মেঘ বৃষ্টির গল্প

এক.
বিকেলবেলা হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মুষলধারে বৃষ্টি।
বাড়িটা পাকা তবে টিনের চৌচালা। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে। এই অবেলায়ও ঘুম আসতে চায়। বাড়ির সামনে ছোট্ট উঠোনটা পেরোলেই পাকা ঘাট বাঁধানো পুকুর। পুকুরে শাপলা ফুটেছে। এর মধ্যেই রাজহাঁসগুলো মনের আনন্দে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। পুকুর পাড়ে বিশাল কদম গাছ, এই বর্ষায় গাছ উপচে পড়া ফুল ধরেছে। ঝড়ে পড়া কিছু কদম ফুল ছড়িয়ে আছে পুকুর ঘাটের লাল মেঝেতে।

এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে মৌমিতা। দুই হাত সামনে ছড়ানো, সে উপভোগ করছে প্রকৃতির শান্ত, স্নিগ্ধ, কমনীয় রুপের স্পর্শ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার শরীরে সূচের মতো বিঁধছে। সে কাঁদছে, একুশ-বাইশ বছর বয়সের মেয়েরা কারণে-অকারণে কাঁদে। সেও কাঁদছে। বৃষ্টির জলে চোখের জল আড়াল হয়ে যাচ্ছে। কেউ জানেনা, সে জানে। সে কাঁদছে। কিছু কিছু ঘটনা মানুষের মনে চোরা কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। দেখা যায়না, শুধু অনুভব করা যায়। ক্ষণে ক্ষণে ব্যাথার সঞ্চার করে, যার দহন খুব তীব্র। চারিদিকে সবাই আছে। তবু যেন কোথাও কেউ নেই।

সন্ধা ঘনিয়ে আসছে। দিনের আলো কমতে শুরু করেছে। বৃষ্টির ধারা বাড়ছেই। রাজহাঁসের দল ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উঠে আসছে। বৃষ্টিভেজা লাল শাপলাগুলো নিঃসঙ্গ হতে শুরু করলো। হিমেল হাওয়া মৌমিতার ভেজা চুল নাড়িয়ে দিচ্ছে। ঠান্ডায় শরীরটা কেঁপে উঠলো। গভীর কালো চোখ জোড়ার কাজল ধুয়ে গেছে অনেক আগেই।
প্রকৃতির এমন জলস্পর্শ মানুষকে নিষ্পাপ করে তোলে। অনেক দাগ ধুয়ে মুছে যায়; সোহাগের দাগ, বেদনার দাগ, আঘাতের দাগ।
মাগরিবের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। ঘর থেকে ডাক শুনতে পেলো মৌমিতা। মা ডাকছে। মেয়েদের সবকিছুতেই নিয়ম মানতে হয়। সংসারের সব নিয়মই যেন মেয়েদের জন্য। বিরক্ত লাগলেও মায়ের ডাকে সাড়া দিলোনা। ভিজতেই থাকলো।
গোধুলিবেলার এমন সম্মোহনী আবেশ মানুষের মনে কিরুপ প্রভাব বিস্তার করে তা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে।

চোখে দিয়ে বিষাদের জল বইছেই। কারণ, মাত্র তিন ঘন্টা আগেই তার প্রিয় মানুষটি চলে যাচ্ছে বলে এয়ারপোর্টের পথ ধরেছে। ‘ভালোবাসি’ কথাটা কখনো বলতে পারেনি মৌমিতা। তাই বলে অন্যপ্রান্তের মানুষটি যে ওর ভালোবাসা বুঝতে পারেনি, তা তো নয়। ভালোবাসার সবরকম প্রকাশইতো সে করেছিলো। শুধুই মুখ ফুটে বলা হয়নি। সংসারে যা কিছু অন্যের জন্য তা যথা সময়ে করা হয়ে থাকে আর যা কিছু নিজের জন্য তা করবো করবো করেও করা হয়ে ওঠেনা। আজওতো বলতে পারতো? নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে মৌমিতার। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। বুকের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে চিনতে পারবেতো নিজেকে?

দুই.
প্রণয় রায় চৌধুরী। মৌমিতার বাবার বন্ধুর ছেলে। একাত্তরে ওদের পরিবার দেশ ছেড়েছে। এখন ওরা থাকে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায়।
পূর্বপুরুষের দেশ দেখতে এসেছিলো প্রণয়। উঠেছিলো তার বাবার বন্ধুর বাড়ি, মৌমিতাদের বাড়ি। অল্পদিনেই বাড়ির সকলের সাথে দারুণ সখ্য গড়ে উঠেছিলো তার। আজ সব মায়ার সুঁতো কেটে দিয়ে আপন ঠিকানায় ফিরে গেছে প্রণয়।
একটা মানুষ তার জীবনটা এলোমেলো করে দিয়ে চলে যাবে। হৃদয় তরঙ্গে উথাল পাথাল ঢেউ তুলে হারিয়ে যাবে, ভাবতেও পারেনি মৌমিতা।
প্রণয় হয়তোবা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে ফিরে গেল ধর্মীয় দ্বৈততার কারণে। কিন্তু ভালোবাসাতো ধর্মের কারণে থেমে থাকেনি কখনো। সে তার নিজ গুণেই বিকষিত হয়েছে যুগে যুগে।
এক অপূর্ণ তরুণীর স্বপ্নের মাঠ-প্রান্তর লন্ডভন্ড করে দিয়ে যে চলে গেলো, সে কি একটুও পুড়বেনা? তারওতো একটা মন ছিলো, স্বপ্ন ছিলো। ভালোবাসাকে কখনোই কোন নিয়মের মধ্যে বন্দি করা যায়নি কোনকালে। দুটি মানুষ পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকলেও তারা একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে পায়।

মৌমিতা কাপড় বদলে বাথরুম থেকে বের হয়েই বিছানায় গেলো। মেয়েদের দুঃখের সবথেকে বড় সাক্ষী তার বালিশ। চোখের জল থামলেও হৃদয়ের রক্তক্ষরণ এখনো থামেনি।
বর্ষার রাতে ব্যাঙ আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ ভেসে আসছে। মৌমিতার বিষন্ন মনে ব্যাথিত সঙ্গীত মনে হচ্ছে ব্যাঙের ডাককে।
এশার আযান হয়েছে একটু আগে। মৌমিতার বাবা নামাজ শেষে ফিরলেই রাতের খাওয়া হয় এই বাড়িতে। শুধু এই বাড়িতে কেন? বাংলাদেশের গ্রামগুলোর সব বাড়িতেই তাই। রাতে কিছুই খেলোনা মৌমিতা।

তিন.
রাত বাড়তে শুরু করেছে। চুপিচুপি ঘর থেকে বের হয়ে উঠোন পেরিয়ে পুকুরঘাটে যেয়ে বসলো মৌমিতা। বৃষ্টি থেমেছে এখন। দমকা হাওয়ায় গাছের পাতা থেকে পানি ঝড়ার মৃদু শব্দ কানে অনুরণন তুলছে। কদম-বেলী-কামিনী ফুলের নির্যাস মিলেমিশে এক মাতাল করা ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে বাতাসে।
আজ শুক্ল সপ্তমী। আকাশে বিশালাকার চাঁদ উঠেছে। থেকে থেকেই মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মেঘের ভেসে চলা আলো ছাঁয়ার অপরুপ আবহ তৈরি করেছে। হিমেল বাতাসে শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্য যে না পেয়েছে তার মনুষ্যজনম বৃথা।
এভাবে কতক্ষণ বসে আছে, মৌমিতা জানেনা।
বাড়ির সামনের মেঠোপথে দূরথেকে একটা আলোর রেখা ভেসে আসছে। মৌমিতার দৃষ্টি গেলো সেদিকে। আলোটা মৃদু গতিতে এগিয়ে আসছে সামনের দিকে।
বাড়ির সদর দরজায় রিক্সা থামলো। রিক্সার নিচে বাঁধা হারিকেনটা এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিলো।
প্রণয় রিক্সা থেকে নামলো। মৌমিতা ভূত দেখার মতো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। প্রণয় এগিয়ে আসছে পুকুর ঘাটের দিকে, হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল।
মৌমিতা এখনো হতভম্ব, বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে।
প্রণয় আরো একটু এগিয়ে গেল, ফুলগুলো বাড়িয়ে ধরলো মৌমিতার দিকে। মৌমিতা ফুলগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে অনেকটা অস্ফুটে বললো- “তু…তুমি?”
প্রণয় হঠাৎই বুকে টেনে নিলো মৌমিতাকে। একে অন্যকে জড়িয়ে রেখেছে তারা। অনেক কিছু বলতে চায় মৌমিতা। মনের অব্যক্ত কথাগুলো হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু এসময় কোন কথা বলতে নেই, শুধুই সুখটুকু শুষে নিতে হয়। মৌমিতা কাঁদছে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
বৃষ্টিজলে দুজনেই ভিজে গেছে। একে অন্যকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ভালোবাসার উষ্ণতা এতই বেশী যে এই হিম শীতল বাতাসেও শরীরে কাঁপন অনুভূত হয়না।

অঝোড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি এমনি। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার ঝমঝম শব্দে মৌমিতার ঘুম ভেঙে গেলো। এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো সে। হ্যা, স্বপ্ন। বাস্তবে প্রণয়রা কোনদিন ফেরত আসেনা, স্বপ্নেই আসে। তাদের রেখে যাওয়া মধুর স্মৃতি মৌমিতাদের হৃদয় থেকে দীর্ঘশ্বাস নির্গত করে প্রতিনিয়ত।
বিছানা থেকে নেমে জানালা খুলে দিলো মৌমিতা। তার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, অথচ মনের দহনের তীব্রতাই যেন বেশী।
সপ্তমীর চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
বিষাদে ছেঁয়ে গেছে আকাশ, মৌমিতার মনেরই মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *