╚»★ এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০) ★«╝ {একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র}

শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব বেশিদিন আগের নয়। বাংলাভাষায় তাই শিশুতোষ চলচ্চিত্রও খুব বেশি নেই। সত্যজিৎ রায়ের “গুপীগাইন বাঘা বাইন”, “হীরক রাজার দেশে” নির্মাণ করে শিশুদের জন্যে বেশ উপযোগী, শিক্ষামূলক ও বিনোদন ধর্মী চলচ্চিত্রের নিদর্শন রাখেন। এছাড়াও কাউকে জিজ্ঞাসা করলে আরো একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্রের নাম সবারই জানা। অথবা বাংলাদেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্রের কথা জিজ্ঞাসা করলে সবাই এক বাক্যে যা বলবে তা হল মোর্শেদুল ইসলাম নির্মিত “দীপু নাম্বার টু”। কিন্তু সম্পুর্ণ সরকারী অনুদানে বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ছিল “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০)”।


শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব বেশিদিন আগের নয়। বাংলাভাষায় তাই শিশুতোষ চলচ্চিত্রও খুব বেশি নেই। সত্যজিৎ রায়ের “গুপীগাইন বাঘা বাইন”, “হীরক রাজার দেশে” নির্মাণ করে শিশুদের জন্যে বেশ উপযোগী, শিক্ষামূলক ও বিনোদন ধর্মী চলচ্চিত্রের নিদর্শন রাখেন। এছাড়াও কাউকে জিজ্ঞাসা করলে আরো একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্রের নাম সবারই জানা। অথবা বাংলাদেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্রের কথা জিজ্ঞাসা করলে সবাই এক বাক্যে যা বলবে তা হল মোর্শেদুল ইসলাম নির্মিত “দীপু নাম্বার টু”। কিন্তু সম্পুর্ণ সরকারী অনুদানে বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ছিল “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০)”।

“এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” ‘র মতন শিশুতোষ যে নির্মিত হয় নি আমাদের দেশে তা কিন্তু নয়। কিন্তু এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এখানে তিনি একসাথে অনেক শিশুকে অভিনয়ে অংশ গ্রহণ করান। এতে করে শিশুদের ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে বিষয় গুলো সোজা হয়। পুরো ব্যাপারটাই তারা প্রায় খেলাচ্ছলেই করে। এছাড়াও, “দীপু নাম্বার টু” তে বাবা মায়ের সাথে শিশুদের সম্পর্ক, “দূরত্ব” সিনেমাতে ধনী গরীব শিশুদের বৈষম্য তুলে ধরা বেশ লক্ষণীয়। তারেক মাসুদ এববগ ক্যাথরিন মাসুদও কিন্তু বেশ কয়েকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যার মাঝে “মাটির ময়না” তে তৎকালীন মাদ্রাসার ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। “ভয়েস অফ চিল্ড্রেন” তাদের নির্মিত শিশুতোষ আরেকটি প্রামাণ্য চিত্র। এটি এখনো দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি আমার।

“এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” ‘র দিকে চোখ রেখে যদি আমরা বর্তমান সময়ের শিশুতোষ কোন চলচ্চিত্রের খোজ করি চিত্রটি খুব বেশি সুখকর নয়। কারণ কি?? কারণ পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। সাথে অশ্লীল চলচ্চিত্রের হার বৃদ্ধি সহ নানান চিত্র চোখে পরবে। শুদের সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে সরকারেরও কোন বিশেষ ভূমকা লক্ষণীয় না। শুধু শিক্ষার মাধ্যমেই নয় সুস্থ চলচ্চিত্র ও সুস্থ সংস্কৃতি শিশুদের বিকাশে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও কিশোর অথবা শিশু অপরাধের হারও কমাতে সাহায্য করে এই সকল বিষয়। এক্ষেত্রে কার্টুন অথবা এনিমেশন ফিল্মেরও ভূমিকা রয়েছে। নিজ ভাষায় এনিমেশন ফিল্ম হলে তা শিশুদের কাছে আরো বেশি গ্রহনযোগ্যতা পাবে। কিন্তু সেদিক দিয়েও কারো কোন পদক্ষেপ নেই। শিশুদের খেলার স্থান যেমন কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তেমনি তাদের সৃজনশীলতার বিকাশেও বাধা দিচ্ছি আমরাই। কারো কোন ভ্রুক্ষেপই নেই এই বিষয়ে। অনেক আগে একটা গান শুনেছিলাম। “বৃত্ত” ব্যান্ড এর “রুদ্ধ শৈশব”। কথা গুলো এমন,

“ওইযে দূরে ভিজছে সবই
আমার শুধু ভিজছে দু’হাত
এমন সময় বেশতো হত
পারলে যেতে ঐ দূরটাতে
পেরিয়ে সাগর পেরিয়ে নদী
বাসঘর ছেড়ে তেপান্তরে।।”

কথাগুলো আমাদের সময়ে যতটা না সত্য ছিল, এখনকার শিশুদের জন্যে আরো বেশি প্রযোজ্য।

“এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” ‘র কথা মনে হলেই একটা গান কানে বাজে।
‘আমরা যাব অভিযানে সঙ্গে যাবে কে,
এই তো আমার বীর বাহিনী কোমর বেঁধেছে’

এমিল চরিত্রটির প্রকৃত স্রষ্টা জার্মান লেখক এরিক কাসনার (Erikh Custner)। বিশ্বের নানা দেশে এমিলকে নিয়ে ছবি নির্মিত হয়েছে। এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’র চিত্রনাট্য সেই গল্পকে অবলম্বনেই করা হয়েছে। খেলাঘরের “মুক্ত পাখিকে বন্দী কোরো না” শীর্ষক রচনা প্রতিযোগীতায় প্রথম হয়ে খুলনার ছেলে এমিল ঢাকায় পুরস্কার নিতে আসে। আসতেগিয়ে তার সাথে থাকা ৫০০ টাকা হারিয়ে ফেলে। ট্রেনে আসার সময়ে এই দূর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু নাছোড় বান্দা এমিল, সেই টাকা উদ্ধার করবেই। এর পর থেকেই শুরু হয় তার অভিযান। অভিযানে তার সঙ্গী হয় ঢাকায় নতুন গড়ে ওঠা কিছু বন্ধু এবং পরে তাদেরই একজনের মামা। কিন্তু আসলেই কি শেষ পর্যন্ত টাকা টা উদ্ধার হয়?? নাকি সে অন্য কোন ফাঁদে জড়িয়ে পরে?? শেষ কাহিনী জানতে হলে সিনেমাটি দেখে ফেলতে হবে অবশ্যই।

খুব ছোট অবস্থায় দেখেছিলাম সিনেমাটি। তাও টিভিতে দেখার কারণে পুরোটা দেখতে পারিনি বলে আবারো দেখে ফেললাম আজ। তখনই সিনেমাটি আমাকে স্পর্শ করেছিল। হয়তো ছোট ছিলাম বলে একটু বেশিই করেছিল। তবে সেইসময়ে নায়ক নায়িকার আর প্রেম নির্ভর সিনেমার ভীড়ে এইধরণের শিশুতোষ সিনেমা তৈরী করে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন মরহুম পরিচালক বাদল রহমান। এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য আর কোন সিনেমার কথা শুনিনি আমি।

সিনেমায় অভিনেতা অভিনেত্রীরা ছোট বাচ্চাদের আকর্ষণ করতে যেইরকমের অভিনয় দরকার ঠিক তেমনটিই করেছেন। আর এমিল সহ প্রফেসার আর প্রফেসারের মামার চরিত্র সব বাচ্চাদের আকর্ষণই করবে। এছাড়াও বেশ কিছু যায়গা বেশ মজার করে সাজিয়েছিলেন যাতে বাচ্চারা আকৃষ্ট হয়।

তবে গল্প নির্বাচন ব্যাক্তিগত ভাবে আমার পছন্দ হয় নি। এরচেয়ে আরো অনেক ভালো ভালো কিশোর উপন্যাস বাংলা লেখকদেরই ছিল। সেসব কোনতা দিয়ে কাজ করলে হয়তো মানসিক শান্তি পেতাম। এইটা একান্তই ব্যাক্তিগত মত। সেই দিক দিয়ে দীপু নাম্বার টু, আর আমার বন্ধু রাশেদ এর গল্প নির্বাচন বেশি ভালো লেগেছে আমার। গল্প নির্বাচন যাই হোক তার পরেও সাধারণ গল্পকে অসাধারণ চলচ্চিত্রে পরিণত করার জন্যে বাদল রহমানের অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য। এই সিনামার জন্যে তিনি এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার জাতীয় চলচ্চিত্রও পুরস্কার পান। একনজরে আমরা দেখে নিতে পারিঃ

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
সেরা চলচ্চিত্র – এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (প্রযোজক বাদল রহমান)
সেরা পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা – গোলাম মুস্তাফা – এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী
সেরা শিশুশিল্পী – টিপটিপ – এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী
সেরা চিত্রগ্রাহক (রঙিন) – আনোয়ার হোসেন – এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী
সেরা সম্পাদনা – বাদল রহমান – এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী

আমার আশে পাশে বাচ্চা কাচ্চার অভাব নেই। মাঝে মাঝেই এদের নিয়ে বসে পরি কোন এনিমেশন মুভি দেখতে। আশায় থাকলাম আমাদের নবীন চলচ্চিত্রকারেরা হয়তো বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে কিছু তৈরী করবেন। তা এনিমেশনই হোক অথবা শিশুতোষ কোন চলচ্চিত্রই হোক। নাহয় এদের জীবন বৃত্ত’র “রুদ্ধ শৈশব” গানটার মতই হয়ে যাবে।

সিনেমার নাম : এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০)
কাহিনীঃ লেখক এরিক কাসনার
চিত্রনাট্য ও পরিচালনাঃ বাদল রহমান
শ্রেষ্টাংশে: গোলাম মোস্তফা, সারা যাকের, মাস্টার পার্থ, এটিএম শামসুজ্জামান, শর্মিলী আহমে, শিপলু এবং আরো অনেকেই।

✘✘✘ দয়া করে কোন বাংলাদেশী মুভির ডাউনলোড লিংক শেয়ার করবেন না। বাংলা মুভি সিনেমাহলে গিয়ে অথবা অরিজিনাল ডিভিডি কিনে দেখুন। দেশের চলচ্চিত্র রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করুন।

১৪ thoughts on “╚»★ এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০) ★«╝ {একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র}

  1. এত আগের একটি মুভি ইউটিউব এ
    এত আগের একটি মুভি ইউটিউব এ আছে দেখে ভাল লাগল!!আপ্লোডকারী কে তার অজান্তেই ধন্যবাদ দিলাম।
    আপ্নারে প্রতিদিন ধন্যবাদ দিব না! ব্লগিং চালিয়ে যান। ভাল লাগ্ল।

    তারেক মাসুদের ভয়েস অফ চিল্ড্রেন কি ইউটিউব এ নাই?? কিংবা কোন প্রডাকশন এর ব্যানারে বের হয়েছে জানেন??

    1. আমি খোজ করে দেখি নি আগে। আজকে
      আমি খোজ করে দেখি নি আগে। আজকে খোজ করবো দেখি “ভয়েজ অফ দ্যা চিলড্রেন” 🙂

      ধন্যবাদ আপ্নেরে প্রতিদিন মতামত জানানোর জন্যে 🙂

  2. আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই ছবিটা
    আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই ছবিটা যখন মুক্তি যায়, তখন পরিবারের ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাবা-মা’রা সিনেমা হলে ছুটেছেন। এমনও পরিবারকে দেখেছি কিশোর-কিশোরীদের আবদার মিটাতে তাদের বাবা-মা’রা দ্বিতীয়বার সিনেমা হলে গিয়ে এই মুভিটি দেখেছে। আর সেই সময়কার গৃহবিনোদনের একমাত্র মাধ্যম বিটিভি’র কল্যানে কতবার যে বাদল রহমানের এই মুভিটি দেখেছি, তার ইয়াত্বা নেই।

    এই মুভিটির একটি গান, ‘মাষ্টার শাকিল’র লিপসিং-এ এবং সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ছিল- “হায়রে আমার মনমাতানো দেশ, হায়রে আমার সোনা ফলার মাটি……..”। সম্ভবতঃ আরো একটি গান ছিল- “আমারো দেশেরো মাটিরো গন্ধে ভরে আছে সারা মন……..।” এই গানগুলোর উপস্থাপনা, সুর ও গায়িকার গায়োকী কৃতিত্বে আমার সেই কিশোর বয়সে দেশের প্রতি ভালবাসা গেঁথে গিয়েছিল অন্তরের মধ্যে।

    পুরান পাপী ভাইকে ধন্যবাদ পুরানো এই ছবিটির রিভিউ শেয়ারের জন্য। এই প্রজন্মের সবাইকে মুভিটি দেখার জন্য অনুরোধ জানাব। সেই ৮০ সালে মুক্তি পাওয়া মুভিটি দেখলে বুঝবেন এক সময় বাংলা চলচ্চিত্র কতটা শক্তিশালী ছিল। বাংলা চলচ্চিত্রের ভাষা কতটা সমৃদ্ধ ছিল। মুভিটির ডিভিডি পাওয়া যায়।

    1. ধন্যবাদ দুলাল ভাই। কিছুদিন
      ধন্যবাদ দুলাল ভাই। কিছুদিন যাবত আমাদের দেশের পুরোনো সিনামা গুলো নিয়ে কাজ করছি। আশাকরি আরো কিছু পোষ্ট শীঘ্রই পাবেন 🙂

      আর ডিভিডি আমি পাইনি বলেই ইয়ুটিউবে দেখেছি। এমন অনেক সিনামার ডিভিডি পাইনি আমি 🙁 খুজে না পেয়ে শেষমেশ ইয়ুটিউবের দ্বারস্থ হয়েছিলাম 🙁

      1. এই ছবিটির ডিভিডি আমি
        এই ছবিটির ডিভিডি আমি বসুন্ধরাতে দেখেছি। বসুন্ধরার ডিভিডি’র দোকানগুলোতে পুরানো দিনের বাংলা মুভির ভাল সংগ্রহ আছে। অন্যান্য জায়গায় তেমন একটা চোখে পড়েনা। একটা থাকলে অন্যটা নাই।

  3. এরিখ কাস্টনারের মূল বইটি
    এরিখ কাস্টনারের মূল বইটি পড়েছি,সিনেমাটি অনেক চেষ্টা করেও দেখতে পারিনি!

  4. পুরনো বাংলা সিনেমা প্রায়
    পুরনো বাংলা সিনেমা প্রায় বেশীর ভাগই দেখা আছে। এই সিনেমাটা কিভাবে কিভাবে যেন মিস হয়ে গেছে। দেখে ফেলতে হবে। ওইসময়ের আরেকটা সুন্দর শিশুতোষ চলচ্চিত্র আছে- “ছুটির ঘণ্টা”। আফসোস, সবাই উন্নতি করে, আর আমরা আরও পিছিয়ে যাচ্ছি। তবে তরুন নির্মাতাদের নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী।

    1. ছিটির ঘন্টা আগেও দেখছি, তবে
      🙂 ছিটির ঘন্টা আগেও দেখছি, তবে রিসেন্ট লি আবার দেখবো বলে ঠিক করছি 🙂

      “একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব
      নীল আকাশে, সবুজ ঘাসে খুশীতে হারাব”
      মনে পইরা গেল 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *