নাস্তিকরা কেন ইসলাম নিয়ে বেশি লেখে ?

বিভিন্ন নাস্তিক বনাম আস্তিক ফেসবুক গ্রুপে বা ব্লগে ইসলামধর্মকে কটাক্ষ করে লিখলে, মুমিন-মুসলিমরা প্রায়ই এই অভিযোগ তোলেন যে,
নাস্তিকেরা শুধু ইসলামকেই কেন আক্রমণ করেন, নাস্তিকতা মানেই কি শুধু ইসলামবিরোধিতা, পৃথিবীর আরো হাজারটা ধর্ম নিয়ে কেনো আলোচনা করা হয় না, শুধু ইসলামকে কেন অাক্রমনের লক্ষ্যবস্তু করা হবে, অনেকে এও বলেন গ্রুপের নাম বদলে নাস্তিকতা বনাম ইসলাম রাখা হোক ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গেই কিছু কথা।

বিভিন্ন নাস্তিক বনাম আস্তিক ফেসবুক গ্রুপে বা ব্লগে ইসলামধর্মকে কটাক্ষ করে লিখলে, মুমিন-মুসলিমরা প্রায়ই এই অভিযোগ তোলেন যে,
নাস্তিকেরা শুধু ইসলামকেই কেন আক্রমণ করেন, নাস্তিকতা মানেই কি শুধু ইসলামবিরোধিতা, পৃথিবীর আরো হাজারটা ধর্ম নিয়ে কেনো আলোচনা করা হয় না, শুধু ইসলামকে কেন অাক্রমনের লক্ষ্যবস্তু করা হবে, অনেকে এও বলেন গ্রুপের নাম বদলে নাস্তিকতা বনাম ইসলাম রাখা হোক ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গেই কিছু কথা।
.
.
(১) ফেসবুকের এই বাংলা গ্রুপগুলো কোনো ইন্টারন্যাশনাল থিওলজীকাল গ্রুপ বা কম্পারেটিভ থিওলজী ডিসকাশন গ্রুপ নয় যে, দুনিয়ার আরো আড়াই হাজার নতুন পুরাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করা হবে। বাংলাভাষার গ্রুপ এটি। বেশিরভাগ বাংলাভাষী হিন্দু, মুসলিম, তারপর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, খ্রিষ্ট ধর্মের বাংলাভাষী একটু কম হলেও ইসলামের আলোচনায় ইহুদী-খ্রিষ্ট ধর্ম এমনিতেই চলে আসে। সারা পৃথিবীতে এগুলোই মূলত প্রধান ধর্ম। দ্বন্দ্ব সংঘাত মূলত এ ধর্মগুলোকে কেন্দ্র করেই ঘটছে। তাই মাইনর রিলিজিয়ন তাও, শিখ, জৈন, বাহাই, মিশরীয় ধর্ম, শিন্টো, নর্ডিক, কাল্ট, গ্রীক ধর্ম, ব্যাবিলনীয় ধর্ম, আফ্রিকান ধর্ম, পুয়েবলো, এজটেক, ইনকা, মায়া ইত্যাদি সাধারণত আলোচনার বাইরে থাকে। আর নাস্তিকেরা সবাই সব ধর্ম সম্পর্কে আইডিয়া রাখলেও,সব ধর্ম নিয়ে একই পোস্টে আলোচনা করাও সম্ভব না, আলোচনার সুবিধার্থেই একটি পোস্টে সাধারণত একটি ধর্ম নিয়েই আলোচনা করা হয়।
.
.
(২) অন্য দেশের অবস্থা নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে নিজের দেশের অবস্থা আমরা দেখি। আমাদের দেশে ৯০% ইসলামের অনুসারী। তারপর হিন্দুরা মাত্র ৬/৭%। এরপর বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। আরো আছে অল্পসংখ্যক উপজাতি আদিবাসী। বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের প্রভাব বিস্তারের পথে, তাদের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা মনে করে ভারতকে আর হিন্দুদেরকে। বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান খুব বেশি নাই। ৬-৭% হিন্দু বাংলাদেশে থাকাটা যেন মুসলমানদের সহ্য হয় না। ১০০% মুসলিম দেশ বাংলাদেশের প্রতিটা মুসলিমের যেন স্বপ্ন।
.
.
(৩) এই ৯০% মুসলিমের বিশাল অংশ অর্ধশিক্ষিত এবং গোঁড়াবাদী বা মৌলবাদী। এরা বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর। যদিও তা অসম্ভব। এই মৌলবাদীরা ভুলে যায় এদের পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলো বা বহিরাগত মুসলিম ছিলো। এদেশে আগে হিন্দুরাই ছিলো। তরবারী আর ক্ষমতার জোরেই এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খুব বেশিদিনের কথা না। এরা হিন্দু, বৌদ্ধদের তো দু চোখেও দেখতে পারেনা। বিশেষ করে হিন্দুদের প্রতি তাদের মনে কি পরিমাণ ঘৃণা বিদ্বেষ লুকিয়ে আছে, তার প্রমাণ ফেসবুক পোস্টের কমেন্টেও দেখা যায়। একজন নাস্তিক ইসলামবিরোধী কথা বললেই তাকে মালুর বাচ্চা, মালাউন ইত্যাদি উপাধি দেয়া হয়। হিন্দু দেবদেবীদের কটাক্ষ করে, তাদের দেবদেবীদের প্রতি অশ্লীল কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার সময় এরা শালীনতার কথা তো ভাবেই না। এরা ভুলে যায়, ইসলামের ইতিহাসও খুব পবিত্র, জমজমের পানির ন্যায় স্বচ্ছ ছিলোনা। এই গোঁড়া মুসলিমদের চাপে এমনিতেই হিন্দুরা সদাশঙ্কিত, নিজের জানমাল নিয়ে ভয়ে থাকে, তার ওপর কে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলবে? বেশিরভাগ হিন্দুই জানে তাদের দেবদেবী, ধর্মগ্রন্থের অসারতা সম্পর্কে। তারা পালন করে অনেকটাই পরিবারের বন্ধন ও চাপে পড়ে। আর পূজাপার্বণে যতটা না ধর্মীয় দিক মানা হয়, তার চেয়ে বেশি মুখ্য থাকে উৎসবআনন্দ।
.
.
(৪) এই ৯০% মুসলিমের দেশে আরেকটা বড় অংশ হচ্ছে মডারেট মুসলিম। গোঁড়া মুসলিমরা তো প্রকাশ্যেই অন্য ধর্মের বিরোধীতা করেন। কিন্তু এই মডারেট মুসলিমরা মুখে মধু, অন্তরে বিষ নিয়ে চলেন। বাইরে এরা খুব সুন্দর ভাষায়, ইসলামের উদারতা, পরধর্মসহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সেকুলারিজম, ইত্যাদির বয়ান দিয়ে থাকেন ; কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য ধর্মের কল্লা কাটার কাজটা ঠিকই করে থাকেন। ইসলামি মৌলবাদীরা যখন ভিন্নধর্মীদের ওপর আক্রমণ করেন, তখন এরা চুপ থেকে নীরব সমর্থন জানান।
.
.
(৫) বাংলাদেশে কি কখনো আপনি হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিষ্টানদের নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে দেখেছেন নাকি এরা এক ধর্মকে আরেক ধর্মের ওপর চড়াও হতে দেখেছেন? দেখেননি। কারণ এরা নিজেরা সংখ্যালঘু। আর মুসলিমদের দেখুন, তাদের সবার সাথে সমস্যা। মায়ানমারেও রোহিঙ্গা মুসলিমরা বৌদ্ধদের সাথে একসাথে থাকতে পারছে না, বাংলাদেশে পাহাড়ীদের সাথে সমস্যা, হিন্দুবৌদ্ধদের সাথে সমস্যা, খ্রিষ্টানদের তো আগে থেকেই দেখতে পারেনা। তারপর আবার মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা, শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব, মাজহাবী হানাফি -শাফেয়ীদের দ্বন্দ্ব, মাজহাবী-লা মাজহাবীদের দ্বন্দ্ব, তারপর আবার সালাফিবাদ, ওহাবিবাদ, জঙ্গিবাদ এখন দেখা যাচ্ছে। আর পীরদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। এক পীর আরেক পীরকে দেখতে পারে না। মুরিদানদের মধ্যে প্রায়ই কলহ দেখা যায়। এর পেছনে কারণ কি? কারণ একটাই সেটা হলো, মুসলমানদের ধর্মের মধ্যেই এই ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি আর অন্য মত, অন্য ধর্মকে ধ্বংস করে নিজের মত, নিজের ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার ইতিহাস যুগযুগ ধরে চলে আসছে। মুসলিমরা টয়লেট থেকে জাতীয় সংসদ সব জায়গাতেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু এরা বোঝে না এটা কখনোই সম্ভব না। আর এরকম কাজ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মে নেই। এই ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তাই ইসলামের ধ্বংসের কারণ হবে।
.
.
(৬) ইসলামের এই চরিত্র যে ইসলামের জন্যই ক্ষতিকারক তা নয়, বিশ্বমানবের ও মানবতার জন্যই বিপদজনক। এটা এখন ধার্মিকরা না বুঝলেও পরে যখন বুঝবে তখন আর কিছুই করার থাকবেনা। এবং যা ক্ষতি হবে তা হবে অপূরণীয়। ধার্মিকদের এই অজ্ঞতা, মূর্খতাই নাস্তিকদের জীবনবাজি রেখে লেখার কারণ। ধর্মের ভ্রান্তি, অসারতা এরা বুঝেছেন বলেই ধর্মত্যাগ করেছেন। তারা প্রয়োজন বোধ করেন মানুষকে জানানোর। ধর্মান্ধদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধর্মের ভিত্তিহীনতা দেখানো ছাড়া ধর্মান্ধদের নৃশংসতা, উগ্রবাদ থেকে পৃথিবী মুক্ত হবেনা।
.
.
(৭) বাংলাদেশের নাস্তিকদের বেশিরভাগেরই জন্ম, বেড়ে ওঠা মুসলিম পরিবারে। ৯০% মুসলিমের দেশে এটাই স্বাভাবিক। ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ হওয়ায়, এবং হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া নাস্তিকরা বেশিরভাগই হিন্দু কুসংস্কার, হিন্দুধর্মের ভিত্তিহীনতা ইত্যাদি নিয়ে লেখালেখি করে থাকেন। আবার ইহুদী, খ্রিষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে আলোচনা কম হয়। কারণ আমাদের দেশে ইহুদী, খ্রিষ্টান খুবই কম। অন্যদিকে, ঈসা বা মুসা সম্পর্কে বেশি লেখা খ্রিষ্টান বা ইহুদী গবেষকদের কাছ থেকেই পাবেন। বাংলাদেশের এই নাস্তিকদের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদীরা টাকাপয়সা বা সুবিধা দেয়না ইসলামের বিরুদ্ধে লেখার জন্য। নিজের টাকায়, নিজের সময় শ্রম দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখার প্রধান কারণ হচ্ছে, এদের জন্ম, বেড়ে ওঠা মুসলিম পরিবারে, ফলে এরা ইসলামের মূল ব্যাপারগুলো যত ভালোভাবে বুঝবে, সেটা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে অত ভালো বোঝা যাবেনা। অনেকেই অন্য ধর্মগুলো সম্পর্কে জানেন, বোঝেন, লেখেন। তবুও অনেকেই যেহেতু পাঠককুল বেশিরভাগ মুসলিম, তাই ইসলামের ভুলত্রুটি বিষয়ক পোস্টই বেশি লেখেন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্ট, ইহুদী ধর্মের বিরুদ্ধে লেখাগুলো আবার মুসলমানরা, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্ট, ইহুদীদের দেখিয়ে নিজের ধর্ম ইসলামকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। আর মুসলমানদের অন্য ধর্মকে গালিগালাজ করার বদ খাসলত তো আছেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে তাই আগে মুসলিমদের ঘুম ভাঙ্গানোটাই বেশি জরুরী, কারণ এরা চোখ খুলে ঘুমায়।
– রুদ্র মঙ্গল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *