কাহ্নপার অশ্রু

একদিন বিকেলবেলা কাঠমান্ডুর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহরের নিকটস্থ বড় এক বনপাহাড়ের উপর পৌঁছে গিয়েছিলাম। ঊর্ধ্বজগতে অক্সিজেন কম থাকায় শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তাই একটা নাম না জানা বৃক্ষের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য বসে পড়েছিলাম। বসে বসে ভাবছি নেপালদেশের অতীত স্মৃতি। গৌতম বুদ্ধ এই দেশেই জন্মেছিলেন একদা। শুনেছি ৫৬৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।

কিছু ইতিহাস মনের ভেতর ভেসে উঠল নির্জনে। একে একে মনে পড়তে লাগল চর্যাপদের কবিদের। কাহ্ন পা, লুই পা, ভুসুকু পা, শবর পা। তাদের করুণ মুখগুলি।

হাজার বছর আগে হিন্দুদের অত্যাচারে, খুনের ভয়ে বঙ্গভূমি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন চর্যাপদের বৌদ্ধ কবিরা। নেপালে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রথম নিদর্শন চর্যাপদ নেপালের রাজগ্রন্থাগারে পাওয়ার রহস্য এখানেই।

নিজেকেও কেন যেন তখন চর্যাগীতিকার অন্যতম কবি বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার নাম তাড়ক পা। মনে মনে মুখস্থ চর্যার কিছু পদ আবৃত্তি করছিলাম।

কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।।
সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই॥

বঙ্গদেশে ফেলে আসা প্রিয়তমার মুখ মনোজগতে ভেসে উঠছিল ক্ষণেক্ষণে। তখন গাইলাম চর্যার আরেকটি লাইন।

জইনি তঁই বিণু খনহি ন জীবমি, তো মুহো চুম্বি কমলরস পীবমি।

( জান, তোকে ছাড়া ক্ষণকাল বাঁচি না, তোর মুখ চুম্বনে কমলরস পান করি।)

জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখে-শুনে যা বুঝলাম, সংখ্যালঘুরা পৃথিবীর সর্বত্র নিপীড়িত। যেখানে যার ক্ষমতা সেখানে সে অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশে যে মুসলিমরা কাবাশরিফ অবমাননার কৃত্রিম খবর ছড়িয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর, পুজার ঠাকুর সব ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে, সেই মুসলিমরাই সামান্য একটা তারকাটার এপাশে গরুর মাংস খাওয়া যে তাদের অধিকার সেটা জানিয়ে মানবিক পৃথিবীর কাছে করুণ আর্তনাদ জানায়। আবার ভারতের যে হিন্দুরা মুসলমানের ঘরের ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার সন্দেহে ত্রিশূল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সংখ্যালঘু পরিবারটির বুকে, তারাই আবার বাংলাদেশে আজান হলে পুজার বাদ্য বন্ধ রাখে মুসলিম বন্ধুদের ইবাদতে ক্ষতির আশংকায়।

এই সব যখন ভাবছিলাম হঠাৎ কোথা থেকে দুএক ফোঁটা জল আমার গায়ে এসে পড়ল। উপরে তাকিয়ে দেখলাম–ঘন মেঘে ছেয়ে আছে পুরোটা আকাশ। মাঝেমাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির কয়েকটি ফোঁটা আমার কপালের উপর পড়েছে। হাত দিয়ে মুছে ফেলার সময় মনে হচ্ছিল এই বৃষ্টির ফোঁটা বৃষ্টির ফোঁটা নয়; এ হয়ত হাজার বছর আগের কবি কাহ্নপার চোখের অশ্রুবিন্দু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *