আমেরিকায় সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা এবং আমাদের তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার

কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আ্যপলিকেশন ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে দুটো প্রশ্ন এবং তার সম্ভাব্য উত্তর আমার নজর কেড়েছে। জেন্ডার বা আর জেন্ডার ওরিয়েন্টেশনের প্রশ্নে সম্ভ্যাব্য সকল অপশনের সাথে একটা চমৎকার অপশন ছিলঃ আই ডু নট ওয়ান্ট টু ডিসক্লোজ মাই জেন্ডার অর জেন্ডার ওরিয়েন্টেশন । এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমার সবসময়ের পছন্দ- আমার জেন্ডার আর জেন্ডার ওরিয়েন্টেশন আমি অপ্রকাশ্য রাখতে চাই।

আমি সৌভাগবান যে আমি কুন্ঠাহীনভাবে এই উত্তর দিতে পারি। এমন উত্তরের জন্য কেউ আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায় না, আমি কখনো ডিসক্রিমিনেশন বা বৈষম্যের শিকার হই না। এমনকি কেউ কখনো এ রকম উত্তরের কারণও জানতে চায়নি আমার কাছে।

আজ নিজ থেকেই বলি, আমার মতে, জেন্ডার আর সেক্সচুয়ালিটি বা জেন্ডার ওরিয়েন্টেশনের বিষয়গুলো প্রতিটি মানুষের জন্য স্বতন্ত্র,আর সে কথা সবার কাছে প্রকাশ করা বা না করা ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছার বিষয়। আমি মনে করি আমি একজন মানুষ, এ আমার একমাত্র পরিচয়। অন্য কোন কিছু দিয়ে আমাকে বিচার করা যায় না, শ্রেণীবিন্যাস করা যায় না। আমি তো আম নই যে, হিমসাগর হলে সবগুলো এক ঝুড়িতে যাবে, সব ল্যাংড়া বা ফজলি যাবে আলাদা আলাদা ঝুড়িতে।

আমার আচরন বা বিশ্বাসের তথ্য প্রকাশ করা বা না করার এই অবাধ স্বাধীনতা আমি ভোগ করি কারণ যে দেশে আমি থাকি, সেই দেশটি নাম ইংল্যান্ড। বহু আগে থেকেই দেশটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে সবাইকে। ২০০৪ সাল থেকেই ইউ.কে তে সিভিল পাটর্নারশিপকে বৈধ করা হয়েছে। আর ২০১৪ সালের মার্চ মাস থেকে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধতা পেয়েছে এখানে (নদার্ন আয়ারল্যান্ড ব্যাতীত)। সমলিঙ্গের মানুষের সমান অধিকারের বিষয়ে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে ইউরোপের দেশগুলো। গত শুক্রবার ইউনাইটেড স্টেটস সুপ্রিম কোটর্ এক ঐতিহাসিক রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি রাজে্যই সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা দিয়েছে। আর এই রায়ের সমথর্নে সমকামীদের সংগঠন
এলজিবিটি ( লেসবিয়ান, গে, বাই সেক্সচুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার) এর প্রতিনিধিত্বকারী রংধনু রঙে রাঙানো হয়েছে হোয়াইট হাউজ। রংধনু রঙে রঙীন অসংখ্য ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারও। তাই বলে প্রোফাইলের মালিকেরা সকলেই যে সমকামী বা সমপ্রেমী তা কিন্তু নয়। এ সমথর্ন মানুষ হিসাবে সবার বৈষম্যহীনভাবে বাঁচার প্রতিশ্রুতিকে সমথর্ন করে। চোখে পড়া একটা নিউজ সবার সাথে শেয়ার করি। ঢাকার ধমর্রাজিক বৌদ্ধবিহার থেকে রমজানে দরিদ্র ও দুস্থ রোজাদারকে ইফতার সরবরাহ করা হয়। বহু বছর ধরেই তারা এ কাজটি করে আসছে। মানুষে মানুষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর সম্প্রীতির এই কাজে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ভিক্ষুরা যেমন তাদের নিজ ধমর্ হারাচ্ছে না , তেমনি তাদের কাছ থেকে ইফতার খেয়ে কোন ধমর্ভীরু মুসলমানের ও জাত চলে যাচ্ছে না।

মানবাধিকার আইন বলে, যদি তুমি বিশ্বাস কর ভিন্ন বণর্, জাত, ভাষাভাষী, ধমর্ ও লিঙ্গের মানুষকে সমান সম্মান আর অধিকার দেওয়া উচিত, তাহলে ভিন্ন সেক্সচুয়ালিটি বা লিঙ্গ অভিযোজনকে কেন নয়? কেমন করে শুধু এক প্রকার মানবাধিকারকে সমথর্ন করা যায়, যেখানে লিঙ্গ অভিযোজনের ভিন্নতার কারনে অনে্যর অধিকার খবর্ হয়?

আমাদের দেশের অনেক ফেসবুক ইউজারের প্রোফাইল পিকচার রংধনুতে রাঙানো দেখা যাচ্ছে। কোথায় কোন মাকির্ন মুল্লুকে কি এক আইন হলো, তার সাথে আমাদের হুজুগে বাঙালীর কি সম্পর্ক? আরে ভাই, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিয়ে কি লাভ? এ ধরনের প্রশ্নের জবাবে প্রসঙ্গের বাইরে সহজ একটা পাল্টা-প্রশ্ন করি, বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বাংলাদেশের শহর-গ্রামের বাড়ির ছাদে ব্রাজিল, আজের্ন্টিনা, জার্মানীর বা নেদারল্যান্ডসের বনির্ল পতাকা যে পতপত করে ওড়ে, তাতেই বা লাভ কি? আমরা কখনও বিশ্বকাপে খেলার জন্য কোয়ালিফাই তো করতে পারি নি। তবু কেন সবার চেয়ে বড় ভিনদেশি পতাকা বানানোর প্রতিযোগিতা, কেন মাঝরাতে জেগে থেকে টেলিভিশনে খেলা দেখা? কারণ একটাই, আমরা সমথর্ক। তেমনি নিজের ফেসবুকের ছবিতে রংধনু রঙের ছোঁয়ায় আমরা মানুষের অধিকারকে সমথর্ন জানাই। সমকামীদের বিয়ের অধিকারে সমথর্ন করা মানে নিজে সমকামী হয়ে যাওয়া নয়। নারী অধিকার নিয়ে কোন পুরুষ কথা বললেই সে নারী হয়ে যায় না। সাদা, কালো, বাদামী, হলুদ, জলপাই, পিঙ্গেল যে কোন চামড়ার মানুষের অধিকার রক্ষার কথা সমথর্ন করলেই কেউ সেই চামড়ার মানুষ হয়ে যায় না। তবে, একটা চমৎকার ব্যাপার হয়। ধর্ম, বর্ন, জাত, লিঙ্গ ভিন্নতার কারনে কেউ যেন বৈষমে্যর শিকার না হয়, এ রকম কিছু নিয়ে যে মানুষটা কথা বলে; সে আদতে একজন মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষ হতে গেলে কিচ্ছু প্রয়োজন নেই; শুধু প্রয়োজন বিবেক আর মানবিকতা।

সমকামিতা বিকৃত মানসিকতা বা অসুস্থতা নাকি জেনেটিক ব্যাপার বা ইন্সটিঙ্ক সেই দ্বন্দ্বে আজ যাব না। কিন্তু আজকের দিনে অ্যালান টুরিং এর কথা একবার না বললেই নয়।সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর। বৃটেনে তখন সমকামিতাকে অপরাধ হিসাবে গন্য করা হত। ১৯৫২ সালে সমকামিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হন বৃটিশ গণিতবীদ ও ক্রিপ্টোগ্রাফার অ্যালান টুরিং। তাকে সমকামিতার রোগমুক্ত করতে মানব শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এস্ট্রোজেন ইঞ্জেকশন নেওয়ার শাস্তি দেওয়া হয়। ইন্জেকশনের সেই ভয়াবহ যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে টুরিং দুবছর পর আত্মহত্যা করেন।টুরিং এর মৃত্যুর অধর্শতক পর, ২০০৯ সালে বৃটিশ সরকার দাপ্তরিকভাবে ক্ষমা প্রাথর্না করেন টুরিংকে ক্ষতিকর চিকিৎসায় বাধ্য করার জন্য। আর ২০১৩ সালে রানী এলিজাবেথ তাঁকে মরোনত্তর ক্ষমা প্রদান করেন।

এই গল্পটি কেন বললাম? কারণ আমাদের মত সমাজের চোখে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কোন ধারনাই নেই কেবল কিছুটা ব্যতিক্রম হওয়ার কারনে কত নিষ্ঠুর আচরণের বলি হতে হয় মানুষকে।

নভেম্বর, ২০১৩ থেকে বাংলাদেশ সরকার নারী, পুরুষের পাশাপাশি তৃতীয় একটি লিঙ্গকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়, যারা আমাদের সমাজে পরিচিত হিজড়া নামে। পুরো পৃথিবীতে বহু সেক্সচুয়ালিটির মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন ট্রান্সজেন্ডার আছে। কিন্তু আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের হিজড়া বলতে আমরা বুঝি সেই সব মানুষকে যাদের পুরুষ জননেন্দ্রিয় আছে কিন্তু তাদের আচরন, কমর্কান্ড ও পোশাক নারীসুলভ। অর্থাৎ যাদের পুরুষ শরীরের অভ্যন্তরে একজন নারী বাস করে। তবে একই ব্যক্তির শরীরে পুরুষ ও নারী উভয় জননেন্দ্রিয় যেমন থাকতে পারে, সংখ্যায় লঘু হলেও নারী শরীরে পুরুষের অস্তিত্ব ও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

হিজড়া মানেই যে রংচংয়ে বেঢপ পোশাক পরা কেউ; নেচে,গেয়ে, জোরজবরদস্তি করে রাস্তায় অন্যান্যদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা চাওয়া জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু নয়। ফেসবুকের মাধ্যমে একজন হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে চিনি, যে কিনা তার পরিবারকে পযর্ন্ত সাহস করে বলতে পারছে না তার জেন্ডার আইডেননটিটি। তার পরিবার ছেলেটির মেয়েলিপনায় বিরক্ত, কিছুটা উদ্বিগ্ন। ধামির্ক পরিবারটি স্রষ্টাকে ডাকছে যেন তাদের ছেলেটি স্স্থ হয়ে যায়। অথচ হিজড়া হওয়া কোন অসুস্থতা নয়, কোন দোষের কিছু নয়।

এই ছেলেটি সমাজ-সংসারের চোখে একজন পুরুষ কারণ তার পুরুষ জননেন্দ্রিয় আছে। বাইরে যদিও সে পুরুষের পোশাক পরে, কিন্তু ভিতরে সে অনুভব করে তার নারীত্ব।

ছেলেটি কখনো পছন্দের অন্য একটি ছেলেকে বলতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা। খুব সরল কিন্তু অবিচল প্রশ্ন তার, সরকার স্বীকৃতি দেওয়ার পরও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারনে আমি সবাইকে বলতে পারি না যে আমি ছেলে নই, পুরুষ শরীরে আটকে পড়া একজন নারী; আমি হিজড়া। এই যখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তখন কেমন করে আশা করি আমারও একটা সংসার হবে, পরিবার হবে কোন একদিন। কেউ কি সাহস করে , ভালোবেসে আমাকে বিয়ে করবে কখনো? লেখাপড়া বা চাকুরীর সুযোগই তো কারো একমাত্রকাম্য হতে পারে না। বিয়ের অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার- এগুলোও তো আর সবার মত আমি চাইতেই পারি।

কি উত্তর দেব আমি, কি উত্তর দেব সমাজের চোখে সুস্থ স্বাভাবিক আমরা?

আমাদের মতই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া হিজড়ারা পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়ে সাধারনত আশ্রয় নেয় অন্য আরো হিজড়াদের সাথে । ওরা দলবদ্ধ হয় কোন গুরুর অধীনে। কিশোরবেলা থেকে বেঁচে থাকার প্রতিদিনকার সংগ্রামে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে অপরাধমূলক কমর্কান্ড আর পতিতাবৃত্তিতে। সরকারী আইন অনুযায়ী, নারী পুরুষের পাশাপাশি হিজড়ারাও নাগরিক হিসাবে সংবিধানে বনির্ত সব অধিকারের যৌক্তিক আর আইনানুগ দাবিদার। কিন্তু আমরা কখনো কি চিন্তা করেছি , হিজড়ারা কি পরিবার গড়ে তুলতে পারবে কখনো? বিয়ে বা সঙ্গীর সাথে বসবাসের অধিকার যদি একজন নারী বা পুরুষের থাকে, তাহলে একজন হিজড়ার কেন থাকবে না? এ সম্পকের্ আমাদের আইন কি বলে একটু জেনে নেই?

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১)অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্ম, বর্ন, গোত্র বা লিঙ্গের ভিত্তিতে রষ্ট্র কোনও নাগরিকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন করবে না।

অন্যদিকে, ১৮৬০ সালের পেনাল কোড এর ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী দুজন ব্যক্তির সম্মতি থাকা সত্তেও হোমোসক্চুয়াল বিহেভিয়ার বা সমলিঙ্গের ব্যক্তিদ্বয়ের মধ্যে যৌনাচারনকে প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধতার কারনে অপরাধ হিসাবে গন্য করা হয়। এই অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি ১০ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। .

এই আইন অনুসারে হিজড়া কেউ অন্য কারো সাথে যৌনাচারন করলে তা সমকামিতা স্বরূপ প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ যৌনাচারন বলে অভিহিত হতে পারে এবং সে শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে।

এই আইনটি আসলে সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, রাইট টু ইকুয়ালিটি বা সমতার অধিকার এবং লিঙ্গ ভিন্নতার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন আচরনের পরিপন্থী।

এখনই সময় সব লিঙ্গের মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা। এই দেড়শত বছরের পুরোনো রদ্দিমাকার্ আইনকে নতুন করে সাজানো। লক্ষ্য করুন আমি আমেরিকার মত বাংলাদেশেও সমকামীদের বিয়ের বৈধতা চাইছি না, আমি শুধু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের বিয়ের আর পারিবারিক জীবনযাপনের অধিকার চাইছি।

ইউনিভাসের্ল ডিকলারেসন অব হিউম্যান রাইটসের ২০ তম আটির্কেল মানুষ হিসাবে আমার নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। আর সেই মানবাধিকারের জোরে একই সনদের ১৬তম আটির্কেলে ঘোষিত ইকুয়াল রাইট টু ম্যারেজ এন্ড ফ্যামিলি লাইফ হিজড়াদের জন্যও প্রযোজ্য হোক এইমত প্রকাশ করছি। সব লিঙ্গের মানুষের জন্য বিয়ে ও পরিবার গঠনের সম-অধিকার নিশ্চিত করে আইন তৈরীতে বাংলাদেশ সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে জোরালো মত প্রকাশ করছি।

কারন, সকলের সমান অধিকারই মানবাধিকার।

আমিও মানুষ, তুমিও মানুষ
তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়।।

( প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এর সেনাবাহিনীতে ট্রানসজেন্ডারদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে পুনরায় পোস্ট দেওয়া হল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *