় অনুযায়ী একেকটা বই পড়া দরকার। আমি যখন ক্লাস সিক্স সেভেন-এ গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তাম। কি যে আনন্দ হতো! এখন সেগুলো পড়লে ভালো লাগবে না। কিন্তু পুরনো আনন্দটা এখনো আছে । এখনো মনে করতে পারি কি রোমাঞ্চের ভেতর দিয়ে গেছি ।

– আমিও জানি । যে সময়টা কাকাবাবু, ফেলুদা আর তিন গোয়েন্দা পড়তাম । সেগুলো আলাদা অনুভূতি দেয় না…

– … কিন্তু সময় অনুযায়ী উপভোগ্য ছিল।

ক্যামেলিয়া সিটে হেলান দিল। মাথাটা সামান্য কাত করে বলল, কার বই ভালো লাগে?

– আমি খুব বেশি বই পড়িনি। ভারী ভারী কম পড়েছি। আপনার?

– নির্দিষ্ট কারো না যখন যেটা পাই।

– আপনার ইয়েস্তেন গার্ডারটা ভালো লাগবে।

– কেন?

– আপনাকে দেখে মনে হল।

– আপনি আমাকে দেখেছেন এখনো?

রুদ্র সামান্য লজ্জা পেল। চোখের কোণা দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেককিছুই লক্ষ্য করা যায়। রুদ্র পারে। এর মানে এই না যে সে ট্যাঁরা চোখ করে তাকিয়ে থাকে। ব্যাপারটা জটিল। প্রথমে চোখের পাশের অঞ্চলের ছবি আসে তারপর সংরক্ষণ করা দৃশ্যটা পর্যবেক্ষন করে… এরকমই। ব্যাপারটা নিয়ে রুদ্রের আরো ভাবতে হবে।

– দেখিনি। কিন্তু মনে হল।

ক্যামেলিয়া মনে মনে একটু হেসে নিল। কেমন বাচ্চাদের মত একটা উত্তর।

– আপনার নাম কি?

– রুদ্র…

– আমার নাম ক্যামেলিয়া

– নামটা সুন্দর। কাল আমি ইয়েস্তেন গার্ডারের যে বইটা পড়লাম সেটা শুরুই হয়েছে ‘Dear Camellia’ লাইনটি দ্বারা। দাদু তার নাতনি ক্যামেলিয়াকে ঘটনাগুলো বলছিল।

– আপনাকে দেখে মনে হয়না আপনি অনেক কথা বলতে পারেন।

– আমি অনেক কথা বলতে পারি। টানা ছয় ঘন্টা কথা বলার রেকর্ড আছে আমার। তবে বাজে ব্যাপার হচ্ছে আমি টানা কিছুক্ষণ কথা বললে আশেপাশের শ্রোতারা ঘুমিয়ে পড়ে। এটা অনেক অপমানজনক। আগে মনে হত আমি অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারি। এখন মনে হয়না। খুবই কষ্ট দেয়।

– নাহ্ ! আপনার কথা শুনতে খারাপ লাগেনা।

রুদ্র নির্লিপ্তভাবে বলল, আপনাকে দেখতে খারাপ লাগে না। এরকম প্রত্যুত্তরে ক্যামেলিয়া হাসবে নাকি অবাক হবে বুঝতে পারলনা। সে একটু বোকার মত হাসল। এরকম পরিবেশে এরকম হাসি একটু বেমানান। ক্যামেলিয়ার মনে হল তার আরও স্মার্ট হওয়া জরুরি। আগে ক্যামেলিয়াকে কেউ স্মার্ট বললে ভালো লাগত। এখন স্মার্ট শব্দটাই কেমন খ্যাত্ খ্যাত্ লাগে। বকধার্মিকেরা যেভাবে ঈশ্বরকে নিচে নামাচ্ছে সেভাবে এযুগের ছেলেমেয়েরা স্মার্ট শব্দটাকে নিচে নামিয়ে ফেলেছে। এটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

– তুমি শীর্ষেন্দু পড় খুব, না?

– হ্যাঁ

– এই যে তুমি বললে জীবন অর্থহীন। হতে পারে। জন্ম যেমন অভিনব ব্যাপার, মৃত্যু তেমনই বাজে একটা ব্যাপার। মানুষ প্রায় সম্পূর্ন অনুভূতিহীনতার পর্যায়ে অনেকবার গেছে। কিন্তু কখনো পর্যবেক্ষন করতে পারেনি। তোমার স্বপ্ন ছাড়া ঘুমের বাকি সময়টুকু অনুভূতিহীনতা। কিন্তু তুমি বলতে পারবেনা সেটা কি। এটা একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। তুমি যখন অনুভূতিহীন তখন তুমি সেটা কখনই জানবেনা, জানবে অন্য কেউ। তেমনই মৃত্যুর পর তুমি কখনও বুঝতেই পারবেনা তুমি মারা গেছ। বুঝবে অন্যরা। মৃত্যু খুবই ভালো একটা বিষয়।

– মাত্রই তো বললেন বাজে।

– বাজে এজন্যেই যে জন্মের একটা অর্থ আছে। ভালো এই জন্যেই যে জীবনের কোন অর্থ নেই। বুঝতে পেরেছ?

– নাহ্ ! ভাবছি একটু।

তারা দু’জন ফুটপাতে হাঁটছে। নীলক্ষেতে পৌঁছে গেছে তারা। মাথার উপর গ্রীষ্মের সূর্য, নীলক্ষেত এসে যেন গরমের প্রচন্ডতা আরও বেড়ে গেছে। ক্যামেলিয়ার মনে হল এত মনোযোগ দিয়ে কখনো সে কারো কথা শুনেনি। তবে উনি ঠিকই বলেছেন, ওনার কথা শুনলে আশেপাশের মানুষ ঘুমিয়ে যায়। তার ঘুম পেয়েছে। এটার কারণ এটি নয় যে তার কথা গুলো বিরক্তিকর বা একঘেয়ে। কথাগুলোতে প্রচুর মনোযোগ দেয়া লাগে। অনেক কিছু কল্পনা করতে হয়। তাই ক্লান্তি এসে পড়ে। ক্যামেলিয়া ভাবতে পারেনি একঘন্টার পরিচিত মানুষের সাথে সে এত মনোযোগ দিয়ে কথা বলবে।

ক্যামেলিয়ার এখন আর জীবন নিয়ে কথা বলতে মনে চাচ্ছে না। হালকা কথাবার্তা বলতে ইচ্ছে করছে। একটু রিফ্রেশমেন্ট এর দরকার।

– আপনি উত্তরা কত’তে থাকেন?

– সেক্টর ৪-এ

– ও…

তারা একটা বুকস্টলের সামনে দাঁড়াল। ক্যামেলিয়ার মনে হল খুব দ্রুত বাসায় যাওয়া দরকার। এখানে বেশি দেরি করা যাবেনা।

– আপনি দেরি করবেন এখানে?

– নাহ্ । কয়েকটা বই কিনেই চলে যাব।

– একসাথেই তাহলে যাওয়া যাবে।

– হ্যাঁ… যাবে।

কিছুক্ষণ পর রুদ্র বলল, ক্যামেলিয়া কয়েকটা থ্রিলার নিয়ে যাও; রাতে পড়তে অসাধারণ লাগে। আমি এখনও ক্রাইমস্টোরি পড়ি।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

রাস্তায় প্রচন্ড যানজট। তবে এখানে এমন যানজট হবার কথা না। রুদ্র বাসের জানালা দিয়ে একটা উঁকি দিল। যতদূরেই চোখ যায় গাড়ি আর গাড়ি। বাসের হেলপার বলল, ‘সামনে গাড়ি একসিডেন্ করছে’। আশেপাশের যাত্রীরা জিজ্ঞেস করল, কোন গাড়ি? হেলপার বলল, ‘বাস। রাস্তায় কাইত হইয়া আছে’। রুদ্র মাথা ভেতরে নিল। হাতে ধরা বইয়ে মনোযোগ দিল। তখন বাজে ২ টা ১৫। ক্যামেলিয়াও একটা বই পড়ছে; ‘Hallo, not de aon’। “ঈশ্বর আছে নাকি নেই সেটা বড় কথা না। ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন, তাহলে উনি কে? আর ঈশ্বর না থাকলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটা কি?”

অনেকক্ষণ পর জ্যাম ছুটল। প্রায় পুরাটা রাস্তা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ কারও সাথে কথা বললো না।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..


ঘটনা ২ ক

তারিখ ১২-৮-০৮।

সময় ১১ টা ।

রুদ্র বাসা থেকে বের হল। বাইরে আগুন গরম। এখন তার মনে হচ্ছে সে শীতের দেশে জন্মালেই ভাল হত। অন্তত গরমের অস্বস্তিটা লাগত না। গরম প্রতিভানাশক। রুদ্র তার ভাগ্য কে গালি দিতে পছন্দ করে। যদিও তথাকথিত ভাগ্যে তার বিশ্বাস নেই। ভাগ্য তার কাছে স্বাভাবিক ঘটনার বাইরে কিছু নয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত সে তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। রুদ্র এখন নীলক্ষেত যাবে। ইয়েস্তেন গার্ডারের যতগুলো বই পাবে সব নিয়ে আসবে। ইয়েস্তেন গার্ডার ভাবতে শিখায় ।

রুদ্র রাস্তায় নেমে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। সিগারেট ধরাবে নাকি ধরাবে না। সিগারেট জ্বালাতে মন চাচ্ছে খুব। সমস্যাটা বাস আসা নিয়ে। ত্রিশ সেকেন্ডের ভেতর বাস এসে পড়লে সমস্যা। সিগারেট ফেলে দিতে হবে । রুদ্রের ইনট্যুশন বলল বাস আড়াই মিনিট পর আসবে। রুদ্র সিগারেট ধরাল। রুদ্রের ইনট্যুশন ভুল প্রমান করে বাস দশ সেকেন্ডের ভেতর এসে পড়ল । রুদ্রের ভেতর ঘটল সিদ্ধান্তহীনতা । সিগারেট ফেলে দিবে নাকি বাস টা ছেড়ে দিবে ? বাস এখানে মিনিটে মিনিটে আসে। একবার তার মনে হল পরের বাসে উঠবে সে। সে কিছু দূরে মুঈনকে দেখল। তার সাথে রুদ্রের সামান্য কথা ছিল। বাস থেকে হেলপার হাঁক ছাড়ল, এই শাহবাগ… শাহবাগ… । রুদ্রের মনে হল বাকি কাজ গুলো পরে করা যাবে। সে বাসে উঠতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে ডাক এল, রুদ্র… এই রুদ্র…। মুঈন ডাকছে। সিগারেটটা সে ততক্ষনে ফেলে দিয়েছে। খুব বাজে একটা কম্বিনেশনের ঘটনা ঘটল। অন্তত রুদ্রের তাই মনে হল।

– কোথায় যাচ্ছিস ?

– নীলক্ষেত।

– তোর সাথে কথা ছিল।

– চল একটা চায়ের দোকানে বসি।

তারা একটা চায়ের দোকানে বসল। দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিল। রুদ্র আরেকটা সিগারেট ধরাল, আয়েশ করে এখন খাওয়া যাবে। পাশ থেকে মুঈন বলল, এত সিগারেট খাস কেন ?

– এত কোথায় ? মাত্র তো একটা।

– এখন তো টানা খেতে থাকবি।

রুদ্র চায়ের কাপটা নিতে নিতে বলল, ব্যাপার কি? মুঈন খুব উদাসভঙ্গিতে উত্তর দিল, তোকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে দিতে হবে।

রুদ্র জিজ্ঞাসা করল, কি কাজ?

মুঈন একটু সময় নিল। তারপর বলল,

– আমি তোকে আমার উপন্যাসের একটা পান্ডুলিপি দিব। তুই বাংলাবাজারে ‘শব্দ প্রকাশনী’ তে নিয়ে যাবি। আমি যেতে পারছিনা”।

– কেন ?

– একটা কাজ আছে। তুই নিয়ে যা।

– না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কি আমাকে দেখে নিলি?

– হুম। তুই না থাকলে যেতে হত। আমি না গিয়ে যদি পান্ডুলিপিটা জমা দিতে পারি তাহলে অধিক লাভবান হব।

রুদ্র পান্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে বলল, কি নিয়ে উপন্যাস?

– পরে বলা যাবে বিস্তারিত। তবে এখন এটা নিয়ে আলোচনা করতে ভাল লাগছে না।

– মুঈন তুই ফেসবুকে এসব কি পোস্ট দিস আজেবাজে? পড়লে মেজাজ খারাপ হয়।

মুঈন সামান্য হাসল।

– তোর খারাপ লাগতে পারে কিন্তু ফেসবুকে আমার মুরিদের অভাব নেই।

– তুই যেরকম আপোসে লিখালিখি করিস আমার বিরক্ত লাগে। একটা অসৎ মানুষ দেখি।

– ব্যাপারটা কিন্তু আপোসের না , ব্যাপারটা ফিটনেসের। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে প্রথার সাথে সামান্য আপোস বাঞ্চনীয়। তারপর মোটিভেশন, তারপর পরিবর্তন।

– এভাবে বলে তুই বৈধতা আনতে পারিস কিন্তু তুই লিখালিখিতে অসৎ প্রকৃতির। এটা সত্য।

– হতে হয়।

মুঈন কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। বলল,

– ফেসবুকে একটা মেয়ের সাথে সামান্য কথা হয়েছে। কথাবার্তা অসাধারণ। মনে হয় আমার মুরিদ।

– তোর ইন্টার লেভেলের আবেগ আমার ভাল লাগে না।

– এখানে ইন্টার লেভেলের কি দেখলি?

– আমি এখন উঠব।

– নাহ, তুই বলে যাবি এখানে তুই ইন্টার লেভেলের কি দেখলি !

– এখন তুই যা করছিস তাও ইন্টার লেভেলের কাজ। মেয়েটার নাম কি?

– ক্যামেলিয়া।

– নামটা সুন্দর।

– নামধারীটিও সুন্দর। আশেপাশেই থাকে বোধ হয়। আমি ফোন নাম্বার নিব না।

– বাসার ঠিকানা নে। চিঠি লিখিস ক্যামেলিয়া কে। তোর মুরিদ যেহেতু খুব খুশি হবে। জন্মদিনটা জেনে রাখিস।

রুদ্র বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল। তার এখন নীলক্ষেত যাওয়া দরকার।

এই রুটে কিছুক্ষণ পরপর-ই বাস আসে। রুদ্র একটা লোকাল বাসে উঠে পড়ল। খুবই বেহাল দশা বাসের। এই বাসের ইঞ্জিন কিভাবে এতগুলো মানুষকে টেনে নিয়ে যায় রুদ্র ভেবে পায় না। রুদ্র মাঝের দিকে একটা সিট পেল। রুদ্র বুঝতে পারল না এটা কে ভাগ্য ভাল বলবে কিনা। এটাতে ভালোর কিছু নেই। তার বসে যাওয়া মানে আরেকজনের দাঁড়িয়ে যাওয়া। সমস্ত মানুষকে হৃদয়ে ধারন করলে ভাল ভাগ্য এবং খারাপ ভাগ্যতে কাটাকাটি। তবে স্বার্থপরের মত নিজের চিন্তা করলে ভাগ্য ভাল। রুদ্র তার ছিপছিপে ব্যাগটা থেকে পাউলো কোয়েলহো এর ‘পঞ্চম পর্বত’ বের করল । বইটা তার পড়া দরকার।

তার পাশে একজন প্রবীণ লোক বসেছিলেন। উনি ঘাড় ঘুরিয়ে রুদ্র ও তার বইটা এক পলক দেখলেন। ঘাড় সোজা করে বললেন, ‘বই পড়া স্বভাবটা ভাল। কোন ছেলেকে আমার বই পড়তে দেখলে ভাল লাগে’।

রুদ্র মুচকি হাসল। সামান্য মাথা ঝাকাল। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাচ্ছ?

রুদ্র চিবুক চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘এইতো নীলক্ষেত, আপনি ?’

রুদ্র বুঝতে পারল ভদ্রলোক নিঃসঙ্গতায় ভোগা একজন। যেখানেই যায় কথা বলার মানুষ আঁকড়ে ধরে। যেমন একজন রুদ্রের বাবা। মাঝে মাঝে বাসায় কেউ এলে রুদ্রের বাবা বুভুক্ষের মত কথা বলে। নিজের ধ্যান ধারণার কথা বলে। ঘটনা শোনায়। এদের জন্যে রুদ্রের অনেক খারাপ লাগে। আবার রুদ্র যখন ছোট ছিল তখন সে দেখত তার দাদাকে; নিঃসঙ্গতায় ভোগা একজন মানুষকে। চারপাশে তার দাদার এত মানুষ কিন্তু তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে কেউ নেই ! তার কথা মনোযোগ দিয়ে কেউ শুনত না, তার কথাবার্তা ছিল গুরুত্বহীন, ফেলে দেয়া ডিমের খোসার মত। রুদ্রই একমাত্র ব্যাক্তি যে তার দাদার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত। ঠিক মনোযোগ নয়, অন্তত মনোযোগ দিয়ে শোনার ভান করত। তার দাদা যখন কথা বলত একটানা, কথা বলার আনন্দে তার চোখ চকচক করত। হয়ত দুখের কথা বলতেন কিন্তু সেখানে বলার আনন্দ ছিল। রুদ্র ইচ্ছে করেই নানা রকম প্রশ্ন করত কৌতুহল না থাকা স্বত্ত্বেও। অন্তত তার দাদা কথা বলুক। যৌবনকাল মানুষের শ্রেষ্ঠ সময়। তার দাদু ফিরে যেতেন যৌবনে।

তার পাশের লোকটির সাথেও কিছুক্ষণ কথা বললেও হয়ত ফিরে যাবেন যৌবনে।

– তুমি ভাগ্য বিশ্বাস কর?

পাশের লোকটির হঠাত প্রশ্নে রুদ্র থতমত খেল। এখন কি উত্তর দিবে সে? তার কাছে ভাগ্যের সংজ্ঞা যা এই লোকটির কাছে সেটি নাও হতে পারে। ঠিক তাকে কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, তুমি আত্মা বিশ্বাস কর? তার জানতে হবে যে প্রশ্ন করেছে তার কাছে আত্মার সংজ্ঞাটা কি রকম। আত্মা মানে কি আত্ম সত্তাটা ই নাকি বাতাসের মত একটি পদার্থ যা আমিত্ব সৃষ্টি করে !

রুদ্র উত্তর দিল, করি আবার করি না।

রুদ্র কি বলবে যে, ভাগ্য হচ্ছে নিজের নিয়ন্ত্রিত ঘটনার সাথে অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ঘটনার সংঘর্ষ ? বললে কি হবে ?

– আমি করি।

লোকটি উদাস হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল,

– তুমি জন্মেছ এটা তোমার ভাগ্য না?

রুদ্র খানিকক্ষণ চিন্তা করল। আসলেই তো! মানুষের জীবনটা শুরু হয় ভাগ্য দিয়ে। তার ভাগ্যের তত্ত্বটা দিয়ে চিন্তা করলেই ভাগ্য মানে অনিয়ন্ত্রিত ঘটনা। সে যে রুদ্র হয়ে জন্মাল এটাতে কি তার হাত ছিল? আমাদের সারাটা জীবন ভাগ্যের ছড়াছড়ি। ভাগ্য শব্দটিকে বিশ্লেষন করলে কি দাঁড়ায়? ভাগ থেকে এসেছে শব্দটা। এখানে ভাগ মানে কি নিজের পাওনা? কিন্তু ভাগ্য তো অবধারিত কোন ঘটনা না। কখনোই না। জীবন কি কোথাও লিখা থাকে ? তবে আমাদের জন্ম কিন্তু ভাগ্য। আমি ঠিক এই রুদ্রটাই কেন হলাম? আমি হতে পারতাম একটি কৃষকের ছেলে অথবা বিল গেইটসের ছেলে অথবা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। আবার আমি একটা মেয়েও হতে পারতাম। কিন্তু হইনি। কেন আমার আমিত্বটা ঢুকে গেল আমার বাবা মায়ের নিষিক্ত ভ্রুনতে ! কেন অন্য কারোরটা তে নয় ? রুদ্র এটা নিয়ে যে আগে ভাবেনি তা নয়। রুদ্রের মনে হল এর একটা সমাধান সে পেল। এটা নিয়ে সে আজই ডাইরিতে লিখবে। রুদ্র বাসায় গিয়েই যে কাজটি করবে সেটি হচ্ছে ডাইরিতে গুছিয়ে লিখবে সে কেন বিল গেটস এর ছেলে হল না। রুদ্রের একটু আনন্দ হচ্ছে। পাশ থেকে শব্দ এল, মৃত্যুটাও কিন্তু ভাগ্য। তুমি কখনো বলতে পারবে না কখন মারা যাবে। ঠিক না?

রুদ্রকে মৃত্যু তেমন ভাবায় না যতটা ভাবায় জন্ম। জন্ম রহস্যময় আর মৃত্যু কৌতুক। রুদ্র যখন জন্ম মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করছে তখন বাম পাশের রাস্তাটা দিয়ে সমকোণে আরেকটা বাস আসছে সিগনাল না মেনে। সেটা রুদ্র দেখল না, তার পাশে বসা প্রবীণ ভাগ্যবাদীটি ও দেখল না। হঠাৎ একটা পরিবর্তন এল। সে বুঝার সময় ও পেল না যে সে এখন আর জন্ম মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করছে না। সে তার চিন্তা পর্যবেক্ষন করার সময় ও পেল না। সে দু’টি জিনিস অনুভব করল। সে একটা কেন্দ্রাভিমুখী বল অনুভব করল মানে ছিটকে যাওয়ার অনুভূতি। আর সে প্রবল বেগে ছিটকে পড়লো সামনের সিটের দিকে। তার ব্যাগ আর বইটা বুকে ধরা ছিল। রুদ্রের বাস এক্সিডেন্ট করেছে। দুইটি বাসের সংঘর্ষ। দুটি বাসই কাত হয়ে পরে আছে রাস্তায়। আর দুই মিনিট টিকে থাকলে হয়ত রুদ্র শাহবাগ নামত। এক গ্লাস লেবুর শরবত খেত। কারণ রুদ্রের প্রচুর পিপাসা পাচ্ছিল।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

ঘটনা ২ খ

ক্যামেলিয়ার পাশে একটি হাই-ফ্যাশনেবল ছেলে বসেছে। কানে হেডফোন আর হাতে মোবাইল। ক্যামেলিয়া জানালা দিয়ে তাকিয়ে চিন্তা করল ফ্যাশনেবল শব্দটা ও তার খ্যাত্ খ্যাত্ লাগে। ক্যামেলিয়া মনে মনে হেসে দিল। সেটা চোখে মুখেও বেরিয়ে পড়ল। পাশের ছেলেটি একটু তাকাল । আবার সিটে হেলান দিল।

ক্যামেলিয়া একা একা ঘুরে ঘুরে বই কিনল। লেবুর শরবত খেল। কয়েকটা হুমায়ূন আজাদ আর আন্দালিব রাশদীর বই কিনল। আন্দালিব রাশদীর গল্পগুলো তার অসাধারণ লাগে।

ক্যামেলিয়া বাসায় ফিরতি পথে প্রচুর ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ল। ঘটনা শুনল সামনে একটা বাস এক্সিডেন্ট হয়েছে। দুটি বাসের সংঘর্ষ। এখনো গাড়ি সরায় নি। ক্যামেলিয়া বাস থেকে নেমে গেল। বসে থাকা অর্থহীন। এক্সিডেন্ট হওয়া একটা বাসের সামনে ক্যামেলিয়া দাঁড়াল। বেশির ভাগ মানুষই মৃত পড়ে আছে। এখন টেনে টুনে একটা যুবকের লাশ বের করছে। ছেলেটির কোলে একটা ব্যাগ আর বই। ক্যামেলিয়া উঁকি মেরে দেখল ‘পঞ্চম পর্বত’ বইটা। ক্যামেলিয়া মনে করার চেষ্টা করল এই বইটি পড়েছে কিনা। এর মূল নামটা কি ‘A Monte Cinco’ ছিল? ক্যামেলিয়া ভাবল, ছেলেটি কি বাসে বসে বইটা পড়ছিল ! মৃত্যুর আগে সে কি ভেবেছিল? ত্রিশটা সেকেন্ড আগেও হয়ত সে বুঝতে পারে নি কিছু। সমস্ত যাত্রাটা হয়েছিল তার অভ্যেসে। টানা হেঁচড়ায় বইটা কোল থেকে পড়ে গেল। সেটার দিকে কেউ নজর দিল না। ক্যামেলিয়া ভাবল, এখানে প্রত্যেকটা মানুষের পেছনে একটা করে গল্প আছে, আছে হাজারো স্মৃতি, হাজারো পৌরুষদীপ্ত অধ্যায়। এখানে হয়ত আছে কয়েকটা প্রতিভা! কে বলবে এই মৃতের মাঝে একজন খুব বড় কিছু হতে পারত না ! অথবা ‘পঞ্চম পর্বত’ ধরা ছেলেটিও হয়ত জয় করতে পারত নোবেল। আবার নাও পারতে পারে, কিন্তু পারতেই পারে। একটা মৃত্যু ক্যামেলিয়ার কাছে প্রচন্ড শক্তির অপচয় !

পাশ থেকে একজন বলল, সবই ভাগ্য !

ক্যামেলিয়া বাক্যটি মেনে নিয়েও আবার মেনে নিতে পারল না। What is fate? আমি পিছলে পানিতে পড়লে সেটা ভাগ্য আর লাফ দিয়ে পড়লে?

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

ঘটনা ১ গ

রুদ্র আর ক্যামেলিয়ার গল্প যখন শুরু হয়েছে এর দু মাস পরের ঘটনা

তারিখঃ ১২.১০.০৮

সময় বিকেল ছয়টা।

– বুঝেছ ক্যামেলিয়া, তুমি কেন ক্যামেলিয়া হলে? কেন উত্তরার একটা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হলে? পারতে না আফ্রিকার কোন অধিবাসী হতে? ভিয়েতনামের কোন একটা নাগরিক হতে? অথবা পারতে না দশ হাজার বছর আগে কিংবা এক হাজার বছর পূর্বে জন্ম নিতে? একটা পাখি হলে না কেন তুমি? পারতে না?

– পারতাম !

– তাহলে কেন হলে না?

– ভাগ্য।

– না… না। তুমি আগেই স্বীকার করেছ ভাগ্য বলে কিছু নেই। এখন উত্তর দাও।

– আমি পারছি না।

– এর আগে বল তুমি কি তোমার শরীরটা নাকি স্বভাব চরিত্র !

– কোনটাই না। এগুলো আমার আমিত্বের অলংকার।

– মানুষের সাথে মানুষের পার্থক্য কিন্তু এগুলোই। তাহলে আমিত্বটা কি?

– একেবারে মৌলিক। একেবারে।

– তুমি যদি শরীর আর স্বভাবকে আমিত্বের একটা প্রকাশ হিসেবে দেখ তাহলে আমিত্ব অন্য কিছু।

– এটা কি রুদ্র?

– আমি একটু একটু বুঝতে পারি। আমি তোমাকে বুঝাতে পারব না। তুমি নিজে চিন্তা কর। কিছুদিন পর আমার ধারণাটা শোন।

– আচ্ছা।

তারা দু’জন বসেছিল একটা লেকের পাশে। তখন বিকেল ছিল। পাখি ডাকছিল। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। তারা একটানা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকল। ক্যামেলিয়ার মনে চাচ্ছিল একটু অন্য ধরনের কথা বলতে। অথবা রুদ্রের হাতটা ধরতে! ক্যামেলিয়া রুদ্রের হাতে আস্তে করে একটা মৃদু চাপ দিল।

ঘটনা ২ গ

তারিখ ১২.১০.০৮

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

ঘটনা ১ ঘ

রুদ্র ক্যামেলিয়ার একটা প্রশ্ন শুনল, ভালবাসাটা কি এক্সাক্টলি? রুদ্র আনমনে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে।

ঘটনা ২ ঘ

ক্যামেলিয়ার আশেপাশে বন্ধুর খুবই অভাব। ফেসবুকে যায়। রাজনীতি , রাজনীতি এবং রাজনীতি। রাজনীতি শিল্প নাশক। ইদানীং আবার কি হয়েছে ‘মুঈন আহমেদ’ নামে একটা সেলিব্রেটি ইউজার ভাসা ভাসা ভাবে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। তার কথায় সাড়া দিলে কেমন হয়? তবে লোকটা বেশি আপোসবাদী। আপোসবাদীদের ভন্ড মনে হয় ক্যামেলিয়ার। মানে আদর্শগত দিক থেকে। ক্যামেলিয়া রিপ্লাই দিল, কেমন আছেন?

………………………………………………………………………………………………………………………………………..

ঘটনা ১ ঙ

ক্যামেলিয়া রুদ্রকে সকালে একটা এসএমএস পাঠাল, “গুড মর্নিং। একটি পাখি, চারটি পাখি, তিনটি পাখি। “প্রহর শেষে আলোয় রাঙ্গা সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ”

ঘটনা ২ ঙ

মুঈন ক্যামেলিয়াকে সকালে একটা এসএমএস পাঠাল, “গুড মর্নিং, একটি পাখি, চারটি পাখি, তিনটি পাখি। প্রহর শেষে আলোয় রাঙ্গা সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ”

***************************xxxxxxxxxx****************************

গাজী ফাতিহুন নূর

১৮-০৩-১৩

২৯ thoughts on “যাত্রাপথ

  1. চমৎকার শব্দটা কেমন যেন “খেলো”
    চমৎকার শব্দটা কেমন যেন “খেলো” হয়ে যায় গল্পটার প্রশংসা করার জন্য। খুব ভালো লাগল। আপনার লেখার মধ্যে অনেক চিন্তার খোরাক থাকে, এটাই ভালো লাগে। কিন্তু পড়তে ক্লান্তি লাগে না।
    ঘটনা যেভাবে সাজিয়েছেন, তার সাথে সাম্প্রতিক দেখা একটা মুভির কিছুটা মিল আছে- “Run Lola Run”. দেখেছেন?

  2. অস্থির এবং অন্যরকম একটা গল্প।
    অস্থির এবং অন্যরকম একটা গল্প। খুবই ভাল লাগলো। সব থেকে বড় ব্যাপার এত বড় গল্প কিন্তু পড়তে গিয়ে একবারও বোরিং লাগলো না। প্রিয়তে নিলাম। স্পেশাল থ্যাংকস টু ইষ্টিশন মাষ্টার এই গল্পটাকে স্টিকি করার জন্য। ইষ্টিশন প্রমাণ করল শুধু ভারী ভারী জ্ঞানগর্ভ লেখাই নয়, মান্সন্মত হলে গল্পও স্টিকি হয়। ইষ্টিশনের এই বৈশিষ্ট্য সবসময় বজায় থাকবে বলেই আশা রাখি।

    1. ইস্টিশনের যাত্রী রা আপনারা এত
      ইস্টিশনের যাত্রী রা আপনারা এত সুন্দর করে কমেন্ট করেন কেন বুঝি না। খুব ভাল লাগে। ধন্যবাদ

    2. এই প্রথম কোন ব্লগ দেখলাম
      এই প্রথম কোন ব্লগ দেখলাম যেখানে গল্পকেও প্রাধান্য দিয়েছে। ধন্যবাদ ইস্টিশন মাস্টার।

  3. ইয়াস্তেন গার্ডার এর “সোফির
    ইয়াস্তেন গার্ডার এর “সোফির জগত” পড়েছেন নিশ্চয়ই। আমার সেই বইটার কথা মনে পরল। এর বেশি প্রশংসা করতে পারছি না বলে দুঃখিত। এবং সাথে একটি অনুরোধ, যদি সম্ভব হয় এই দার্শনিক গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে উপন্যাসের রূপ দিন।

      1. আর একটি আবদার । “হুমায়ূন
        আর একটি আবদার :কনফিউজড: । “হুমায়ূন আজাদ” নয় “হুমায়ুন আজাদ”। আমার প্রিয় তো তাই একটু সেন্সেটিভ। :লইজ্জালাগে:

  4. প্রতিটি গল্পের কোন না কোন
    প্রতিটি গল্পের কোন না কোন দর্শন বীক্ষণ থাকে । কিন্তু যখন দর্শন বা মতাদর্শ গল্পকে ছাপিয়ে যায় তখন তা না হয় গল্প না দর্শন । আপনার লেখাটি পড়তে গিয়ে ভয়ে ছিলাম সেরকম কিছু হয় কিনা । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি । গল্প, গল্পই হয়েছে এবং খুব ভাল লেগেছে । ধন্যবাদ একটি ভাল গল্পের জন্য ।

  5. সব কথা তো আগেই সবাই বলে
    সব কথা তো আগেই সবাই বলে ফেলেছে । নতুন করে আর কি বলব?
    তবে একটা প্রশ্ন না করে পারছি না, এতো দ্রুত শেষ হল কেন???

    1. আর কিছু করার ছিল না। ঘটনা
      আর কিছু করার ছিল না। ঘটনা ওখানেই শেষ। সামান্য একটা কিছুর জন্যে আমাদের জীবন যেকোন দিকে যেতে পারে। একটা বাস মিস করলে আমি পৃথিবীটাই মিস করতে পারি

  6. যাত্রাপথে পেয়ে গেলাম,
    এমন

    যাত্রাপথে পেয়ে গেলাম,
    এমন একটা গল্প।
    ভিষণ ভারি, ভিষণ ভারি,
    যদিও সেটা অল্প।

    যাত্রাপথের প্রতিটা পদক্ষেপই আমাকে ভাবনার প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গিয়েছে। সাধারণের আগে কতগুলো অ লাগাবো বুঝতে পারছি না…

    1. আপনাকে ধন্যবাদ দেয়ার আগে যে
      আপনাকে ধন্যবাদ দেয়ার আগে যে কতগুলো অনেক লাগাব বুঝতে পারছি না। ভাল থাকবেন।

  7. অনেক গুছানো একটা লিখা …
    অনেক গুছানো একটা লিখা … ভালো লাগা , সামনে আরও কিছু গল্প পাবো এই আশা করছি

  8. অনেক ভালো লাগলো আপনার লেখাটি
    অনেক ভালো লাগলো আপনার লেখাটি পড়ে আশা করি এই রকম ভালো ভালো কিছু গল্প আমাদের উপহার দিয়ে যাবেন…………

  9. গল্পটা পড়ে কি লিখব বুজতে
    গল্পটা পড়ে কি লিখব বুজতে পারছিনা,। গল্পের প্রধান দুটি চরিত্র এত জীবন্ত মনেহল যেন কারো নিকট থেকে তাদের কাহিনী শুনছি!

  10. অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম
    অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম ইস্টিশনে একটা টিকিট করবো । আজ আপনার এই গল্পটা পড়ার পর আর দেরী করি নি । অসাধারণ আপনার লেখা ।

  11. চমৎকার !!!
    এইটাই তাহলে সেই

    চমৎকার !!!
    এইটাই তাহলে সেই গল্প যেটি স্টিকি হয়েছিলো !?!
    যাক অবশেষে পড়তে পেরে ভালো লাগছে !
    অনেক ধন্যবাদ ! :ফুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *