তুমি শুনতে কি পাও আমার চিৎকার!?

১. বছর কয়েক হল নারী দিবস দেশে বেশ ঘটা করে পালন করা হয়। শহুরে বুটিকগুলোতে, সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়, কর্পোরেট অফিসগুলোতে বেশ ঢাক ঢোল পেটানো হয়। পার্পল শাড়ি, সালোয়ার কামিজে সেজেগুজে অফিস যায় কর্মজীবী মেয়েরা। পুরুষ সহকর্মীরা এদিনটিতে তাদের হাতে গুঁজে দেয় শুভেচ্ছা স্মারক ফুল। কেক কাটা হয়, গল্পগুজব হয়, ফেসবুক জুড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, ছবি আপলোড করা হয়। টিভি চ্যানেলগুলো আরোও একধাপ এগিয়ে- কে কার চেয়ে ইউনিক আইডিয়া নিয়ে নারী দিবসের রিপোর্ট করতে পারে, ভিন্নতর বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে সবাই যেন সেই প্রতিযোগিতায় নামে।

পূজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পন্য আর প্রচারই মুখ্য, কারন, দিন, পাত্র-পাত্রী কেবলই বিধেয়!
৩৬৫ দিনের মাঝে পুরো একটি দিন নারীকে উৎসর্গ করা হচ্ছে- একবিংশ শতাব্দিতে এর চাইতে বেশি নারীর আর কি চাওয়াই বা থাকতে পারে?

অথচ পত্রিকায় প্রতিদিন ধর্ষনের কথা পড়ি, পারিবারিক সহিংসতার কথা পড়ি, রাস্তায় লাঞ্চিত হয় নারী, অফিসের পুরুষ সহকর্মীদের টিপ্পনীর শিকার হয় নারী, বিশ্ববিদ্যালয় পেরোতেই বাড়িতে বিয়ের চাপ দেওয়া হয় মেয়েকে, মেয়েদের ক্যারিয়ারের অবস্থান সবসময়ই স্বামী-সংসার আর সন্তানের প্রাধান্যের পর।

২. আমার নানীর পৃথিবী ছিল ছোট্ট একটা গ্রামের কয়েক ঘর আত্মীয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ। সারাদিনের সংসারের খাটুনি, বিকেলে বাড়ির মেয়েদের সাথে উঠোনের কোণে বসে চুলে তেল দেওয়া, চুল বাঁধা আর রুমালে ভুলোনা আমায় সুঁইয়ের ফোঁড়- এই ছিল তার জগৎ-সংসার। তার পরের প্রজন্ম আমার মা শহরে এসেছেন, পড়াশোনা করেছেন, সংসার পেতেছেন। তার সঙ্গী-সাথীরা ও স্বভাবতই শিক্ষিত। কিন্তু দিন শেষে মায়ের শখ বা অবসরের প্রিয় কাজ ছিল সেই রান্নাবান্না বা সুঁইয়ের ফোঁড়। শহুরে উকিলের স্ত্রী হিসাবে মা তার নারী বন্ধুদের সাথে চাইনিজ বা মোঘলাই খাবার রান্নার ক্লাস করেছেন, নানীর আমলের রুমাল বা কাঁথার বদলে মা সেলাই করেছেন ওয়াল ম্যাট, টেবিল কভার। নিজের শিক্ষাদীক্ষার প্রকাশ করেছেন কখনও চাকুরী করে, তো কখনো সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ খবর করে। কিন্তু দিন শেষে মায়ের প্রধাণ আর প্রথম কর্তব্য ছিল স্বামী-সন্তান-সংসার। এগুলো সামলে তবেই তাকে সামান্য যে ক্যারিয়ারের চিন্তা তা করতে হয়েছে। দুই ঈদে ঠিকই বাবার সাথে ছুটেছেন তার শ্বশুর বাড়িতে – বিয়ের পর ওই ঠিকানাই নারীর আসল ঠিকানা যে!

সব সময় শুনে আসছি, আমরা এ সময়ের মেয়েরা অনেক ভাগ্যবতী! পড়াশুনা করছি, চাকরি করছি, নিজের উপার্জন নিজে খরচ করছি, প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত হয়েছি, ফেসবুকে, ইন্টারনেটে মেয়েদের গ্রুপ, পেজ, নারী পোর্টাল খুলছি- তারপর স্বাধীনতার নামে যাচ্ছেতাই বকে যাচ্ছি!! আমরা নাকি স্বাধীনতার নামে নাস্তিকতা আর পরকীয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, উৎসাহিত করছি বাকি সবাইকে!
যদি পুরুষ তুমি তাই মনে কর, যদি পুরুষতন্ত্র তুমি চোখ রাঙাও, তবে তাই হোক! পুরুষ নাস্তিক হতে পারলে নারী নয় কেন? পুরুষ পরকীয়ায় আসক্ত হতে পারলে নারী নয় কেন? নাস্তিকতা অপরাধ হলে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমান বিচার হওয়া চাই, কেবল নারীর প্রতি তুমি বিরক্ত কেন? পরকীয়া করে মদ্যপ রাজ্জাক-আলমগীর-জসীমেরা বাড়ি ফিরবে বীরদর্পে আর শাবানা-ববিতা হয়ে নারীকেই কেবল চোখের জল ফেলে যেতে হবে আজীবন?

৩. হ্যা আমি তোমাকে বলছি পুরুষ, তোমাকে বলছি সমাজ-
আমি বিশে বিয়ে করব নাকি বিয়াল্লিশে , নাকি আদৌ বিয়ে করব না- তা আমি ঠিক করব, পুরুষতন্ত্র নয়। আমি ক্যারিয়ারের কথা ভেবে পয়ত্রিশে সন্তান নেব নাকি আদৌ নেব না, তা আমি ঠিক করব। আমি হিজাব পরব নাকি ওয়েস্টার্ন পোশাক পরব তা আমি ঠিক করব। আমি নয়টা-পাঁচটা অফিস করব নাকি আর সব পুরুষ সহকর্মীর মত কাজ শেষে রাত করে বাড়ি ফিরব তা কেবল আমি ঠিক করব।

আমি একা একা বাড়িতে থাকব, নাকি সম্ভ্রম বাঁচাতে কোন আত্মীয়ের আঁড়ালে লুকাবো- তা আমি ঠিক করব। আমার মস্তিষ্ক-শরীর-জরায়ু-যোনীর উপর কেবল আমার একারই অধিকার। আমি আমার বাবার-ভাইয়ের কিংবা স্বামীর সম্পত্তি নই, আমি আমার সম্পদ।
আমি রাস্তায় চলব, পাবলিক বাসে চড়ব, কিন্তু পথে ঘাটে, বাসের ভীড়ে কোন লোভাতুর চাহনি, নোংরা স্পর্শ মেনে নেব না- তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে পারো না আমি কেন বাড়ির বাইরে বের হব? কেন ভীড় বাসে উঠব?
আমি বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাব, বেড়াতে বের হব, হৈচৈ করব, কিন্তু আমি সহিংসতা মেনে নেব না- তুমি প্রশ্ন করতে পারো না আমি কেন বন্ধুদের সাথে পাহাড় দেখতে গেছে, বনে-বাদাড়ে হেঁটেছি, সমুদ্রে গা ভিজিয়েছি।

আমি আমার পছন্দের পোশাক পরব, তাতে তোমার উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তুমি দায়ী হবে, আমি নই। ধর্ষণের জন্য নারীর সম্ভ্রম যাবে না;পুরুষতন্ত্র, তোমার দিকে আমি আঙুল তুলব বারবার! চোখে চোখ রেখে, চিৎকারে, শ্লোগানে, কলমের আঁচড়ে শাণিত দৃঢ়তায় বারবার আমার প্রাপ্য অধিকার আমি তোমার কাছ থেকে আদায় করেই নেব আমি। হয়ত রক্ত-মাংসের এই আমি নই, কিন্তু এই নারী-আমি একদিন ঠিকই তোমার কাছে নিজেকে মেয়ে মানুষ নয়, মানুষ হিসাবে প্রমাণ করব।

১ thought on “তুমি শুনতে কি পাও আমার চিৎকার!?

  1. পড়লাম। বেশ যৌক্তিক!
    পড়লাম। বেশ যৌক্তিক!
    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *