বেড়ায় গুতায়!

সেদিন ফেসবুকে এক ভদ্রমহিলার শেয়ার করা একটা ছোট্ট ঘটনা পড়ছিলাম। ভদ্রমহিলার বাসায় কাজ করে মধ্য বিশের এক মেয়ে, প্রচলিত শব্দে যাকে বলে বাসার বুয়া। প্রথম স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর মেয়েটি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। এই বর্তমান স্বামীটি বেকার, ভবঘুরে আবার নেশাও করে।এক সকালে মেয়েটি ওই ভদ্রমহিলার বাড়িতে কাজে এসেছে কালশিটে পড়া চেহারা নিয়ে- সহজে অনুমেয় গতরাতে মাতাল স্বামী আবারো মেরেছে। ভদ্রমহিলা কিছুটা বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে প্রশ্ন করল, এই যে রোজ রোজ মার খাও ওই লোকটার হাতে, তোমার রোজগারের সব টাকা-পয়সা নিয়ে যায় সে, সংসারে যার বিন্দুমাত্র কোন অংশগ্রহণ নেই, কেন তাহলে আবারো বিয়ে করা?
একটু হেসে মেয়েটা বলে- কী করব আপা, বিয়া না কইরা একদিন ও থাকন যায় না, রাইতে বস্তির ঘরের বেড়ায় গুতায়!
কে গুতায়? সহজেই অনুমেয়- সমাজ গুতায়, দুপেয়ে কিছু সামাজিক জীবেরা গুতায়।

আমার পরিচিত এক মেয়ে, দারুণ মেধাবী, ঝকঝকে রেজাল্ট, পড়াচ্ছে দেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। ত্রিশের কোঠায় পা দিয়েছে, তবে বিয়ে-থা করেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার উপস্থিতি জানিয়ে দেয় বিয়ে নিয়ে মাথাব্যথাও নাই। বেশ সাবলীল, স্বচ্ছন্দ্য আর সাজগোজ করতে পছন্দ করে সে। কোন এক অনুষ্ঠানে তোলা তার শাড়ি পরা ছবিতে পরিচিত অপরিচিত কিছু মানুষের বেশ রসালো কমেন্ট পড়ে সে যারপর নাই বিস্মত। ছবিতে শাড়ি সরে গিয়ে মেয়েটির কোমরের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। সেই সুযোগে কিছু সামাজিক দুপেয়ে প্রাণী মেয়েটির ফেসবুকের ভার্চুয়াল ওয়ালে , ছবির তলায় চটুল মন্তব্য ছুড়তে দ্বিধা করেনি একবার ও। এই দুপেয়ে জীবেরা অধিকাংশই মধ্যবয়সী শান্ত শিষ্ট লেজ গৃহপালিত প্রাণী বটে। তাদের বউ-সংসার আছে, চাকরি-বাকরি আছে, জ্ঞান-গরিমাও আছে। নেই কেবল কাণ্ডজ্ঞান আর নারীকে মানুষ বিবেচনা করার মানসিকতা।
এই শিক্ষিত-কর্মজীবী মেয়েটির ফেসবুকের ওয়ালে বা ভার্চুয়াল বেড়ায় গুতায় সমাজ, সমাজের দুপেয়ে জীবেরা। বেড়ায় গুতায় পুরুষতন্ত্র!

পুরুষতন্ত্র মানতে পারে না কোন অবিবাহিত, ডিভোর্সী, বিধবা নারী একা একা নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে, নিজের উপার্জনে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইতে পারে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে। পুরুষতন্ত্র তখন সমাজ-সংসার, শতাব্দি ধরে চলে আসা সামাজিক রীতির নামে, ধর্মের রক্তচক্ষুর নামে নারীকে চুপ করিয়ে দেয়। পায়ে শেকল হিসাবে পুরুষের অধীনস্ত দাসী বানায়। নারীর নিজের নাম
যথেষ্ট নয়, বাবার বা স্বামীর নাম লাগবেই।

সিঙ্গেল মেয়েকে বাড়ি ভাড়া দেয় না কোন বাড়িওয়ালা যদিও মেয়েটি হয়ত নিজের উপার্জনে বেশ ভালো বাড়ির ভাড়া দিতে সক্ষম। বাড়িওয়ালার প্রয়োজন গ্যারান্টি, সেই গ্যারান্টি কেবল দিতে পারে পুরুষ অভিভাবক। হয়ত মেয়েটির উপার্জনে সংসারের সিংহভাগ খরচ চলে, হয়ত মেয়েটি পৃথিবীর নামী দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরেছে, হয়ত কর্মস্থলে মেয়েটি আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ পদে, হয়ত মেয়েটির অধীনেই কাজ করে কয়েকজন পুরুষ সহকর্মী, হয়ত কাজের জন্য তাকে আজ এদেশ তো কাল ওদেশে যেতে হয়, তবু একা সিঙ্গেল একটা মেয়ে একা একা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে পারে না এদেশে। তার মাথায় এক অদৃশ্য ছাতা লাগে, এই ছাতা হতে পারে কেবল একজন পুরুষ। পুরুষের অধীনে, পুরুষের পরিচয়েই একজন নারী সম্পূর্নতা পায় এই সমাজে।

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঊনমানুষ বা মেয়েমানুষ হয়ে জন্ম নেয় নারী, বেড়ে ওঠে, বড় হয়, বুড়ো হয়। কিন্তু নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মত যোগ্যতা তার হয় না কখনও। শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, কর্মজীবী বা গৃহিনী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত- নারী সে যে শ্রণিরই হোক, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেড়ায় গুতানো এই সমাজ নারীকে শুধু নারী বানিয়ে রাখে, মানুষ হতে দেয় না।

৩ thoughts on “বেড়ায় গুতায়!

Leave a Reply to ফারজানা সুমনা Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *