রিপনের পূজা

আজ মহা সষ্ঠি৷ কালকে রাতের মতো আজও রিপন মন্দীর প্রাঙ্গনে এসেছে৷ মন্দীরের ঝলমলে আলোকসজ্জা উপভোগ করতে৷ মন্দীরে ওর বয়সি অনেক ছেলে মেয়েরা কিচির মিচির করে খেলা ধুলা করছে৷ রিপনেরও প্রানটা ছটফট করছে ওদের খেলার সাথী হবার জন্য৷ মায়ের শত বারন অমান্য করেও রিপন ছুটে এসেছে মন্দীরে৷
বছর পর একটি বার দেবী আসে সপরিবারে এই ধরা ধামে৷ তাও তো শুধু পাঁচ দিনের জন্য৷ ইস্ পূজা যদি বছর পেরিয়ে না হয়ে মাস পেরিয়ে হতো, কিযে মজা হতো তাহলে৷
প্রতি বছর পূজা এলেই বাতাসে কেমন যেন একটা পূজা পূজা গন্ধ ভেসে বেড়ায়৷ এই গন্ধটা নাকে এলেই মনটা খুশিতে নেচে ওঠে৷ পূজা মানেই নতুন জামা৷ রিপনের গায়ে অবস্য নতুন জামা ওঠেনা৷ কিন্তু তবুও পূজা পূজা গন্ধটা নাকে এলেই রিপনের গায়ের ময়লা ছেঁড়া জামাটাকেও নতুন মনে হয়৷ভাবতে ভাবতে রিপন একা একাই হেসে ওঠে৷ হঠাৎ কল্পনার আবেশ কেটে যেতেই রিপনের জ্বল জ্বল চোখ দুটো আবার মন্দীর প্রাঙ্গনের ছেলে মেয়ে গুলোর দিকে চলে যায়৷ এক অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে রিপন ওদের উচ্ছলতা দেখছে৷ ওর খুব ইচ্ছে করছে ওদের সাথে খেলায় মেতে উঠতে৷ কালও রিপন এসেছিল এখানে৷ মন্দীরে ঢুকে ওদের সাথে খেলতে চেয়েছিল৷ কিন্তু ওরা বলেছিল, তোর সাথে আমরা খেলবনা৷ তুই আমাদের কাছ থেকে সরে যা৷ তোর গায়ে নোংরা৷ তুই আমাদের ছুঁবি না৷ আমাদের মা তোকে ছুঁতে বারন করেছে৷ তুই চলে যা এখান থেকে৷
ওদের এই ধরনের কথা শুনে রিপনের উজ্জল মুথ পান্ডুর হয়ে যায়৷ ও মাথা নিচু করে এক কোণে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখতে থাকে৷ খানিকক্ষণ পর অপূর্ণ আশা নিয়ে ঘরে ফিরে যায় রিপন৷
ছেলের মলিন বদন দেখে মা রিপনকে জিজ্ঞেস করে, তার কি হয়েছে৷ কেউ কিছু বলেছে কিনা৷ মায়ের কথা শুনে রিপনের চেপে রাখা কষ্ট ফুলে ফেপে ওঠে৷ সে মায়ের কোলে ঝাপিয়ে কাঁদ কাঁদ গলায় বলে, মা ওরা আমাকে খেলতে নিলনা৷ ওরা বলল, ওদের মা নাকি আমাকে ছুঁতে বারন করেছে৷ আমি নাকি নোংরা আমার গায়ে গন্ধ ।
ছেলের দুঃখে মায়ের চোখ সজল হয়ে ওঠে৷ ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সে বলে, তুই আর যাসনে বাবা৷ ওরা হলো উচু জাত৷ ওরা পয়সা ওয়ালা৷ ওরা আমাদের দেখলে নাকে হাত চাপা দেয়৷ ওরা আমাদের ছোঁয়না৷ আমাদের ছোঁয়া লাগলে ওরা স্নান করে শুদ্ধ হয়৷ আমাদের ওরা ওদের ঘরে ঢুকতে দেয়না৷ ওদের মন্দীরেও যেতে দেয়না৷ আমরা তো নিচু জাতরে বাবা৷ নিচু কুলে আমাদের জন্ম৷ আমাদের ওদের সাথে দাঁড়ানোর অধীকার নেই৷ আমরা যে দলিত সম্প্রদায়৷ তুই আর ওদের মন্দীরে যাসনে বাবা৷ ওদের পূজা দেখতে যেতে হবেনা।
রিপন মুখ তুলে মায়ের দিকে চেয়ে বলল, কেন মা? মা দূর্গা কি শুধু ওদের? আমাদের নয়?
রিপনের মা ছেলের এই কথার কোনো উত্তর দিতে পারেনি৷ রিপন ওর মা বাবার একমাত্র ছেলে৷ ওরা ঋষি সম্প্রদায়৷ সনাতন ধর্মীয়দের মধ্যে ওরা দলিত সম্প্রদায়৷ উচ্চ সম্প্রদায়ীরা ওদের নিচু নজরে দেখে৷ ওদের থেতে দূরত্ব বজায় রাখে৷ ওদের মূল পেশা জুতা সেলাই করা৷ ওরা বাশের জিনিসপত্র তৈরি করে৷ আর ওরা, দূর্গা পূজায় যে ঢাক বাজে সে ঢাকও তৈরি করে৷ আর দূর্গা পূজাতে এই ঋষিরাই ঢাক বাজায়৷ সে উচু নিচু যে সম্প্রদায়ীদেরই পূজা হোকনা কেন৷ কিন্তু তবুও এরা নিচু জাত৷

রিপন মা দূর্গার জলজলে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ আর মনে মনে বলছে, তুমি কেন আমাদের তোমার কাছে আসতে দাওনা? সবার মতো আমিও কেন তোমার কাছে যেতে পারিনা? কেন তোমার মন্দীরে আমার জায়গা হয়না? ওরা কেন আমাকে খেলতে নেয়না? ওদের মতো আমিও কেন নতুন জামা পড়তে পারিনা? তুমি কি তবে শুধু ওদের মা? আমাদের নও?
না, মা দূর্গা রিপনের কথার কোনো উত্তর দেয়না৷ সে পাথরের মূর্তি পাথর হয়েই থাকে৷ রিপন নিরুত্তর মূর্তির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেয়৷ আবার তার চোখ দুটো ওদের দিকে চলে যায়৷ ঢাকের তালে তালে ওরাও নাচছে৷ রিপনের মনটা ছটফট করতে থাকে ওদের সাথে নাচার জন্য৷ কিন্তু ওরা যে রিপনকে ঘৃনা করে৷ কিন্তু ওর মন যে কিছুতেই মানছেনা৷ ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মন্দীরে৷ রিপন ভাবল, আমি কেন মন্দীরে যাবনা? মা কি শুধু ওদের? আমাদের নয়? আমিও মন্দীরে যাব৷ আমিও ওদের সাথে নাচব৷ ওদের মতো আমিওতো মায়ের সন্তান৷ তবে আমি কেন নিচু জাত হব?রিপন দ্রুত পায়ে মন্দীরে ঢুকতে গেল৷ কিন্তু মন্দীরের দরজাতেই একটা লোক তাকে থামিয়ে দিল৷ লোকটা চোখ বড় বড় করে বলল, কোথায় যাচ্ছিস?
রিপন আকুত গলায় বলল, আমি মন্দীরে যাব৷
লোকটা তিরিক্ষি গলায় বলল, না তুই মন্দীরে যেতে পারবিনা৷
রিপন বলল, কেন পারবনা? আমিও ওদের সাথে খেলব৷
লোকটা গর্জন করে বলে উঠল, তোর সাহস তো কমনা শালা মুচির বাচ্চা৷
কথাটা বলেই লেকটা রিপনকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল৷
ঋষি সম্প্রদায়ীদের প্রধান পেশা জুতা সেলাই করা অর্থাৎ মুচির কাজ করা৷ তাই উচ্চ সম্প্রদায়ীরা ওদের মুচি বলেই আখ্যায়িত করে৷৷

পূজা সাহা ২৭/০৯/২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *