অ্যান্ড দেন ইট হ্যাপেন্ড


জার্নিতে আমার কপাল বেশ ভাল। প্রায়ই পাশের সিটে সুন্দরী পাই। আমার এই সৌভাগ্য দেখে আপনি জেলাস ফিল করতে পারেন, তবে কথা সত্য। আমি আসলেই বেশ কপাল নিয়ে জন্মেছি। ইভেন ট্রেন জার্নিতেও এমনটা হয়েছে। দুবার তো গল্প গুজব বেশ রোমান্টিক চেহারা নিয়ে ফেলেছিল। তারপর? নাহ তারপর আর এগোয়নি। আর তাই, এখনও ব্যাচেলার। তবে এলিজেবল ব্যাচেলর।
মনে হচ্ছে অহংকার করছি? বলতে পারেন। তবে আমার বর্ণনা শুনলে, আমার ধারণা আপনি আপনার মত পাল্টাবেন। ওকে। এখন বলুন আমার বর্ণনায় কি কি শুনতে চান? হাইট? গায়ের রং? দেখতে কেমন? আলাদা করে বর্ণনা করতে গেলে মনে করতে পারেন, আত্মপ্রশংসা করছি। তাই কম করেই বলছি, দেখতে আমি খুব খারাপ না। আর যোগ্যতাও নেহাত মন্দ না। যোগ্যতা মানে দুই ধরেনর যোগ্যতার কথাই বলছি। মেয়েদের আকৃষ্ট করবার যোগ্যতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা। শিক্ষাগত যোগ্যতা হচ্ছে আমি এমবিবিএস এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছি। চিকিৎসকদের যোগ্যতায় যে তিনটি ব্যাপারকে বেঞ্চমার্ক ধরা হয়, তার প্রথমটি হচ্ছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান আছে কি না, দ্বিতীয় হচ্ছে সরকারী চাকরী আছে কি না আর তৃতীয় হচ্ছে সরকারী চাকরীতে তার বর্তমান পদ কি।
এই আলোকে আমার যোগ্যতা অবসহ্যে তেমন আকর্ষণীয় না। ডাক্তারি বা বলা যায় এমবিবিএস পাশ করছি। সরকারী চাকরী এখনও হয়নি। ব্যাপারটাকে অবশ্য আমার অযোগ্যতা বলা ঠিক হবে না। কারণ বিসিএস দেয়ার সুযোগ এখনও পাইনি। সার্কুলার হয়েছে। ফর্ম টর্ম ফিল আপ চলছে। এপরে কি হয়, দেখা যাক। সো সরকারী চাকুরী এবং সরকারী পদ, এই দুটি অযোগ্যতা আমার আছে। তবে বয়সও কম। এবং বিসিএসে ফেল এখনও করিনি। সো, অযোগ্যতাগুলোকে ঠিক অযোগ্যতা বলা ঠিক হবে না। বলা উচিত সম্ভাবনাময় ক্যান্ডিডেট।
এনিওয়ে, গল্পের সারাংশ হচ্ছে, আমি পেশায় ডাক্তার। একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরী করি। যদিও মেডিকেল অফিসার, তারপরও বেতন খারাপ না। এবং এখনও বিসিএস ফেল মারিনি। এই যোগ্যতা বিয়ের বাজারে, মাঝারি অবস্থানে আছে। শুধু এই যোগ্যতায় ভাল কিছু হয়তো জুটবে না, তবে এর সাথে যদি ফ্যামিলি স্ট্যাটাস আর আমার অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার যোগ করা হয়, তবে দূরদর্শী অভিভাবকরা আমার ভেতরে দামী পাত্র দেখতে পারেন।
বাট। এখানে একটা বড়সড় বাট আছে। আর তা হচ্ছে প্রেমের ক্ষেত্রে এসব যোগ্যতা সাধারনতঃ দেখা হয় না। ওখানে যোগ্যতা বলতে প্রথমে আসে মুখশ্রী। নারীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম অতীব জরুরী। তবে পুরুষের ক্ষেত্রে এই নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আছে। মোটামুটি চেহারার সাথে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, এই কম্বিনেশানটাও অনেক ক্ষেত্রে কাজে দেয়। আর এই কথাটা বলার জন্যই এই সাতকাহন গাইলাম।
এর আগে যে কবার আমার পাশের সিটে কোন অপরুপা বসেছেন, প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই আমি গল্প জমিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। আর একবার বিশ্বাস অর্জন হয়ে গেলে, মোবাইল নম্বর কিংবা ফেসবুক আইডি জোগাড় যে তেমন সমস্যা না, তা তো বুঝতেই পারছেন। তেমন বেশ কয়েকজনের সাথেই সখ্য হয়েছে। এখনও আছে, তবে ঐ পর্যন্তই। এর বেশি এগোয়নি। কেন এগোয়নি, তা নিয়ে রিসার্চ করা হয়নি, বাট ওয়ান থিং ইস সিওর, সেই সুন্দরীরা কেউই আমাকে রিজেক্ট করেনি।
এনিওয়ে, এই গল্পের নায়িকা এই মুহূর্তে আমার পাশে বসে আছে। কাহিনী হচ্ছে, আমরা ঢাকা থেকে রাজশাহী যাচ্ছি। বাসে উঠেই দেখি আমার পাশের সিটে বসে আছে এই সুন্দরী। শুধু সুন্দরী বললে কমিয়ে বলা হবে। অপূর্ব ভ্যারাইটির সুন্দরী। যথারীতি মনটা বাকুম বাকুম শুরু করে দিয়েছিল। কিভাবে কি করব, ভাবতে ভাবতে বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল। ট্রাজিডি হচ্ছে, কাহিনী কিছুই এগোয়নি। উনি মোবাইল ফোনে গান শুনছেন। এতোটাই মনোযোগে গান শুনছেন, যে চোখ বন্ধ করে রেখেছেন।
প্রথমবারের মত মনে হচ্ছে ধরা খেতে যাচ্ছি। জার্নি এমনিতেই ঘণ্টা পাঁচেকের। জ্যাম থাকলে অবশ্য কাহিনী আলাদা। আর এই জার্নির মূল জ্যামটা থাকে সাধারনতঃ ঢাকায়। এরপরে টাঙ্গাইল। এরপরে সাধারনতঃ থাকে না। আর কিছুক্ষণের ভেতরেই টাংগাইলে এসে পৌছাব। বাট, এভাবে ঘুমালে তো কাহিনী শুরুই হবে না। কিছু একটা বাহানা খুঁজছি, কিভাবে শুরু করা যায়। কিন্তু জুতসই কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। অন্ততঃ ঘুমন্ত কিংবা চোখ বন্ধ করে গান শুনছেন, এমন একজনকে ডেকে তোলার জন্য শক্ত বাহানা দরকার। বিশ্বাস যোগ্য হওয়া ছাড়াও, সেটাতে আরও একটা ব্যাপার থাকতে হবে। সেই বাহানায় গায়ে পড়া ভাব থাকা যাবে না।
এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। বাসটা থেমে গেল। সামনে তাকিয়ে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। বাসটা একটা জ্যামে পড়েছে। গ্রেট। এবার সুযোগ আছে। শুধু চাই জ্যামটা বিরক্তিকর রকমের লম্বা যেন হয়। আরও কিছু তথ্য এখানে দেয়া উচিত। জায়গাটা জ্যামের না। এখনও টাঙ্গাইল আসতে একটু দেরী আছে। এখানে জ্যাম মানে সম্ভবত” জ্যাম বেশ লম্বা। মনটা আনন্দে নেচে ওঠার এটাও একটা কারণ।চাঁদ তারার অবস্থান টবস্থানে তেমন বিশ্বাস করি না, তারপরও মন বলল, ইটস অ্যা গ্রেট সাইন। একটা কিছু ঘটাবার সুযোগ এখন একধাপে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এখন নায়িকা চোখ খুললেই হয়।
বাসের সুপারভাইজার বেশ করিৎকর্মা লোক। দ্রুত মোবাইল ফোনে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলল। এরপরে উদ্ভট একটা অফার দিল। অফারটা উদ্ভট হলেও মনটা নেচে উঠল। সুপারভাইজার জানাল, সামনে বিশাল জ্যাম। সামনে কোথাও একটা গাড়ি দুজন ছাত্রকে মেরেছে। মেরেছে মানে আহত না, স্পট ডেড। এরপরে শুরু হয়েছে প্রতিক্রিয়া। রাস্তা অবরোধ। এবং জ্যামের দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। এবার সে জানাল
— আপনারা যদি বলেন, তবে একটা কাজ করা যেতে পারে।
সবাই জানতে চাইল কি সেই কাজ। এবার সুপারভাইজার সেই মজার অফারটা দিলেন।
— গাড়ি ঘুরিয়ে আরিচা হয়ে যাওয়া যায়। যদি সবাই রাজী থাকেন, তবে সেটা করা যায়, কিন্তু একটা শর্ত আছে।
সবাই জানতে চাইল কি সেই শর্ত। উত্তরে উনি যা জানালেন তার সারাংশ হচ্ছে, ঐ পথে যেতে হলে দূরত্ব কিছুটা বেশি হবে, যমুনা ব্রিজের বদলে ফেরি পার হতে হবে এবং এসব কারণে খরচ কিছুটা বাড়বে। এই বেড়ে যাওয়া খরচ আমাদেরকেই বহন করতে হবে। যদি আমরা রাজী থাকি, তবে সবাইকেই পঞ্চাশ টাকা করে দিতে হবে। এবং সবাইকেই রাজী হতে হবে, অর্ধেক রাজী অর্ধেক অরাজি, এমনটা হলে হবে না।
যথারীতি ভাঙ্গন দেখা দিল। কেউ কেউ জ্যামে অপেক্ষা করতে রাজী। নসিহত দিল, আরে এটা কোন সমস্যা না। ন্যাশনাল হাইওয়ের ব্যাপার। এখনই মন্ত্রী মিনিস্টার ইনভলভ হয়ে যাবে। ছাত্রদের আশ্বাস টাস্বাস দিবে। তারপরে একবার অবরোধ উঠে গেলে, জ্যাম ছাড়তে সময় লাগবে না। অন্য গ্রুপের বক্তব্য উল্টো। এসব অবরোধ পাঁচ ছয় ঘণ্টার আগে থামে না। ঘটনা যেহেতু কিছুক্ষণ আগে ঘটেছে, তাই এখানে থাকা মানে ছয় ঘণ্টা জ্যামে আটকানো।
সুপারভাইজার আরও জানাল যে সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে। গাড়ির লাইন লেগে গেলে গাড়ি রিভার্স করা সমস্যা হয়ে যাবে। ব্যাপারটায় কিঞ্চিৎ চালাকি আছে। কারণ ড্রাইভার খানিকটা ফাঁকা যায়গায় গাড়িটা রেখেছে। সে সম্ভবতঃ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ঐ পথেই যাবে। এখন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে যেন সিদ্ধান্তটা দ্রুত আসে। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে ঐ সিদ্ধান্তে সম্মতি দেয়া। আর ড্রাইভারের কাজ হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথেই আরিচা রোডে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়া যায়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছুটা কনফিউজড। কোন পথে গেলে এই অপরূপার সাথে একটু বেশি সময় থাকা যাবে। ভাগ্যের ওপরে নিজেকে ছেড়ে দিলাম। দেখা যাক কি হয়। বেশ কিছুক্ষণ তর্ক বিতর্ক চলল। যুক্তি তর্কের রীতিমত ঝড় বয়ে চলল। মূল সমস্যা সম্ভবতঃ এক্সট্রা পঞ্চাশ টাকার কারণে তৈরি হয়েছে। সেটা দিতে অনেকে নারাজ। বাকী ব্যাপারে কারো তেমন আপত্তি নেই। এক পথে গেলেই হল।
সুপারভাইজার বেশ অনুনয় বিনয় শুরু করলেন। তাগাদা দিলেন। বেশি দেরী করলে ফেরি পেতে সমস্যা হবে। যমুনা ব্রিজ হওয়ার পরে ফেরি পথে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের ঢাকা রাজশাহী যাত্রীদের নেই বললেই চলে, ফলে ফেরি ঘটিত জটিলতা নিয়ে সুপারভাইজারের বক্ত্যব্যের সত্যটা যাচাই করবার উপায় নেই।
মিনিট দশেক বিতর্ক চলার পরে, একদল রণে ভঙ্গ দিল। সুপারভাইজারের দেয়া ফর্মুলা মেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত হল, আমরা সবাই এক্সট্রা পঞ্চাশ টাকা দিব আর আরিচা নগরবাড়ী পথে, ফেরি পারাপার করেই আমরা রাজশাহীর পথে এগিয়ে যাব।


গাড়ি ঘুরে গেল। ড্রাইভার বুদ্ধি করে মূল রাস্তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা রেখেছিলেন। সিদ্ধান্ত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে ফেললেন। টাঙাইলের কাছাকাছি এলাকা থেকে ঢাকার দিকে ফিরে আসতে শুরু করলাম। ঠিক কোন এলাকায় ঘটনাটা ঘটেছিল, নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, আমার ধারণা আমরা তখন চন্দ্রা থেকে ঘণ্টা খানেকের দূরত্বে ছিলাম।
এই পুরো বচসা চলাকালীন আমার পাশের সিটের অপরূপাটি একবার গান বন্ধ করেছিলেন। সুপারভাইজার যখন যাত্রীদের উদ্দেশ্যে জানাচ্ছিলেন, গাড়ি নিয়ে কি করতে চান, সেই সময়ে। সব শুনে আবার কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। সুপারভাইজার সাহেব এখন টাকা সংগ্রহ করছেন। আমার কাছে এলেন। সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সহযাত্রীটির সাথে আলাপের। উনাকে ঘুমন্ত দেখে হয়তো সুপারভাইজার আমাকে জানাতে পারেন, উনাকে যেন ডেকে দিই।
সে আশার গুড়ে বালি পড়ল। সম্ভবতঃ হেড ফোনের আওয়াজ কম ছিল আর মেয়েটি জেগেই ছিল, তাই কাছাকাছি আসতেই সে চোখ খুলে তাকাল। আমি যখন টাকা দিচ্ছি, সেও তখন নিজের হ্যান্ড ব্যাগ থেকে টাকা বের করল। এক হাজার টাকার নোট। আশায় আছি, যদি ভাংতি না থাকে তবে আমি অফার দিব টাকা ভাঙ্গিয়ে দেয়ার। আমার কাছে পাঁচশ, একশ, সব ধরনের নোটই আছে। সে ঘটনাটাও ঘটল না। ভাংতি মেয়েটির কাছেই ছিল। সুপারভাইজার ছোট নোট দিতে বলায় সে বের করে দিল।
নাহ, আজকে লাক বেজায় বিট্রে করছে। এমন তো কখনো হয়নি। আজকে কি হল? এখন বিকেল পাঁচটা হবে। আমাদের বাসটা রওয়ানা দিয়েছিল তিনটার দিকে। যখন ফিরে আসবার সিদ্ধান্ত হয় তখন সময় আনুমানিক ছটা হবে। আর এখন সময় সাতটা হবে। তবে গাড়ি বেশ দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। আরিচা রোডে আর কিছুক্ষণের ভেতরেই উঠব।
এরপরে ভয়ানক ঘটনাটা ঘটল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। প্রায় ঘণ্টা খানেক সম্ভবতঃ ঘুমিয়েছিলাম। কারণ যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন দেখি আমরা আরিচা রোডে। কোন জ্যাম নেই। এমনকি তেমন গাড়ি ঘোড়াও বেশ কম। আসলে যমুনা ব্রিজ হওয়ায় এই রাস্তার ওপর লোড বেশ অনেকটাই কমে যায়। ফলাফল হচ্ছে, গাড়ি বেশ দ্রুত চলতে থাকল। ঘুম ভেঙ্গে পাশে ফিরে দেখি অপরূপাটির চোখ খোলা। গান শোনাও স্থগিত। বেশ অবাক হয়ে বাইরে দেখছে। আর অবাক হওয়ার কারণ হচ্ছে বাইরে তখন নেমেছে অঝোর ধারার বৃষ্টি।
আমিও খানিকটা হতবাক হয়ে গেলাম। কতদূরে এসেছি? গাড়িটা থেমে আছে। আবার জ্যামে পড়লাম নাকি? বাংলাদেশে বৃষ্টি মানেই জ্যাম। আমার আপত্তি নাই। যাত্রী আর সুপারভাইজারের নিশ্চিন্ত ভাব দেখে মনে হল না, তেমন সমস্যার কোন ঘটনা ঘটেছে। আগেরবার পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম, এবার সামনের উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকালাম। এবার থেমে থাকার কারণ বুঝলাম। আমরা আরিচা পৌঁছে গেছি। সামনে সারি সারি ট্রাক। অর্থাৎ এখন আমরা ফেরিতে ওঠার সিরিয়ালে আছি। সম্ভবতঃ এই মুহূর্তে ঘাটে কোন ফেরি নেই। গ্রেট।
একটু নেমে যে সামনে হেঁটে আসব, তার উপায় নেই। বেশ কয়েকজনকে অবশ্য নামতে দেখলাম। সম্ভবতঃ প্রকৃতির ডাক। কিছু একটা মাথায় দিয়ে রাস্তার পাশেই সেরে ফেলছে। আমার খুব জোরে লাগেনি। নামব কি না ভাবছি, এমন সময় ঝালমুড়ি ওয়ালা উঠল। গলায় একটা ঢাউস সাইজের চারকোনা বাক্স। সামনের দিকে কাঁচ। সেখানে রাখা আছে চানাচুরগুলো। বাকী সব ভেতরে। ওগুলো দেখানো জরুরী না। খদ্দেরদের মূল আকর্ষণ চানাচুর। সেটা যে আছে, এই তথ্যটা দেয়ার জন্যই সম্ভবতঃ সামনের আর পাশের অংশে কাঁচ। সৌন্দর্যও কারণ হতে পারে। বৃষ্টি সম্ভবতঃ বেশ খানিকক্ষণ ধরেই হচ্ছে। একেবার চুপচুপে না হলেও বেশ খানিকটা ভিজেছে। সম্ভবতঃ বৃষ্টির প্রোটেকশানের কিছু সাথে রাখেনি। একটা গামছা আছে, গাড়িতে উঠেই গামছা দিয়ে মাথা মুছে নিল। বৃষ্টির জন্য তো আর আজকের ব্যাবসা নষ্ট করা যায় না। সো মাস্ট গো অন।
এদের ফর্মুলা সম্ভবতঃ দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ঢুঁ মারা। যা বিক্রি হয়। এধরনের হকার টাইপ লোক উঠলে দেখেছি, একেবারে মিস হয় না। কেউ না কেউ কিছু না কিছু কেনেই। সে ডোন্ট মাজন হোক আর ঢোল কোম্পানির মলম হোক। এই বাসেও যথারীতি বিক্রি শুরু হল। সামনের দিকের দুএকজন নিল। দুই সিটের মাঝের জায়গায় দাঁড়িয়ে বেশ দক্ষ হাতে ঝালমুড়ি বানাতে লাগল। ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সাহস হল না। রাস্তার খাবার খেলে পেট খারাপ হওয়া আমার জন্য প্রায় অবধারিত একটা ব্যাপার।
আমাদের সিট টা ছিল মাঝামাঝি। ঠিক আমার সামনের সিটে বসা যাত্রীটি অর্ডার করেছিলেন ঝালমুড়ির, তাই আমার খানিকটা সামনে দাঁড়িয়েই ছেলেটা মুখরোচক খাবারটি বানাচ্ছে। আর আমি লোলুপ দৃষ্টিতে সেটা দেখছি। সংযমের বাঁধ ভাঙ্গি ভাঙ্গি করছে। ঠোঁট নিশপিশ করছে। বলতে চাইছে, বেশি করে ঝাল আর চানাচুর দিয়ে দশ টাকার মাখাও। এমন সময় শুনতে পেলাম
— আমাকেও দাও। দশ টাকার। ঝাল আর চানাচুর একটু বেশি দিবা
আওয়াজটি নারী কণ্ঠ। নিঃসন্দেহে আমার না। হতভম্ব ভাবটা কাটবার পরে বুঝলাম, অর্ডারটি প্লেস করেছেন আমার পাশে বসা অপরূপাটি। এই প্রথম পাশে বসা সহযাত্রীটির গলার আওয়াজ শুনলাম। এমন স্মার্ট দর্শী নারী রাস্তার তৈরি ঝালমুড়ি খাচ্ছে? তার ওপর এমন ফেরিঘাটে। অবাক হয়ে তাকালাম। মেয়েটির তেমন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঝালমুড়ি প্রস্তুতকারক ছেলেটি সামনের যাত্রীটিকে তাঁর অর্ডার সরবরাহ করে অপরূপার জন্য মুড়ি, চানাচুর আর বাকী সব জিনিসপত্র মাখতে শুরু করে দিল। খারাপ না। সমস্যা হলে চিকিৎসক হিসেবে পারফর্ম করার সুযোগ পাব।
অবশেষে প্রস্তুত হল খাদ্যটি। একটি কাগজকে ঘুরিয়ে কোন বানিয়ে সেটায় ঢালতে লাগল ছেলেটি। দেখে বেশ লোভ হচ্ছিল। কি আর হবে, একটু ডায়ারিয়াই তো? ওষুধ খেয়ে নেব। ঝালমুড়ির ঠোঙ্গাটি হস্তান্তরের পরে আমি সজোরে আমার সংযমের বাঁধ ভাঙলাম। ঝালমুড়ি ওয়ালার কাছে আমার অর্ডার প্লেস করলাম। জানালাম
— আমাকেও দাও। চানাচুর বেশি, ঝালও বেশি।
অপরূপা ব্যাপারটা লক্ষ্য করল না। ব্যাপার কি? আমি কি এতোই ফ্যালনা? আমার কোন কিছুর দিকেই তো দেখি এই মহিলার কোন নজর নাই। এতো দেমাগের কি আছে? নাহ রাগ করা যাবে না। ধৈর্য রাখতে হবে। ভাগ্যের ওপরও আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। জীবনে কখনও মিস হয়নি। এবারও হবে না। দেখা যাক। মনে মনে অবশ্য কিছুটা অভিমান হচ্ছে, ‘সমস্যা হোক খালি’।
ওদিকে শুরু হয়ে গেল ঝালমুড়ি তৈরির প্রক্রিয়া। আমি একবার সেই প্রক্রিয়া আরেকবার অপরূপাকে দেখছি। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি, ভাল হয়েছে? ভাবনাটা বাদ দিলাম। এমন সস্তা স্টাইলে আলাপ করার চেষ্টা করলে, ব্যাপারটা বুমেরাং করবে। দারুণ ভাব গম্ভীর কোন স্টাইল ট্রাই করতে হবে। সেটা কি হবে, পরে ভেবে দেখব। আপাততঃ ঝালমুড়িতে মনোযোগ দিই।
হাত যেন ব্যাবহার না করতে হয়, তাই একটা শক্ত কাগজ আলাদা দিয়ে দিয়েছিল। সেটা দিয়ে খেতে গিয়ে কিছু মুখে ঢুকছে, আর কিছু বাইরে পড়ছে। পাশে তাকিয়ে দেখলাম। উনি এতো ঝামেলায় যাননি। হাতে ঢালছেন আর খাচ্ছেন। কাজটা আমি করলে একটু খ্যাত খ্যাত দেখাতো, কিন্তু ওকে দেখাচ্ছে না। সাবলীলভাবেই কাজটা করছে। মনে হচ্ছে কাজটা প্রায়ই করে।
বাসের আর কেউ তেমন আগ্রহী হল না। আর কয়েকবার চিৎকার করে ঝালমুড়িওয়ালা নেমে গেল। এবার উঠল বই বিক্রেতা। সে অবশ্য একটু আগেই উঠেছে। সামনের দিকে বই দেখাচ্ছিল। ঠিক বই বিক্রেতা না, কক্টেল টাইপ। বই আছে, সাথে কিছু পত্রিকাও। সাথে একটা ঝোলাও আছে। সেখানে সম্ভবতঃ বেশ কিছু স্টক আছে। আকর্ষণীয় বইগুলো হাতে রেখেছে আর কম আকর্ষণীয় কিংবা প্রদর্শন যোগ্য না, এমন বইগুলো ঝোলার ভেতরে।
বৃষ্টির জন্য প্রায় সব বইই পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখেছে। বাসের দুই সারি সিটের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে আর যাত্রী দের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছে, নেবে কি না। চেহারা দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কোন ধরনের বইয়ের কথা জানাবে। তেমন বিক্রি হচ্ছে না। তাই বেশ দ্রুতই এগিয়ে আসছে। আমার কাছাকাছি চলে আসল। এরপরে মাথা নিচু করে বেশ রহস্যময় কিন্তু চাপা গলায় বলল
— মামা, লাগবে? ভাল কালেকশান আছে।


এই হকারগুলোর একটা ব্যাপার আনপ্যারালাল। এদের চোখ খুব শার্প হয়। এক নজর দেখেই বুঝে যায় কার মনে কি চলছে। কে পোটেনশিয়াল গ্রাহক, আর কে কেবল বই নেড়ে চেড়ে দেখবে কিন্তু কিনবে না। আর এটাও বুঝে যায়, কাকে খানিকটা উৎসাহ দিলে, মৃদু না, হ্যাঁ হয়ে যাবে।
আমি খুব অল্প সময়ের জন্য তাকিয়েছিলাম। আর সেই অল্প সময়েই সম্ভবতঃ আমার মনের অবস্থা দেখতে পেয়ে যায় এই থট রিডার। বুঝে যায় আমি ওসব নির্বিষ টাইপ বইয়ের গ্রাহক না। এভাবে রাস্তায় বইকেনা টাইপই না। বরং আমি হচ্ছি সেইসব বিশেষ টাইপের বইয়ের পটেনশিয়াল গ্রাহক। তবে হিপোক্র্যাট টাইপ। ঐ যে, উৎসাহ দিলে, মৃদু না, হ্যাঁ হওয়া টাইপ। ঠিকই ধরেছে। কিনতে একেবারে যে ইচ্ছে করছিল না, তা না। তবে এভাবে? সবার সামনে? নেভার। সবাই কি ভাববে?
বাসের নিয়ম হচ্ছে রাত হয়ে গেলে বাসের ভেতরের লাইট বন্ধ রাখা হয়। আমরা যখন ফেরিঘাটে এসে পৌঁছি তখন সন্ধে পার হয়ে গেছে। রাতের বেলা কোন কারণে বাস থামান হলে ভেতরের লাইটগুলো সাধারনতঃ জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ফলে সবাই সবাইকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। ছেলেটা বিভিন্ন ধরনেরই বই আর পত্রিকা বিক্রি করছিল। ভেতরের সেই মোটামুটি আলোতে একনজর তাকিয়ে বুঝে গেলাম, বইগুলো নির্বিষ টাইপ বই। ভদ্র গোছের যাত্রীদের কাছে গিয়ে সেসব বইয়ের লিস্টি শোনাচ্ছে।
তবে পত্রিকাগুলোর দিকে এক নজর তাকিয়েই বুঝে গেলাম, ওগুলো মিক্সড। কিছু নির্বিষ টাইপ আর কিছু এক বিশেষ শ্রেণীর। অভিজ্ঞ চোখে তাকিয়ে এক নজরেই বুঝি যাই, সেই বিশেষ শ্রেণীরগুলো পত্রিকাগুলোর যে দুই ধরন হয়, অর্থাৎ হার্ড অ্যান্ড সফট, সেই দুই জাতেরই ওর কাছে আছে। হার্ডগুলো আবার পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। কেবল ওপরে ছবিটা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে লেখা দেখার উপায় নেই। কিনলেই কেবল পড়তে পারবেন।
বেশ দ্রুতই উত্তর দিলাম
— নাহ। লাগবে না।
মিস্টার থট রিডার সম্ভবতঃ আরেকবার টোকা মারত, পাশে মহিলা যাত্রী দেখে কাজটা করল না। এই ব্যাপারে মিস্টার থট রিডাররা আরও একটা ব্যাপারও জানে। আমাদের টাইপের ছেলেদের হিপোক্র্যাসিটা। পড়তে আগ্রহ ষোল আনা, শুধু কেউ যেন না জানতে পারে। আড় চোখে মেয়েটার দিকে তাকালাম। বাইরে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ব্যাপারটা লক্ষ্য করেনি। কথাবার্তা যেহেতু ইশারায় আর অনেকটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজে হয়েছে, মেয়েটার বোঝার কথাও না।
স্মিত হাসলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল হোস্টেল জীবন। একটা সময় ছিল যখন এসব ছিল হটকেক। বেশিরভাগই এসব কেনা হত জার্নির সময়। কখনও স্টেশানে, কখনও ফেরি পারাপারের সময়। আর এসব বই দ্বিতীয়বার পড়ে যেহেতু প্রথমবারের মত উত্তেজনা আসত না, তাই চলত শেয়ারিং। নিজেদের কালেকশান ইন্টারচেঞ্জ করতে কেউই দ্বিধা করতাম না। কমবেশি সবাই জানত, আমরা কে কে, এই লাইনের লোক।
আমাদের আবার গুরুও থাকত। প্রায় প্রতিটি ইয়ারেই একজন থাকত। যার কাছে হয় কালেকশান থাকত আর নয়তো খবর থাকত, কার কাছে কি কি আছে। বিছানার তোষকের নীচেই সাধারনতঃ রাখা হত, তবে অতি সাবধানীরা আরও গোপন কোন জায়গায় এসব লুকিয়ে রাখত।
সাধারনতঃ শেয়ার করেই এসব পড়তাম। হোস্টেলে নতুন কোন কালেকশান আসলে পুরো গ্রুপের কাছেই খবর পৌঁছে যেত। নতুন মালিকের কাছে রীতিমত সিরিয়াল দিয়ে রাখতে হত। যে ছেলেটিকে খনি হিসেবে সবাই চিনত, তার কাছে কালেকশান থাকত। আর তাই ওর কাছে মাঝে মাঝেই যাওয়া হত, ‘নতুন কিছু আছে?’ জিজ্ঞেস করতে। পেলে ভাল, আর না হলে পুরনোগুলোর একটা দিয়েই চালিয়ে দেয়া হত। কখনও ‘রফিকের কাছে নতুন একটা দেখলাম’ এমন কোন তথ্য দিয়ে সাহায্য করত।
হকারটা ততোক্ষণে বাসের শেষ প্রান্তে চলে গেছে। সেই একই ভঙ্গিমায় আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করল। আমার চেয়েও বয়সে তরুণ একজন কিনল। ছেলেটা ফিরে আসছে। আর বিক্রি হয়নি। একবার ভাবলাম বাইরে বেরোই। অন্ধকারে কিংবা একপাশে ডেকে নিয়ে একটা কিনে ফেলি। যদিও অনলাইনে এসব এখন ভুরি ভুরি, তারপরও ছাপানো বইয়ের একটা আলাদা ফিলিংস আছে। কিন্তু হঠাৎ কেন ইচ্ছে করছে? অনেস্টলি স্পিকিং, আমি নিজেই জানি না। হয়তো স্মৃতি জেগে উঠেছে, হয়তো জাস্ট ইচ্ছে করছে। আসল কারণ যা ই হোক, ইচ্ছেটা দাবাতে ইচ্ছে করল না। ঠিক করলাম, বাসটা ফেরিতে উঠলে এক সুযোগে…।
ছেলেটা ফিরে আসবার পথে আবার আমাদের সিটের ঠিক পাশে এল। আবার সেই আড় চোখের দৃষ্টি। তবে এবার কিছু বলল না। সিট পেরিয়ে যাবে এমন সময় আওয়াজ আসল
— ভাল কালেকশান আছে?
নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পাশে বসা অপরূপাটি প্রশ্নটা করেছে। যাকে বলে হা করে তাকানো, ঠিক সেভাবেই মেয়েটার দিকে এবার তাকালাম। কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সোজাসুজি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেছে মেয়েটা। ছেলেটার চোখের অবস্থাও ছানাবড়া টাইপ। জীবনে কখনও কোন মেয়েকে এসব পত্রিকা কিনতে ও দেখেছে বলে মনে হয় না।
থট রিডার মশায় দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। বেশ উৎসাহ নিয়ে নিজের কালেকশানগুলো দেখাল। দুএকটা রিকমেন্ডও করল। অপরূপাটি কয়েকটা হাতে নিয়ে দেখল। অবশ্য দেখার কিছু নেই। কি কি গল্প আছে, বোঝার উপায় নেই। জাস্ট আন্দাজে নিতে হবে। ব্যাপারটা জানে বলেই মনে হল। মিস্টার থট রিডার যে থট রিডিং করেছিল, তার ওপর নিজেই সম্ভবতঃ ভরসা করেনি। তাই সফটগুলো দেখিয়েছিল। সেগুলো নেড়েচেড়ে পছন্দ হল না অপরূপার। এরপরে থট রিডারের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল
— আর জি নাই?
‘আর জি’? ‘আর জি’ মানে কি? স্পেশাল টাইপ কিছু? ছেলেটা তখন হতবাক হয়ে অপরূপার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা প্রথমে আমার মাথায়ও ঢুকছে না। মেয়েটা এবার পরিষ্কার করে বলল
— গুপ্তর বই নাই?
এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ‘আর জি’ হচ্ছে এধরনের বইয়ের জনৈক বিখ্যাত লেখকের নামের অদ্যাক্ষর। সংক্ষেপে বলেছিল। রাইটারটির যে এই কোড নেম হয়েছে, জানা ছিল না। আই লাইনের লেখক হিসেবে কার নাম, তা সাধারনতঃ কেউই দেখে না। তবে এই রাইটারটার নামটা কিভাবে যেন বেশ হিট করে যায়। এই নামে আদৌ কেউ আছে কি না কে জানে? নামটায় যেহেতু কিছুটা তরল ইঙ্গিত আছে, তাই ধরে নেয়া যায়, নামটা ফেক।
ছেলেটা এবার সম্বিৎ ফিরে পেল। বুঝতে পারল কি চাইছে। পলিথিনে মোড়া হার্ড টাইপেরগুলো বের করল। যে কয়টা বাইরে রেখেছিল, সেগুলো প্রথমে দেখাল। এরপরে ঝোলার ভেতর থেকে আরও কয়েকটা বের করল। দেখা গেল তার কাছে পত্রিকা ছাড়াও বইও আছে। মোটা, পাতলা অনেক ধরনেরই আছে।
সবগুলো নেড়েচেড়ে দেখে অবশেষে দুটো পছন্দ করল। একটা পত্রিকা আরেকটা বই। দাম জানতে চাইল। থট রিডার মহাশয় তখনও স্বাভাবিক হয়নি। তবে এতদিনের প্র্যাকটিস কাজে দিল। নিজের অগোচরেই বেশি দাম চাইবার ফর্মুলায় ঢুকে গেল। অপরূপাও মনে হল ফর্মুলা জানে। প্রফেশনাল ক্রেতা।
কেনা শেষ হল। আমার হতভম্ব ভাব অনেকটাই তখন কেটে গেছে। রোমাঞ্চ কাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এ কি মেয়ে রে বাবা! এভাবে সবার সামনে? কোন সংকোচ নেই, কোন ইতস্ততঃ ভাব নেই। একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করল। আমি যে হা করে ব্যাপারটা দেখছি, আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। ব্যাপারটা টের পেলাম যখন শুনলাম
— পড়বেন?
আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছে। চোখে দুষ্টুমি কিংবা তেমন কোন ইঙ্গিত নেই। সোজা সাপটা প্রশ্ন। আমার ইতস্ততঃ ভাব তখন কাটতে শুরু করেছে। আরও একটা ব্যাপার বুঝে গেছি, শী ইজ সামথিং স্পেশাল। শুধু সুন্দরী না, দারুণ আধুনিক এক চরিত্র। সাহসী। মেয়েটার প্রতি এতক্ষণ কেবল একটা ভালোলাগা কাজ করছিল। হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম, অপরূপার মুখ থেকে বের হওয়া একটা শব্দে এবার সারা শরীরে সত্যিকারের একটা শিহরণ খেলে গেল। বললাম
— পড়ব।
চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *