হালদা নদীর পাড়ে

ছোটবেলা থেকেই আছি চট্টগ্রামে। তাই চট্টগ্রামের বন্ধুই বেশি। গত ১০ মে শুক্রবার আমার বন্ধু আব্দুর রহিম একটা মেজবান এর দাওয়াত দেয়। সংগত কারণে যেতে পারিনি। আবার গতকাল ১৭ মে শুক্রবারও আবার মেজবান এর দাওয়াত দেয়। প্রসংগক্রমে বলে রাখছি চট্টগ্রামের মানুষ মেজবান কে অসম্ভব বেশি পরিমাণে পছন্দ করে। এবারের দাওয়া আর মিস করিনি। মিস না করার আরো একটি কারণ হালো হালদা নদী দেখার ইচ্ছা।

হালদা নদীর পাড়ে স্লুইস গেইট এর ওপর হতে তোলা। ছবি- মুক্ত কথন।


ছোটবেলা থেকেই আছি চট্টগ্রামে। তাই চট্টগ্রামের বন্ধুই বেশি। গত ১০ মে শুক্রবার আমার বন্ধু আব্দুর রহিম একটা মেজবান এর দাওয়াত দেয়। সংগত কারণে যেতে পারিনি। আবার গতকাল ১৭ মে শুক্রবারও আবার মেজবান এর দাওয়াত দেয়। প্রসংগক্রমে বলে রাখছি চট্টগ্রামের মানুষ মেজবান কে অসম্ভব বেশি পরিমাণে পছন্দ করে। এবারের দাওয়া আর মিস করিনি। মিস না করার আরো একটি কারণ হালো হালদা নদী দেখার ইচ্ছা।

হালদা নদীর পাড়ে স্লুইস গেইট এর ওপর হতে তোলা। ছবি- মুক্ত কথন।

১৭ মে শুক্রবার সকাল বেলা রহিম আমাকে ফোন করে বলল যে দুপুর ১২টা করে বের হবে। আমিও ১২টার মধ্যে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ১২টার কিছুক্ষণ পরেই ও আমাকে ফোন করল বের হতে। আমি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলাম। মোটরসাইকেলে অকটেন কম ছিল বিধায় যাওয়ার পথে একটি ফিলিং স্টেশান হতে অকটেন নিয়ে নিলাম। মোটরসাইকেল স্বাভাবিক গতিতেই চালাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর গতি ‍বাড়িয়ে দিলাম, কারণ শুক্রবার, জুমার নামাজ পড়তে হবে। ১:১৫ মিনিটে হাটহাজারীর ফতেহাবাদ এর কাছাকাছি প্রায় চলে আসলাম। ওখানে যাত্রা বিরতি করে দুজনেই জুমার নামাজ পড়ে নিলাম। মনটা একক্ষণ উসখুস করছিল এই জন্য যে নামজটা পড়তে পারব কিনা। যাইহোক এখন একদমই আর টেনশন রইল না। আবার যাত্রা শুরু করে ফতেহাবাদ এসে ডানে মোড় ঘুরে আমাদের প্রথম গন্তব্যে পৌঁছলাম আরো প্রায় ২০মিনিট পর। যে বাড়ীতে এসে পৌঁছলাম সেটা রহিম এর নানা বাড়ী নয়, ওর আম্মুর নানার বাড়ী। আমরা অপেক্ষা করছিলাম রহিম এর আম্মু আর ছোট বোনের জন্য। উনারা বেশকিছুক্ষণ পরে এসে পৌঁছাল। এর মধ্যে আমরা এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম। মেজবানের চলছিল বিশাল আয়োজন। আমাদের মতো অনেকেই এসেছিল শহর থেকে গাড়ী নিয়ে। অনেক মেহমানের ব্যাক্তিগত গাড়ী দেখে বুঝতে বাকি রইল না, যিনি এত সবের আয়োজন করছেন তিনি সমাজের বেশ উঁচুস্তরের মানুষ। তাই আয়োজন টা ও করেছেন সেভাবে। সাধারণত গ্রামের বাড়ীর আয়োজনে এত এলাহি কান্ড করে না। যাই হোক এর মধ্যে রহিম এর আম্মু আর ওর ছোট বোন এসে পৌঁছল। আমরা খাওয়ার পর্ সারতে প্যান্ডেলের ভেতরে প্রবেশ করলাম। অত্যন্ত পরিপাটি করে সব সাজানো গুছানো। প্যান্ডেল যেখানে করা হয়েছে তার নিচে মাটি হলেও কার্পেট দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলাম কার্পেট পানিতে যেন চুপসে আছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সকাল বেলা নাকি খুব বৃষ্টি হয়েছিল। ঐ বেরসিক বৃষ্টিই করেছে এই সব কান্ড। খাওয়ার পর্ব শেষ করতে একটু সময় লাগলো। আমি পরিমাণে একটু কম খেলেও তথন আমার খাওয়া হয়েছে একটু বেশি। প্যান্ডেল থেকে বাইরে এসে দেখি একজন লোক আগত অতিথিদের সবাইকে ছোট ছোট কাপ এ করে শরবত বানিয়ে দিচ্ছেন বরফ দিয়ে। আমি এক কাপ নিলাম টেস্ট করে দেখার জন্য। ভালই লাগল। তারপর যাদের আয়োজনের আসলাম তাদের ঘরে কিছুক্ষণ বসলাম। আবার সেখানেও চা খেতে হলো। যদি খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। গ্রামের মানুষ সহজ সরল, না খেলে যদি আবার রাগ করে। ওখানের আয়োজন শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম। তখন প্রায় বিকাল ৩টা বেজে গেছে।

বেরিয়ে পড়লাম রহিম এর নানা বাড়ী দেখতে। ওখানে পৌঁছাতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট লাগলো। ওখানে ওর মামা মামীর সাথে দেখা করে আমরা চলতে শুরু করলাম হালদা নদীর দিকে। পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে পাঁচ ছয় মিনিটের বেশি লাগেনি। রাস্তাগুলো ছিল খুব ‍সুন্দর তাই মোটর সাইকেল চালাতে বা হাঁটতে মোটেই অসুবিধা হয়নি। গ্রামের পরিবেশ দেখতে এমনিতেই খুব সুন্দর লাগে। তার উপর সকালে এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে প্রকৃতিতেও একটি ঠান্ডা ভাব ছিল। দারুণভাবে উপভোগ করছিল গ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। নদীর পাড়ে যাওয়ার পরিবেশটাও ছিল অসম্ভব সুন্দর। হালকা বাতাস বইছিল যেন স্বর্গ থেকেই আসছিল। নদী দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হলাম। নদী দেখার অভিজ্ঞতা আমার ছোট বেলা থেকেই ছিল। কিন্তু আজকের অভিজ্ঞতাটা ছিল অন্য গুলোর চেয়ে একদমই ভিন্ন। কারণ এই হালদা নদীর ভৌগলিক কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। আর তাই এই নদীটিকে ছোট বেলা থেকেই দেখার একটা ইচ্ছা ছিল। এতদিন সময় ও সুযোগের অভাবে নদীটিকে দেখা হয়ে উঠেনি। আর ওই দিন সময় আর সুযোগ দুটোই মিলে গেল বিধায় সুযোগ হাত ছাড়া না করে সময়টাকে কাছে লাগিয়ে ছুটে গেলাম এই হালদা নদীর তীরে। নদীতে ছিল ভরা জোয়ার। অন্য দিকে সকালে বৃষ্টি হওয়াতে চারপাশের বয়ে যওয়া পানি এসে পড়েছিল নদীতে। তাই নদী ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নদীর পাড়ে কিছু নৌকাকে নোঙর করে থাকতে দেখলাম। একজন মাঝিকে দেখলাম ওপার থেকে এপারে আবার এপার হতে ওপারে দু একজন করে যাত্রি পারাপার করছে। আমারও নৌকায় ভ্রমণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময়ের কারণে আর হয়ে উঠেনি।

যেসব কারণে এই হালদা নদী দেখার ইচ্ছ‍া ছিল আমার …………………………..

হালদা খালের উৎপত্তি স্থল মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ী গ্রাম সালদা। সালদার পাহাড়ী র্ঝণা থেকে নেমে আসা ছড়া সালদা থেকে হালদা নামকরণ হয়। সালদা নামে বাংলাদেশে আরো একটি নদী আছে যেটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে উৎপন্ন ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

হালদা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি নদী। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাটনাতলী পাহাড় হতে উৎপন্ন হয়ে এটি ফটিকছড়ির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবেশ করেছে। এটি এর পর দক্ষিণ-পশ্চিমে ও পরে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ফটিকছড়ির বিবিরহাট, নাজিরহাট, সাত্তারঘাট, ও অন্যান্য অংশ, হাটহাজারী, রাউজান, এবং চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী থানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটি কালুরঘাটের নিকটে কর্ণফুলী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এর মোট দৈর্ঘ্য ৮১ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২৯ কিলোমিটার অংশ সারা বছর বড় নৌকা চলাচলের উপযোগী থাকে।

প্রতিবছর হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস ও কার্প জাতীয় মাতৃমাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার বিশেষ সময়কে তিথি বলা হয়ে থাকে। স্থানীয় জেলেরা ডিম ছাড়ার তিথির পূর্বেই নদীতে অবস্থান নেন এবং ডিম সংগ্রহ করেন। ডিম সংগ্রহ করে তারা বিভিন্ন বাণিজ্যিক হ্যাচারীতে উচ্চমূল্যে বিক্রী করেন।

হালদা নদী এবং নদীর পানির কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য এখানে মাছ ডিম ছাড়তে আসে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে ভিন্ন তর । এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক , রাসায়নিক ও জৈবিক। ভৌতিক কারন গুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর বাঁক , অনেকগুলো নিপাতিত পাহাড়ী ঝর্ণা বা ছড়া , প্রতিটি পতিত ছড়ার উজানে এক বা একাধিক বিল , নদীর গভীরতা , কম তাপমাত্রা , তীব্র খরস্রোত এবং অতি ঘোলাত্ব । রাসায়নিক কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে কম কন্ডাক্টিভিটি , সহনশীল দ্রবীভুত অক্সিজেন । জৈবিক কারণ গুলো হচ্ছে বর্ষার সময় প্রথম বর্ষণের পর বিল থাকার কারণে এবং দুকুলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে নদীর পানিতে প্রচুর জৈব উপাদানের মিশ্রণের ফলে পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে যা প্রজনন পূর্ব গোনাডের পরিপক্কতায় সাহায্য করে। অনেক গুলো পাহাড়ী ঝর্ণা বিধৌত পানিতে প্রচুর ম্যেক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকার ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণু র সৃষ্টি হয়। এই সব বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে হালদা নদীতে অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছকে বর্ষাকালে ডিম ছাড়তে উদ্ভুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা।


স্লুইস গেইট এ পানির প্রবাহ । ছবি : মুক্ত কথন।

নদীর পাড়েই ছিল একটি স্লুইস গেইট। নদী অতিমাত্রায় যাতে প্লাবিত না হয় তাই স্লুইস গেইট খুলে দেয় হয়েছে। এতোমধ্যেই সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। আমরা নদীর পাড়ে এবং স্লুইচ গেইট হতে অনেক গুলো ছবি তুললাম স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখার জন্য। ফেরার পথে প্রবেশ করলাম হাটহাজারী-ভাটিয়ারী লিংক রোডে। কারণ এই পথে ‍একটু দ্রুত আসা যাবে। সেই সাথে দেখা যাবে পাহাড়ী আঁকা বাঁকা পথের সৌন্দর্য। যদিও একটু ভয় ছিল এই জন্য যে আমাদের দুজনের মধ্যে হেলমেট ছিল শুধু আমার। অন্যজনের ছিল না। পথে মিলিটারী পুলিশ চেকপোষ্ট ছিল। তারা এই পথে সাধারণত হেলমেট ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দেন না। কারণ পথটার সৌন্দর্যের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে ছিল মরণ ফাঁদ। একটু আনমনা হলেই চলে যেতে হবে পাহাড়ের বিশাল ঢালু খাদে। যেখান হতে মৃত্যু ছাড়া ফিরে আসা ভাগ্যের ব্যাপার। তাই তারা এই সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নেন। খোলা পথ পেলে কি আর মোটর সাইকেল আস্তে চালানো যায়? তাই চারপাশের বিপজ্জনক সু্ন্দর অবলোকন করছি বিকেলের শেষ আলোতে। এর সাথে এগিয়ে পাহাড়ী আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে মোটরসাইকেলের দুরন্ত গতিতে। হাটহাজারী ভাটিয়ারী লিংক রোড এর দূরত্ব প্রায় ১২ কি:মি:। এর মধ্যে প্রায় ৯ কি:মি: পাড়ি দিয়ে এসে এক জায়গায় দাঁড়ালাম। মাগরিবের নামাজের সময় হওয়াতে নামাজটাও সেখানেই আদায় করলাম। এরই মধ্যে দুটি মিলিটারী পুলিশ চেক পোষ্ট অতিক্রম করে এসেছি। কোথাও বাধার সম্মুখিন হতে হয়নি। সামনে আর একটা আছে। আশা করি সেখানেও কোন বাধার সম্মুখিন হতে হবে না। ভাটিয়ারীতে এসে আমাদের এক স্টুডেন্টের বাসায় গেলাম তার সাথে দেখা করতে। তারপর সেখান থেকে ফিরে এলাম আবার এই ইট কাঠের যান্ত্রিক নগরিতে।

ধন্যবাদ বন্ধু রহিম কে, যে এত সুন্দর একটা জায়গায় আমাকে নিমন্ত্রণ এ নিয়ে গেছে। যেখান থেকে প্রাকৃতিক এই অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করা সম্ভব হয়েছে।

১ thought on “হালদা নদীর পাড়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *