উহু, একদম অবহেলা নয়

শিরোনাম দেখে চমকে উঠেছেন? হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আমি ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের কথা বলছি। ২১ আগস্ট তিনি সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এতোদিন তিনি পরিবারসহ দর্শকদের জন্য চিন্তা করেছেন। তাদের জন্য কাজ করেছেন। অথচ সেই মানুষটি অবিবেচকের মত চলে গেলেন। ঠিকানা বদল করলেন। লক্ষ্মীকুঞ্জ থেকে গেলেন সোজা বনানীতে। অথচ একবারও ভাবলেন না, এখন অন্যদের কি হবে? বড্ড বলতেন তিনি, উহু কোন কাজেই অবহেলা নয়। একদমই নয়। সিরিয়াসলি কাজটা করতে হবে। নাহলে হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া যাবেনা। বিষয়টি যে মিথ্যে নয়, নায়করাজ নিজেই তার প্রমাণ।

মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করে লাখো মানুষ চোখের জল ফেলেছেন। হা-হুতাশ করেছেন। বাদ যাননি রাজধানীর নাখালপাড়ার সেই ষাটোর্ধ গৃহবধূও। তার নাম কাজী শওকত আরা। ছোটবেলা থেকেই তিনি নায়করাজের ভক্ত। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে, পেটে ক্ষুধা নিয়ে পর্দায় দেখেছেন প্রিয় এ নায়ককে। মায়ের কাছে এ কারণে বকাঝকাও কম শোনেননি। খেয়েছেন দিনের পর দিন মার। তবুও বাদ দেননি সিনেমা দেখা। বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে দেখে গেছেন একের পর এক সব সিনেমা।

শওকত আরার স্বপ্নে ছেলেবেলার মত এখনো আসেন নায়করাজ, স্বপ্নের নায়ক হয়ে। হেসেখেলে বেড়ান। গানের তালে আঁচল উড়িয়ে দিতেও ভুল করেন না তিনি। আহ্লাদিত হয়ে খাট থেকেও পড়ে গেছেন অসংখ্যবার। কোমরে ব্যাথাও পেয়েছেন। তবুও স্বপ্ন দেখা থামাননি শওকত আরা। ভেবেছিলেন একদিন ঠিকই প্রিয় নায়ককে সামনে থেকে দেখবেন, ছুঁয়ে দেখবেন। তার সেই ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নও পূরণ হলো। শুধু সে দেহে প্রাণ থাকলো না। নিথর সে দেহ। কাফনে মোড়া। এ অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি তিনি। অঝোরে কেবল কাঁদলেন। স্তব্ধ হয়ে থাকলেন। একটি কথাও বললেন না। ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছিলেন আবার। শহীদ মিনারের চারপাশ ঘুরে ঘুরে বিড়বিড়িয়ে শুধু বলছিলেন, এটা অবিচার। আপনি যেতে পারেন না। এভাবে না। কোনমতেই না।

৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন এ কিংবদন্তি অভিনেতা। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি কাটিয়েছেন চলচ্চিত্রের পেছনে। সবমিলিয়ে পরিসংখ্যানে দেখো গেছে, বিগত ৫ দশক তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রকে নিজের কাজ দিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন। উপহার দিয়ে গেছেন অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা।

চলচ্চিত্রকে ‘আপন’ ভেবে নেয়া এ মহানায়ক ব্যক্তি জীবনে ছিলেন অত্যন্ত উদার ও স্নেহপূর্ণ মনের অধিকারী। তাঁর কাছে যখনই যিনি গিয়েছেন, তাকেই তিনি সহায়তা করেছেন। পাশে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকার নাকতলায় বাবা আকবর হোসেন ও মা নেসারুন্নেসার ঘর আলো করে পৃথিবীতে আসেন নায়করাজ রাজ্জাক। পারিবারিক নাম আবদুর রাজ্জাক। ১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে শরণার্থী হয়ে ঢাকায় আসেন। তখন অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। জীবনে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। না খেয়েও থেকেছেন। তবুও নিজের নীতি থেকে সরেননি।

সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় তিনি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। এটিই তার জীবনের প্রথম কাজ। এর মাধ্যমেই তার অভিনয় জীবন শুরু। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর ঢাকাই চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি।

কয়েকটি ছবির পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। হতে চেয়েছিলেন খেলোয়াড়—তুখোড় গোলরক্ষক। কিন্তু হয়ে গেলেন অভিনেতা। একসময় উপাধি পেলেন ‘নায়করাজ’। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যাঁদের হাত ধরে দাঁড়িয়েছে, তিনি তাঁদেরই একজন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যমত ‘সফল’ স্থপতিও বলা হয় তাকে। চলচ্চিত্রের এ সংকট কালে তার চলে যাওয়াটা সমীচিন নয়। তবুও তিনি চলে গেলেন। আমাদেরকে এতিম করে, চলচ্চিত্রাঙ্গণকে করলেন অভিভাবকশুন্য।

আপনার প্রতি এজন্য অনেক অভিযোগ-অভিমান। তবুও বলব, ভালো থাকবেন স্যার। যেখানেই থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *