আমার অবুঝ মেয়ে….

আমাকে নিয়ে অনেক টেনশন আমার বুড়ি মেয়েটার। আমার কাছে একদম বাচ্চা মেয়েদের মত বায়না ধরে। প্রতিদিন এস এম এস করতে হবে, পারলে ইমেইলও প্রতিদিন। আর রাতে ঘুমুতে যাবার আগে তাকে অবশ্যই ফোন করতে হবে। আমার সবকিছু তাকে জানানো চাই ই চাই। কোনদিন এসএমএস পাঠাতে বা কল করতে ভুলে গেলে সে নিজেই পরদিন ভোরবেলা ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে জিজ্ঞেস করবে – “কাল ফোন/ম্যাসেজ দিস নি যে?”

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে চলে যেতাম। ট্রেনের দুলুনিতে বসে বসে আম্মুকে sms পাঠাই। বাংলাদেশে তখন ভোর ৪ টা।

“আম্মু, আমি এখন ক্লাসে যাচ্ছি। অঞ্জনের একটা গান আছে না? বসে আছি ষ্টিশানাতে…ট্রেনের দোলাতে রোজ দুপুরে, মায়ের কোলের সেই দোলাটা, যায় মনে পড়ে যায় আমার! জানো, আমি এখন বসে বসে ট্রেনের দুলুনি খাচ্ছি আর গানটা শুনছি আইপডে। সরি আম্মু তোমার ঘুমের ভেতর ম্যাসেজ পাঠালাম। নাও এবার প্রতিদিন ম্যাসেজ পাঠাতে বলার হ্যাপা সামলাও।”

ট্রেনের দোলার সাথে মায়ের কোলের দোলা – কি অদ্ভুত মেটাফোর! সত্যি কি তাই মনে হয়েছে তার? সেটা জানিনা কিন্তু ট্রেনের দোলাতে সত্যি সত্যি আমার ঘুম চলে আসতো। হালকা ঘুম নয়, গাঢ় ঘুম। ঘুমের কারনে কতদিন গ্রামের দিকে চলে গিয়েছিলাম মফস্বল ছাড়িয়ে।

প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই আসে।

‘sabdhaney thakis kintu, toder train to khub jorey chole, seater sathey valokore setey bosbi. hatol ba lohar rod thakle valo kore chepe dhore rakbi. mone jeno thake. onjoner oi gaanta to sunsi, onekdin shona hoina, tor kotha shune money porey gelo.’

[সাবধানে থাকিস। তোদের ট্রেন তো খুব জোরে চলে। সিটের সাথে একদম সেটেঁ বসে থাকবি। লোহার রড বা হাতল থাকলে ভালো করে সেটা চেপে ধরে বসে থাকবি, মনে যেন থাকে। অঞ্জনের ঐ গানটা তো শুনেছি। অনেকদিন শোনা হয় না, তোর কথা শুনে মনে পড়ে গেলো।]

এই হল আমার আম্মু। মনে মনে আমি হাসি। আমি স্বান্তনার স্বরে লিখি,

“তুমি একদম চিন্তা করো না আম্মু, আমি ট্রেনের হাতল খুব শক্ত করে ধরে বসে আছি। ট্রেনের বাবারো সাধ্য নাই সিট থেকে আমাকে নড়ায়।”

প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে প্রতি রাতে বাসায় ফিরে দেশে ফোন দিতে হয়। সারাদিন কি করলাম সেগুলোর খুটিনাটি বর্ননা দিতে হয়। প্রতিবারই ফোন রাখার আগে কড়া করে ধমক খাই ‘খবরদার একদম রাত জাগবি না, নিশাচর কোথাকার।’
এস এস সি পরীক্ষার জন্য রাত জাগার বদ্যাভাস হয়েছিলো। সেই তখন থেকে আমাকে মাঝে মাঝে ‘নিশাচর’ বলে ডাকা হয়। আম্মু, তুমি তো জাননা, পড়ার চাপে আর তোমার দেয়া নামের অবদানে তোমার নিশাচরকে এখন সারারাত অনলাইনে কাটাতে হয়।

অজি এ্যামবাসি যখন আমার প্রথম আবেদনটা নাকোচ করে দিলো, বাসায় এসে তখন মামনিকে ধরে সে কি কান্না আমার! এ কান্না লজ্জা আর ক্ষোভের! বল্ল, ‘ধুর পাগল, এত ছোট একটা কারনে এভাবে কাঁদতে হয় নাকি?’ দ্বিতীয়বারে যখন ভিসা পেয়ে গেলাম, সেদিন মামনি আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। বল্লাম, ‘আম্মু এত ছোট একটা কারনে এভাবে তুমি কাদঁছো?’ মামনি কান্না মাখা হেসে বল্ল, ‘আমার কথা আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিলি?’

আম্মু নিজের হাতে আমার সুটকেস গুছিয়ে দিলো। সে জানতো যে মাথার বালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারি কিন্তু কোলবালিশ ছাড়া কখনই আমার ঘুম হয় না। তাই আমার সু্টকেসে আমার কোলবালিশটাই আস্ত ভরে দিলো। কেউ কোনদিন কোলবালিশ সাথে নিয়ে বিদেশে গিয়েছে কিনা জানিনা তবে সিডনি এয়ারপোর্টের কাস্টমস অফিসার যখন আমার ব্যাগ চেক করছিল, ভেতর কোলবালিশ দেখে সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো। পরে মামনিকে এই ঘটনা বল্লে মামনি তো হাসতে হাসতে শেষ।

যেদিন দেশ ছেড়ে আসি, দেখলাম আমার মেয়েটার লাল মুখ কাঁদতে কাঁদতে আরো লাল হয়ে গেছে। আমিও যে সেদিন কাঁদব তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
আমার একটা চশমা কয়েকমাসের বেশী যায় না। ভেঙে ফেলি। তাই আম্মু বুদ্ধি করে আমার ব্যাগের ভেতর কয়েকটি চশমা দিয়ে দিয়েছিলেন। এখন বুঝি, আম্মু আমার কত্ত বড় উপকার করে ছিলেন। এখানে চশমার যা দাম, চশমা কিনতেই আমার সেমিস্টার ফি’র অর্ধেক চলে যেত। আম্মু প্রায়ই মজা করে বলতেন, তোর চোখ আর চশমার পেছনে যতটাকা খরচ করেছি, সেই টাকা দিয়ে আমি তোর মত আরেকটা ছেলেকে পালতে পারতাম।

অথচ আমার চোখের এই দুরবস্থার জন্য কিন্তু মামনিই দায়ী ছিলেন। সেই ক্লাস টু তে তিনি আমার হাতে সত্যজিৎ রায় তুলে দিয়েছিলেন। সেই যে শুরু হল। তারপর একে একে তাঁর সবগুলো প্রিয় লেখকের প্রায় সবগুলো বই আমাকে দিয়ে গলাধঃকরন করানো হল। মানুষের মায়েরা তাদের ছেলেদেরকে কতকিছু উপহার দেয়। আম্মু শুধু দিতো বই। কোন জন্মদিন বা কোন অকেশানে আমার মনে পড়ে না আম্মুর কাছ থেকে আমি বই ছাড়া অন্যকিছু পেয়েছি। শেষে আমার বইয়ের এমন নেশা হল যে আব্বুর ভয়ে কতদিন কম্বলের নীচে র্টচ লাইট জ্বালিয়ে বই পড়েছি! এর পরও চোখ বাবাজি যে এখনও সাথে আছে এই তো বেশী। তবে আম্মুর প্রচেষ্টা হয়ত কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছিলো। তাইতো, মিঠু আন্টি একদিন বল্ল-‘ আপা, আপনার ছেলেটি তো বই ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।’ আম্মু মুচকি হেসে বল্লে, ‘হুমম, পরে ‘ই’ এর জাগায় ‘উ’ না হলেই হয়।’ আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি, পরে যখন বুঝলাম, তখন খুবই মজা পেয়েছিলাম আম্মুর কথায়।

মামনির রসবোধ আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে।

সেদিন আম্মুকে ফোনে লরেলের [আমার ক্লাসমেট] কথা বলতেই আমাকে বলে, ‘দেখিস, বিদেশী মেয়েদের সাথে আবার কোন সর্ম্পকে জড়াস না যেন। ওদের চরিত্রে বিশাল বিশাল সমস্যা থাকে।’ আমি তো হাসতে হাসতে শেষ।
মামনি তোমার সেই দিনটির কথা মনে আছে, চশমার দোকানের ওয়েটিং রুমে হঠাৎ লিনুর সাথে দেখা হবার পর যেদিন তুমি আমাকে বলেছিলে,’ তুই কি সাইকেল নিয়ে এদিকেই আসিস নাকি?’ আমি সেদিনও হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়েছিলাম। কারন তুমি হয়ত ভেবেছিলে, আমি প্রতিদিন বিকালে ওর সাথে ডেট করতেই সাইকেল নিয়ে বের হই। আম্মু, আমার অবুঝ মেয়ে, একজন মানুষ আমার জীবনে আসবে, আর আমি সেটা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখব, সেটা কি কখনো হয়?

আম্মুর গানের গলা খুবই চমৎকার ছিলো। সেসব দিনের কথা এখনো মনে পড়ে ভীষন, খুব ছোট বেলায় আমার যখন জ্বর হত তখন মামনি আমাকে নিয়ে রাতের বেলা আমাদের বাসার ছাদে বসে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আর আমাকে গান শুনাতো। মামনির কাঁধে মাথা রেখে খুব মন দিয়ে তাঁর গান শুনতাম। মোমের পুতুল মোমের দেশে, আমরা সবাই রাজা, আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, বাবা বলে গেলো আর কোনদিন গান করনা, বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে—-এইগান গুলো মামনির মুখ থেকে শুনে শুনে সব মুখস্ত করে ফেলেছি। শিশুতোষ সেই গানগুলো আমার কাছে ছিলো ঘুম পাড়ানি গান। মামনি, আমার যদি কখনো একটা দুষ্ট বুড়ি হয়, আমি তোমার কাছে ওকে গান শিখতে দিবো। তুমি তোমার জানা সব গান তোমার নাতনীটাকে শিখাবে। এরপর তোমার মতো করে ওই বুড়িটা তার এই বুড়ো ছেলেটাকে তোমার শেখানো ওই গানগুলো গেয়ে তামার মত করেই ঘুম পাড়াবে।

মা, তোমার খুব শখ ছিলো মা ডাক শোনার, কিন্তু জীবনে খুব কমই তোমার এই শখটা পূরন করতে পেরেছি। বন্ধুরা যখন মা বলে ডাকত, তখন মনে হত মা বুঝি খুব ভিন্ন কিছু, সে আমার চিরচেনা ‘আম্মু’ নন। প্রথম প্রথম কেমন যেন লজ্জা করত। তাই মামনি ডাকতাম। আরেকটু বড় হলে ‘আম্মু।’ এখন মা বলে ডাকতে ইচ্ছে হয় খুব, কিন্তু মা, আমার কি সেই যোগ্যতা আছে?

কতদিন রাতে ঘুমাই না। মা, আমার মা, এখন সারারাত নির্ঘুম কাটলেও কেউ আর আমাকে ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে শোনায় না।
প্লিজ তুমি এই লেখাটি পড়ো না মামনি, খুব কষ্ট পাবে। আর যদি কোন বকাঝকা দিতে ইচ্ছে করে তাহলে প্রিয়তিকে দিও। সেটা ওর প্রাপ্য। ওর কবিতাটা পড়েই তোমাকে নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে করল।

[৫ বছর আগে সামু ব্লগে আমার একাউন্ট থেকে করা পোষ্ট থেকে; ইষৎ সংক্ষেপিত, সংশোধিত ও সম্পাদিত]

অনেক ছোটবেলায় আম্মুর কাছ থেকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ লেসন পেয়েছিলাম।

যখন প্রাইমারিতে পড়ি, তখন আমাদের বাসায় প্রায় আমার মতো বয়সীই একজন গৃহপরিচারিকা ছিলেন। তার একটা রুটিন কাজ ছিলো, আমাকে প্রতিদিন বিকেলে মগ ভর্তি করে গরুর দুধ দেয়া। সংগত কারনেই কাজটা আমি ভীষন অপছন্দ করতাম। কারন প্রতিদিন নিয়ম করে মগ ভর্তি দুধ খাওয়া সেসময় আমার কাছে রীতিমতো এক ধরনের ফিজিক্যাল টর্চার মনে হতো। দু চুমুক খাবার পরই বমি বমি ভাব হতো। বেশ কিছুদিন এই টর্চার সহ্য করে একদিন চেষ্টা করলাম মেয়েটার সাথে একটা সন্ধি করতে। ওকে বল্লাম যে, আম্মুর অগোচরে মগ ভর্তি দুধটাকে দু ভাগ করে ফেলতে। এক ভাগ ও খাবে, আরেকভাগ আমি খাবো। তাহলে আমার উপর চাপ কমবে। প্রথমে ছোটভাইর কথা মাথায় এসেছিলো যে বাকী অর্ধেক ওকে দেবো, কিন্তু ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ছোটবেলায় ওর চরম ব্ল্যাক মেইলিং এর স্বভাব ছিলো, মানে আমার দুর্বলতাগুলো খুজেঁ খুজেঁ বের করে সেগুলো আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে আমাকে দিয়ে ওর কাজগুলো ইচ্ছেমতো করিয়ে নিতো। তাই পারতপক্ষে ওর কাছ থেকে আমি সব সময় নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতাম। বুঝেছিলাম যে, দুধের প্ল্যানের কথা ওকে কোনভাবেই বলে দেয়া যাবে না।

কিন্তু সেই মেয়েটাও বেকেঁ বসলো। তাকে কিছুতেই আমার প্রস্তাবে রাজী করাতে পারলাম না। সে কিছুতেই দুধ খাবে না। আমাকেই পুরোটা খেতে হবে। অনেক্ষন বোঝানোর পর শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে রাগে দু:খে ওকে দুম দাম করে কয়েকটা কিল-ঘুষি মেরে বসলাম। ও চিৎকার করে পালিয়ে বাচঁলো।

রাতে আম্মু পড়ার টেবিলে আমার সামনে বসে শাসন করার ভংগিতে বল্লেন – “ওকে মেরেছো কেন?”

আমি চুপ করে রইলাম। বুঝলাম যে মেয়েটা আম্মুর কাছে নালিশ করেছে। ভাবলাম আজকে একটা মারও মাটিতে পড়বে না। কিন্তু আম্মু দুয়েক মিনিট বোকা ঝকা করে শান্ত স্বরে বল্লেন – ” একটা কথা সব সময় মনে রাখবে। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা সবচেয়ে খারাপ কাপুরুষের কাজ।” একটু থেমে আবার বল্লেন, “শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ কাপুরুষের কাজ। তাই এরপর আবার যদি ওর গায়ে তুমি হাত তুলো, তুমি নিজেকে ভাববে যে, তুমি শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ একজন কাপুরুষ। মনে থাকবে?”

আমি মাথা নেড়েছিলাম। আম্মুকে জানিয়েছিলাম, মনে থাকবে। সেদিন নিশ্চিত মারের হাত থেকে বাচাঁর কারনে খুব খুশী হয়েছিলাম কিন্তু রাতে শোবার পর আম্মুর কথাগুলো আবার মাথায় আসলো। আম্মু আমাকে কখনই মারতেন না, শুধু যতবার পড়ার সময়ে অসুস্থতার অজুহাতে বিছানায় কম্বলের নীচে শুয়ে টর্চলাইট জালিয়ে গল্পের বই পড়েছি, ততবারই মার খেয়েছি। [দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে অল্প আলোতে বই পড়ার কারনে ক্লাস টুতেই আমাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চশমার দারস্থ হতে হয়েছিলো।] এছাড়া আর কখনো নয়। তবু সেদিন মনে হচ্ছিলো আম্মু আমাকে একটা হলেও চড় থাপ্পড় মারবেন। কিন্তু সে কেন আমাকে না মেরে শুধু কয়েকটা কথা বলে ছেড়ে দিলো? কারন তিনি বুঝেছিলেন, আমাকে প্রহারের চাইতে এই কথাগুলো বেশী কার্যকর হবে। আমার অহমে আঘাত দিয়ে আমাকে খুব প্রয়োজনীয় একটা শিক্ষা দিয়ে দিলেন।

পরবর্তী সময়ে আম্মুর কথাগুলো আমার মাথায় পাকাপাকিভাবে গেথেঁ গিয়েছিলো। এরপর আমি যতবারই দেখেছি বা শুনেছি যে কোন লোক তার বউকে পিটিয়েছে, বা কোন ছেলে কোন মেয়েকে মেরেছে, আমার বদ্ধমূল ধারনা হয়ে যেতো, ঐ লোকটি বা ছেলেটি একটা কাপুরুষ। শুধু কাপুরুষ না, সবচেয়ে খারাপ একজন কাপুরুষ।

আমার ভেতর যা কিছু ভাল আছে, তার সিংহভাগ আমার আম্মুর অবদান। বই পড়ার প্রচন্ড ঝোকঁ থেকে শুরু করে লেখালেখি করা, ছবি আকাঁ বা চিন্তা-ভাবনা – এ সবকিছুই পেয়েছি আম্মুর জিন থেকে। ছোটবেলা থেকেই আম্মুর ভেতর পরিমিতিবোধ, শিষ্ঠতা ও বুদ্ধিদীপ্ত আচরন দেখেছিলাম। মুন্সিগঞ্জের একটি অভিজাত এবং রক্ষনশীল পরিবারের সন্তান হয়েও আম্মু বাদ রাখেননি ললিতকলার কোন শাখা প্রশাখা পদচারনা করতে। একটি ধার্মিক পরিবারের মেয়ে হয়েও শিখিয়েছিলেন কিভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনেও মুক্তমনা হওয়া যায়, নিজের বিবেকের কাছে মাথা উচুঁ করে দাড়াঁনো যায়। ধার্মিক হওয়া আর ধর্মান্ধ হওয়া যে এক জিনিস নয়, খুব ছোটবেলাতেই এই শিক্ষা তারঁ কাছ থেকে পেয়েছিলাম। আমার ধারনা, আমি যে শিক্ষাগুলো আম্মুর কাছ থেকে পেয়েছি, সেগুলো যদি আমার ছেলে-পেলেদের দিয়ে যেতে পারি, তাহলে সেটাই ওদের চলার পথের পাথেয় হিসাবে যথেষ্ঠ হবার কথা।

মাকে নিয়ে আমার আরেকটা স্মৃতি…মাঝ রাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কোন তুলনা নেই।

চারিদিকে কেমন যেন একটা আদুরে আদুরে শীত শীত ভাব! ছোটবেলায় এই সময়ে কাথাঁ মুড়ি দিয়ে আম্মুর গায়ের সাথে লেপ্টে শুয়ে গল্প শুনতাম। হঠাৎ লোডশেডিং এ ঘরের বাতি নিভে যেতো। আম্মু উঠে গিয়ে হারিকেন ধরাতেন। হারিকেলের সলতে থেকে কেরোসিন পোড়া গন্ধ বাইরে থেকে জানালা শিক গলে ভেসে আসা ভেজা মাটির সোদাঁ গন্ধের সাথে মিশে যেতো। আমাদের বংশাল ভিলার টিনের চালে তখন বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে আর সেই গন্ধ শুকতেঁ শুকঁতে কখন ঘুমিয়ে যেতাম!

এখনো মাঝরাতে বৃষ্টি হলে ছোটবেলাকে মনে পড়ে ভীষণ…এখন যেমন পড়ছে… (মে ৯)

আজ রাতে বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। একটু পর পর চারিদিক কাঁপিয়ে সারা আকাশ আলো করে বাজ পড়ছে। দেশে থাকলে এই সময়টাতে নির্ঘাত বিদুৎ চলে যেত।
খুব ছোটবেলায় এইরকম পরিবেশে মোমবাতি জ্বালিয়ে আম্মুর গা জড়িয়ে কাঁথার নীচে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতাম। আম্মু তখন আমাকে “ঠাকুরমার ঝুলি” থেকে ভূতের গল্প পড়ে শুনাতো। আমি প্রচন্ড ভয় পেতাম। সেটা দেখে আম্মু বলতেন- “এখন ঘুমাও। আর গল্প শুনতে হবে না।” আমি বলতাম – “তুমি গল্প শেষ করো মামনি।” – আম্মু বলতেন – তুমি তো ভয় পাচ্ছ!
-হু। তবু তুমি পুরোটা বলো।”
শেষ পর্যন্ত আমি পুরো গল্পটা শুনেই ঘুমুতে যেতাম।

…গায়ে চাদর জড়িয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে খানিকটা আগে কিছুক্ষনের জন্য অনেক আনমোনা হয়ে গিয়েছিলাম….মনে হচ্ছে আজকের রাত আম্মুর গলা জড়িয়ে ধরে সেই ভূতের গল্প শোনার রাত…

ভাবছি আম্মুকে ফোন করে বলবো এ কথা। আম্মু কি বলবেন জানি। আম্মু হেসে বলবেন, “তুই তো এখন বড় হয়ে গেছিস!”
আমি তো অনেক বড় হয়ে গেছি তাই না মা? এখন তো আর তোমার গলা জড়িয়ে ধরে ভূতের গল্প শুনা যাবে না।
ছোটবেলায় ভাবতাম – কবে যে বড় হবো? আর এখন ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে -মানুষ কেন এত বড় হয়? কি দরকার ছিলো এত বড় হবার? (১/৮/২০০৯)

মাকে নিয়ে লিখতে আমার কোন দিবস টিবসের দরকার হয় না, কিন্তু আমি একটা ছুতোঁ খুজেঁ পেলে সেটাকে হাতছাড়া করতেও ইচ্ছে হয় না।

মা দিবসে পৃথিবীর সকল অতীত, বর্তমান আর ভবিষৎত মায়েদের অভিনন্দন।

৯ thoughts on “আমার অবুঝ মেয়ে….

  1. চমৎকার করে লিখেছেন। আমারও বই
    চমৎকার করে লিখেছেন। আমারও বই পড়ার হাতেখড়ি আমার মায়ের বই পড়ার অভ্যাস দেখে দেখে। প্রথম ধরেছিলাম সেবা প্রকাশনী, এরপর আস্তে আস্তে অন্য সব বই। আপনার বুড়ি মেয়ের জন্য আন্তরিক শ্রদ্ধা।

    1. ডাঃ আতিক, আপনাকে এবং প্রলয়
      ডাঃ আতিক, আপনাকে এবং প্রলয় হাসান কে ঈর্ষা হচ্ছে … আমার ছেলেবেলায় এমন সৌভাগ্য হয়নি । মনে পড়ে স্কুলে থাকতে একটা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা সিরিজের বই পড়ার জন্য বন্ধুর বাসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতে হতো। কারণ বন্ধু, আমার দুর্বলতার বিষয়টা জানতো । আর বই পেলে যে আমাকে ও পাবেনা এটাও বুঝত ।

  2. মা – ছেলের অপূর্ব জীবন কাহিনী
    মা – ছেলের অপূর্ব জীবন কাহিনী ! সত্যি মুগ্ধ হয়ে পরলাম । পৃথিবীর সব মা -ই চমৎকার । আপনার মা কে আমার হাজার সালাম । এমন মা বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে থাকুক আর সেই মা তার আদরের ধন কে গল্প, কবিতা, গান শুনিয়ে জীবনের যথার্থ মানে মর্মে গেথে দিক । এই দেশটা সত্যিকারের সোনার ছেলে – মেয়েদের দেশ এ পরিণত হোক ।

    একটা বিষয় ভালো লাগলো না । ” কাপুরুষ ” এই শব্দটা চরম পিতৃতান্ত্রিক এবং একমাত্র পুরুষ শ্রেষ্ঠ না হয়ে পারেনা এই বোধ কে জাগিয়ে তোলে । পুরুষ মানুষের সাহস না থাকলে তিনি অভিহিত হন কাপুরুষ। সংস্কৃত ভাষায় কাপুরুষ শব্দের অর্থ ঈষৎ পুরুষ বা খানিকটা পুরুষ।

    1. আপনার মাকেও হাজার সালাম ভাই।
      আপনার মাকেও হাজার সালাম ভাই। আর কাপুরুষের কথাটা খুব সম্ভবত আম্মু আমার ছোটবেলায় অহমে নাড়া দিয়ে কাজ আদায় করে নিতে চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলাম কাপুরুষ বল্লে আমি হয়তো পরেরবার মেয়েটার গায়ে হাত তোলা থেকে বিরত থাকবো। মনে রাখতে হবে, আমি তখন বাচ্চা ছিলাম। আমার জন্য এই শব্দটাই হয়তো তখন সহজ ছিলো। 🙂

    1. আমাদের জেনারেশন থেকেই খুব
      আমাদের জেনারেশন থেকেই খুব সম্ভবত মা কে আম্মু বলার চল ঢালাওভাবে শুরু হয়। আসলে ছোটবেলা থেকে মামনি মাম বা আম্মু যে নামেই ডাকি না কেন মা এর চেয়ে মধুর ডাক আর নাই। ধন্যবাদ নন্দিনী। 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *