প্রধান বিচারপতির ছুটি নেয়া এবং আমাদের গণতন্ত্রের অবস্থা

ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের সাথে যুক্ত প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পর্যালোচনা যদি অপ্রাসঙ্গিক বা অপ্রয়োজনীয় হয়, যদি তিনি এই কাজ হাসিনাবিদ্বেষী বিখ্যাত আইনজীবীগণ, সুশীল সমাজ এবং ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়া গ্রুপের দ্বারা প্রভাবিত হয়েও করে থাকেন, যদি এটা হাসিনা সরকারকে উৎখাতের চেষ্টায় পাকিস্তানের কায়দায় কোন জুডিশিয়াল ক্যু ঘটানোর চেষ্টার একটা একটা অংশ হয়ে থাকে আর তাতে এস কে সিনহাকে জড়ানোর চেষ্টাও করা হয় তারপরও আমি বলব আওয়ামী লীগের এক শ্রেণীর মন্ত্রী ও নেতা এই পর্যালোচনা সংক্রান্ত সুস্থ ও শোভন আলোচনায় না গিয়ে, সংবিধানের আলোকে এর প্রতিকারের চেষ্টা না করে তার বিরুদ্ধে এভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে পারেন না, যেমনটা “বিচারপতি সিনহা দু’টাকার উকিল”, “তিনি পাকিস্তানি, তার এখনই চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়া উচিৎ”, “তিনি দুর্নীতিবাজ”, “তিনি যুদ্ধাপরাধী সাকা. চৌধুরির পরিবারের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করেছেন” ইত্যাদি উক্তির মাধ্যমে করা হয়েছে, এমনকি ছাত্রলীগের সভাপতিও তাকে নিয়ে অশালীন কথা বলেছেন যা হতাশাজনক ছিল।

দেশে এই বিতর্ক যে অবস্থায় গিয়েছে, এর প্রচারণাকে যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে এতে একজন ব্যক্তি বিচারপতিকে নয়, আসামি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে গোটা বিচার বিভাগকে। ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় নিয়ে সুস্থ ও সাংবিধানিক সমালোচনার বদলে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রচার ও গালিগালাজের মাধ্যমে দেশের জুডিশিয়ারি ইনস্টিটিউশনের মর্যাদা ধ্বংস করে দেশের গণতন্ত্রের যে ক্ষতি করা হল সেই মর্যাদার পুনরুদ্ধার হতে কত যুগ লাগবে কে জানে। অথচ এই তো কিছুদিন আগেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মর্যাদা কত ঊঁচুতে পৌঁছেছিল (এক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির ভূমিকার কথা আর নতুন করে বলতে গেলাম না)।

বিচারপতি একজন ব্যক্তি আর বিচার বিভাগ একটি ইনস্টিটিউশন। ব্যক্তি অন্যায় করে থাকলে তাকে শাস্তি দেয়া হোক, কিন্তু এখানে খেয়াল রাখা জরুরি যাতে ইনস্টিটিউশনের কোন রকম সম্মানহানি না হয়, যদি সেটা হয় তাহলে দেশের গণতন্ত্রের ভয়াবহ সর্বনাশ হয়ে যায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে চারটি ভিত্তি থাকে তার প্রধান দুটো হচ্ছে পার্লামেন্ট আর জুডিশিয়ারি। ক্ষমতার চেক এন্ড ব্যালেন্সের ক্ষেত্রে এই দুটো প্রতিষ্ঠান আবশ্যক। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আর জুডিশিয়ারির স্বাধীনতা ও সম্মান হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ। যেকোন স্বৈরাচারী সরকার এই সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে চায়, কিন্তু কোন গণতান্ত্রিক সরকার তা চাইতে পারে না।

বাংলাদেশে বর্তমান পার্লামেন্ট এমনিতেই একটি খোঁড়া প্রতিষ্ঠান, কারণ তাতে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। এখন যদি বিচারবিভাগও পূর্ণ স্বাধীনতা না পায় তাহলে আওয়ামী লীগ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষায় যতই আগ্রহী দেখাক না কেন, শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বদলে দলতন্ত্রের ছাপ থেকে যাবেই।

বিচারপতি সিনহা যে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ব্যক্তি এসব কথা আমাদের শুনতে হল ষোড়শ সংশোধনী সংক্তান্ত তার রায় আসার পর। তিনি যদি এত খারাপ লোকই হন তাহলে বিচারপতি পদে তাকে নিযুক্ত করার আগে সরকারের তা জানা ছিল না? আর এখন যদি বা জানাও গেল তাহলে বিচার বিভাগের মর্যাদায় হাত না দিয়ে এই শীর্ষপদ থেকে তার সরে যাবার কোন ব্যবস্থা কি করা যেত না? দেশবাসী এগুলোকে কিভাবে নিচ্ছে বা নিতে পারে, ক্ষমতায় যারা আছে তাদের বোধ হয় এসব ব্যাপারে কোন ধারণাও নেই। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে তাতে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়ে গেল তার ধকল এই জাতি সামনে কিভাবে সামলাবে সেটা একটা বিশাল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। আয়রনি হচ্ছে এটা এমন সময় ঘটল যখন হাসিনা সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের মানষকন্যা, মাদার অব হিউম্যানিটি ইত্যাদি নামে প্রসংশিত হচ্ছেন…

১ thought on “প্রধান বিচারপতির ছুটি নেয়া এবং আমাদের গণতন্ত্রের অবস্থা

Leave a Reply to সোহেল ইমাম Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *