শুরু এবং সারা

‘Wisdom is believer’s lost camel.’ – Rumi
সময়টা নিদারুণ বোঝাপড়ার । তখন গল্প নিয়ে ভাবতে থাকা অথচ গল্প লেখা শুরু করতে না পারা লেখককে তার সতীর্থ তাড়া দিচ্ছিলেন । ‘ আরে শুরু কইরা ফালাও । শুরু করার আগের মোমেন্টটাই হইলো টাফ । ঐ মোমেন্টটারে লেনদি হইতে দিবা না । যদি কিছু রাবিশ লেখো , তাও সেইটা লেইখা ফালাও ।’

রাফিন আহমেদের মাথায় শুধু কথাগুলো ঢুকছিল মাত্র । কিন্তু সে কোন তাড়া বোধ করছিল না । গল্প লেখার জন্য তার কোন তাড়া নেই । কারণ সে মনে করে , তার চারপাশের এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা বাড়ছে । তার নিজস্ব চিন্তার জগতও এই এনট্রপি সূত্রের বাইরে নয় । নিজেকে সে কখনো প্রবলভাবে আলাদা আবার কখনো পৃথিবীর সাথে পুরোপুরিভাবে যুক্ত বলে মনে করে । তখন সে নিজের বিন্দুমাত্র আলাদা অস্তিত্ব স্বীকার করে না কিংবা করতে চায় না ।
কিন্তু এই মুহুর্তে উপদেশদাতা বন্ধুর কথায় যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে , সেটা আপাতত বন্ধ করা দরকার । মানুষ যে কেন কাতর হয়ে পড়ে বলতে চাওয়া কথাগুলো কোনরকমে বুলেটগতিতে মুখ দিয়ে বের করার জন্য ।

কিন্তু আমরা জানি যে , গল্পকার ( যদি গল্প চিন্তা করার জন্য গল্পকার বলা যায় ) রাফিন আহমেদ বাসায় ফিরে সেদিন রাতেই একটা গল্প যেটা কিছুদিন লিখে ফেলে রাখা হয়েছিল , সেটা নিয়েই আবার বসে এবং মধ্যরাত অবধি কিছু একটা দাঁড় করাতে চায় । সেই মুহূর্তে বন্ধুর বলা কথাগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হতে থাকে । শুধু ছাইপাশ গল্পই নয় , অনেক কিছুই সে শুরু করতে পারে না , পারছে না ।
‘ আরে শুরু করি নি বলেই তো সাম্ভাব্য বিপদ থেকে বেঁচে যাচ্ছি ।’
‘ শুরু না করলে বিপদ আঁচ করা যায় কীভাবে ? ’
‘ সম্ভ্যাব্যতার একটা সূত্র আমাদের জানাচ্ছে যে , হঠাৎ করে কোন জলজ্যান্ত মানুষের শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ারও একটা সম্ভাবনা আছে । সেখানে একটা কাজ সত্যি করে শুরু করা মানে ফিফটি পার্সেন্ট নিশ্চিত বিপদ মাথায় নিয়ে ঘোরা । আর বিপদের আঁচ মাথায় নিয়ে কি বাকি অর্ধেক সাফল্যের আনন্দ নীরবে , ধরা যাক নিজে নিজেই উদযাপন করা সম্ভব ? ’
‘ তাহলে তুমি কাজ করছ না ? ’
‘ অবশ্যই করছি । নিজেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে গিয়ে বাজে অভ্যাস দূর করে শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা সমর্থনযোগ্য । কিন্তু নিজের বোঝাপড়া যদি একটা পর্যায়ে না যায় , তাহলে যা শুরু করব করা , তা তো আর আমি শুরু করছি না । তা করছে অন্য কেউ । ’
‘ অন্য কেউ যদি করে থাকে , তার ভালোমন্দের দায়ভারও তাহলে তোমার ওপর বর্তায় না । ’
‘ অবশ্যই বর্তায় । কারণ , যেহেতু তখন নিজের কাজের ওপর আমার কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ নেই , তাই সময় কাটানো কিংবা ক্ষেপনের উপায় হিসেবে কাজটির পূর্বাপর নিয়েই বেশি ভাবিত হবো । তুমিই বলো , সেটা কত মর্মান্তিক । ’
রাফিন আহমেদ যেহেতু তার পুরোনো গল্পটির যেটুকু লেখা আগে হয়েছিল , তা আগে একবার পড়ে নেয় ,তাই সেই পড়ার আনন্দ তাকে তৎক্ষণাৎ আর কিছু লিখতে দেয় না । তার মনে পড়ে কবি শামীম কবিরের লেখা , দ্য সিকনেস অফ মি ইজ আ কজমিক ইভেন্ট ।

এটা কোন ধরণের সিকনেস ? জ্বরজারি নিশ্চয়ই নয় , দ্বন্দ্ব ? নাও হতে পারে । স্থবিরতা ? সে যে কবে আসিবে সেই প্রশ্ন স্থবিরতার কাছেই ফিরে গেছে । নাহ অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে সেই আবার ঘনঘন লাইনটিই মনে আসছে । দ্য সিকনেস অফ মি ইজ আ কজমিক ইভেন্ট । থাক , কবিতার কথা তাকে না ভাবলেও চলবে । তাকে তো এই মুহূর্তে গল্পই লিখতে হবে ।

নতুন ওয়ার্ড ফাইল ওপেন করে নতুন গল্প লিখতে বসলে রাফিন টের পায় যে , নিজেকে সে একটা আসন্ন গল্পের লেখক বলে ভেবে নিয়েছে বলেই কাজটা তাকে করতে হচ্ছে । এখানে পূর্বকৃত ধারণা নিজের ওপর আরোপ করা হয়েছে । এটা কোন ফ্রি উইল নয় । তাহলে ফার্স্ট ওয়ার্ড যা ট্রু উইজডম ধারণ করে তা কি কেবল শিশুর পক্ষেই আয়ত্তে অআনা সম্ভব ? হ্যাঁ , শিশুদের প্রজ্ঞাবান বলা যায় ।

আমরা আরও জানি যে , মানুষের দেহ কার্বনকণা দিয়ে গঠিত বলে রাফিনও একটা অবজেক্টের বাইরে অন্য কিছু নয় । আর মহাবিশ্বের সকল অবজেক্টের নিয়তিই হলো একজন অবজার্ভারের কাছে নিজেকে সাবজেক্ট হিসেবে তুলে দিয়ে ঘটমান দৃশ্যকলার অংশ হয়ে যাওয়া ।

গল্প সে ঠিকই লেখে কিংবা অন্যভাবে এও বলা যায় যে , রাফিন আহমেদ গল্প লেখার জন্যই বেঁচে থাকে । গল্পকে দর্শকের ভূমিকা সে নিতে দেয় নি । সুতরাং , সুস্থ থাকার জন্য সে গল্পকে অবলম্বন করে এবং সবকিছুকে সে ভাষার চোখ দিয়ে দেখতে চায় ।
স্টার্টিং পয়েন্ট যদি একটা বিন্দুর মতোই দেখতে হয় , তাহলে সেটা তো চূড়ান্ত মাত্রায় স্বাধীন । সেটার বাসস্থান এবং স্ট্রাকচার গল্পের মাথায় , মধ্যে , শেষ লাইনে এমনকি গল্পের বাইরেও হতে পারে । কিন্তু দ্য রিভেঞ্জ ইজ রাইটিং দ্য হোল স্টোরি অন আ ব্ল্যাংক হার্ড অর ভার্চুয়াল পেপার ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *