উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাঃ চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ


সংবিধানে রোহিঙ্গাদের কোন আবাসস্থল নেই। নেই জন্মস্থানে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সামান্যতম অধিকার। অকথ্য নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ তাদের বাধ্য করেছে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসতে। ছেড়ে আসতে হয়েছে বাপ-দাদার ভিটেমাটি, গৃহপালিত প্রাণী এবং স্বপ্নভঙ্গের হাজারো স্মৃতিকে। বন্ধুর পথ, উত্তাল নাফ তাঁদের বেঁচে থাকার আকুতি আটকাতে পারেনি। তাঁদের আটকাতে পারেনি জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ, বন্যা-খরায় জর্জরিত বাংলাদেশ। আসলে রাখাইনদের সাথে ২৭১ কিলোমিটার বাউন্ডারিকে মানবতার কাছে হেরে যেতে হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের স্রোতকে যেভাবে আটকানো যায় না সেভাবে রোহিঙ্গারা এসে বসতি গড়েছে কুতুপালং, বালুখালি, উনচিপ্রাংসহ প্রায় ২৩টি স্থানে। উখিয়া এবং টেকনাফ অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদের পদভারে টালমাটাল। যারা তাঁদের সমস্ত সমস্ত সম্পদ ব্যয় করেছে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে। রিক্ত-নিঃস্ব এসব রোহিঙ্গাদের মুখে খাবার জোটানো চাট্টিখানি কথা নয়। খাবার ছাড়াও বাসস্থান সংকট, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল পাড়ি দেয়া সমান চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশ সরকার, দেশিয়-আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যক্তি উদ্যোগ ও কিছু দেশের সহযোগিতায় এই চ্যালেঞ্জের কিছুটা পথ পাড়ি দেয়া গেলেও যেতে হবে আরো অনেকদূর। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এর শেষ কোথায়? কি কি সমস্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? স্পটগুলোতে আরো যেসব আর্থ-সামাজিক সমস্যা ঘাপটি মেরে আছে তার স্বরূপ কি? রোহিঙ্গাদের সাথে তিনদিনের মিথষ্ক্রিয়ায় এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে সেসব কথা।

জনসংখ্যার ঘণত্বে বাংলাদেশের অবস্থান উপরের সারিতে। মরার উপর খারার ঘা হিসেবে পুরাতনসহ প্রায় নয় লাখ রোহিঙ্গা সমস্যাকে আরো প্রকট করেছে। যাঁদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ শিশু এবং ৬৩ ভাগ মহিলা। ঝুঁকিতে থাকা এই শ্রেণিদুটিকে পাচার হওয়া রোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান বড় এক চ্যালেঞ্জ। শিশুদের জন্য ব্র‍্যাক এবং ইউনিসেফের চাইল্ড ফ্রেন্ডলি (CSF) থাকলেও মহিলাদের এরকম কিছু নেই। যার ফলে, বাসায় কাজ দেয়ার কথা বলে, সন্তান দত্তক দেয়ার নামে পাচার করা হচ্ছে নারী ও শিশু। সংখ্যায় যতো কম হোক তবু এসব সংবাদ সতর্কতা প্রদান করে। পাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সাধারণ লোকের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং নাম সর্বস্ব এনজিওগুলোকে শক্ত মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা জরুরী।

মংডু, রাথেডং এবং বুথিডং থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নগদ অর্থ অথবা দামী সম্পদের বিনিময়ে নাফ নদীর এই পাড়ে পৌঁছানো হয়। তারপর রোঁদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তাঁরা এসে হাজির হয় ক্যাম্পগুলোতে। কিনতে হয় বাঁশ, রশি, মোটা প্লাস্টিক। প্রায় দশফুটের এসব কক্ষে গড়ে আটজন লোক বসবাস শুরু করে। ছোট্ট এই ঘরে থাকে হাড়ি-পাতিল, আরাকান থেকে বয়ে নিয়ে আসা কিছু জিনিসপত্র এবং বিশেষ করে চুলা অনেকটা জায়গা দখল করে নেয়। জানালাবিহীন এসব আবাসের ভিতরে কাঠ-পাতার চুলা ধোঁয়া-গরমে অতিষ্ঠ করে তোলে রোহিঙ্গাদের। শিশু ও বৃদ্ধরা স্যাঁতস্যাঁতে মাটি আর গরম-ধোঁয়ার কারণে আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রকম রোগে। পাহাড় কেটে বসতি আর জ্বালানি সংগ্রহে আশেপাশের সবুজ পাহাড়গুলো দিনকে দিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে ভারসাম্য। প্রকৃতির প্রতি এতো অবিচারে যদি পাহাড়ধ্বসে সংখ্যাতীত লোকের প্রাণহানি ঘটে তবে তাকে দোষ দেয়া যাবে না বৈ কি!

আরাকানে রোহিঙ্গাদের প্রধাণ খাদ্য ছিল ভাত, মাছ, মাংস, শাকসবজি। বাংলাদেশে আসার পর বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁদেরকে খাবার দিচ্ছে। রান্না করা খাবার কিংবা খাদ্য উপকরণ প্রায় সময় একই রকম হওয়ায় খাবারে অনীহা এবং সুষম পুষ্টি পাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গুণমানের আলাদা আলাদা খাবার যেসবের সাথে তাঁরা অভ্যস্ত তা প্রদানের মাধ্যমে সমস্যা কিছুটা লাঘব করা সম্ভব। এছাড়াও সেনাবাহিনীর খাদ্য বিতরণ স্পটের সাথে সেটেলমেন্টের দূরত্বের তারতম্যের কারণে বৈষম্য লক্ষণীয়। রোহিঙ্গারা সবাই প্রায় দুই থেকে তিনবেলা খেতে পারলেও তাঁদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে দাতা গোষ্ঠীর ওয়াকিবহাল থাকা জরুরী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মসুর ডালের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ার পরেও তাঁদেরকে তা দেয়া হচ্ছে। সুতরাং যেসব খাবারের সাথে তাঁরা অভ্যস্থ নয় তা না দেয়া, শিশু-বৃদ্ধদের জন্য আলাদা কিছু খাবার প্রদান করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কিছু শুকনো খাবার দেয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে, পিট ল্যাট্রিন এবং টিউবওয়েলের মধ্যে ৫০ ফুট দূরত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়। নাহলে টিউবওয়েলের পানির সাথে জীবাণু মিশে স্বাস্থ্যহানি ঘটাবে। রোহিঙ্গাদের বসতিসমূহের আশেপাশে অপ্রতুল অগোছালোভাবে কিছু ল্যাট্রিন এবং টিউবওয়েল চোখে পরে। যা WHO-এর নীতিমালা অনুযায়ী স্থাপন করা হয়নি। কিছু কিছু স্পটে ল্যাট্রিনের সংখ্যা এতোই কম যে সেটাকে হিসাবের মধ্যে না ধরলেও চলে। এছাড়া মাত্র দুই একটি স্লাবের এসব ল্যাট্রিন দ্রুত ভরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে ল্যাট্রিন ব্যবহারের সংখ্যা খুব নগণ্য। গড়ে প্রায় ১২৫ জন লোকের জন্য একটি করে ল্যাট্রিন হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে জঙ্গলে বা খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কর্ম সারতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে ছড়িয়ে পড়ছে জীবাণু। বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের চিত্র আরো ভয়াবহ। গভীর নলকূপের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এবং কিছু কিছু স্থানে পানির লেয়ার অনেক নিচে থাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা পানি সংগ্রহ করছে পুকুর কিংবা ছড়া থেকে। পানির অভাবে এবং মেয়েদের গোসলখানা না থাকায় গোসল বিহীন দিন পার করছে অনেকে। এ কারণে চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদূর্ভাব লক্ষ্যণীয়।

জাতিসংঘ-বাংলাদেশ যৌথভাবে কলেরার টিকা দেয়া শুরু করেছে, ব্র‍্যাক অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রসূতি মায়েদের জন্য ক্যাম্প খুলেছে, ইউএনএফপিএ দিয়েছে এম্বুলেন্স, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যথাসাধ্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও আরো কিছু এনজিও কাজ করছে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে। যা চাহিদার তুলনায় কম। অনেক রোহিঙ্গা এখনো জানে না কোথায় গেলে কোন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপরের দিকে রয়েছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী মা এবং কিশোরীরা। যারা সহজে সবজায়গায় যেতে পারছেন না। অন্যদিকে এরচেয়েও ভয়ংকর খবর হলো রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি পজেটিভ রোগী শনাক্ত করা গেছে। যা বাংলাদেশের জন্যেও হুমকির কারণ। যতো দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত নেয়া না গেলে তা আরো বেশি ভয়ংকর রুপ ধারণ করবে- এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

উখিয়া টেকনাফের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে গণসচেতনতা, ব্যবহারিক শিক্ষা দ্রুততর করা উচিৎ। নাহলে তাঁদেরকে যেসব ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেয়া হচ্ছে তার সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেশিরভাগ কিশোরী জানে না কিভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয় কিন্তু তাঁদেরকে তা দেয়া হচ্ছে, ওরাল স্যালাইন পানিতে মেশানোর পরিবর্তে হাতে ঢেলে খেয়ে নিচ্ছে, মিনারেল ওয়াটারের আলাদা ঘ্রাণ থাকায় সেই পানি পান না করে হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছে! সুতরাং শুধু বস্তা ভর্তি ত্রাণ দিলে হবে না। শেখাতে হবে ব্যবহার। উলুবনে মুক্তো ছড়িয়ে সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে না কখনো।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকতে পৃথিবীর সবথেকে বেশি শরণার্থী হাজির হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশের পক্ষে সামাল দেয়া যা সত্যি কষ্টসাধ্য। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযুক্ত সময় এখন। ধর্মীয় অনুভূতির উর্ধ্বে এসে যথোপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থ হলে জঙ্গিবাদ, মহামারী, পাহাড়ধ্বস, ভিক্ষাবৃত্তি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, পতিতাবৃত্তিসহ সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। যা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে কারো কাম্য নয়।

১ thought on “উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাঃ চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *