ডুব – রিভিউ পর্ব ১


ইচ্ছে ছিলো মুভিটা ঢাকায় দেখি। কিন্তু নিজের শারীরিক অসুস্থতা আর পারিবারিক কিছু কাজে সিলেটেই আটকে গেছি। এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম অনেক দিন থেকেই। শেষ পর্যন্ত বলাকার জায়গায় নন্দিতায়ই দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। কাল রাত থেকেই অপেক্ষায় সকাল সাড়ে দশটা কখন বাজবে। যদিও শো শুরু হবে সাড়ে এগারটায় কিন্তু আগে আগে যেতে হবে। না হলে আবার টিকেট পাওয়া সম্ভব না।
যাই হোক সাড়ে এগারটা থেকে তার পরের ঠিক ১ ঘন্টা ৫০ মিনিটের গল্পটা বলি।

এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন ইরফার খান(জাভেদ), তিশা(সাবেরি), পার্নো মিত্র(নিতু), রোকেয়া প্রাচী(মায়া) আর ইরফানের ছেলের চরিত্রে আহির। এই সবকটা চরিত্রই যথেষ্ট সিনেমা শুরু হওয়া থেকে পরের দুঘন্টা আপনাকে ঘোরের মধ্যে রাখতে। তবে মন জয় করার মত চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলেছে সাবেরি। আর সাবেরি চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিশা। মুভিটা ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিটের হলেও মুভি শেষ হওয়ার পরেও আমার মধ্যে সেই একই ঘোরই কাজ করে। এই মুভিটার অনেকগুলো দিক আছে। তার মধ্যে অন্যতম একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুভিটা নিয়ে সমালোচনা বা প্রশংসা যা’ই করেন না কেন তার জন্য অবশ্যই আপনাকে মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা মিনিট দেখতে এবং শুনতে হবে। কিছু মুহূর্তে করুণ চাহনি আবার কিছু কথা আপনার শরীরকে শীতল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এবার আসি মূল কথায়। মুভির ছাড়পত্র নিয়ে অনেক কিছু ঘটেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন মুভির গল্প বা কাহিনীর নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ স্যারের জীবনের সাথে মিল আছে। কিন্তু আমার সেটা মনে হয় নি। কারণ এমন ঘটনা যে কারো জীবনেই ঘটতে পারে। শুধু হুমায়ূন স্যার কেন? আপনি বা আমার পরিবারেও এমন কিছু ঘটতে পারে বা ঘটছে। কিন্তু আমরা অন্যদের খবর নেই বা রাখি না। তবে তার মানে এই না যে আমিও অন্যদিক থেকে স্বীকার করছি সেটা স্যারের জীবনের সাথে মিল আছে। এখানে জাভেদ একজন শর্টফিল্ম মেকার। এখন পর্যন্ত আমি দু-তিনটে রিভিউ পড়েছি। কিন্তু এই জায়গায়টায় এসে পরিচালক যে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজটা দিয়েছেন সেটা কোন রিভিউতেই উল্লেখ ছিলো না। মুভির শুরুতেই আমরা খেয়াল করেছি জাভেদ আর মায়া ভালোবেসে বিয়ে করতে চায় কিন্তু মায়ার বাবার সেখানে আপত্তি। তিনি স্বীকার করতে রাজি হন নি জাভেদ একজন শর্ট ফিল্ম মেকার। কারণ তার কাছে এটা কোন পেশা বা পদবী কোনটাই না। জাভেদ টিউশনি করতো বলে তিনি পুলিশের কাছে তার সেই টিউটর পরিচয়টাই তুলে ধরেন। এখানে যে ম্যাসেজটা দেয়া হয়েছে সেটা হচ্ছে একজন ফিল্ম মেকার এক দিনে হওয়া সম্ভব না। জাভেদও শর্ট ফিল্ম দিয়েই শুরু করেছিলেন কিন্তু প্রথমদিকে তার প্রিয় মানুষের বাবা সেটাকে কোন সম্মানের চোখে দেখলেন না। কারণ তিনি মনে করেন এসবে ভাত পাওয়া যায় না। কিন্তু দেখেন? শেষে এই জাভেদই দেশের একজন নামকরা ফিল্ম মেকার হলেন। এই যে একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ম্যাসেজ সেটা নতুন যারা ফিল্ম মেকার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাদের জন্য শিক্ষণীয়।

এবার আসি পরের স্টেপে। মুভির শুরুতে আমরা আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছি সাবেরির সেই বান্ধবী অর্থাৎ নিতু স্কুল জীবন থেকেই সাবেরির সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। অনেকটা এরকম যে সাবেরির সবথেকে প্রিয় জিনিসটা নীতুরও চাই। এজন্যই সাবেরির সবচেয়ে প্রিয় বাবাটাকে কাছে টেনে নিতে সাবেরিদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। একজন মানুষ যখন একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে ঠিক তখনই এক একটা বাঁধা তার সামনে আসে। কেউ কেউ বুঝতেই পারে না কিছু একটা হঠাৎ করে এসে সবকিছু উলট-পালট করে দিবে। জাভেদের জীবনেও এই একই ব্যাপার ঘটেছে।

এই মুভিতে দুটো জায়গায় দুটো কথা শুনে আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। বিশ্বাস করেন আপনারা কেউ যদি মনোযোগ সহকারে মুভির প্রত্যেকটা মুহূর্ত, প্রত্যেকটা কথা শুনার এবং বুঝার চেষ্টা করেন তাহলে আপনাদের ক্ষেত্রেও একই জিনিস ঘটবে।

“মানুষ তখনই মারা যায় যখন পৃথিবীতে তার আর কোনো প্রয়োজন থাকে না অথবা তার কাছে পৃথিবীতে থাকার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই ” -জাভেদ হাসান।
জাভেদ একটা সময় বুঝতে পেরেছিলো তার বাবার প্রয়োজনীয়তা একটু একটু করে ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর এজন্যই প্রতিদিন নিজের বাবাকে একটা গল্পের অর্ধেকটা শুনিয়ে বাকি অর্ধেকটা পরের দিনের জন্য রেখে দিতো। জাভেদ জানতো এই গল্পের শেষটা শোনার প্রয়োজনীয়তা তার বাবার আছে আর এজন্য তার বাবাকে বাঁচতে হবে। কিন্তু ব্যস্ততায় জাভেদ যখন তার বাবাকে আর গল্পটা শুনাতে পারে নি তখনই বাবার প্রয়োজনীয়তা একটু একটু করে কমতে থাকে।

“আমি ওর মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে খুব খুশী হয়েছিলাম। কারণ এখন আর ওর উপর কারো অধিকার নেই ” -মায়া। একজন স্ত্রী কখনোই তার স্বামী অন্য কারো হয়ে যাবে সেটা মানতে বা সহ্য করতে পারে না। নীতু জাভেদকে কাছে টেনে নিয়ে মায়ার অধিকারটা জাভেদের উপর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো। আর জাভেদ? নীতুকে পেয়ে প্রথম দিকে ভুল রাস্তায় পা বাড়ালেও একটা সময় নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। কিন্তু তখন তার সেই মায়া, তার মেয়ে, ছেলে কেউই তার কাছে নেই। জাভেদের মৃত্যুর খবরটা মায়ার কাছে পৌঁছানোর পরেই মায়া এই কথাটা বলে।

এই মুভি রিলিজ হওয়ার আগে থেকেই দর্শকদের মনে অনেক আগ্রহ। প্রথমত একজন বলিউড অভিনেতাকে বাংলায় কথা বলতে দেখা, তার উপর তিশা তার মেয়ের চরিত্রে। এছাড়াও পুরো মুভিতে মাত্র একটা গান। সবকিছু মিলিয়ে সবাই প্রস্তুত “ডুব” দিতে।

এখন বলছি তাদের উদ্দেশ্যে যারা মুভিটা দেখার পরে সমালোচনা করছেন। আপনার সমালোচনার কারণটা আপনার কাছে কি সেটা না জানলেও আমার ধারণা আপনি হয়তো মুভিটা দেখতে দেখতে ভেবেছেন এটা হুমায়ূন স্যারের জীবনের গল্প, হতে পারে আপনার কাছে গল্পটা তিন মিনিটের মনে হয়েছে। কিন্তু এই তিনটা মিনিটই কারোও কারোও জীবনের সুখ, হাসি সব কেড়ে নিতে পারে। আপনাদের এই রিভিউ দেখে যারা আগ্রহ নিয়ে এতদিন ধরে অপেক্ষা করছেন তারা মুভি দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু আমি আপনাদের বলছি আপনারা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন যে এটা হুমায়ূন স্যারের জীবনের গল্প। হলে ঢুকার আগে মনে মনে চিন্তা করুন এখন আপনার সাথেই ঘটা একটা গল্পের সম্মুখীন হচ্ছেন। কথা দিতে পারি ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট পরে নতুন একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হবেন।

ধন্যবাদ দিবো না ফারুকী ভাইকে। বিগত কয়েকটা দিন “ডুব” এর জন্য আপনাকে অনেক জ্বালিয়েছি। এত সুন্দর একটা উপহারের জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। অনেক অনেক ভালোবাসা আপনি আর তিশা আপুর জন্য।

আহারে জীবন, আহা জীবন!!

২ thoughts on “ডুব – রিভিউ পর্ব ১

  1. ডুব সিনেমার গল্পটি
    ডুব সিনেমার গল্পটি অনুপ্রেরণার বলার চেয়ে, সিনেমাটি হুমায়ুন আহমেদের জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি করা বলা ভাল হবে, তবে বায়োপিক নয় । এই স্বাধীনতা কিন্তু নির্মাতার আছে । আর যদি বলেন সিনেমা দেখার সময় হুমায়ুন আহমেদের জীবন ভুলে যান, তারা কিন্তু এটা ভুলে যান সে সিনেমার মধ্যে মানুষ তার জীবনের আশে-পাশে ঘটনা খুঁজে বেড়ায়। যদি সে ধরণের মিল খুঁজে পেলেই কিন্তু র্দশক সিনেমার সাথে সম্পৃক্ত বেশি হতে পারেন ।এটা নির্মাতার টেলিভিশন সিনেমার উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি । কিন্তু এমন একটি সিনেমা হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর কিছুদিন পর তৈরি করা হলে সেটা উঁনার পরিবারের সমস্যা হতে পারে । যেমন ধরুণ হুমায়ুন আহমেদের স্যার এর ছেলেরা স্কুলে যায়, তার সহপাঠিরা কিন্তু এই সিনেমা দেখে এক ধরণের বিরুপ আচরন করতে পারে । এই বিষয়গুলি হুমায়ুন আহমেদের ছেলে মেয়েদের পারিবারিক জীবনের প্রভাব ফেলতে পারে । এই বিষয়ে সিনেমা আজ হতে ২০ বছর পর করলে হয়ত তেমন কিছুই হত না । তাছাড়া হুমায়ুন আহমেদের বিশাল ভক্ত রয়েছে তাদের সাথে প্রতারণা করেছেন, তিনি যদি একথা বলে নির্মান করতেন যে ‘‘হুমায়ুন আহমেদের জীনবের সাথে হালকা কানেক্টেড’’, হয়ত সবাই এই ছবিকে ভালভাবে গ্রহন করত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *