কর্মজীবি-মা নাকি কর্মজীবি ও মা?

সাহানা বাজপেয়ী আমার খুব প্রিয় একজন সংগীত শিল্পী। কয়েকদিন আগে তার ফেইসবুকের পাতায় পোস্ট করা একটা ছবি নজর কাড়লো বলেই আজ লিখতে বসলাম। সাহানা প্রফেশনাল শিল্পী, অনেক স্টেজ প্রোগ্রাম করেন। সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে তিনি গাইছেন, এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে- এমন একটি ছবি সবার সাথে তিনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এ ছবিটি একজন কর্মজীবি মায়ের ছবি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরেকটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ভারতের এক মহিলা ব্যাংক কর্মকতর্া অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করে চলেছে, পিছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তারছোট্ট জ্বরাক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একটি কমর্জীবী মায়েরই ছবি।



কর্মজীবি-মা নাকি কর্মজীবি ও মা?

১. সাহানা বাজপেয়ী আমার খুব প্রিয় একজন সংগীত শিল্পী। কয়েকদিন আগে তার ফেইসবুকের পাতায় পোস্ট করা একটা ছবি নজর কাড়লো বলেই আজ লিখতে বসলাম। সাহানা প্রফেশনাল শিল্পী, অনেক স্টেজ প্রোগ্রাম করেন। সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে তিনি গাইছেন, এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে- এমন একটি ছবি সবার সাথে তিনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এ ছবিটি একজন কর্মজীবি মায়ের ছবি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরেকটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ভারতের এক মহিলা ব্যাংক কর্মকতর্া অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করে চলেছে, পিছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তারছোট্ট জ্বরাক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একটি কমর্জীবী মায়েরই ছবি।

আমার মা শিক্ষকতা করেছেন আজীবন, বাড়িতে কখনও আমার নানী আর কখনো খালা কিংবা কেউ না থাকলে বাড়ির কাজের মেয়েটি আমাদের দেখে রেখেছেন। কিন্তু এমনঅনেক অনেক দিন আমি মনে করতে পারি যখন মায়ের স্কুলরুমের অফিসের ওই টেবিলটির পিছনে মেঝেতে মাদুর পেতে পরীক্ষার পড়া করেছি, কখনো ক্লান্ত হয়ে চেয়ারের উপর থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ভাজ করে বালিশ বানিয়ে মেঝেতেই ঘুমিয়ে গেছি। স্কুলের টিফিনের ঘন্টা বাজলে মা এসে মাদুরে বসে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে বাড়ি থেকে আনা ভাত মুখে তুলে খাইয়েছেন। এই ছবি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়তো যে কোন চাকুরিজীবি মায়ের সন্তানদের কাছে। এই ছবিতে আমরা মাকে দেখি, মায়ের স্নেহ দেখি, সন্তান আর কাজের প্রতি মায়েদের সমান আর সমান্তরালে চলা একাগ্রতা ও দেখি- শুধু দেখিনা বাবাকে। সন্তান পালনে বাবাদের ভূমিকা অথর্ উপার্জন আর কখনো কখনো পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার মধে্য ই সীমিত। সন্তানের অসুস্থতায় বাবারা বিচলিত হন অবশ্যই কিন্তু তাদের কাজ আর বাড়ির মাঝে কোন অহেতুক ছুটোছুটি করতে হয় না। আমার বাবা সহ আশেপাশের কোন বাবাকেই আমি কখনো সন্তানের জ্বর হয়েছে বলে কাজে ছুটি নিতে দেখিনি, সন্তানকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়া তো বেশ অকল্পনীয় বিষয়। তারা ঘরে-বাইরে কর্মজীবি-বাবা নন বরং তাদের পরিচয় তারা বাইরে কর্মজীবি এবং ঘরে বাবা।

পুরুষতান্ত্রিক আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় সন্তান জন্মদান আর লালন-পালনে শুধু মায়ের দরকার পড়ে। সনাতনী সমাজে প্রসবকালীন যন্ত্রনায় স্ত্রী তার স্বামীকে পায়নি কাছে, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের কান্নার শব্দ শোনার অপেক্ষায় দরজার বাইরে গম্ভীর মুখে পায়চারি করেই পুরুষ তার দায়িত্ব মিটিয়েছে। অনেকক্ষেত্রে বাড়ি থেকে আ বয়, কাম শাপর্- টেলিগ্রাম হাতে এলেই কেবল বাড়ির পথ ধরেছে জন্মদাতা পুরুষ। পাশ্চাত্যে সন্তান প্রসবের সময়ে হাসপাতালে জন্মদাত্রীর সাথে জন্মদাতার উপস্থিতি আবশ্যক হওয়াতে আমার পরিচিত অনেক বাঙালি ছেলেকেও প্রবাসে সন্তান জন্মের গল্প বলার সময় শিউরে উঠতে দেখেছি, সন্তান লালন পালনে তাদেরকে বেশিমাত্রায় সহযোগিতা করতে দেখেছি।

সরকারি আইন অনুসারে সরকারি চাকুরিজীবি মায়েরা মাতুত্বকালীন ছুটি উপভোগ করেন ছয় মাস। অপরদিকে দেশের বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী একজন কর্মজীবী নতুন মা সবর্োচ্চ ষোল সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবিদার। বেসরকারি চাকুরিজীবিদের জন্য সরকারের কোন নিদর্িষ্ট নীতিমালা না থাকার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কমর্রত মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি মালিকপক্ষের মজর্ি অনুসারে চারমাস থেকে ছয়মাসের মধে্য ঘোরাফেরা করে । । সুতরাং আমাদের আইন প্রণয়নকারীদের অদূরদর্শিতার কারণে মায়েরাও ভাগ হয়ে যাচ্ছেন সরকারি আর বেসরকারি এই দুই ভাগে। অপরদিকে, বাবাদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানেই নেই কোন পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা। সমাজ পরিবতর্নের প্রেক্ষাপটে শহুরে নাগরিক জীবনে যখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তখন পিতৃত্বকালীন ছুটির অভাবে সন্তান জন্মের পর নতুন মাকে একলা হিমশিম খেতে হচ্ছে সন্তানের দেখাশোনার জন্য। ইউরোপের দেশগুলোতে মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটির আইনকানুন বেশ পোক্ত। যুক্তরাজ্যের নতুন মায়েরা পুরো বেতনে ২৬ সপ্তাহ এবং বিনা বেতনে আরও ২৬ সপ্তাহ, মোট ৫২ সপ্তাহ বা এক বছর মাতৃত্বকালীন ছুটি উপভোগ করেন। নতুন বাবাদের জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটি পুরো বেতনে ২ সপ্তাহ এবং বেতন ছাড়া আরও দুই সপ্তাহ, মোট চার সপ্তাহ। বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোকে মানব উন্নয়নের সূচকে প্রগতিপন্থী ও সুখী সমাজের তকমা দেওয়া হয় তাদের পারিবারিক আর পরিবেশগত আইন কানুনের জন্য। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি মোট ষোল মাস, মা-বাবা এই ছুটি ভাগাভাগি করে নিতে পারেন-যার মধে্য নূন্যতম তিনমাসের বাধ্যতামূলক ছুটি বাবাকে নিতে হবে সন্তানের বয়স আট হবার আগেই। সুতরাং, শুধু সন্তান জন্মের পরই বাবার ছুটি নয় বরং সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়েও বাবাকে ছুটি দেওয়ার বিধান করছে উন্নতবিশ্বের দেশগুলো, আর এদিকে আমাদের দেশে পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে কথা বললেই লোকে স্ত্রৈণ বলে তেড়ে আসে ওই পুরুষের দিকে। আজও লোকের ভ্রুকুটি দেখতে হয়- অশৌচ আঁতুড় ঘরে বাবার কাজ কি আবার ?

গতকালেরপত্রিকার পাতায় পিতৃত্বকালীন ছুটি বিষয়ে ভারতের নারী ও শিশু কল্যান মন্ত্রী মেনেকা গান্ধীর করা মন্তব্য আর সেই মন্তবে্যর তীব্র বিরুদ্ধাচারণ পড়ছিলাম। মেনেকা গান্ধী বলেছেন পিতৃত্বকালীন ছুটির চেয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির নিশ্চয়তার বিধান করা বেশি জরুরি। কারণ ভারতীয় পিতারা এই পিতৃত্বকালীন ছুটিকে অন্য সাধারণ ছুটির মতই আয়েশের জন্য ব্যবহার করবে। এই মন্তবে্যর প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের নারীবাদী , মানবতাবাদী তথা প্রগতিপন্থী ব্যক্তিবগর্। তাদের মতামত, মেনেকার এমন মন্তব্য লিঙ্গ-বৈষম্যহীন ভারতের অন্তরায়, এ মন্তব্য কেবল পিতাদের প্রতি বিরুদ্ধাচারণ নয় বরং এই চিন্তাধারা সনাতনী ভারতীয় সমাজের গৎবাঁধা রীতিকে প্রশ্রয় দেয়।

২. এ যুগের মেয়ে যে- এই অমোঘ বাণীকে সত্য করতেই নারীরা আজ হরহামেশাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ি পেরোচ্ছে, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। প্রতিরক্ষা, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন পেশা ও উত্পাদনশীল খাতে নারীর সরব অংশগ্রহণ ইতিবাচক।

তবে হতাশার কথা আমাদের কমর্প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নারীর মেধা আর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয় কদাচিৎ। উপরন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে ছুটি চাইলে কমর্জীবি মায়েদেরকে অহরহ কটূ কথা আর টিপ্পনি শুনতে হয় ঊদ্ধর্তন কমর্কতর্া আর পুরুষ সহকর্মীদের কাছে। । অথচ এই মায়েরা একা একাই কিন্তু সন্তান জন্ম দিয়ে ফেলেননি, ওই অসুস্থ সন্তানদের বাবারা ও হয়তো কর্মজীবি। অফিসের যেসব পুরুষ সহকর্মীরা কর্মজীবি মায়েদের প্রতি বাহানা আর অযুহাতের ব্যঙ্গাত্মক উক্তি ছুড়ে দেন, তাদের কেউই কিন্তু চিরকুমার বা সন্তানহীন নয়। তাহলে সন্তানের অসুস্থতায় একা মাকে কেন শুধু অফিসে নতমুখে ছুটির দরখাস্ত দিতে হয়, নারীকেই কেন কর্মজীবি মায়ের উপাধি দেওয়া হয়, আমাদের সমাজে কোন পুরুষ কেন কর্মজীবি বাবার তকমা পায় না কখনো?

পিতৃত্ব পুরুষের পৌরষ বাড়ায়, বংশের নাম রক্ষার পথ দেখায়। অথচ পিতৃত্ব পুরুষের কর্মজীবনে সামান্যই প্রভাব ফেলে। অপরদিকে, চব্বিশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সমাজের কানকথায় অতিষ্ঠ হয়ে পঁচিশে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যে মেয়ে ; নতুন সংসার আর চাকরি নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই সে হয়তো অনাগত সন্তানের আগমনীবাতর্া শোনে বছর না ঘুরতেই। সংসার-চাকরি-সন্তান এই তিনের বোঝা নারীকেই একা বইতে হয়। বাড়ির বউকে দশটা-পাঁচটা অফিস করার অধিকারটুকু দিয়েই সমাজের বাহবা কুঁড়ায় পুরুষ। তবে পান থেকে চুন খসলেই সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীর উপর, সন্তানের অসুখে, পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে পিতার দোষ নেই কোন, সব দোষ কর্মজীবি নারীর।

আবার, এদিকে কর্মজীবি মায়ের কাজের পরিবেশ কিন্তু সবসময় তার অনুকূলে থাকে না। মাতৃত্ব বেশ ধারালো নখর বসায় তার ক্যারিয়ারে। দেশে আমার এক নারী সহকমর্ী মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে এসে চাকুরির প্রমোশনের ইন্টারভিউতে গেলে ওই ইন্টারভিউ বোডের্র সব নামজাদা ব্যক্তিরা তাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল মাতৃত্বকালীন ছুটির ওই ছয়মাস তার প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় তিন বছরের কাজের সময়সীমাকে ব্যহত করেছে। সোজা কথায়, বাচ্চা জন্ম দিতে আমার সহকর্মীর্ কাজ থেকে ছয়মাসের ছুটিতে ছিল। তাই আগে এই ছয়মাসের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়ে তবেই প্রমোশনের ইন্টারভিউ দিতে আসতে হবে। অথচ একই সাথে ইন্টারভিউতে যাওয়া কর্মজীবি সদ্য বাবারা তরতর করে মই বেয়ে উপরের ধাপে এগিয়ে যায়। এই মাতৃত্বকালীন ছুটি যেন কর্মজীবি নারীর অধিকার নয়, কুড়িয়ে পাওয়া সহানুভূতি মাত্র।

কিন্তু, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশে নারীর সম-অধিকারের বিধান রয়েছে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে রয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ ২৮(২) অনুচ্ছেদে আছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ ২৮(৪)-এ উল্লেখ আছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ ২৯(১)-এ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’

৩. কর্মজীবী এই নারীরা সন্তান প্রসবের পর নবজাতকের লালন-পালনে পাচ্ছেন না প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। যেসব নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরি করছেন ও সন্তান পালন করছেন তারা দুটি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

সরকারের রাজস্ব বাজেটের আওতায় ঢাকা শহরে সাতটি এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ মোট ১২টি ডে-কেয়ার সেন্টার নিম্নবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী-শ্রমজীবী মহিলাদের শিশুদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের জন্য ঢাকায় ৬টি ডে-কেয়ার সেন্টার মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ডে-কেয়ার সর্বস্তরের কর্মজীবী নারীদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে শিশুসন্তান ও কর্মস্থল নিয়ে অনেককেই উভয় সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর কথা। কিন্তু কর্মজীবী মায়েরা এ সুযোগ পাচ্ছেন না। ‘কর্মজীবী নারী’র পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫১ দশমিক ৩৫ ভাগ অফিস বা কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টারের অস্তিত্ব নেই। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানে ৪০-এর অধিক নারী শ্রমিক আছেন সেখানে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু সন্তানের জন্য শিশুকক্ষ বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জায়গা থাকতে হবে। কিন্তু এ আইন বাস্তবে মানা হচ্ছে না, যার ফলে সন্তান পালনের জন্য বহু নারী শ্রমিককে কাজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানাসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশুদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ না থাকায় কর্মজীবী মায়েদের বেশ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এমনকি বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, সরকারি-বেসরকারি অফিসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের এখন পর্যন্ত এমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব ও কর্মস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার না থাকায় তারা একদিকে যেমন সন্তানের যথাযথ যত্ন নিতে পারছেন না, অন্যদিকে কাজেও মনোযোগ কমছে। ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র।

৪. আমাদের পাড়ার কয়েকটি বাসায় এক দরিদ্র মহিলা কাজ করতেন। এক বাড়িতে কাজ শেষে আরেকটি বাড়ি- এভাবে দিনের শুরু থেকে রাত গড়ানো অব্দি তাকে পাড়ার গলিতে কখনো পানি নিতে আবার কখনো পাড়ার শেষ মাথায় অবস্থিত ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে দেখা যেতো। কাজের প্রয়োজনে পাড়ার ধনী বাড়িগুলোতে ওই মহিলার যাতায়াত থাকলেও তার বছর দেড়েকের বাচ্চাটাকে বাড়ির চৌহদ্দিতে জায়গা দেয়নি কোন বাড়ির মালিক। মাঝে মধে্যই ওই ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোন বাড়ির গেটের ঠিক বাইরে ধুলোবালির মধে্য মেঝেতে ছড়ানো মুড়ি খুঁটে খুঁটে খেতে দেখা যেত। সেই দাওয়াতে যোগ দিত কেবল কয়েকটি কর্কশ কালো কাক। সাহানা বাজপেয়ী কিংবা ভারতের ওই ব্যংক কর্মকতর্া মায়ের মত আমাদের পাড়ার ওই কাজের মহিলা ও একজন কর্মজীবী মা। সমাজের মুখে চপোটাঘাত করা কাক-মানব সন্তানের একসাথে খাবার খাওয়ার এই নির্বাক ছবিটিও একজন কর্মজীবি মা ও তার সন্তানের। কর্মজীবী মায়ের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার আমরা যেন এই শিশুটির মাকে ভুলে না যাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *