স্ট্যান্ড ফর রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গাদের জন্য বঙ্গীয় মুসলমানদের কান্না দেখে বোঝা যাচ্ছে তাদের মধ্যে সত্যিই মানবতা আছে। অনেক বন্ধু প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে লিখেছে Stand for Rohingya Muslims মানুষের জন্য মানুষ কাঁদছে এটা দেখতে কার না ভালো লাগে।

তবে এটা কি মানুষের জন্য মানুষের কান্না না মুসলমানের জন্য মুসলমানের কান্না?

আপনি মানুষ না মুসলমান সেটা বোঝার একটা বিশেষ উপায় আছে। একদম নির্ভুল রেজাল্ট বেরুবে এই পরীক্ষায়। এ জন্য আপনাকে কয়েকটি প্রশ্নের সৎ উত্তর দিতে হবে। আচ্ছা, বলুন তো রোহিঙ্গারা যদি মুসলিম না হয়ে হিন্দু হত এবং তারা যদি একইভাবে বৌদ্ধদের দ্বারা নির্যাতিত হত তাহলেও কি আপনার মানবতা সমভাবে জেগে উঠত? আপনি কি লিখতেন Stand for Rohingya Hindus?

Stand for Rohingya Muslims বলে আপনি তাদের ধর্মপরিচয়কে বড় করে দেখছেন। তারা মুসলিম বলেই আপনার অন্তর তাদের দুঃখে সারা দিচ্ছে। যশোর বা নাসিরনগরে যখন হিন্দুরা রামধোলাই খায় আপনার মানবতাবোধ তখন খিলখিলিয়ে হাসে। নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের মেরে কেটে দেশান্তরি হতে বাধ্য করে প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘুর জন্য চোখমোছা অসুস্থ মানবতাবোধের পরিচয়। রামুতে যখন বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন এসেছিল আপনি কি লিখেছিলেন ‘স্ট্যান্ড ফর রামু বুদ্ধিস্ট?’

বাংলাদেশে যখন নাস্তিক ব্লগাররা হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক একের পর এক খুন হচ্ছিল তখন আপনাদের অনেককেই চুপিসারে খিলখিল করতে দেখেছি। মনে মনে খুশি অথচ মুখে কূটনীতিক ভাষা প্রয়োগ করে বলেছেন হত্যা সমর্থন করি না, তবে ব্লগারদেরও কারো অনুভূতিতে আঘাত করে লেখা উচিৎ হয় নি। ইনিয়েবিনিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, ব্লগার হত্যার জন্য ব্লগারদের লেখালেখিই দায়ী!

আচ্ছা এখন যদি বলি রোহিঙ্গারা আক্রমণের শিকার হয়েছে নিজেদের দোষে। প্রতিবার আক্রান্ত হওয়ার আগে রোহিঙ্গা জিহাদিরা বার্মার কোনো না কোনো সেনাছাউনিতে আক্রমণ চালিয়ে সে দেশের সেনাসদস্যদের হত্যা করেছে। কিছু বৌদ্ধভিক্ষুও হত্যার শিকার হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়া স্বরূপ রোহিঙ্গারা আক্রান্ত হচ্ছে দেশটির ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী কর্তৃক। শুনতে খুব ভালো লাগবে এই যুক্তি?

না, আমি এই যুক্তিকেও সমর্থন করি না। কিছু জিহাদবাদী রোহিঙ্গার জন্য পুরো রোহিঙ্গাসমাজকে জাতিগতভাবে নিধন, হত্যা, ধর্ষণ, দেশান্তরে বাধ্যকরণ কোনো যুক্তিতে সমর্থনযোগ্য নয়। এটা বার্মিজ সরকারের কুৎসিত ধর্মাশ্রয়ী মানসিকতার পরিচয়। জীবন শংকায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী-শিশু-যুবক-বৃদ্ধ যে-কাউকে আশ্রয় দানের পক্ষে আমি। দুষ্কর্মা মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রবল চাপপ্রয়োগের পক্ষে। এমন কি প্রয়োজনে খুনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মাধ্যমে অস্ত্র প্রয়োগেরও পক্ষে।

তবে, Stand for Rohingya Muslims বাক্যটিতে আমার প্রবল আপত্তি রয়েছে। এটাকে বলে সাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ। এই মানবতাবাদ চরম অন্ধ হয়। এই মানবতাবাদ আপনার দূষিত মনের পরিচয়। এই মানবতাবাদের ফলে ইহুদি ইহুদিদের জন্য, খ্রিষ্টান খ্রিষ্টানের জন্য, হিন্দু হিন্দুর জন্য, মুসলিম মুসলিমের জন্য কাঁদে। কেঁদে কেঁদে নাক আর চোখের জল এক করে। কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত কেউ আক্রান্ত হলে সে নীরব থাকে; কখনো কখনো আক্রমণকারীকেই নানা খোঁড়া যুক্তি যোগাড় করে সমর্থন করে।

(২)

এবার চলুন যারা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে প্রচণ্ড আপত্তি তুলছেন তাদের ‘মানবতাবাদ’ একটু পরীক্ষা করে দেখি। রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসতে শুরু করলেই তাদের আশ্রয় দানের আগেই এই ‘মানবতাবাদীরা’ স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলাদেশের মুসলিমরা নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের সাথে ভালো ব্যবহার করে না। সুতরাং রোহিঙ্গাদের জন্যও মানবতা দেখানোর প্রয়োজন নেই। কেউ আবার ব্যাঙ্গ করে বলে, ঠিক আছে সব রোহিঙ্গাকে ডেকে এনে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে দাও। আশ্রয়প্রার্থী কারো প্রতি এমন চিকন বুদ্ধির ট্রল আর হয় না। রোহিঙ্গারা অশিক্ষিত, ডাকাত, পরবর্তীকালে জিহাদি হবে ইত্যাদি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে সীমান্ত বন্ধের পক্ষে তারা যুক্তির কসরত চালায়।

ভাইরে, যুক্তি বাদ দিয়ে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আপনি নিজে কখনো সেই মাত্রায় শরণার্থী হয়েছেন? কখনো কি এমন হয়েছে একদল লোক হত্যার জন্য অস্ত্র নিয়ে তাড়া করছে আর আপনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত টপকে প্রতিবেশী দেশে ঢুকে পড়েছেন প্রাণ বাঁচানোর আশায়? আপনার জীবনে ঘটেছে কিনা জানি না, তবে আমার জীবনে ঘটেছে। গত দুবছর ধরে আমি একজন অসহায় শরণার্থী। খুব ভালোভাবে জেনে গেছি জীবন হারানোর আতংক কাকে বলে। তাই, ধর্ম বর্ণ জাতি বয়স নির্বিশেষে সকল শরণাপন্নর প্রতি আমার সহমর্মিতা অকৃত্রিম। আশ্রয় পাওয়ার অধিকার বিপদগ্রস্ত নির্যাতিত মানুষের সব চেয়ে জরুরি মৌলিক অধিকার। কোনো যুক্তিতেই আপনি যদি সে অধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আপনার সে মানসিকতাকে স্রেফ ঘৃণা করি।

নিজেকে কল্পনায় একজন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ভাবুন তো। মনে করুন আপনি জন্ম নিয়েছেন এক রোহিঙ্গা ঘরে। জন্মভূমির সংখ্যাগুরুরা আপনাকে সে দেশের নাগরিকই মনে করে না। হঠাৎ একদিন দেখলেন সেনাবাহিনীর লোকেরা গ্রামে ঢুকে পড়েছে। আপনি কোনো জিহাদের সাথেও সংশ্লিষ্ট নন। অথচ তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। সবাই পালাচ্ছে। আপনার বোনকে ধরে নিয়ে গেছে সেনাবাহিনীর লোকেরা। সেখানে বোনের কপালে কি ঘটতে পারে ভাবুন। ভাবুন আপনি, আপনার মা, বয়স্ক বাবা, বয়োবৃদ্ধ দাদা, দাদি প্রাণভয়ে গ্রামের সব কিছু ফেলে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ সীমান্ত আবধি। নৌকায় করে পালাতে গিয়ে আপনার কোনো নিকট আত্মীয়ের ৪ বছরের শিশুটি নদীতে পড়ে মারা গেছে। তার লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। আপনি জানেন না আদৌ আপনাদের আশ্রয় মিলবে কিনা। মিললে কোথায় মিলবে তাও জানেন না। মনে করুন সীমান্তে এসে নৌকাটি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পরে গেল। নিজ বাড়িতে গতকালের গোলাগুলির শব্দ স্মৃতিতে এখনও শুনতে পাচ্ছেন। আপনার বোনের চিৎকার শুনতে পাচ্ছেন। এ অবস্থায় ফিরে গেলে ভাগ্যে কি ঘটতে পারে, ভেবে শিউরে উঠছেন বারবার। তখন যদি বাংলাদেশের এপার থেকে কেউ চিৎকার করে বলে: যতসব ছোটলোক রোহিঙ্গার দল, তোরা যেখান থেকে এসেছিস ফিরে যা বলছি। একজনকেও এ দেশে ঢুকতে দেব না। তোদের নিয়ে বোঝা বাড়াতে চাই না। তখন কেমন লাগবে আপনার?

বাংলাদেশের মুসলিমরা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে, সে জন্য কি রোহিঙ্গারা দায়ী? একটি অন্যায়ের প্রতিবাদে আরেকটি অন্যায়কে সমর্থন করা যায় না।

“তুমি অধম–তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন?”

কেউ কেউ ছড়াচ্ছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে তারা নাকি আরাকান আর চট্টগ্রাম মিলিয়ে একটা স্বাধীনরাষ্ট্র বানিয়ে ফেলবে। চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে ছিনিয়ে নেবে। এ সমস্ত কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই। চরম দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা একটা হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী, অশিক্ষিত, গায়ে ভালো জামা নেই, পরনে ছেঁড়া শাড়ি, ছেঁড়া লুঙ্গি, মুখগুলো আতঙ্কিত, শুষ্ক, অভুক্ত; যারা বেঁচে থাকার জন্য পায়ের তলায় এক টুকরো মাটি পাচ্ছে না, তারা চট্টগ্রাম দখল করে নেবে বলে যারা অনুমান করছেন তাদের দূরদর্শিতা আমাকে মুগ্ধ করে। এরাই যদি হয় মানবতাবাদের সংজ্ঞা-নির্ধারক, তাহলে পৃথিবীর জন্য কিছুটা আতংকবোধ করি ।

সমস্ত নির্যাতিত বিপদগ্রস্ত সংখ্যালঘুর পক্ষে আমি। সে হোক হিন্দু, সে হোক মুসলিম। বৌদ্ধ, ইহুদি, নাস্তিক, বা যে কোনো সম্প্রদায়ের। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানের পক্ষে উগ্র সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করি। তবে ‘স্ট্যান্ড ফর রোহিঙ্গা মুসলিম’ হিসেবে নয়, হৃদয়ের ঐকান্তিক চাওয়া Stand for Rohingya Victims.

৬ thoughts on “স্ট্যান্ড ফর রোহিঙ্গা

  1. অসাধারণ লিখেছেন। রোহিঙ্গাদের
    অসাধারণ লিখেছেন। রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুসলিম না হয়ে নিপীড়িত মানুষ হিসাবে হলে অন্তত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে এত দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে হত না আমাদের।

  2. বাহ সুন্দর
    বাহ সুন্দর
    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *