প্রদোষে প্রাকৃতজন -অভাজনের ভজনা

প্রদোষে প্রাকৃতজন সেই প্রাকৃতজন দের কথা বলা হয়েছে যাদের সংগ্রাম আর প্রতিবাদ প্রতিরোধ ইতিহাসে লিখা নেই । ইতিহাসয়ে শুধু সফল এবং জয়ীদের মনে রাখে তাদের গৌরবগাঁথাই ফিরে ফিরে আসে। আজ থেকে ৮০০ /১০০০ বছর আগের বিলাসিতা আর ভোগ বিলাসে মত্ত মহারাজ লক্ষনসেন এর সময়ের সমাজব্যবস্থায় এক দিকে রাজার সামন্তদের শোষন এর যাঁতাকলে যখন নিম্নবর্ণ অনেক হিন্দুরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছে এবং সামন্তরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উচ্ছেদ করে ফেলতে চাইছে অপর দিকে কিছু মানুষ ( বৌদ্ধ ভিক্ষু রাই প্রধানত থাকলেও কিছু মানুষ বললাম এজন্য যে মুক্তিকামী মানুষ কোন ধর্মের হয় না, আর তাদের সাথে হিন্দু ধর্মের মানুষ ছিল, পরে জানাবো) এক শোষনহীন সমাজ নির্মাণ এর লক্ষ্যে বিদ্রোহ করছে। এসময় আবার তুর্কী যবন(মুসলিম) সেনাদের একের পর এক রাজ্য বিজয়।উপন্যাস এর শেষ দিকে আমরা দেখতে পাই সে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যবন দের সহায়তা নিয়ে শোষকদের উচ্ছেদ করবে কিনা সে দ্বন্দে লিপ্ত।

প্লট : শ্যামাঙ্গ নামে এক মৃৎ শিল্পীকে লেখক সেই প্রদোষকাল এক ঘরছাড়া, উদ্বাস্তু হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন যে তার শিল্পের মধ্যে বেচে থাকতে চেয়েছিল। প্রথমেই দেখতে পাই শ্যামাঙ্গ গুরু আশ্রম থেকে নিজস্ব শিল্প সত্তার প্রকাশ এর কারনে, খদ্দের এর ইচ্ছামত মৃৎ পুত্তলিকা না তৈরি করায় বিতাড়িত হয়ে এক রদ্র ক্ষরতাপ দিনে এক গৃ্হস্থ বাড়িতে আশ্রিত হয়। সেই গৃহস্থের কন্য মায়াবতী যার স্বামী বনিক বসন্তদাস এবং মায়াবতীরর সখী লীলাবতী সে স্বামী পরিত্যাজ্যা। মায়াবতী যাত্রার সময় বলে তার সখীর স্বামীর খোজ নিতে। কিন্তু তার আর খোজ পাওয়া যায় না। অনাথা লীলাবতীকে দেখার কেউ নেই এই সংসার এ। আবার তাকে ভোগ করার বা অন্যায় উপদ্রব করা সামন্ত, মহা সামন্ত,রাজপুরুষ দের যেন নিত্য এবং সমাজস্বীকৃত কাজ। এমতাবস্থায় শ্যামাঙ্গর শিল্পী হৃদয়ে লীলাবতীর জন্য দায়িত্ব বোধ তৈরি হয় যা পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ভালো বাসায় গড়ায়। কিন্তু এই হিন্দু সমাজ তো তাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না আবার এদিকে সামন্তরা এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লীলাবতী দের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘরছাড়া দুজন মানব মানবীর আর ঘরে ফেরা হয় না জীবন থেকে তারা পালিয়ে বাচতে চায় যেখানেই যায় সেখানেই তারা উদ্বাস্তু সেখানেই শোষন ও হামলার স্বীকার। শেষ অংশে তারা এক যবন কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়,সেখানে লীলাবতী সন্তান সম্ভবা হয়।এমতাবস্থায় লীলাবতী বলে,”শ্যামাঙ্গ! চলো, আমরা যবন ধর্ম গ্রহণ করি!’ লীলাবতী আরো জানায়, ‘আমি ওদের মন্ত্রটা শিখেছি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদার রসুলুল্লাহ! বলো ত’ ওদের মন্ত্রে ল অক্ষরটা এত বেশি কেন?’ বলে পুনরায় হাসিতে আর কৌতুকে লুটিয়ে পড়ে লীলাবতী। সে নতুন জীবনের আস্বাদ চাইছে।

শ্যামাঙ্গ হাহাকার করে। লীলাবতীকে বোঝাতে চায় যে পিতৃ পুরুষের ধর্মে যতই অন্যায় আর ভুল থাকুক সেই ধর্মই যে মৃত্তিকার ধর্ম।

‘এই ধর্ম আমাদের মৃত্তিকার ধর্ম লীলাবতী! এই ধর্ম পরিত্যাগ করলে আমরা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্যুত হব!’ কিন্তু লীলা এত বড় কথা বোঝে না, এত তত্ত্ব বোঝে না। সারাজীবন অন্যায়, অবহেলার পাত্রী হয়ে বেচে ছিল সে, যেখানে তার মুক্তি, যেখানে তার মাতৃত্বের মর্যাদা, যেখানে তার সংসার সুখ সেটাই তার কাছে ধর্ম।শ্যামাঙ্গ মেনে নিতে পারে না। উপন্যাস এর শেষ অংশে শ্যামাঙ্গর মৃত্য হয়। শওকত আলী নিজেই বলেছেন ” তার মতো মৃৎ শিল্পীর বেচে থাকার অধিকার দেয় নি ঐ সময়ের সমাজ ইতিহাস “। দেহের মৃত্যু হয়েছিল ঠিকি কিন্তু সৌমপুর বিহার বা অন্যান্য বিহার গুলো তে যে অপূর্ব শিল্প কলার নিদর্শন পাই তা অই শিল্পীদের জীবন, সংগ্রাম, ভালোবাসা র যেন প্রতিকৃতি। যেন শিল্পীরাই জীবিত হয়ে উঠেছেন তার মধ্য দিয়ে।

অপর দিকে বসন্তদাস মায়াবতীর স্বামী সে একজন বনিক সেও ঘড়ছাড়া তার ঘর শুধু স্ত্রী, শ্বশুর শাশুড়ি বা মা বাবা নিয়ে নয় তার ঘর সব মানুষ কে নিয়ে তাই সে ঘরে থাকতে পারে না বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে যোগদান করে নতুন সমাজ নির্মানের আশায়। বনিক বৃত্তি করতে গিয়ে তার নানা অভিজ্ঞাতার মধ্যে দিয়ে তার উপলব্ধি হয়।

” বসন্তদাসের হাসি পায়,মানুষ বড়ই সহজ সরল। পথে দস্যু যা হস্তগত করে সে আর কতটুকু!পক্ষান্তরে যুগ যুগ ধরে নিজ গৃহেই অপহৃত হয়ে চলছে তারা।গ্রামপতি নেয়,রাজপুরুষেরা নেয়,কায়স্থরা নেয়
-কে তাদের শ্রমলব্ধ উপার্জনের অংশ নেয় না? আশ্চর্যের বিষয়,এই চিন্তাটুকু মানুষ করতে পারে না”

শওকত আলী পাঠকের কাছে বসন্তদাসের চিন্তার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন,
“ভগবান বিষ্ণুর অবস্থান কোথায়? তার মনে প্রশ্ন জাগে। যেখানে এবং যাদের মধ্যে তার অধিষ্ঠান, সেখানে কি গ্লানি আছে? নির্যাতিত মানব শিশুর রোদন ধ্বনি কি অতদূরে তার শ্রবন স্পর্শ করে? কে জানে, বসন্ত দাস এর অন্তত জানা নেই। ভগবান বিষ্ণু,মতস্য,কূর্ম্য,বরাহ,বামন,নৃসিংহ ইত্যাদি সকল রূপেই মর্তে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু চন্ডালের, কি ব্রাত্য শূদ্রের গৃহে কখনও কি তার জন্ম হয়েছে? কেন হয় নি বলা কঠিন। তবে হলে ভালো হত। চন্ডাল ডোম হডডিরা ভাবিতে পারত যে নর সত্যই নারায়ণ। এই চিন্তা করে স্বস্থ ও সাহসী হতে পারতো যে তারাও একই ভগবান আশ্রিত।”

বসন্তদাসের নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু মিত্রানন্দের সাথে সখ্যতা তৈরি হয়। মিত্রানন্দ তাকে বলে,”প্রশ্নটা হলো মানবমুক্তির, মানব মুক্তির পথে যা অন্তরায় তাই অধর্ম তাই পরিত্যাজ্য -আমাদের এই দৃষ্টি তে সমগ্রে বিষয়টি বিচার করে দেখতে হবে”

হঠাত খবর আসে রাজা লক্ষন সেন লক্ষণাবতী থেকে পলায়ন করেছেন এবং যবন দের আক্রমণ অনিবার্য। আবার যবানরাও নির্বিচারে মানুষ মারছে। পুণ্ড্র নগরের মহা বিহারে বসন্তদাস,মিত্রানন্দ এবং সব ভিক্ষুরা জড় হয় এখন কার্য কি হবে, তূর্কী যবন দের সহযোগীতায় শাসক গোষ্ঠী দের উতখাত করবে নাকি অন্য কিছু কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত হয় না।

বাকিটা আমরা ইতিহাস থেকে জানি ইখতিয়ারউদ্দিন বিন বখতিয়ার খলজি লক্ষানাবতী দখল করে অনায়েসে, কেউ ভয়ে কেউ অনায়েসে ধর্মান্তরিত হয়,প্রচুর ভিক্ষু নিহত হয়।শুরু হয় নতুন যুগ নতুন শাসন,শাসক-শোষক গোষ্ঠী।

১ thought on “প্রদোষে প্রাকৃতজন -অভাজনের ভজনা

  1. বাহ। চমৎকার
    বাহ। চমৎকার

    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *