অবেলার কাব্য

আজ জীবনের অবেলায় দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা বড়ই মনে পড়ে প্রিয়দা। ঘরে আমার ছেলে-বৌমা, একটা নাতনিও হয়েছে। কিন্তু মনেহয় এইতো সেদিন কলেজের অনুষ্ঠানে আমি আবৃত্তি করলাম, তুমি গান গাইলে। সেদিন বলেছিলে, আবৃত্তিটা গুরুত্ব সহকারে করতে। ঈশ্বরের কি ইচ্ছে দেখো, আজ আমি সংবাদ পাঠিকা।

প্রিয়দা,
প্রণাম নিও। আজ এতবছর বাদে লিখছি তোমাকে। হয়তো ভাবছো আজ খবর নেবার সময় হলো? তা নয়, খবর নেবার সময় ও ইচ্ছে দুটোই ছিলো। শুধুই সাদা কাগজে কলমের আঁচরটুকু দেয়া হয়নি।
সংসারের সমস্ত কাজ শেষ করে, সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করে নিজের জন্য কিছু করার মতো ধৈর্য্য থাকেনা আর। আজ প্রায় দুই যুগ ধরে বেতারে খবর পড়ছি। সারা পৃথিবীর খবর শুনাই সবাইকে, শুধু আমার খবরটুকুই তোমাকে দেবার ফুরসত পাইনা।
দেখতে দেখতে বেলাও যে পরে এলো। বয়সের হিসেবটা করে দেখেছো? এখনো যখন বেতারে আরতি মুখোপাধ্যায়ের এই গানটি চালু করি, মনেহয় আমার বুকের মধ্যে কোথায় যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে-
“তখন তোমার একুশ বছর বোধয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়,
লজ্জা জড়ানো ছন্দে কেঁপেছি
ধরা পরেছিলো ভয়।”

আজ জীবনের অবেলায় দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা বড়ই মনে পড়ে প্রিয়দা। ঘরে আমার ছেলে-বৌমা, একটা নাতনিও হয়েছে। কিন্তু মনেহয় এইতো সেদিন কলেজের অনুষ্ঠানে আমি আবৃত্তি করলাম, তুমি গান গাইলে। সেদিন বলেছিলে, আবৃত্তিটা গুরুত্ব সহকারে করতে। ঈশ্বরের কি ইচ্ছে দেখো, আজ আমি সংবাদ পাঠিকা।
জীবনের বাঁকে বাঁকে যে এত রহস্য লুকিয়ে আছে জানা ছিলোনা প্রিয়দা। কলেজ জীবনের ঐ আলোঝলমলে দিনগুলোতে কি জানতাম? জীবনের অপরাহ্নে এমন আঁধার অপেক্ষায় আছে আমাকে গ্রাস করবার জন্য। সেদিনের দুরন্তপনার ছাপগুলো যে জীবনের পরতে পরতে এভাবে আঁকা থাকবে বুঝতে পারিনি।

তোমার মনে আছে প্রিয়দা? একদিন নাটক দেখতে নিয়ে গেলে আমাকে। মঞ্চের সামনে তৃতীয় সাড়ির এক কোনায় বসিয়ে রেখে বললে আসছি। সেই যে গেলে, আর তোমার খবর নেই। রবি ঠাকুরের ‘অচলায়তন’ এর তৃতীয় দৃশ্য যখন শেষের পথে তখনি বুঝতে পারলাম এই ‘পঞ্চক’ইতো আমার প্রিয়দা। তোমার গলায় এতো গান শুনেছি কিন্তু বিশ্বাস করো, গান দিয়ে যখন প্রথম দৃশ্য শুরু করলে তখনো তোমাকে চিনতে পারিনি।
চিনতে পারিনি আরো একদিন, যেদিন আমার বিয়ে ঠিক হবার কথা শুনে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে। আশেপাশে সবাই ছিলো শুধু তুমি ছাড়া। বিয়ের আগে একপলক চোখের দেখা পেলাম না। ছোটবেলা থেকে যাকে ঈশ্বরজ্ঞানে জেনে এসেছি, বিদায়লগনে একটিবার প্রণামও করতে পারলাম না। আজ কতো বছর দেখা হয়না বলতো? জীবনটা বড়ই গোলমেলে লাগে এখন, মনেহয় শুধুই অপচয় করেছি জীবনের মহামূল্যবান সময়গুলোর, সুপ্ত ইচ্ছেগুলোর। একসময় যে মানুষটার থেকে এত স্নেহ পেয়েছি, ভালোবাসায় মোড়ানো শাসন পেয়েছি। তাকে কিছুই দিতে পারিনি। আমার হাতের পায়েস তুমি খুবই পছন্দ করতে, আমি জানি। আজো যখন পায়েস রাঁধি, তোমার ভাবনাটাই মনে আসে সবার আগে। সবাই আনন্দ করে খেয়ে তৃপ্ত হয়, শুধু আমিই খেতে পারিনা।

একটা স্মৃতি এখনো খুব শিহরিত করে প্রিয়দা। মনেআছে? তুমি আর আমি কলেজ থেকে ফেরার পথে সরদারপাড়ার ঘাটে বসে ছিলাম নৌকার জন্য। শুনেছি ব্রীজ হয়েছে এখন সেখানে। নৌকার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বৃষ্টি চলে এলো। কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুটা সামনেই বৃষ্টি হচ্ছে, উথাল পাথাল বৃষ্টি, বৃষ্টির ফোঁটাগুলে নদীর পানিতে ঝিলমিল করছে। অথচ আমরা যেখানে বসে আছি সে পাশে বৃষ্টি নেই। তুমি বলেছিলে পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে বৃষ্টি হয়না, বৃষ্টিরও একটা সীমানা রয়েছে। আমরা বৃষ্টির সীমানার বাইরে বসে ছিলাম। এ দৃশ্য যে দেখেনি তাকে বোঝানো যাবেনা। প্রকৃতির পরম সৌন্দর্যে আমার দুচোখ বেয়ে মুগ্ধতা ঝরে পড়ছিলো। সেই বৃষ্টির প্রান্তে দাঁড়িয়ে তুমি গেয়ে উঠলে-
“যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে॥”

প্রিয়দা, জীবনের সঞ্চিত মূল্যবান সব মণি-মুক্তোই পেয়েছি তোমার থেকে। জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্তগুলো তোমার সান্নিধ্যেই কেটেছে আমার। যা কিছু স্মৃতি তা আজো আমার নিঃসঙ্গ সময়ের পরম বন্ধু। বলতে পারো সেই দিনগুলোকে একরকম সোনার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছি। সারাদিন খাঁচার গায়ে হাত বুলোই, চারদিকে ঘুরে বেড়াই। শুধু দরজা খুলবার সাহস হয়না।
প্রিয়দা, একটিবার তোমার মুখটা দেখার সাধ বহুদিনের। ইচ্ছেকরে আবারো তোমাকে পায়েস রান্না করে খাওয়াই। তোমার কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে হারিয়ে যাই সেই দিনগুলোতে। তুমি কি এখনো গাও আগের মতো?
ভালো থেকো সবসময়। পত্র দিও…

ইতি,
তোমারই মধুমিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *