বাংলাদেশের গনতন্ত্র ও মানবধিকারের পক্ষাপটে নাস্তিক,মুক্তমনা ও মানবতাবাদী ব্লগার এবং সমকামীদের জীবন

প্রথমে আমাদের বাংলাদেশের উপর সংক্ষেপে কিছু বিষয় আলোচনা করা আমার জন্য নৈতিক কর্তব্য। বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন তা বাংলাদেশের ভিতরে যারা বাস করছেন তারা দৈনিন্দ জীবনে উপলদ্ধি করছেন। কিন্তু যারা দেশের বাহিরে আছেন তারাও অন্যভাবে প্রতিনিয়ত অনুভব করেন এবং দেশে থাকা মানুষগুলোর কষ্টের অংশীদার হচ্ছেন।

বাংলাদেশের যদি প্রথম ও অন্যতম সমস্যা কি তা নির্ধারণ করতে বলা হয়,মনে হয় একজন শিশুও বলবে দুর্নীতি। আর এই দুর্নীতির প্রধান হোতা হচ্ছেন সকল প্রকার রাষ্ট্র পরিচালনায় নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ। যাদের হাতে রাষ্ট্রকে জনগনের আমানত হিসেবে পরিচালনার দায়ভার দেওয়া হয়, তারা ক্ষমতা গ্রহনের পর সেই ক্ষমতাকে পৈত্রিক সম্পত্তির মতো ভোগ করে এবং জনগনকে তাদের হুকুমের গোলাম বানিয়ে রাখে। আর যাকে সুস্থ সচেতন বিবেক দ্বারা মূল্যায়ন করলে, রাজনীতিবিদের এই আচারন হচ্ছে জনগনের আমানতের খেয়ানত।শুধু তাই নয় রাষ্ট্রীয় সর্বশক্তির উৎস জনগন হয়ে যায় সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের শিকার।তবে চরম অপ্রিয় হলেও সত্য এই যে বাংলাদেশে জনগনের হাতে কি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতা কি কখনো ছিল?

আর এখনতো বাংলাদেশের জনগনের ভোট দেওয়ার অধিকারও নেই। অবশ্য ভোট দিয়েই বা কি লাভ মক্ষতায় কে আসবে আর কে হারাবে তা পূর্বেই নির্ধারিত হয়।সেক্ষেত্রে এখন জনগন মিথ্যা ভোট কেন্দ্র যাওয়ার কষ্ট থেকে এবং অসত্য প্রতিশ্রুতি শুনা থেকে বাঁচলো। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কি বাঁচতে পারবে? না পারবেনা এবং পারেনি।গনতন্ত্র হচ্ছে জনগনের চাবি সে গনতন্ত্র নির্বাসনে থাকলে কোনোদিন জনগন তার সুফল লাভ করবে না।আর গনতন্ত্র শুধু একটি শব্দ নয় বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনগনের সঠিক অধিকার নিশ্চিতকরণসহ সর্বপোরি রাষ্ট্রীয় জীবন কাঠামো।তাই গনতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে সঠিক মানবধিকার এবং সবার জন্য সমান আইন একটি কাল্পনিক গল্পের মধ্য হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতায় নয়।

গনতন্ত্র কোনো সপ্ন নয় বরং মানবিক অধিকারের অন্তরভূক্ত একটি নাগরিক অধিকার। প্রত্যকটি সর্বভৌম রাষ্ট্রের জনগন এই অধিকারের দাবিদার।কারন, একমাত্র সঠিক ও সুস্থ গনতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত লোকদের জনগনের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।আর জনগনেই তার বিচার করে। তাই গনতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরিহার্য অংশ। কিন্তু , সে গনতন্ত্র যদি হয় বাংলাদেশের গনতন্ত্রের মতো তাহলে মানুষ গনতন্ত্রকে অভিশাপ ভেবে গনতন্ত্রকে সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করতে চাইবে।তাই আমাদের জানতে হবে গনতন্ত্রের সঠিক সংজ্ঞা কি? গনতন্ত্রের মূল উৎস কি? গনতন্ত্রের সুফল কি কি?এরপর সর্ব শেষে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যেটি, গনতন্ত্রের আদর্শ দেশগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে, তাদের কাছ থেকে গনতন্ত্র চর্চ্চার শিক্ষা নিতে।

বাংলাদেশ একটি ধর্ম নিরপক্ষ রাষ্ট্র কিন্তু রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৮৯% মুসলিম, ৯% হিন্দু আর ২% অন্যান্য ধর্মাবলি লোক। তাই ইসলাম ধর্মের প্রভাব সব ক্ষেত্রে রয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় আমানত চুরি করার সময়ও তাদের মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন (আল্ হামদুল্লিলহা) বলে। আর তাদের আল্লাহকে চুরিতে সামিল করে দেন।তারপর চুরির টাকা দিয়ে আরাম-আয়াশ করে তাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ শকর গুজার করেন।

বাংলাদেশের জনগন বাক স্বাধীনতাহীন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতাহীন একটি অচল অবস্থায় বসবাস করছেন। এক দিকে গনতন্ত্রের নির্বাসন চলছে, অন্য দিকে ধর্মীয় উগ্রতা ও প্রভাব বিস্তার করার জন্য একটা বিশাল জন গোষ্ঠী সর্বদা দেশে একটা ভয় জাগিয়ে রাখছেন। এমতবস্থায়, সবার জন্য সমান মানবধিকার প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবা হচ্ছে, গরিবের গৌড়ার রোগের মতো।

তাহলে নিচের প্রশ্নগুলোর কি উত্তর,কে দিবে উত্তর?
১* বাংলাদেশের সাধারন জনগন কি এই দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের শৃঙ্খলে বন্দী দাঁস হয়ে তাদের সকল শোষন আর নিপীড়নের শিকার হতে থাকবে?
২* বাংলাদেশের সরকারি আমলারা কি অত্যাচারী শাসকের হুকুমের গোলাম হয়ে দেশের সাথে সর্বদা বিশ্বাসঘাতকা করবে?

৩* দেশের সংখ্যা লগিষ্ঠ জনগন কি সর্বদা সংখ্যা গরিষ্ঠদের হাতে নির্বিচারে অত্যাচারিত হবে?

৪* দেশে কি আমাদের মতো ধর্মহীন ও ধর্মীয় কুসংস্কারে অবিশ্বাসী লোকের কোনো স্থান হবে না?

৫* বাংলাদেশে কি কখনো নাস্তিক ও মুক্তমনা বল্গারদের মত প্রকাশের পূর্ন স্বাধীনতা এবং ভয়হীনভাবে বাঁচতে দেওয়া হবে না?

৬* বাংলাদেশে কি সমকামীতাকে মানবধিকার হিসেবে স্বীকার করা হবে না?

উপরের সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাবো শুধু সঠিক ও সুস্থ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে। আর সেই গনতন্ত্র হতে হবে ধর্মীয় প্রভাব ব্যতি রেখে এবং সবার জন্য সমান মানবধিকার সুনিশ্চিতের মাধ্যমে। সমাজে সকল প্রকার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মিথ্যাচারকে পরিহার করে ধর্মহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় গনতন্ত্র সকলের জন্য কাজ করবে সমান গুরুত্ব দিয়ে।

কিন্তু সমাজ থেকে এতো সহজে কি ধর্ম নামের ভাইরাসটি সরিয়ে মানবধিকার ও মানবতাবোধ প্রচার এবং প্রসার কি কখনো সম্ভব?
যেই মানবধিকার সুরক্ষা দিবে দেশের সব ধরনের জনগনকে। কিন্তু তা হয়তো কখনো সম্ভব হবে কিনা জানি না। কিন্তু একটা বিষয়তো নিশ্চিত সবার জানা পশ্চিমা বিশ্বের বেশির ভাগ গনতান্ত্রিক দেশে উপরের উল্লেখিত ৬টি প্রশ্নের সঠিক ও যুক্তিযুক্ত উত্তর আছে।উদাহরণ স্বরুপ আমি কিছু বিষয় নিচে বর্ননা করছি;

আমি যুক্তরাজ্যের(ইউকে)কথা এখানে বলবো: যুক্তরাজ্যে জাতি,গোত্র,ধর্ম,বর্ন,লিঙ্গ ও রাজনৈতিক সব অনুসারীদের সকল প্রকার মত প্রকাশের পূর্ন স্বাধীনতা রয়েছে। আর এই স্বাধীনতাতে কোনো বৈষম্য নেই। যতটুকু স্বাধীনতা একজন ধর্ম পালনকারী মানুষের ততোটুকু স্বাধীনতা একজন নাস্তিকেরও রয়েছে। আবার বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট দুইজন সঙ্গী যতোটুকু স্বাধীনভাবে তাদের ভালোবাসা এবং ভাল লাগা প্রকাশ করতে পারে ঠিক ততোটুকু দুইজন সমকামী সঙ্গী এক হয়ে প্রকাশ করতে পারে।একজন লোক যেই অধিকারে ধর্মীয় প্রচার ও প্রসার করে,ঠিক একই অধিকারে অন্যরা সেই ধর্মীয় উগ্রতা ও কুসংস্কারগুলোর সমালোচনা করতে পারে। আপনি যেই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন সেই দলের নেতাদের সরাসরি প্রশংসা এবং সমালোচনার পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেরও সরাসরি প্রশংসা এবং সমালোচনার সম্পূর্ন অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশীরা যখন বাংলাদেশ থেকে নাস্তিক ব্লগার,মুক্তমনা ব্লগার ও সমকামী হওয়ায় এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতবাদের বিরোধিতার কারনে প্রান ভয়ে পালিয়ে আশ্রয় খুঁজে তখন তারা আশ্রয় পাই এসব ননমুসলিম সভ্য মানবধিকারে বিশ্বাসী গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে।

যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বেশির ভাগ শক্তিশালী মানবধিকার সংস্থাগুলো যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল প্রকার মানবধিকার লঙ্গনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এবং বিশ্ব জনমতের মাধ্যমে ঐসব বর্বরতাকে প্রতিহত করে মানুষের মানবধিকার সমুন্নত রাখার জন্য নিরলস কাজ করে যায়। আর এসব সংস্থা গুলো বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠিত করেছেন নন-মুসলিম উদার পন্থি লোকেরা। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই যে এসব সংস্থাগুলোর সুফল বেশি ভোগ করছেন আরব দেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের মুসলিম ও ননমুসলিম অত্যাচারিত মানুষগুলো। এই ধরনের সংস্থা গুলোর মধ্য ‘অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে, ও ইউকে হিউম্যান রাইট্স ওয়ার্চ,ব্রিটিশ হিউমেনিস্ট অ্যাসোসেয়েশান (হিউমেনিস্ট ইউকে) রয়েছেন।

Manchester pride 2017

Posted by Butterfly on Tuesday, September 26, 2017

সমকামী:
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী সমকামীদের একটা বড় নেটওয়ার্ক আছে। এবং বাংলাদেশ “ল জি বি টি” কমিউনিটি তারই একটি শাখা কমিউনিটি। বাংলাদেশের শত শত তরুন যুবক ও যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের সমকামী লোকেরা এদেশের এবং বিশ্বের নির্যাতিত সব দেশে সমকামী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের শরিক হওয়ার জন্য নিজেদের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এই সংস্থাগুলোর মধ্য রয়েছে লন্ডন প্রাইড,ইউকেজিআইজিসহ আরো বেশ কিছু।এই সংস্থা গুলো তাদের সব ধরনে সাহায্য সহযোগিতা করছে এবং তাদের মানবধিকার সুনিশ্চিত করতে।এখানে তারা তাদের জীবনকে নিরাপদ ভাবছেন।তাই তারা স্থানীয় এলাকায় সামাজিকভাবে বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিজেদের অবদান রাখছেন। অথচ তাদের নিজ দেশে তাদের মতো মানুষদের কুকুরের মতো করে ব্যবহার করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রানহানিও করে। আর রাষ্ট্রীয় আইনেও এটি দন্ডীয় অপরাধ বলে তাই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জায়গায় রাষ্ট্রীয় বর্বরতার স্বীকার হন। আর সমকামীদের এইসব কিছুর শিকার হতে হয় শুধু সমকামী বিরোধী ধর্মীয় মিথ্যা মতবাদ ও উগ্রতায় কারনে। বাংলাদেশী সমকামীদের কিছু ততপরও কার্যকর গ্রুপ আছে ইউকেতে যেখানে সব বাংলাদেশ ‘ল জি বি টি, মানুষেরা মিলিত হয়।এই গ্রুপগুলো সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশী ‘ল জি বি টি, লোকদের উন্নায়নে কাজ করে। এইগুলোর কয়েকটা হচ্ছে; ল জি বি টি বাংলাদেশ লন্ডন,রাইনবো বাংলাদেশ লন্ডন,বিডি মিট আপ গ্রুপ।

মুক্তমনা,নাস্তিক,মানবতাবাদী ব্লগার:
আমার অনেক বন্ধু,সমমনা লেখক, শুধু মানবতাবাদী হয়ে ধর্মীয় কুসংস্কারকে অস্বীকার করেছেন বলে এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরায় তাদের অকালে প্রান হারাতে হয়েছে। বন্ধু নাজিমউদ্দীন সামাদ, অভিজিৎ রায় দা এবং নীলয়সহ আরো অনেকে প্রান হারিয়েছেন ইসলামী উগ্রবাদী জঙ্গিদের হাতে। আরো প্রান হারিয়েছেন প্রথম বাংলাদেশী সমকামী আন্দোলনের অগ্রজ কর্মী জুলহাঁস ও তন্ময়। আজ তারা আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাদের সেই আন্দোলনের আলো আজ আমাদের হাতে। আমাদের তা বয়ে যেতে হবে অনেক দূর।তখন হয়তো একদিন হাজারো অভিজিৎ রায়ের মতো সৃষ্টি হওয়া সচেতন শিক্ষিত ও প্রগতিশীলদের হাত ধরে ধর্মীয় গোঁড়ামি উগ্রতাকে পরাজিত করবে তরুনেরা।বাংলাদেশের প্রত্যকটি উদারপন্থী,নাস্তিক ও মানবতাবাদী ব্লগার আজ প্রানের ভয়ে আছেন শুধু বাংলাদেশ সঠিক গনতন্ত্র ও মানবধিকার না থাকায়। আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাক স্বাধীনতার উপর চরম কট্টরপন্থী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থের প্রবল চাপ।তাই দেশের সচেতন,মুক্ত চিন্তার এবং প্রগতিশীল লোকগুলো পালিয়ে বা অন্য ভিনদেশে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছেন।কিন্তু এসব সাহসী মানবতাবাদে বিশ্বাসী অগ্রনী সৈনিকেরা সহজে হাল ছাড়ার নয় তারা নিজের এবং সকলের সমান অধিকারের আন্দোলনে নিজেদের যে যেখানে আছেন সেখান থেকে উৎস্বর্গ করে যাচ্ছেন।আমি আশাবাদী আমরা ধর্মীয় উগ্রতা ও কুসংস্কারকে পরাজিত করবো মানবতাবোধ আর বাস্তব সম্মত বিজ্ঞান ভিত্তক জ্ঞান ও প্রমান দিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *