একজন সংস্কৃতি- কথক!

“সাহিত্য,শিল্প, সঙ্গীত কালচারের উদ্দেশ্য নয়- উপায়। উদ্দেশ্য, নিজের ভেতরে একটা ঈশ্বর বা আল্লা সৃষ্টি করা। যে তা করতে পেরেছে সে-ই কালচার্ড অভিধা পেতে পারে,অপরে নয়। বাইরের ধর্মকে যারা গ্রহণ করে তারা আল্লাকে জীবনপ্রেরণা রূপে পায় না, ঠোঁটের বুলি রূপে পায়।তাই শ’র উক্তিঃ Beware of the man whose God is in the skies.- আল্লা যার আকাশে তার সম্বন্ধে সাবধান।”

বাঙালি মুসলিম সমাজে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কাণ্ডারি ‘শিখা’ পত্রিকার সাথে দুজন ‘মোতাহের হোসেন’ যুক্ত ছিলেন।একজন কাজী মোতাহের হোসেন, যিনি শিখা সংঘের প্রধানদের মধ্যে একজন, অন্যজন হলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। এই দ্বিতীয়জন তেমন বিখ্যাত কেউ ছিলেন না। জীবদ্দশায় তাঁর কোন বই প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর তাঁর তিনটি বই প্রকাশিত হয়- সংস্কৃতি কথা, সুখ, সভ্যতা। এর মধ্যে প্রথমটি তাঁর মৌলিক প্রবন্ধের সংকলন, বাকি দুটো ভাবানুবাদ। উল্লিখিত উদ্ধৃতিটুকু সংস্কৃতি কথা গ্রন্থের ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া।

প্রবন্ধটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৪০-৫০ এর মধ্যে কোন একটা সময়ে। ঐ সময়ে এরকম আধুনিক চিন্তাধারার উদাহরণ আজকের বাংলাদেশে বিরাট সাহসী কোন ব্যাপার বলে মনে হয়। এমন সাহসী, আধুনিক- যুক্তিবাদী চিন্তার উদাহরণ ছড়িয়ে আছে তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ বইটির প্রতিটি প্যারায়। অন্য প্রবন্ধ গুলো বাদ দিলেও, কেবল নাম প্রবন্ধ অর্থাৎ ‘সংস্কৃতি-কথা’ শীর্ষক বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটিও আজকের দিনে তাঁর মৃত্যুর কারণ হতে পারতো। ঐ সময়ে এত অগ্রসরমান চিন্তার পরিচয় পেয়ে সেগুলো তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছিনা।

প্রবন্ধটিতে তিনি মূলত আবিষ্কার করতে চেয়েছেন ‘সংস্কৃতি’ বা কালচার-এর গ্রহণযোগ্য কোন সংজ্ঞা। সংস্কৃতি কী, কিভাবে সেটা সভ্যতার অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলে- এই আলোচনা করতে গিয়ে অবধারিত ভাবে এসে গেছে ধর্ম। তবে তিনি ধর্মকে বাতিল করে দেননি। প্রবন্ধটি শুরুই হয়েছে তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে- “ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।”

এরপরেই লিখেছেন,

“ধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। মার্জিত আলোকপ্রাপ্তরা কালচারের মারফতেই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত করে। বাইরের আদেশ নয়, ভেতরের সূক্ষ্ণ চেতনাই তাদের চালক, তাই তাদের জন্য ধর্মের ততটা দরকার হয় না। বরং তাদের উপর ধর্ম তথা বাইরের নীতি চাপাতে গেলে ক্ষতি হয়। কেননা তাতে তাদের সূক্ষ্ণ চেতনাটি নষ্ট হয়ে যায়, আর সূক্ষচেতনার অপর নাম আত্মা।”

ধর্মকে নীতির উৎস ভাবার যে ভুল ধারণাটি প্রচলিত তাঁর বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন এখানে। ধর্ম নীতির উৎস নয়। ধর্মের বিধি নিষেধের কারণে যে অন্যায় থেকে বিরত থাকে আর নিজের নীতিবোধের দ্বারা তাড়িত হয়ে যে ন্যায়ের পথে থাকে- এই দু ধরণের মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। মোতাহের হোসেনের ভাষায়-

“আল্লাকে সে স্মরণ করে ইহলোকে মজাসে জীবন যাপন করবার জন্য আর পরকালে দোজখের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে, অথবা স্বর্গে একটা প্রথম শ্রেণীর সিট রিভার্ভ করার আগ্রহে- অন্য কোন মহৎ উদ্দেশ্যে নয়। ইহকালে ও পরকালে সর্বত্রই একটা ইতর লোভ। … ধার্মিকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে ভয় আর পুরস্কারের লোভ। সংস্কৃতিবান মানুষের জীবনে ও-সবের বালাই নেই। তারা সব কিছু করে ভালবাসার তাগিদে। সত্যকে ভালোবাসা, সৌন্দর্যকে ভালোবাসা, ভালোবাসাকে ভালোবাসা- বিনা লাভের আশায় ভালোবাসা,নিজের ক্ষতি স্বীকার করে ভালোবাসা- এরই নাম সংস্কৃতি। তাই ধার্মিকের পুরস্কারটি যেখানে বহু দূরে থাকে সংস্কৃতিবান মানুষ সেখানে তার পুরস্কারটি পায় হাতে হাতে, কেননা, কাজটি তার ভালোবাসার অভিব্যক্তি বলে তার আনন্দ,আর আনন্দই তার পুরস্কার।”

ধর্ম ও কালচারের মধ্যে যে সংঘর্ষ বিদ্যমান সেটিকে সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। লিখেছেন,

“চিন্তা বা বিশ্বাসের ব্যাপারে সমতা স্থাপন করে মানুষের স্বাতন্ত্র্য লুপ্ত করতে চায় বলে ধর্ম অনেক সময় কালচারের পরিপন্থী। ধর্ম চায় মানুষকে পাপ থেকে, পতন থেকে রক্ষা করতে, মানুষকে বিকশিত করতে নয়। অপর দিকে কালচারের উদ্দেশ্য হল জীবনের বিকাশ, পতন পাপ থেকে রক্ষা নয়।”

সংক্ষিপ্ত এই প্রবন্ধে নারী প্রসঙ্গেও আমরা তাঁর প্রগতিশীল চিন্তার পরিচয় পাই।তিনি লিখেছেন,

“কী মানসিক, কী সাংসারিক সর্বপ্রকার সমৃদ্ধির গোড়ায় নারী। যাত্রাপথে নারীর জয়ধ্বনিই পুরুষের জীবন-পথের শ্রেষ্ঠ পাথেয়।যে জাতি নারীকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা রাখতে চায় সে জাতি মৃত্যুর আরাধনা করে।”

প্রেম-ভালোবাসা যে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার জন্য কতখানি জরুরী সে বিষয়টি তিনি তুলে ধরছেন এই প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন যে আমরা আসলে যৌন অবদমিত একটা জাতি। যৌনতা আমাদের কাছে নিষিদ্ধ। সমাজে যে বিয়ের প্রথা চালু আছে তা প্রেম-বহির্ভূত এক প্রকার শারীরিক সম্পর্ক মাত্র। এ প্রসঙ্গে সরাসরি প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করছি-

“নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় যৌনতৃপ্তি। যৌনতৃপ্তির উপায় কামকে প্রেমের সাথে যুক্ত করা। শুধু কামে তৃপ্তি নেই, তা পরিণামে ক্লান্তি ও অবসাদ নিয়ে আসে। প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েই কাম স্নিগ্ধ ও তৃপ্তিকর হয়ে ওঠে। অথচ সমাজ বিয়ের মারফত কামের দ্বারটি খোলা রাখলেও (বিয়ে মানে sex made-easy) প্রেমের দ্বারটি বন্ধ করে দিয়েছে।

বিবাহিত নর-নারীর প্রেমহীন স্থুল যৌনসম্ভোগে সমাজের আপত্তি নেই, কিন্তু অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা যদি একটু হাতে হাত রাখে, অথবা ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায় তবেই যত আপত্তি। প্রীতিকে বড় করে না দেখে নীতিকে বড় করে দেখার এ-ই স্থূল পরিণতি।”

এর পরিণতিতে যে আসলে ব্যাভিচার, গোপন সম্পর্ক (বহুল আলোচিত পরকীয়া!) ইত্যাদি বাড়ছে সে ব্যাপারটি পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করেন তিনি এখানে। তাঁর ভাষায়-

“কামকে দমাতে গিয়ে ধর্ম ও ধর্ম-সৃষ্ট সমাজ প্রেমকেই দমায়। প্রেম মরে যায়, কাম গোপনীয়তার আশ্রয় গ্রহণ করে টিকে থাকে- মুখ নীচু করে চোরের মত চলে।”

আমরা যে এখন ‘ফ্রি-থিংকিং’ এর কথা বলি, সেই ফ্রি থিংকিং এর দারুণ একটা সংজ্ঞা দিয়েছেন মোতাহের হোসেন-

“ধার্মিকের কয়েকটি মোটা বন্ধন, সংস্কৃতিবান মানুষের বন্ধনের অন্ত নেই। অসংখ্য সূক্ষচিন্তার বাঁধনে যে বাঁধা সে-ই তো ফ্রি থিংকার আর ফ্রি থিংকিং কালচারের দান। যেখানে ফ্রি থিংকিং নেই,সেখানে কালচার নেই।”

কিছু লোক আছে যারা একই সাথে ‘কালচারড’ আবার ধার্মিকও। অর্থাৎ সংস্কৃতি চর্চা করছে,আবার ধর্ম-কর্মও করছে। এদের সম্পর্কেও বলেছেন তিনি এবং ব্যাখ্যা করেছেন এই দ্বি-মুখী আচরণ সম্পর্কে। একই সাথে ধর্মের পাশাপাশি যেকোন মতবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ- এগুলোও যে সংস্কৃতির বিকাশের পরিপন্থী, সে ব্যাপারটা নিয়েও আলোচনা করতে ভুলেননি।

“মতবাদীর সব চেয়ে বড় ত্রুটি এই যে,একটি আদর্শের আলোকে সমস্ত কিছু দেখতে চায় বলে সে অবজেকটিভ তথা তন্ময় হতে পারেনা। আদর্শের গোঁড়ামির দরুন সে বৈচিত্র্যবোধ তথা জীবনবোধ হারিয়ে বসে। তাই কান পাততে নয়, মুখ খুলতেই সে ভালোবাসে। অথচ কান পাতাতেই সংস্কৃতি, মুখ খোলাতে নয়।”

শেষ পর্যন্ত তিনি সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছেন। বলেছেন,

“সংস্কৃতি মানে সুন্দর ভাবে,বিচিত্র ভাবে, মহৎ ভাবে বাঁচা ; কাব্যপাঠের মারফতে, ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাদের চাওয়ায় বাঁচা ; গল্পকাহিনীর মারফতে, নর-নারীর বিচিত্র সুখে বাঁচা ; ভ্রমন কাহিনীর মারফতে, বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা ; ইতিহাসের মারফতে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচা। বাঁচা বাঁচা বাঁচা। প্রচুরভাবে, গভীর ভাবে বাঁচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা।”

এই বইটিতে আরো ২৭ টি প্রবন্ধ আছে বিভিন্ন বিষয়ে। প্রথম প্রবন্ধটিতেই পাওয়া যায় আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, অগ্রসরমান চিন্তার পরিচয়। অন্য প্রবন্ধ গুলোও একই সাক্ষ্য দেয়। ভাবতে অবাক লাগে, দেশে ভাগেরও আগে শিক্ষিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল মানুষ ছিলেন যারা কিনা সকল রকম সংস্কারমুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থে মুক্তমনা হয়ে উঠেছিলেন। ভাবতে কষ্ট হয়, আমাদের এই পথপ্রদর্শকদের দেখানো পথ থেকে এখন আমরা কত দূরে সরে এসেছি।

১৯৪০ এর দশকে মোতাহের হোসেনরা তাঁদের মৌলিক রচনাবলী এবং শিখা পত্রিকার মারফত যেসব কথা বলেছেন, এই ২০১৭ এর বাংলাদেশে সেই কথা গুলো তাঁদের মৃত্যুর কারণ হতো। সংস্কৃতি-কথা বইটি হয়তো নিষিদ্ধ করা হত,সড়িয়ে ফেলা হত বই মেলা থেকে। শিখা পত্রিকার অনলাইন ভার্সন থাকলে, মামলা হত ৫৭ ধারায়! সেই সময়ে, যখন মাত্র শিক্ষা ও জ্ঞান-চর্চার বিকাশ ঘটছে, তখন তাঁদের চিন্তা কতটা অগ্রসর ছিল। আর এখন প্রযুক্তি-ইন্টারনেট আর বিজ্ঞানের অসংখ্য ম্যাজিকের মধ্যে বসে থেকে আমরা যাত্রা করছি উল্টো পথে- অন্ধকার, অজ্ঞনতা আর কুসংস্কারের দিকে।

সম্ভব হলে সংস্কৃতি কথা বইটি পড়তে পারেন।প্রকাশ করেছে নবযুগ পাবলিকেসন্স। শিখা পত্রিকার নির্বাচিত লেখা গুলোর সংকলনও পাওয়া যায়,আব্দুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায়,প্রকাশ করেছে একুশে প্রকাশন। বইগুলো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিতেও পড়তে পারবেন।

এখন যারা লিখছে তারা তো ‘ধর্ম-বিদ্বেষী’, ‘কটুক্তিকারী’, ‘ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী’। তো অনুরোধ থাকবে আগের লেখা গুলোই পড়ুন। পড়ুন বাঙালি ‘মুসলমি’ জাগরণের কাণ্ডারিদের লেখা গুলো। সংস্কৃতিবান হয়ে উঠুন। মোতাহের হোসেনের সাথে চাইলে কন্ঠ মেলাতে পারেন-

“জীবন নিয়ে পরীক্ষা করবার অধিকার আমার আছে। আমার ভেতরে যে অমৃত লুকিয়ে আছে তা আমার চাই-ই। আর তা আমাকে আবিষ্কার করে নিতে হবে। তোমার ধরাবাঁধা নীতির অনুসরণ করলে তা পাওয়া যাবেনা। কে তোমাকে শেষ কথা বলার অধিকার দিয়েছে? আমি অশেষের পূজারী। নীতির বাঁধনে বেঁধে আমার জীবনকে, আমার আগমনকে ব্যর্থ করে দিও না, আমাকেই আমার উদ্ধারকর্তা হতে দাও,আমার জীবনের নিয়ামক হতে দাও।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *