কারাগারে ৪২ দিন – রোমান পোলানস্কি

রোমান পোলানস্কি, এই নামটির সঙ্গে সিনেমা আগ্রহী দর্শক বা পাঠকদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। ১৯৩৩ সালে জন্মানো পোলিশ বংশোদ্ভূত এই পরিচালক বিশ্বব্যাপি একাধারে নন্দিত ও একটি বিশেষ কারণে নিন্দিত। ১৯৭৮ সালে ১৩ বছর বয়সী এক নাবালিকার সাথে যৌন কেলেংকারির কারণে খ্যাতিমান এই পরিচালক বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় তোলেন। নাবালিকা ধর্ষণের অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেফতার হলে তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ‘চিনো’ কারাগারে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার জন্য প্রবেশনে রাখা হয়। প্রবেশন শেষে তার মামলার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও ৪২ দিন পর তিনি ছাড়া পান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে প্যারিসে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি তার তার এক স্মৃতিকথায় তার ৪২ দিনের কারাভোগ ও প্যারিসে যাওয়ার পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন। যদিও কিভাবে তিনি যৌন কেলেংকারির সাথে জড়িত হলেন বা কিভাবে অভিযোগটি উঠল এ ব্যাপারে তার মতামত কোনটাই তিনি তার এই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেননি।
~তার ৪২ দিনের কারাভোগের এই দুর্লভ স্মৃতিচারণটির ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ আগ্রহী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করলাম।লেখাটিও অনেকটা বড়। পড়তে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে আপনাদের। তবে আপনাদের আগ্রহ আর ধৈর্যের প্রতি আস্থা রেখেই অনুবাদটি প্রকাশ করলাম।

——————————————————————————————————-

আমাকে চিনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হল। বন্ধু ডাল্টন আমাকে কারাগারের কিছু নিয়মনীতি বলে দিচ্ছিল। কয়েদীরা দামি ঘড়ি রাখতে পারেনা। আমাকে রোলেক্স ঘড়িটা নিরাপদে রাখার জন্য হারকিকে দিয়ে পনের ডলার দামের একটা টাইমেক্স কিনেছিলাম। ধারনা করেছিলাম আমার কারাগারে উপস্থিতির খবরটা কেউ জানবেনা। কিন্তু দেখলাম রিপোর্টার, ফটোগ্রাফাররা আমাকে ঘিরে ফেলেছে। কারাগারের অফিসাররা চাচ্ছিলেন রিপোর্টারদের একপাশে ঠেলে রাখতে এবং কিছু কাগজপত্র ও আমার আইনজীবীকে খুঁজছিলেন। হারকি আমাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিল।

কারাগার প্রাঙ্গনে প্রবেশ করে দেখলাম প্রাঙ্গণটা ফুটবল খেলার মাঠের মত। একপাশে দোতলা ভবন। কয়েদীরা মাঠে শুয়ে বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমাকে দেখে কয়েদীরা অনেকে স্বাগত জানাল ‘হাই পোলানস্কি, কেমন আছ’ বলে। চিনোতে আমার উপস্থিতি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল এবং কয়েদীরা তা দেখেছে। এবং এখন আমি নিজেই তাদের সামনে। আমাকে একটা কাউনণ্টারের সামনে নেয়া হল। সেখানে আমার নিজের জামাকাপড় নিয়ে কয়েদীদের পোশাক দেওয়া হল। আমার জুতার ফিতা আর নতুন টাইমেক্স ঘড়িটা ফেরত দেওয়া হল। আমার গলায় একটি নম্বর প্লেট ঝুলিয়ে দেয়া হল। তাতে লিখাঃ CALIF PRISON B 88742Z. R.POLANOSKI 12.19.77। এরপর আমার ছবি তোলা হল। আরেকজন লোক এল,সে আমার আঙ্গুল আর হাতের ছাপ নিয়ে রাখল। ফলে আমার দু’হাতে কালি লেপ্টে গেল। বিশেষত ভাল ছাপ পরছেনা বলে বার বার হাতে কালি লাগাতে হচ্ছিল। ঘণ্টা খানিকের বেশি লেগে গেল এই আনুষ্ঠানিকতায়। যার সামনেই পড়ছিলাম সেই নানা উপদেশ দিচ্ছিল। আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রহরী আমাকে নিয়ে গেল আরেকটি কাউনণ্টারে। সেখানে আমাকে দেয়া হল সাবান, একটি টাওয়েল, টয়লেট পেপার ও কারাগারের নিয়মকানুন সংক্রান্ত একটি বই। শুন্য করিডরের দু’পাশে সেলের ইস্পাতের দরজাগুলো। প্রহরী একটা দরজা ঠেলে আমাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিল এবং দরজাটা আমার পেছনে বন্ধ হয়ে গেল। মনে হল একটা কনক্রিটের বাক্সে আটকা পরেছি।

আমার সেলের চারদিকে তাকালাম,দেয়ালটা হাল্কা নীল রঙের। দেয়াল ঘেঁষেই একটা সংকীর্ণ ইস্পাতের বাক্স। তাতে মাদুর বিছানো। স্টেইনলেস স্টীলের একটা টুল, টেবিল, শেলফ; সবই দেয়ালের সাথে সিমেন্ট দিয়ে আটকানো। গরম ও ঠাণ্ডা পানির টেপ বিশিষ্ট একটা বেসিনও আছে। বেসিনের উপর একটা বড় আয়না, পাশেই ফ্ল্যাশ টয়লেট। বাঙ্কের একপ্রান্তে ছোট জানালা। জানালার কাঁচ ইস্পাতের প্রতিবন্ধক দিয়ে নিরাপদ রাখা হয়েছে। জানালা দিয়ে চেষ্টা করলে দিগন্তে কারাগারের প্রাচিরের উপর কাঁটাতারের বেষ্টনী চোখে পড়ে।
সেলটা ময়লায় পরিপূর্ণ, টয়লেট পেপার দিয়ে পরিস্কার করতে শুরু করলাম। হটাৎ রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে দরজা খোলার শব্দ পেলাম। জানতামনা আমার কি করনীয়, তাই অপেক্ষা করলাম। একটি কণ্ঠ ভেসে এলো মাইক্রোফোনে ‘ পোলানস্কি,সেলের বাইরে এসে দাড়াও’। করিডরে এসে দাঁড়ালাম। আমাকে যে প্রহরী এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে তার সাথে দু’জন কয়েদী। সে বলল, এ দুজন তোমাকে কিছু দিতে চায়। কয়েদীদের একজন এক প্যাকেট ক্যামেল সিগারেট বের করল। আমি তাকে বললাম যে আমি ধূমপান করিনা। চকলেট? আমি বললাম ধন্যবাদ। সে আমাকে একটি চকলেট বার দিল। প্রহরী আমাকে এক মগ কফি এনে দিল। সে বলল এই কয়েদী দুজন শিগ্রি ছাড়া পাবে, তাই তারা অন্য কয়েদীদের মত খ্যাপাটে নয়। আমার কারা জীবনের প্রথম দিনটায় সবায় ভাল ব্যাবহার করতে চাইছিল। আমাকে বলা হল যে প্রিজন কমিটি আমার মর্যাদা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত আমাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটাতে হবে। প্রহরী ও দুজন কয়েদীর সাথে করিডরে হাটতে হাটতে কথা হচ্ছিল। একটু পর প্রহরী আমাকে সেলে ফিরে যেতে বলল। সে রাতে অঘোরে ঘুমালাম।

ভোর ৬ টায় মৃদু আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙল। সেলের দরজাটা খুললে কেউ একজন বলল,চা অথবা কফি? আমার হাতে একটা ট্রে তুলে দেওয়া হল। প্রচুর খাবার তাতে; ঝোলের মধ্যে শূকরের মাংসের চপ, পাউরুটি, মাখন, কর্ণফ্লেক্স, এক বোতল দুধ। সবকিছু একটা মাত্র চামচ দিয়ে খেতে হবে। লাঞ্চের নির্ধারিত সময় বেলা সাড়ে ১১ টা। ক্ষুধা অনুভূত না হলেও সব কিছু খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সেদিন বিকেলে আমাকে প্রিজন কমিটির সামনে নেওয়া হল। সদস্যরা আমার সাথে ভাল ব্যাবহার করলেন। কিন্তু তারা যে খবর দিলেন সেটা ভাল নয়। আলোচনা শেষে সুপার বললেন যেকদিন এখানে থাকব, আমাকে প্রটেক্টীভ কাস্টডিতে থাকতে হবে। আমি প্রাঙ্গনে গেলে দৈহিক নির্যাতনের শিকার হতে পারি। আমার অপরাধের প্রকৃতির কারণে না হলেও আমার খ্যাতির কারণে। সুপার ব্যাখ্যা করলেন ‘আপনি একটি স্বাভাবিক লক্ষ্য। এই জায়গা অন্য জায়গার চেয়ে ভিন্ন নয়, মানুষ চায় প্রচার। কারণ এতে নাম পাওয়া যায়। নাম কুড়াতে কেউ আপনাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে’। আমাকে বলা হল যে এই সুপারিশের বিরুদ্ধে ইচ্ছা করলে আমি আপীল করতে পারি। আপীল না করারই সিদ্ধান্ত নিলাম। একই দিনে আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হল যে, পোলানস্কি তার খ্যাতির ব্যাপারে সচেতন এবং কয়েদীদের কাছে এই খ্যাতি একটা সমস্যা। সেকারণে সার্বক্ষণিক আটক কয়েদীর মর্যাদায় থাকতে হবে। এর অর্থ হল, যতদিন কারাগারে থাকব ততদিন কারাপ্রাঙ্গণ, লাইব্রেরী, জিমনেশিয়াম এসবের সুযোগ নিতে পারবোনা।
সেল থেকে আমাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হল। এখানে প্রটেকটীভ কাস্টোডির কয়েদীরাই থাকে। দিনের বেলায় ব্যাবহারের জন্য একটি কক্ষ চেয়ার টেবিল ও টেলিভিশনে সজ্জিত। আমার মত প্রটেক্টীভ কাস্টোডিতে যারা আছে তাদের মধ্যে পুলিশ হত্যাকারী, জুয়াড়ি, ইনফরমার, এবং সাধারণ কয়েদীর দ্বারা বিপদের আশঙ্কাগ্রস্থরা আছে। এদের অধিকাংশই চিকানো এবং কৃষ্ণাজ্ঞ।

চিনোতে আসার কিছুদিন পর থেকে নিজেকে সুখী লোক বলে ভাবতে লাগলাম। প্রথমতঃ আমার প্রতীক্ষার দীর্ঘ সময়ের অবসান ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ জনগণের দৃষ্টি থেকে আমি আড়ালে আছি। আমি নিরাপদে এবং শান্তিতে আছি। নিজেকে তৎপর রাখার জন্য একটা রুটিন তৈরি করেছি। দিনের বেলায় ব্যাবহারের কক্ষ এবং করিডর পরিস্কারের কাজে আমি সহায়তা করতাম। কিছু সময় জগিং করতাম কারাগারেই। আমার কাছে অনেক চিঠি আসতে শুরু করল। অনেকে সমবেদনা জানিয়ে লিখত। চিঠিগুলো সেন্সর হতো। পোলিশ ভাসার চিঠিগুলো তাদের সেন্সর করার উপায় ছিলোনা। যে মেয়ের সাথে আমার প্রেম ছিল, পোল্যান্ড ছেড়ে আসার পর যেসব বন্ধুর সাথে আর সাক্ষাত হয়নি তাদের চিঠিও পেতাম। কারাগারের রুটিন একঘেয়ে, কয়েদীরা তাস খেলত বা টিভি দেখত। কিন্তু টিভি দেখায় আসক্ত কেউ ছিলোনা। অধিকাংশই দেখত খবর অথবা একটা মুভি। আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করত কারাজীবনের দৈনন্দিন ঘটনাবলী- কে ছাড়া পাচ্ছে, কোন প্রহরী ভাল, কে অন্য কারাগারে বদলি হচ্ছে ইত্যাদি। একদিন সকালে অবাক হয়ে আমি দেখলাম যে, চিনো কারাগারের কিছু প্রহরী মহিলা।

ক্রিসমাসে কয়েদীরা বাইরে থেকে উপহারের প্যাকেট পেতে পারে। আমি আমার সেক্রেটারি কনসেপ্টার কাছে কারাগারে অনুমোদিত জিনিসপত্রের একটা তালিকা পাঠালাম। তাতে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে হাতে তৈরি রুটি, শ্যাম্পু এসব ছিল। কিন্তু যখন প্যাকেট পৌঁছাল তখন আমাকে জানানো হল যে ‘Z’ মর্যাদার কয়েদীরা কোন প্যাকেট গ্রহন করতে পারেনা। আমার নম্বরে ‘Z’ এর উল্লেখ করার অর্থ ছিল মনস্তাত্ত্বিক পরিশুদ্ধির জন্য আমাকে কারাগারে আনা হয়েছে। কিন্তু পড়ে সুপার আমাকে প্যাকেটটা দিলেন।

কারাগারে আমাকে প্রথম দেখতে এলো কৌশলী ডাল্টন। প্রটেক্টিভ কাস্টোডতে আমাকে রাখা হয়েছে জেনে চমকে উঠল! কিন্তু এটার যে প্রয়োজন ছিল তা উপলব্ধি করে আশ্বস্ত হল। ডাল্টন যখন খুশী আমার সাথে সাক্ষাত করতে পারে। কিন্তু অন্যান্য নিয়মিত দর্শনার্থীদের প্রতি ৫ দিনে একবার সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হল। দর্শনার্থীরা আসার পর নতুন একটা উপদ্রব শুরু হল। সাক্ষাত শেষে তারা চলে যেতেই আমার সেল তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা হতো। আসলে তারা মাদকদ্রব্য খুঁজত। আমার এখানে আসার খুব আগের ঘটনা নয়, একজন কয়েদী তার দর্শনার্থীর নিয়ে আসা হেরোইন ভর্তি কনডম গিলে ফেলেছিল। গিলে ফেলার পর কনডমটি ফেটে যাওয়ায় কয়েদীর শোচনীয় পরিণতি ঘটে।

প্রথম প্রথম আমি অপেক্ষা করে থাকতাম যে আমার সাথে কেউ দেখা করতে আসবে। কিন্তু পরে সে ব্যাপারেও আমি নিরাসক্ত হলাম। বহু সাক্ষাতের অনুরোধ আসছিল। যাদের সাথে হয়তো কদাচিৎ কোথাও দেখা হয়েছে তারা এবং সম্পূর্ণ অচেনা বহু লোক সাক্ষাত করতে চাইত। ব্যেক্তিগত বন্ধুর পরিচয় দিয়ে উৎসাহী সাংবাদিকরাও দেখা করতে চেষ্টা করত। আমি আমার উপদেষ্টাকে একটা তালিকা দিলাম যাদের সাথে আমি সাক্ষাত করতে চাই। তালিকার বাইরে কেউ যাতে দেখা করতে না পারে। অবশ্য এর দ্বারা সাংবাদিকের আগমন ঠেকানো যায়নি। দুজন কয়েদী জানালা দিয়ে আমার সাথে কথা বলত। তাদের প্রশ্নে হঠাৎ আমার সন্দেহ হল যে, আমার উত্তর বিকৃতভাবে সাংবাদিকদের কাছে চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমার সন্দেহ যথার্থ ছিল।

কারাগারে এসে কারাজীবন সম্পর্কে আমার ভিন্ন ধারনা হল। মুভিতে একজন অপরাধীকে দেখানো হয় ভয়ংকররূপে। কিন্তু চিনো কারাগারের বন্দীরা নিরীহ, ছোটখাটো এবং উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট্যই তাদের নেই। এখানে আমার প্রথম দিনে যে দুজন কয়েদী আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল তাদের একজন ‘টেরি’ দাগী অপরাধী নয়। তার স্ত্রীকে অন্য এক পুরুষের সাথে দেখে সে উন্মত্ত হয়ে লোকটিকে গুলি করে হত্যা করেছিল। আরেকজন কয়েদী ‘কোকার’ মোটামোটি নিয়মিত অপরাধ করে থাকে। এবার সে কারাগারে এসেছে চোরাই মাল গ্রহণ করার দায়ে। কোকারের ক্ষোভ বেভারলি নামে কমবয়েসি এক কৃষ্ণাজ্ঞ কয়েদীর প্রতি। চিনো কারাগারে তাকে কয়েদীরা ব্যাবহার করত ‘বালিকা’ হিসেবে। কৃষ্ণাজ্ঞ ও সমকামীদের বিরুদ্ধে কোকারের ক্ষোভ একই ধরণের। এই দুজনের মধ্যে মারামারি বহুবার আমাকে থামাতে হয়েছে।

কোকার প্যারোলে মুক্তি পায় এবং চিনো ছেড়ে যাওয়ার পর আমাকে বেশ ক’টি চিঠি লিখেছিল। পরে সে এক সংবাদপত্রের কাছে আমার কারাজীবনের কাহিনী বিক্রি করেছিল। তাতে এমন একটা অভিযোগও ছিল যে, আমি তার তার মেয়ে যার বয়স মোটে চার বছর তাকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছি।

লুজান একজন বেঁটেখাট স্বল্পভাষী মেক্সিকান আমাদের ব্লকে এসেছিল আমি আসার পরপরই। সে মাফিয়া চক্রের লোক। ষোলজন লোককে হত্যা করেছে বিভিন্ন কারাগারে। সবই হয়েছে তার নেতার নির্দেশে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লুজান তার অপকর্মের সঙ্গীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তার চক্রের নেতা লুজানের পরিবারের সকলকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়। কিন্তু তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে ঘটনাচক্রে বেঁচে যায়। তারা স্থায়ী পুলিশ প্রহরায় গোপন স্থানে বাস করছে।

‘শটগান’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছে কারাগারে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য ধরা পড়ার পূর্ব পর্যন্ত তার অপরাধের কোন রেকর্ড ছিলোনা। তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তার কাছে ৮০ ডলারের একটা চেক পায়। এজন্য তার সাজা ছিল স্বল্প মেয়াদী। কিন্তু একদিন তার সেলের অপর কয়েদী তার সাথে যৌন ক্রিয়া সম্পাদনের চেষ্টা করলে ‘শটগান’ তাকে আঘাতে আঘাতে মেরে ফেলে এবং তখন থেকে সে কারাগারে আছে। তার গায়ে একটা ব্যাজ আছে যা দেখে চেনা যায় যে সে কারাগারে হত্যাকাণ্ডের জন্য আটক।

মারামারি এবং গোলমাল চিনোতে নিয়মিত হতো। অধিকাংশ মারামারির সূত্রপাত হতো কৃষ্ণাজ্ঞ এবং তথাকথিত এরিয়ান ব্রাদারহুডের সদস্যদের বিতর্ক থেকে। আমি থাকতেই ব্রাদারহুডের একজন সদস্য কৃষ্ণাজ্ঞদের দ্বারা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়, এ জন্য তার প্রহরীকে দোষারোপ করা হয় যে সে অসতর্ক ছিল। পরে সেই প্রহরীর উপরও হামলা হয়। একটি স্ক্রু তার চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রহরীটি বেঁচে যায়। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে সে তার উপর হামলাকারীদের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে হাসপাতালের বেডে তার উপর দ্বিতীয় দফা হামলা হয়। তখন সে কারা কতৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়।

আমার ব্লকটা মাঝে মাঝে খালি হয়ে যেত। আবার কখনো কখনো ব্যাবহারের কক্ষটা বন্দীতে পূর্ণ হয়ে যেত একদিন আমি লস এঞ্জেলস পুলিশ প্রধান সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিলাম। তিনি একটু আগে টিভি’তে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। একজন অচেনা আসামি আমার পাশে দাঁড়ালো। লোকটি ক্ষীণকায়, চিকচিকে কালো চুল বিশিষ্ট চিকানো। সে বলল- ‘তুমি কি চাও লোকটিকে সরিয়ে ফেলি?’ আমি বললাম- ‘কি বলতে চাও তুমি?’ লোকটি বলল-‘ আগামি সপ্তাহে আমি প্যারোলে যাচ্ছি। তুমি চাইলে আমি তার বেঁচে থাকা ঘুচিয়ে দিতে পারি, ব্যয় হবে মাত্র ৫ গ্র্যান্ড’।

গির্জার যাজক ও ইহুদী রাব্বি ছাড়াও দু’জন মনোবিজ্ঞানী ও মনস্তাত্ত্বিক আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এলো। একজন মহিলা মনোবিজ্ঞানী সব রকম লিখিত পরীক্ষা নিল, নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে হল। দুটি কাগজ দিয়ে একজন পুরুষ আর একজন মহিলার ছবি আঁকতে বলল। আর্ট স্কুলের অভ্যাস অনুসারে আমি দুটি উলঙ্গ ছবি আঁকলাম।

সময়ের সাথে কারাগারের একঘেয়েমি বাড়তে লাগলো। আমি উপলব্ধি করলাম, আমেরিকান সমাজের বহু বৈশিষ্ট্য কারাগারে বর্তমান। তারা নিজেদের যতটা সভ্য দাবী করে তা তারা মোটেই নয়। আমলাতান্ত্রিক জতিলতাও এখানে রয়েছে। তবে অনেকের ব্যেক্তিগত আচরন অনেকটা নমনীয়। কারা প্রহরীরা কখনো কয়েদীদের পেটায়না বা গালিগালাজ করেনা। গোলমাল এড়ানোর সব কৌশলই তারা খাটায়। অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হয়না কয়েদীদের সাথে। এর মধ্যে আমেরিকানদের মৌলিক দক্ষতাও প্রতিফলিত হয়। আমার সাথে পুলিশ ও কারা কতৃপক্ষের লোকজন খুব ভাল আচরন করে।

আমার কারা মেয়াদের অর্ধেক কেটেছে। একদিন কে যেন বলে গেল ‘রোমান, ২৯ শে জানুয়ারি তুমি তুমি ছাড়া পাবে’। আমি জানিনা সে কিভাবে জানলো ! কিন্তু তার দেয়া খবরটা সঠিক ছিল। ২৮ জানুয়ারি আমার উপদেষ্টা আমাকে কারাগার ত্যাগের প্রস্তুতি নিতে বলল। কেউ যাতে ব্যপারটা জানতে না পারে সে পরামর্শও দিল। আমার ক্রিসমাস প্যাকেটটাতে সবকিছু তুলে নিলাম। কারাগারের পোশাক ফিরিয়ে দিয়ে আমার নিজের গুলো পেলাম। আমার কৌশলী ডাল্টন বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। কারাগারে প্রবেশের সময় যেমন জড়তা ছিল বেরুবার সময় তা অনুভব করলামনা। আমি আনন্দিত কারণ কোন ফটোগ্রাফার বা টিভি ক্যামেরার সম্মুখীন হতে হয়নি। কারাগারে চুল ও দাড়ি না কাটায় আমার যে চেহেরা হয়েছিল তা পত্রিকাওয়ালাদের চমৎকার খোরাক হতে পারত। আমার ওজনও কমেছে। ডাল্টন আমাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল। রেস্টুরেন্টে খুব একটা লোকজন নেই। কেউ আমাকে চিনতে পারবেনা বলেই ধারণা করেছিলাম। কিন্তু অর্ডার করার সময় কাউন্টারে বসা লোকটি বলল ‘ কেমন আছ পোলানস্কি?’

সেদিন বিকেলেই আমার স্পন্সর ‘ডাইনো ডি লরেনটিস’ পুরনো কাজটা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। পরিচালক ‘ড্যান ট্রোলার’কে বলেছেন আমার জন্য জায়গাটা ছেড়ে দিতে। চাইলে আমি ছবিতে ফিরে আসতে পারি। কিন্তু আমি তখনো জানিনা বিচারক ‘রিট্যানল্যান্ডের’ মনে কি আছে। ডাল্টন কাল তার সাথে দেখা করবে। সে কথা ডাইনোকে বললাম, যাতে সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত মুতাবেক ডাইনোকে সঠিক সিদ্ধান্ত জানাতে পারি।

কিন্তু ৩০ শে জানুয়ারি বিচারকের সাথে ডাল্টনের সাক্ষাতে বিচারকের মতামত জানা গেল যে তিনি তার সিদ্ধান্ত পালটেছেন! বিচারক এর আগে ডাল্টনকে একান্তে বলেছিল যে চিনোতে আমার মনস্তাত্ত্বিক পরিক্ষার পর সাজার মেয়াদ নির্ধারণ হবে। সেই রিপোর্ট তিনি পেয়েছেন এবং এরকম বাজে রিপোর্ট নাকি এর আগে তার ক্যারিয়ারে কখনোই পাননি! আমি পুরোপুরি ‘হোয়াইট ওয়াশ’। তিনি আমাকে পুনরায় কারাগারে পাঠাতে একেবারে সংকল্পবদ্ধ। তিনি আরও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, সম্ভাব্য ৯০ দিন কারাগারে থাকার কথা থাকলেও আমি কিভাবে ৪২ দিনেই ছাড়া পেলাম! কারণ কারাগারে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার জন্য সময়ের গড়ই হল প্রায় ৪৭ দিন। আমাকে অন্তত ৯০ দিন কারাগারে কাটাতে হবে বলে সুপারিশ করা হল।

বিচারকের সাথে ডাল্টনের বৈঠকের পর আমি গোটা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলাম। বিচারক আমার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান ও এখানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করতে বদ্ধপরিকর। ৪২ দিন কারাগারে কেন কারাগারে থাকলাম? অবশিষ্ট সময়ও কাটিয়েই বা কি লাভ! ডাল্টনের অফিসে বসা ছিলাম। উঠে দাড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালাম। সে বলল ‘ একটু অপেক্ষা করো, যাচ্ছ কোথায়?’ আমি বললাম, তোমার সাথে পরে কথা বলব। ওদের দুজনকে রেখে আমি চলে এলাম।
সোজা ডাইনোর অফিসে এসে ব্যাগ গুছাতে লাগলাম। তাকে বললাম ‘ আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, এদেশ থেকে চলে যাচ্ছি’।

ডাইনো জানতে চাইল আমার কাছে টাকাকড়ি কিছু আছে কিনা। তার এক সহকারীকে ডেকে বলল, নগদ টাকা কি আছে নিয়ে আসতে। সহকারী ৫ হাজার ডলার নিয়ে এলে ডাইনো আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করল। তার অফিস থেকে বেড়িয়ে সান্তা-মোনিকা এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলাম। গানেল এভিয়েশন থেকে একটা সেসনা-১৫০ বিমান ভাড়া করতে ১০ মিনিট লাগবে এবং আধঘণ্টা চালালেই মেক্সিকো সীমান্ত পাড়ি দিতে পারব। এরপর হঠাৎ অন্যরকম ভাবলাম। গাড়ি ঘুরিয়ে লসএঞ্জেলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এর দিকে রওনা হলাম। লন্ডনগামী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এর ফ্লাইটটি ছেড়ে যেতে পনের মিনিট বাঁকি। আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড দিয়ে ফ্লাইটের শেষ আসনটির টিকেট কাটলাম। সেখান থেকে সেক্রেটারির কাছে একটা টেলিফোন করার সময়টুকু শুধু পেলাম। আমার গাড়িটা বহিরগমন বিভাগের বাইরে পার্ক করা হয়েছে। পুলিশ সম্ভবত গাড়িতে জরিমানার জন্য টিকেটও দিয়ে গেছে। তাতে আর আমার কিছু যায় আসেনা, এ দেশে এটাই আমার শেষ মুহূর্ত।
প্লেন টেকঅফ করার পর আমি নিচের লসএঞ্জেলসে দেখছিলাম। আলোর সমুদ্র ধিরে ধিরে ম্লান হয়ে আসছিলো। আমেরিকায় বদনামের সাথে সাথে সাংবাদিকদের হাতে নাজেহাল হয়েছি। পরিচালকের দুটি কাজ হারিয়েছি। এসব ভেবে সারারাত ঘুম এলোনা।
লন্ডনে পৌঁছেও আমার অবসাদ কাটলোনা। স্যুটকেস খোলার আগে আমেরিকায় ডাল্টনকে ফোন করে বললাম যে আমি ইংল্যান্ডে। তার বেশি কিছু বলার ছিলোনা। দেশ ছেড়ে পালানো মক্কেল এর আগে সে পায়নি। আমি আমার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবছিলাম। কোথায় যেন ভুল হয়েছে! এখনো আমি নিরাপদ নই বলে মনে হচ্ছিল।

সেদিনই সন্ধ্যায় আমি প্যারিসে চলে গেলাম। পরদিন সকালে ডাল্টন কোর্টে গিয়ে জানাল যে আমি দেশ ত্যাগ করেছি। বিচারক আমাকে হাজির হওয়ার জন্য ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করেছে। ডাল্টন আমাকে ফোনে পীড়াপীড়ি করছিল আমেরিকায় ফিরে আসতে। শেষ পর্যন্ত সে তার সহকর্মীকে নিয়ে প্যারিস এলো এবং বিচারকের সামনে হাজির হওয়ার ইতিবাচক দিকগুলো বুঝাতে চেষ্টা করল। আমি কিন্তু ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল। তারা ফিরে গেল।

সাংবাদিকদের কাছে একটা বক্তব্যও দিল। সাক্ষাৎকার ও সাংবাদিক সম্মেলনে বিচারক আমার প্রতি যে বিদ্বেষ ব্যক্ত করেছিলেন ডাল্টন তা পক্ষপাতদুষ্ট ও অবান্তর বলে প্রতিবাদ করেছে। পত্র পত্রিকায় আমার মামলার রায়, বিচারকের বক্তব্য, ডাল্টনের প্রতিবাদ ইত্যাদি নিয়ে এমন লেখালেখি শুরু হল যে বিচারক বদল করা হল। নতুন বিবিচারক আমার অনুপস্থিতিতে বিচারের সিদ্ধান্ত নিলো এবং ১৪ই ফেব্রুয়ারি চারক এলেন ‘পল ব্রেকিনরিজ’। তিনি ঘোষণা করলেন-‘আমি কারো অনুপস্থিতিতে কোন বিচার করিনি। অবশিষ্ট জীবনেও তা করবোনা’। আমার মামলাটি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বলেছিলেন-‘সে যদি ফিরে আসে আমি নতুন করে তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার রিপোর্ট চাইবো এবং তখনই সেগুলো বিবেচনা করে দেখবো’।
আমার পক্ষে কি আর আমেরিকায় ফিরে যাওয়া সম্ভব! পৌছামাত্রই সেখানে আমাকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হবে। মামলাটি পুনরায় শুরু হওয়ার অর্থ রিপোর্ট আহবান এবং সম্ভবত চিনোতে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার জন্য আরেকদফা প্রেরণ। যাহোক, আমার ফিরে যাওয়ার পথও রুদ্ধ হল। প্যারিসে পৌছার পর আমার যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল ঘোষণা করা হল।

৬ thoughts on “কারাগারে ৪২ দিন – রোমান পোলানস্কি

  1. চমৎকার অনুবাদ। রোমান
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার অনুবাদ। রোমান পোলানস্কি আমার একজন প্রিয় চলচ্চিত্রকার।

  2. আপনি খুব ভালো অনুবাদ করতে
    আপনি খুব ভালো অনুবাদ করতে পারেন। এটা একটা বিরাট কোয়ালিটি। আশা করছি সামনে আরও চমৎকার চমৎকার অনুবাদ পাবো আপনার কাছ থেকে। পোস্ট পড়ে খুব ভালো লাগল। এতো বড় লেখা কখন শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি।

    1. অনেক ধন্যবাদ আতিক ভাই।
      অনেক ধন্যবাদ আতিক ভাই। সৃজনশীল কাজের জন্য উৎসাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাথে থাকবেন, আমি চেষ্টা করে যাব।

  3. অনুবাদ ভাল লেগেছে ।আপনাকে কি
    অনুবাদ ভাল লেগেছে ।আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব , রোমান পোলানস্কি আমার প্রিয় পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম ।

    1. কষ্ট করে পড়ার জন্য আপনাকেও
      কষ্ট করে পড়ার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ আজিম ভাই। পোলানস্কির প্রতি আমারও ভাললাগা অসীম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *