স্বাধীনতা ভ্রম

যে যেভাবেই দেখুক- ভূখন্ডের মালিকানা পরিবর্তনকেই আমরা স্বাধীনতা হিসেবে ধ’রে নিই। মালিকে- মালিকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে, চেতনার দ্বন্দ্বেও আমরা অংশগ্রহণ করি সোৎসাহেই। রাজা যায় রাজা আসে; পুরাতন ভৃত্যের প্রচ্ছন্ন ছায়ায় নতুন ভৃত্যবেষ্টিত প্রভূ’র আগমনীতে আমরা উল্লাসে মাতি। স্বাধীনতা মানে ঐ ক্ষণিকের উল্লাসটুকুই, স্মৃতি হাতড়ে যে বিশেষ মুহূর্তটুকু আমরা খুঁজে ফিরি; পাই। এরপর শুরু হয় পরাধীনতার অন্য উপাখ্যান, পর্বে পর্বে বিভক্ত পরাধীনতা।

ভারতবর্ষের সাতচল্লিশ অব্দের স্বাধীনতার ইতিহাসও তা-ই বলে। বৃটিশ-রাজ এর কারসাজিতেই হোক আর ধর্মীয় উন্মাদনায়-ই হোক ভারতবর্ষ ‘বিভক্ত’ হয়ে স্বাধীন হল। সমগ্র ভারতবর্ষ দুইভাগে এবং পরবর্তিতে তিনভাগে ভাগ হয়ে তিনটি আলাদা-আলাদা পোকায়-কাটা স্বাধীন সার্বভৌম পুঁজময় রাষ্ট্রে পরিণত হল। লোকের কথায়- অবশেষে ভারতবর্ষ দুইশ বছরের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেল। আসলে কি তাই? তবে যদি মুক্তি-ই পেল সেই মুক্তি ভারতবর্ষকে দুইভাগ করার জন্য কিছুটা হলেও দায়ী নয়কি? এই মুক্তিকে কি ভারতবর্ষের মুক্তি বলব নাকি ভারতবর্ষে গোঁজামিল করে থাকা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মুক্তি বলা উচিত? নাকি মহাকাব্যিক ভারতে অনাহূত বখতিয়ার খিলজির শোষণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ‘আনীত ইসলামের’ মুক্তি বলা উচিত? যেভাবেই বলি না কেনঃ স্বাধীনতা সুখ ‘জেনাবাই’ এর ‘জীবনে প্রথমবারের মতো’ করাচী বিমানবন্দরে পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে নামার মুহুর্তটুকু পর্যন্তই কিংবা ‘পাকিস্তান’ নামের দ্রষ্টা লিয়াকত আলীর পাকিস্তান সৃষ্টি করতে পারার উন্মাদনা পর্যন্তই; অথবা যদি এভাবে বলি- সমগ্র ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক উস্তাদ/গুরু ‘গান্ধি’র পাকিস্তান সৃষ্টি ঠেকাতে না পারার অনুযোগটুকুই হল স্বাধীনতা এবং আমরা স্বাধীন।

কি বিশেষ উপকার করল এই স্বাধীনতা আমাদের?

বৃটিশ রাজ দুইহাত উজাড় করে যা নেওয়ার নিলেন আর তার ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্টাংশটুকু ভাগাভাগিতে নেমে পড়লেন ‘অহমিকা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া’ এককালের অখন্ড ভারতে বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী এবং পরিশেষে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা ও পাকিস্তানের জাতির পিতা আমাদের ‘জেনাবাই’ এবং তার সাথে যোগ দিলেন বাপের জোলা ধ’রে বেয়ে উঠা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী জহরলাল নেহেরু। আমরা স্বাধীন হলাম এবং পরজাতির অধীনতা মুক্ত হয়ে স্বজাতির ‘মহান দাসত্বের’ অংশীদারিত্ত্ব স্বীকার করলাম! অতঃপর ভারতবর্ষ একটি বৃটিশ-রাজ, আদতে ‘ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র বিপরীতে প্রথমে দুটি (কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ) ও তার অব্যবহিত পরে অজস্র ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্ম দিল এবং অদ্যাবদি দিয়ে চলল। অতএব একথা কি নিঃসন্দেহে বলা যায় না- স্বাধীনতা ঐ মালিকানা পরিবর্তন পর্যন্তই এবং শ্রেণিবিশেষের অর্থাৎ ভৃত্যের উত্থান-পতনেই সীমাবদ্ধ?

এবার বাঙলাদেশের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। বাঙলাদেশ ভূখন্ডটা স্বাধীন বলেই প্রচার কারণ এখানে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নাই, ডাচ-ওলন্দাজ নাই এমনকি লক্ষণ সেনও নাই। পোকায়-কাটা পাকিস্তান তার ‘অপবাদ’ ঘোচানোর জন্য চব্বিশ বছর সময় নিল এতেই বরং বিস্ময়। আমরা স্বাধীন হলাম মতান্তরে ইন্ডিয়া’র দুষ্কৃতিকারীতা/ হঠকারিতার কারনে পাকিস্তান তার অখন্ডতা টিকিয়ে রাখতে পারল না। মূলত ষোল-ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার ক্ষণটকুই ছিল আমাদের স্বাধীনতা বা স্বাধীনতা বলতে আমরা যা বুঝেছিলাম তা। একটু অন্যভাবে বললে নয় মাসের পাক এবং পাকি-বীর্য-পাকদের বিভীষিকার পরিসমাপ্তির মূহুর্তটুকুতেই কেবলমাত্র আমরা নিজেদের স্বাধীন বলে ভাবতে পেরেছিলাম।

কিন্তু এই ভাবাভাবিতে বিশেষ কি লাভ হল?

পাকিদের শোষনের বদৌলতে আওয়ামীলীগ এল এবং একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমরা আগের তেতো স্বাদই পেতে শুরু করলাম। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল যুদ্ধটা শুধু আর্মিরাই করল যার নজির হিসেবে আমরা বীরশ্রেষ্ঠদের দেখতে পাই। সম্মুখ যুদ্ধের সেনানীরা শুধুমাত্র মরেছিল; ওরা যুদ্ধ করেনি। ইন্দিরা গান্ধী পরিহাস করে আমাদের ‘জাতির পিতা’ উপহার দিলেন এবং আমরা সেটাকে আমাদের অদৃষ্ট ভেবে বসলাম; নিঃসঙ্গ শেরপা হয়ে তাজউদ্দীন জেলেই পচে মরল। বাঙলাদেশ অধিগ্রহণ করল সিরাজুল আলম গং এবং শেখ মনি’রা। সিরাজ শিকদার মানতে পারলেন না এবং আমরা এখনো মানতে পারি না। !

তবুও আমরা স্বাধীন এবং ভূ-খন্ডের মালিকানার অজস্র দাবিদারদের (ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আদলে প্রতিষ্ঠিত) মাঝে এখনো আমরা বেঁচে থাকতে পারছি বলেই আমরা স্বাধীন! মরে যাওয়ার আগ-মূহুর্ত পর্যন্ত পরাধীনতার ঘেরাটোপে আমরা স্বাধীন! ভৃত্য সেজে ভৃত্যবেষ্টিত প্রভূর গীত গাইতে পারি না অথবা গাইতে বাধ্য নই বলেই আমরা স্বাধীন! ক্ষণিকের জয়ে উল্লাসে ফেটে পড়তে পারি বলেই আমরা স্বাধীন! পর্বে পর্বে খন্ডিত বিবস্ত্র পরাধীনতার উপাখ্যান রচনা করতে পারি বলেই আমরা স্বাধীন যদিও শেষের অংশটুকুর নিশ্চয়তা ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *