বাংলার সর্বপ্রথম ও সর্বব্যাপক সাম্প্রদায়িক গণহত্যার ভুলে যাওয়া ইতিহাস

কিছু দিন আগে একটা বিশেষ দিন চলে গেলো, কিন্তু এ নিয়ে কোথাও কোন নড়াচড়া দেখলাম না। কোন পত্রিকার পাতাতে না, কোন সেলিব্রেটির স্ট্যাটাসেও না। সবাই খুব যত্ন করে এই দিনটাকে ভুলে গিয়েছে। আমারও মনে ছিল না, কিন্তু আজ সকালে হঠাৎ করে কি একটা প্রসঙ্গে গুগলে সার্চ দিতে গিয়ে দেখি এই দিবসের উপর একটা ছবি। কৌতূহলী হয়ে ছবিতে ক্লিক দিতেই আস্তে আস্তে একটা ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলাম। এ বিষয়ে টুকটাক আগে শুনেছি বা পড়েছি কিন্তু এতো গভীরে জানা হয়নি কখনো। পড়তে পড়তে টের পেলাম আমার শরীর কেমন জানি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর সারাদিন কাজেকর্মে খুব একটা মন বসাতে পারি নি। মাথার মধ্যে কতকগুলো প্রশ্ন কুরে কুরে খেয়ে চলেছে সারা দিন ধরেই।

দিনটা হল নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক গণহত্যার দিন, ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর। সেদিন ছিল কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমার দিন। কারো ঘরে হয়তো ধোয়া-মোছা হচ্ছে, কারো ঘরে চলছে মুড়ি-মুড়কি-নাড়ু বানানোর প্রস্তুতি। এমনই দিনে হঠাৎ করে শোনা গেলো শিখ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে শ্যামপুরের দিয়ারা শরীফে হামলা চালানো হয়েছে। নোয়াখালীর শ্যামপুরের দিয়ারা শরীফ ঐ এলাকার হিন্দু-মুসলিম উভয়ের কাছেই পবিত্র ও সম্মানিত স্থান হিসেবে গণ্য হত। দিয়ারা শরীফের তৎকালীন খাদিম ছিলেন গোলাম সারোয়ার হোসেনি। তিনি বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টির টিকিটে নির্বাচন করে মুসলিম লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। যাইহোক, দিয়ারা শরীফে হামলার খবর শুনে হাজার হাজার মুসলিম জনতা দিয়ারা শরীফের সামনে জড়ো হতে লাগলেন। যদিও সেখানে হামলা-আক্রমণের কোন চিনহ দেখা যায়নি, কাউকে আক্রমণ করতেও দেখা যায় নি কিন্তু সমবেত জনতা এ নিয়ে কোন প্রশ্নও তুলে নি। সবাই তখন প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহায় টগবগ করে ফুটছেন। খাদিম সাহেব নির্দেশ দিলেন সেখানকার স্থানীয় বাজার সাহাপুর বাজারে হামলা করার জন্য। কেউ তখন এই প্রশ্নও তুলেননি শিখ সম্প্রদায়ের হামলার প্রতিশোধ নিতে সাহাপুর বাজারের হিন্দু ব্যবসায়ীদের উপর হামলার যুক্তি কি? কেউ প্রশ্ন তুলেননি কারণ প্রশ্ন করার সময় সেটা নয়। কথা কম কাজ বেশি চেতনায় শানিত হয়ে সবাই বীর বিক্রমে চললেন বাজারে, চালালেন আক্রমণ, করলেন অগ্নিসংযোগ, হলো লুটপাট, শুরু হল বাংলার সর্ববৃহৎ ও সর্বব্যাপক সাম্প্রদায়িক গণহত্যা।

অনেকেই এই গণহত্যাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে চালিয়ে দিয়ে অপরাধের দায়ভার দুই দিকে সমানভাগে ভাগ করে দেয়ার চেষ্টা চালান, অপরাধীদের অপরাধ লঘু করে দেয়ার চেষ্টা চালান, কিন্তু আসলে এটা দাঙ্গা কোনভাবেই ছিল না। দাঙ্গা শব্দটার মানে হচ্ছে, দুই পক্ষের লোকজন মুখোমুখি হয়ে পরষ্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, দুই পক্ষেরই হতাহত হচ্ছে, দুই পক্ষই সমানতালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু, সেদিনকার এই বিষয়টা মোটেও এরকম কিছু ছিল না। এই হামলার কারণে নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া ও সন্দ্বীপ থানা এবং তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রাম থানার অধীনে সর্বমোট প্রায় ২০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এই বিস্তৃত অঞ্চলের কোথাওই কোন মুসলিম সম্পত্তি বা জান-মালের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায় নি। এটা একতরফাভাবে একটি সম্প্রদায়ের উপর পরিকল্পিত হামলা ছিল এবং এর পরিকল্পনা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সংগঠিত হয়ে আসছিল। এই হামলা শুরু হওয়ার আরও আগে থেকেই বিভিন্নভাবে প্রস্তুতি নেয়া চলতে থাকে। গ্রামে, গঞ্জে, হাট-বাজারে ছড়া, পালাগান, জারিগান, ছন্দবদ্ধ শ্লোগান ইত্যাদি আবৃত্তি করে, সভা-সমাবেশ করে, বক্তৃতা, বিবৃতি ইত্যাদি দিনের পর দিন প্রচার করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে একটা সার্বজনীন ঘৃণার মনোভাব জনমানসে তৈরি করা হয়। তারপর হামলা করার জন্য অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ অভিযান চলতে থাকে, অগ্নিসংযোগের জন্য দূরবর্তী জেলা শহর থেকে পেট্রল সংগ্রহ করে গ্রামে গ্রামে মজুদ করা হয়। এবং যেদিন হামলা করা হবে তার আগে আগে ঐ এলাকার সমস্ত বাঁশের সাকো ভেঙ্গে ফেলা হয়, রাস্তা খুঁড়ে চলাচলের অনুপযুক্ত করা হয়, যেন হামলার শুরু হওয়ার পরে টার্গেটেট লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে পালাতে না পারে। কাজেই এই হামলা ও গণহত্যাকে কোনভাবেই দাঙ্গা বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।

হামলাকারী জনতা এবং রাষ্ট্রপক্ষ এই হামলার ব্যাপারে এত সুনিপুণ গোপনীয়তা ও চাতুর্য অবলম্বন করেছিল যে, এই হামলার ক্ষয়ক্ষতি পূর্ণাঙ্গরুপে কখনোই নির্ণয় করা যায় নি। ১৯৪৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকার একটি অর্ডিন্যান্স পাশ করে যেখানে বলা হয়, দাঙ্গা বিষয়ক কোন সংবাদ এমনকি সত্য সংবাদও প্রকাশ করা যাবে না।যে সকল বিষয় সংযুক্ত থাকলে যে কোন বিবৃতি,বিজ্ঞাপন,বিজ্ঞপ্তি,সংবাদ,বা মতামত নিষিদ্ধ হবে সেগুলো হল; (১)যে সকল স্থানে দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে সে সকল স্থানের নাম (২) যে উপায়ে ভিক্টিমদের কে মারা বা নির্যাতন করা হয়েছে (৩) যে সকল সম্প্রদায় নির্যাতিত হয়েছে এবং যে সকল সম্প্রদায় নির্যাতন করেছে তাদের নাম (৪)যে সকল স্থান বা মন্দির বা উপাসনালয় যে গুলো ধ্বংস করা হয়েছে সেগুলর নাম । ১৬ অক্টোবরে কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী নোয়াখালীতে হিন্দুদের উপর চলতে থাকা পাশবিক গণ হত্যা,ধর্ষণ,জোরপূর্বক ধর্মান্তকরনের কথা স্বীকার করেন।তিনি আরও বলেন এই দাঙ্গার সুত্রপাত কিভাবে সে ব্যপারে তার কোন ধারণা নেই।তিনি এই মর্মে বিবৃতি দেন যে,খাল-বিল সমূহের নাব্যতা কম থাকায়,ব্রিজ-সাকো গুলো ভেঙ্গে ফেলায় এবং রাস্তা গুলো আটকে রাখায় সেখানে সৈন্য পাঠানো ছিল দুরহ ব্যপার।তিনি বলেন সৈন্য পাঠানোর পরিবর্তে সেখানে ছাপানো প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে, রেডিওতে সতর্কবার্তা প্রেরণ করা হয়েছে।

যাইহোক, তার প্রচারপত্র বিলি ও রেডিওতে সতর্কবার্তা প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে কমপক্ষে ৫০,০০০ হিন্দু হত্যা করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া অনেক হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন এবং হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। সেটার মোট সংখ্যা কত তা সঠিকভাবে কেউ জানে না। তবে এসেম্বেলিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রশ্নের উত্তরে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী বলেন শুধুমাত্র ত্রিপুরা জেলাতে ৯,৮৯৫ টি ধর্মান্তকরনের ঘটনা ঘটেছে। যদিও বাংলার প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক এই গণহত্যার তদন্তের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এডওয়ার্ড স্কিনার সিম্পসন নামের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তার রিপোর্টে কেবলমাত্র ত্রিপুরা জেলার তিনটি পুলিশ স্টেশন যথা ফরিদ্গঞ্জ,চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত এলাকাতেই ২২,৫৫০ টি ধর্মান্তকরনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন। ইতিহাসবিদ ডঃ তাজ-উল-ইসলাম হাশমী মনে করেন,নোয়াখালী গণ হত্যায় যে পরিমান হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকগুন বেশি হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণ এবং ধর্মান্তকরন করা হয়েছে।

প্রায় ৫,০০০ থেকে ৭,৫০০ বেঁচে থাকা হতভাগ্যকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, আগরতলা ও অন্যান্য জায়গার অস্থায়ী আশ্রয় শিবির গুলোতে আশ্রয় দেয়া হয়। এরপরও যারা এলাকায় থেকে গেছিলেন তাদেরকে স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অনুমতি নিয়ে চলা ফেরা করতে হত। জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিতদের কাছ থেকে জোর করে লিখিত রাখা হয়েছিল যেখানে লেখা ছিল তারা স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছে। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে বা ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হত এবং যখন কোন আনুষ্ঠানিক পরিদর্শক দল পরিদর্শনে আসত তখন তাদেরকে ওই নির্দিষ্ট বাড়িতে যাবার অনুমতি দেয়া হত। হিন্দুদেরকে ওই সময় মুসলিম লীগকে চাঁদা দিতে হত যাকে বলা হত জিজিয়া কর। (যা একসময় ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তৎকালিন শাসকদের ‍জিজিয়া নামক বাড়তি কর প্রদান করত।)

আসলে সংখ্যা কিংবা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এই ঘটনার হিংস্রতা কিংবা নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করা যাবে না। নিচে কিছু ঘটনা উল্লেখ করে দিলাম, যা থেকে এই ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে।

ঘটনা ১# যেদিন হামলা পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় অর্থাৎ, ১০ই অক্টোবর কাসেম নামের একজন মুসলিম লীগ নেতার নেতৃত্বে শত শত মানুষ নারায়নপুর থেকে সুরেন্দ্রনাথ বসুর ‘জামিনদার অফিসের’ দিকে এগিয়ে যায়। কল্যাননগর থেকে আসা আরেক দল দাঙ্গাবাজ কাশেমের ফৌজের সাথে যোগ দেয়। সামান্য প্রতিরোধের পরই সুরেন্দ্রনাথ বসু ধারাল অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক ভাবে আহত হন। উত্তেজিত জনতা হাত-পা বেধে তাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।

ঘটনা ২# নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত সোনাচাকা গ্রামের অধিবাসী রায়পুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের হেড পণ্ডিত শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী ঠাকুর(কাব্যতীর্থ) একটি হলফনামায় উল্লেখ করেন,১০ অক্টোবর রায়পুর ও রামগঞ্জে লুণ্ঠন,হত্যা,অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়।১৪ অক্টোবরে রায়গঞ্জ বাজার সংলগ্ন গ্রামগুলোতে অগ্নিকাণ্ড দেখতে পেয়ে প্রায় দুইশত নরনারী স্থানীয় থানায় আশ্রয় নেয়।সংগঠিত মুসলিম জনতা এসময় রায়পুরের সকল দেবদেবীর বিগ্রহ ভেঙ্গে ফেলে,মন্দিরগুলো ধ্বংস করে এবং হিন্দু দোকান-বাড়িঘর লুটকরে থানায় প্রবেশ করে।থানার দারোগা সবাইকে থানা থেকে জোর করে বের করে দেয়।উন্মত্ত মুসলিম জনতা এসময় তাদেরকে তীব্রভাবে প্রহার করে স্থানীয় বড় মসজিদে নিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে এবং গো-মাংস খেতে বাধ্য করে। স্থানীয় খ্যাতনামা ব্যবসায়ী নবদ্বীপচন্দ্র নাথ থানা থেকে বের হতে শেষ পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানালে, লোকজন তাকে থানার ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়।তাকে সেখানেই প্রকাশ্যে নৃশংস ভাবে প্রহার ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে এবং মৃতদেহ রশিতে বেঁধে টানতে টানতে উত্তর দিকে নিয়ে যায়।

ঘটনা ৩# অক্টোবর মাসের ১১ তারিখে গোলাম সরোয়ারের ব্যক্তিগত বাহিনী ‘মিঞার ফৌজ’ নোয়াখালী বার এ্যাসোসিয়েশন ও জেলা হিন্দু মহাসভার সভাপতি রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর বসতবাড়িতে আক্রমণ করে। তারা বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে। রাজেন্দ্রলাল, তার বড়ভাই চিন্তাচরন এবং ছোটভাই সতীশসহ পরিবারের ২২ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। রাজেন্দলাল রায় চৌধুরীর শরীর থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে একটি থালায় নিয়ে গোলাম সরোয়ার হুসেনির নিকট নিয়ে আসে তার বাহিনী। রাজেন্দ্রলালের দুই মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে আসে হুসেনির বাহিনী, যাদেরকে হুসেনি তার দুই বিশ্বস্ত অনুচরকে গনিমতের মাল হিসেবে দিয়ে দেয়।

ঘটনা ৪# অক্টোবরের ১২ তারিখে রাইপুর থানার অন্তর্গত শায়েস্তাগঞ্জের চিত্তরঞ্জন দত্ত রায়চৌধুরীর বাড়িতে হামলা করা হয়। তিনি তার পরিবারের সকল সদস্যদেরকে বাড়ির ছাদে তুলে দেন এবং নিজে ছাদ থেকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে আত্মরক্ষার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেন; কিন্তু আক্রমণ কারীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি অপরদিকে তার গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি তাঁর বৃদ্ধ মা এবং বাচ্চাদেরকে নিজ হাতে গুলি করেন এবং সব শেষে নিজে আত্মহত্যা করেন।

ঘটনা ৫# আরেকটি দল রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের গোবিন্দপুরের যশোদা পাল ও ভরত ভূঁইয়ার বাড়িতে আক্রমণ করে।তারা পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে দড়ি দিয়ে বেধে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে নির্মম ভাবে হত্যা করেএবং বাড়ির মহিলাদের উপর্যূপরি ধর্ষণ করে। আমিশাপাড়া এবং সাতঘরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকার ভৌমিক এবং পাল পরিবারের সবাইকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানানো হয়। এই দুই পরিবারের ১৯ সদস্যকে হত্যা করে মুসলিম জনতা।

ঘটনা ৬# হরেন্দ্রনাথ করের কন্যা মিলা করকে সুলতান মিয়াঁ নামক একজন সিভিল সাপ্লাই কন্ট্রাক্টর অপহরণ করে এবং জোর করে বিয়ে করে।অপহরণের পূর্বে মিলা করের বাবা,ঠাকুরদাদা এবং সন্তানকে তার সামনেই জবাই করা হয়। বারিক মিয়াঁ নামের একজন সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলে রহমত আলী, রানুবালা নামের একজন বিবাহিত হিন্দু মহিলাকে জোরকরে বিয়ে করে।

এরকম অজস্র ঘটনা ঘটে গিয়েছিল সেদিন বাংলার গ্রামে গঞ্জে পথে প্রান্তরে যার কোন সঠিক হিসাব রাখা যায় নি। আজকের দিনে যেমন দেখা যায় দেশের কোন জায়াগায় ধর্মীয় কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হলে তার কোন বিচার হয় না, তখনও এরকমই সব কর্মকান্ড বিচারের আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ জায়গায় পুলিশ-প্রশাসন থেকে উৎসাহ দিয়ে এই হত্যাকন্ডকে গতিশীল করা হয়। এখন যেমন মিডিয়া কর্তৃক হামলাকারীদের দূর্বৃত্ত বলে আখ্যায়িত করা হয় কিংবা মানসিক রোগী বলে দাবী করা হয় তখনও আজকের দিনের মতই মুসলিমলীগারদের মালিকানাধীন পত্রিকাগুলো এই ঘটনাগুলোকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা চালাতো।

যাইহোক, যে কথাগুলো আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল এ দেশে একাত্তর এর গণহত্যা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা হয়, বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের হত্যাকান্ড সম্পর্কে আলোচনা হয়, এমনকি জিয়া কিংবা এরশাদের শাসনামলের হত্যাকান্ড সম্পর্কেও আলোচনা হয় কিন্তু এই বিশাল এবং সর্বব্যাপক হত্যাকান্ড সম্পর্কে কোথাও কোন আলোচনা হয় না কেন? এমনকি বামপন্থী ও সংস্কৃতিমনা সম্পর্কে যারা পরিচিত তারাও তো কোন কথা বলেন না এই বিষয়ে। যে কারণে মানুষ ইতিহাস পর্যালোচনা করে, জানা-বুঝার চেষ্টা করে সেই কারণে কি এই সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ আলোচিত হবার বা পঠিত হবার দাবী রাখে না? সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ডের ভয়াবহ ও নৃশংস দিকটি কি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই? কি বাম কি ডান, কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত সবাই তো দেখি পাল্লা দিয়ে এই ইতিহাসটি ভুলে যেতে চায়, ভুলিয়ে দিতে চায়। নিজেদের যারা মুক্তমনা বা প্রগতিশীল বলে দাবী করেন তারা কি নিজদের পূর্ব পুরুষের কদর্য চেহারা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত? অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন যারা দেখেন তারা কি এই ইতিহাসকে বাদ দিয়ে দেশটাকে অসাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যেতে পারবেন?

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

১ thought on “বাংলার সর্বপ্রথম ও সর্বব্যাপক সাম্প্রদায়িক গণহত্যার ভুলে যাওয়া ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *