কথার ওপর কেবল কথা

বিকেলবেলা তখন । আমি তখন ভার্সিটির বয়েজ লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে ছিলাম । আসলে বসার কোন জায়গা পাচ্ছিলাম না । এই সময়টাতে অনেকের ক্লাসই শেষ হয়ে যায় , তাই বাসায় যাবার আগে কেউ খানিকক্ষণ চা-কফি হাতে বন্ধুদের সাথে দিনের শেষ আড্ডাটা দিয়ে যায় । অবশ্য গতকালের ভিড়ের কারণটা বিপিএল এর লাইভ খেলার কারণেও হতে পারে । চার , ছক্কা , আউট হলেই জোরে গলা ফাটাচ্ছে অনেকে । তারা দুই দলের সমর্থক হতে পারে , আবার তাদের চেঁচামেচি সারাদিনের ক্লাস শেষে শরীর মন খোলসা করার জন্যও হতে পারে । আমি খেলার কোন খোঁজ রাখি না । ভাল লাগে না আসলে । আর ট্রেন্ড ফলো করার প্রবণতাও খুব একটা নেই ।

হঠাৎ করেই আমি হাততালি দিয়ে উঠলাম । কারণ আশেপাশের অনেকেই দিয়েছে । কারণ , আমাকে ঠিক ট্রেন্ড ফলো করতে না হলেও অনেক সময়ই এমন কিছু করতে হয় যাতে করে আমি আশেপাশের অংশ হয়ে উঠি । এটা তখন সহজাতভাবেই আসে । একই সাথে মনে পড়ে , গত বছর রোজার সময় , মানে ঈদের ঠিক আগে , সম্ভবত ইউরো কাপ হবে , বাড়িতে বসে রাত জেগে আম্মু আর ভাইয়ার সাথে ফুটবল খেলা , খেলার মধ্যেকার গোল এবং অমীমাংসিত খেলার টাইব্রেকারের একসাথে অনেকগুলো গোল দেখার সুযোগ বেশ ভালোভাবেই উপভোগ করছিলাম । তো এই আর কি । সামনে কোন ডেডলাইন না থাকলে , চূড়ান্ত রকম অপছন্দের বিষয়েও নিমগ্ন হয়ে পড়ি । হয়তো তুমিও এরকম করো , মানে তোমার স্বভাবের ভেতরেও এরকম প্রোথিত আছে । না , তোমাকে নিয়ে কথা আরও পরে হবে , কেননা উত্তম পুরুষের যাবতীয় বর্ণনার সিংহভাগ আগেভাগেই সেরে ফেলা উত্তম ।

আমার জন্য শীতকালে জল কুসুম গরম করে রাখে নি কেউ । সুতরাং বিকেলবেলা বাসায় ফিরে ঠাণ্ডা জলেই সেরে নিতে হয় গোসল । আর শীতের শহরে বিকেলের উপর সন্ধ্যা নেমে আসাটা যেন বাহারি দোকানের আলগা ঝাপ নেমে আসার মতো । সন্ধ্যার পরে আম্মু আমাকে সব সময় বারণ করতেন গোসল করতে । আম্মুর ভাষায় , ‘ ঠাণ্ডাডা অ্যাক্কালে গায়ে লাইগ্যা যাইবে । ’ তো আমি আম্মুর এই সাবধানবাণী মনে আওড়াতে আওরাতেই কখনো দীর্ঘ গোসলও সেরে নিই । আশেপাশে বারণ করার মতো কেউ না থাকলে , নিজের প্রতিও মায়া দয়া কম হয় । কে হে তুমি অযথা একটা শরীর টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছ , বেঁচে থাকছ ? সারভাইবল ফর দ্য শেমলেস ?

জানি, আমি কোনদিনই আগল খুলে বলে ফেলতে পারব না একের পর এক কথা আর পরম্পরাবিহীন স্বপ্নগুলির বর্ণনা । শুনলে হাসবে অনেকে । সেটাও ব্যাপার না ,কিন্তু বিশ্বাস করতে চাইবে না । সেটাও অতিক্রম করা যায় , কিন্তু শেষমেশ পাগলই বলে ফেলবে । অন্তঃপুরে নিজস্ব ফিসফিসানি স্রোতের মতো দোলে , কখনো সাপের মতো কিলবিলে হয়ে অজানা পথে এলোমেলো বেঁকে বেঁকে ছুটতে থাকে ।
আমাদের অভ্যন্তরে সাঁকো কিংবা স্রোতস্বিনী কিছুই নেই ।
‘ একদিন তোমার কাছে যাবো , আর গিয়ে দেখবো তুমি নেই । ’
‘ আমি ছাড়াও কিছু তো থাকবে সেখানে । তার ধারেকাছেই একটু বসো । ভ্যানিটি ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে জিরিয়ে নিয়ে তারপর যেও । কোন বাধ্যবাধকতা নেই ।’
‘ তুমি না থাকলে কিসের বিশ্রাম ?’
‘ তাহলে বিলাপ ? ’
‘ বিলাসের স্বভাব আমার মধ্যে নেই । কথার ভেতর লুকোচুরি খেলারও একটা বয়স আছে । যদি নাও থাকে , এমন একটা বয়সের সীমারেখা বেঁধে দেওয়া দরকার । ’
‘ আর বিলাসের বয়স পেরিয়ে গেলে ? ’
‘ ঘুরেফিরে সেই বিলাপ । বিলাপের স্বরে মানুষ যে মনের কতো কতো কথা বলে ফেলেছে। ’
‘ তোমাকে দিয়ে বিলাপও হবে না । কারণ সেই চেহারাটা তোমার ভেতর আর নেই । মানে নো লিমিট , নো বাউন্ডারি ব্যাপারটা বিলাপের ভেতর থাকতে হয় তো । ’
‘ তাহলে আমার হয়ে কাজটা তুমিই করে নিও । বিলাপের বিষয়টাও ইচ্ছেমত বাছাই করে নিও । ’

অনেক ঠাণ্ডা । যদিও হিমবুড়ি দেখাচ্ছে সে হুল ফোটাচ্ছে না , কিন্তু জোঁকের মতো ত্বকের উপর দিয়ে যেন শরীরের সমস্ত আরামদায়ক উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে । বরফ নিজেও সাদা আর পরিপার্শ্বকেও সে সাদা করে দেয় নিমিষে ।
দেয়ালে ঝোলানো থেমে যাওয়া একটা ঘড়ি । সারানো নিমিষের কাজ , কিন্তু সেদিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই ,কিংবা এরকমই নিয়ম । না হলে এই ঘরের সাথে মানানসই হবে না সেই ঘড়ি । থেমে যাওয়া কিছু মানুষের সাথে সচল ঘড়ি রাখার কোন অর্থ হয় না ।

একা ঠেলতে পারি না । একটা সাহায্যকারী হাত এসে যোগ দেয় আমার সাথে ।বরফের অতিবাস্তব ধোঁয়ার একটা রেখার সাথে আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি । ভারি স্ট্রেচার তোমাকে আবার মর্গের নিবন্ধনকৃত খোপে পাঠিয়ে দেয় ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *