‘তাজউদ্দীন : নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক’

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে ইমতিয়ার শামীমের লেখা একটি জীবনীগ্রন্থের নাম ‘তাজউদ্দীন : নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক’। যে গ্রন্থে তাজউদ্দীন আহমদ-এর জীবন কাহিনি তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক অপ্রিয় সত্য কথনকে ইমতিয়ার শামীম অসীম সাহসের সাথে উন্মুক্ত করেছেন। দশক বিচারের দিক দিয়ে ইমতিয়ার শামীম আশির দশকেরই একজন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, রাজনৈতিক কলাম দু’হাতে লিখেন। এ দিক বিবেচনায় সব্যসাচী লেখক বলা যায় তাকে। সব্যসাচী ওই লেখকের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ নাই। তবে আমি তার লেখার সাথে পরিচিত হই সেই কলেজ জীবনের শুরুর বছরেই। ২০০৪ সালের ৫ নভেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ‘সমাজ প্রত্যয়ে অভিষিক্ত দেশ’ রচনার বদৌলতে। এ রচনায় ইমতিয়ার শামীম জীবনের সত্যতা বের করে আনার জন্যে রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর থেকে চিন্তাবলয়কে সূত্রবদ্ধ করে যুক্তি, নতুন তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ইস্যু, রাষ্ট্রভাষা ও ধর্মের অপব্যবহারকে সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেছেন। সাম্প্রদায়িক ভাগ-বাটোয়াারার মধ্যে দিয়ে (অনেকটা বানরের পিঠা ভাগের মতো) ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। সম্প্রদায়গত তত্ত্বের তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে নব্য গঠিত স্বাধীন পাকিস্তান পূর্ব বাঙালিদের জন্য ছিল স্বাধীনতার মরীচিকা মাত্র। পাকিস্তান সৃৃষ্টির পর থেকেই নব্য ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি পূর্ব বাঙালির ভাষা সংস্কৃতিতে আঘাত (বীর বাঙালির আত্মদানের মধ্যে দিয়ে সেই ভাষার অধিকার আদায় করে নেওয়ার প্রসঙ্গ) বাঁধায় সাম্প্রদায়গত হামলা, ধর্মকে অপব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ফাঁয়দা লুফে নেওয়ার প্রচেষ্টা, সামাজিক-অর্থনীতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, স্বাধীনতা যুদ্ধ, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, মৌলবাদী তথা জাতির শত্রু স্বাধীনতাবিরোধীদের দেশে পুনর্বাসন, ধর্মের নামে ফতোয়াবাজি ইত্যাদি ইত্যাদি প্রসঙ্গ উল্লেখপূর্বক সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এবং দেশীয় শোষক শ্রেণি (এ তিন শত্রু- লেখক) যে জনগণের অগ্রগমনের অন্তরায় তা অত্যন্ত ভালোভাবে তোলে ধরেছেন ঐ লেখায়। এ ছোট্ট একটি লেখায় উগ্রপন্থী মুসলিম লীগ, মৌলভী-মোল্লাদের আস্ফালন, জামায়াত, নেজামী ইসলামসহ সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমুহের মধ্যেকার উগ্রপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সেই পুরনো ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে, জেনেও না জানার ভান করে নতুন করে ফতোয়াবাজির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ।

ইমতিয়ার শামীম ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে, পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার সূত্রে মুক্তিচেতনার অধিকারী হওয়ায়, কারো কাছে আপস না করার মনোভাব থেকেই বড়ো হয়েছেন। জীবন সংগ্রাম করেছেন, আপসকামী নীতি না থাকার দরুণ সব সময় সত্যের পক্ষে লেখালেখি করেছেন, রাজনীতি করেছেন। ইমতিয়ার শামীম অন্য দশজনের মতো নন, যারা সমাজ, দেশ-জনতা বিক্রি করে নিজেদের আখের গোছানোর জন্যে পুঁজিতান্ত্রিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্যাচকি মারা প্রবন্ধ পয়দা কিংবা দেশ বিক্রির পায়তারায় লিপ্ত অন্য লেখক-গলাবাজদের গলাবাজিতে কখনো জড়ান নি, তিনি সব সময় সত্যের পক্ষেই ছিলেন। সত্যের পক্ষেই ছিলেন বলেই আলোচ্য বিষয় ‘তাজউদ্দীন আহমদ’ এর জীবনী লিখতে গিয়ে অনেক সত্য কথন তুলে ধরতে পেরেছেন ইমতিয়ার শামীম।

পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে আলোচ্য বিষয়ের ভেতরে ঢুকতে চাই। আলোচ্য বিষয় ‘তাজউদ্দীন: নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক’ (২০১০, বাংলা প্রকাশ) গ্রন্থ পাঠে জানতে পারিÑ শৈশবে (যখন তাজউদ্দীন আহমদের বয়ম মাত্র ১০ বছর) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নারায়ন চ্যাটার্জি, বীরেশ্বর ব্যানার্জি এবং মনিন্দ্র শীমানি এর সাথে পরিচয়। তাদের প্ররোচনায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস পড়ে তাজউদ্দীনের মননে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটে। ওই সময়ের মুসলিম লীগকে ভারতের মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থান্বেষী যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা, বিপ্লবের দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার আগ্রহ পোষণ করে। কিন্তু ওই তিন বিপ্লবীদের অন্যত্র নির্বাসিত করায় সে আগ্রহে ভাটা পড়ে। তারপরেও বিপ্লবের দীক্ষায় দীক্ষিত তরুণ তাজউদ্দীন আহমদ সাম্প্রদায়িক ভাগ বাটোয়ারার মধ্যে দিয়ে ভারত বিভক্তিতে প্রচ- কষ্ট পান। কারণ তিনি চোখের সামনে দেখতে পান ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি দেশকে ভেঙে ফেলে লাখো মানুষকে উদ্বাস্তু করে ফেলা হচ্ছে, অথচ এমন কেউ নেই যে এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে রুখে দাঁড়াবে। বহু দিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে অনেক হিন্দু ভারতে চলে ্যায় এবং অনেক মুসলমান ভারত থেকে পূর্ব বাংলায় চলে আসে। এই চলে যাওয়া এবং আসার মধ্যে এক ধরনের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়Ñ তার মধ্যে দখল প্রক্রিয়াও চলে যা ইতিহাস আমাদেরকে জানান দেয়। তাই তাজউদ্দীন আহমদ উচ্ছেদ ও দখল প্রক্রিয়া এবং সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবীদার সংগঠন মুসলিম লীগের ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আর পৃষ্ঠপোষকতা করা ঠিক হবে না মনে করেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে ধর্মকে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রাষ্ট্র পরিচালিত এবং বিকশিত করা সম্ভব নয়। কারণ এ দেশে বহু ধর্মালম্বীদের বসবাস। বুঝতে পেরেছিলেন মুসলিম লীগের এমন এক রাজনৈতিক ধারার সূচনা করতে হবে, যাতে এই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বিলোপ ঘটে। এ প্রেরণা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশের মাত্র পনেরো দিনের মাথায় ৩০ আগস্ট ১৯৪৭ সালে ঢাকা নগরে একটি অস্থায়ী কমিটি গঠনের লক্ষ্যে নাজির লাইব্রেরীতে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠনের এক বৈঠকে মুসলিম শব্দটি উঠে নেয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে তাজউদ্দীন বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন। এই ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মীয় রাজনীতিম্ক্তু ছাত্রসংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’।

পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছর পেরুতে না পেরুতেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা পূর্ব বাংলার ভাষা সংস্কৃতিতে আঘাত করে। ঠিক তখনি বুঝতে পারে ‘ধর্ম দিয়ে রাজনীতি করা যায় না, ধর্ম দিয়ে শোষণ করা হয়; ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র বিকশিত করা যায় না, ধর্ম দিয়ে মানুষকে নিপীড়ন করা হয়।‘ (পৃ:২৩)। তারপরের ইতিহাস ধর্মকে অপব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক হামলা, আরবি হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্রের। তারপর ৫২ এর ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনের মধ্যে বুঝতে পারে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর শোষণ প্রক্রিয়া দীর্ঘতর থেকে দীর্ঘতর করছে। এ সময় শামসুর রহমান খান নামে এক সরকারি কর্মকর্তার সাথে জনসনের কথোপকথনের এক পর্যায়ে তাজউদ্দীন সাহসের পরিচয় দেন। ইমতিয়ার শামীম লিখেন:
‘তোমরা তো জনগনের রাজনীতি করছ, আর আমি এখন পাকিস্তানের সেবক। তোমরা নিশ্চয়ই আমাদের আর পছন্দ করো না! শুনে তাজউদ্দীন তাঁকে বললেন, আপনি অভিজ্ঞতা জমতে থাকুন, দেশ স্বাধীন হলে আমাদের এ অভিক্ষতা কাজে লাগবে। জনসন তাকে বিষ্মিত হয়ে বলেন, দেশ তো স্বাধীনই হয়ে গেছে। এ কথার পিঠে তাজউদ্দীন বলে উঠলেন, এ দেশ না। আমাদের দেশ। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের এক থাকা সম্ভব হবে না ।’ (পৃ: ২৬)
মুসলিম লীগের নির্যাতন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে রেহাই পেতে এবং মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে এ প্রেরণা থেকেই ৫৪ এর নির্বাচন। এ নির্বাচনে অনেক মৌল্লা-মৌলভী যারা এক সময় মুসলিম লীগের সাফায় গাইতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন তারাই মুসলিম লীগকে পরাজিত করতে এক কাতারে মিলিত হলেন। যা হোক, নির্বাচন হলো। এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলো, কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারলো না। এ নির্বাচনে তাজউদ্দীন আহমদ মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ফকির আবদুল মান্নানকে ১৮০৬৭ ভোটে হারিয়ে জয়ী হন।

এরপরের ইতিহাস খুব করুণ। আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণ করেই আমাদেরকে আরো দ্বিগুনভাবে শোষণ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে পাকিস্তানি শাসকদের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে এস এম শরীফ কে আহ্বায়ক করে ‘শরীফ শিক্ষা কমিশন’ নামে গণবিরোধী শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং কেরানী সৃষ্টির প্রক্রিয়ার একটি কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। আ’লীগের একজন নেতা হিসেবে তাজউদ্দীন এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন এবং এ আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সামরিক বাহিনীর তাকে হুমকি মনে করে বন্দী করে রাখে। শুধু তাজউদ্দীনকে নয়, আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে ওই সময়। তারপর আসে ১৯৬৪ সাল। এ বছর তাজউদ্দীন জেল থেকে বেরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলকে পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত হন। তার জনপ্রিয়তা এবং দলের প্রতি একাগ্রতার কারণে তাকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার কর্মসূচী দিলে ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির পক্ষে কাজ করেন। এবং ওই আন্দোলনের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে তাজউদ্দীনকে ফের গ্রেফতারও করে সামরিক জান্তারা। এরপরে আসে ৬৯ এর গণঅভূত্থান এবং সত্তরের নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল আসনে জয়ী হলেও পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভূট্টোর তালবাহনায় অধিবেশন স্থগিত করেন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী। এর পর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দেন। ৭ মার্চের ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ এর মধ্যে দিয়ে মূলত স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।

২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু। যে যুদ্ধে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ প্রমুখ মুক্তিকামী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও দেশের আপামর জনগণ মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হ’ল কিন্তু সরকার নাই। তাজউদ্দীন তা বুঝতে পেরে ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেতার ভাষণ দেন এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয় তার নেতৃত্বে। আমরা ইমতিয়ার শামীম’র এ গ্রন্থ পাঠে জানতে পারি, তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানা না মানার প্রসঙ্গ- বেতার ভাষণ বন্ধ করতে শেখ ফজলুল হক মনি, শেখ আবদুল আজিজসহ ৪২ জন নেতার স্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদন সংগ্রহ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানোর প্রসঙ্গ। কলকাতার ভবানীপুর এলাকার রাজেন্দ্র রোডের চিত্ত সরকারের বাসায় এ নিয়ে প্রচ- তর্ক-বিতর্কের শুরু হয়। এ বির্তক শুধু তাজউদ্দীন আহমদকে সরিয়ে খন্দকার মোশতাককে প্রধানমন্ত্রী (তারা এমনটাই ভাব ধরে ছিলেন যে মোশতাককে প্রধানমন্ত্রিত্ব না দিয়ে ভুল করেছেন) করে স্বাধীনতা যুদ্ধকে দক্ষিণপন্থীর দিকে নিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের মধ্যে মন্ত্রিত্বের লোভ। তারপরেও ১১ এপ্রিল শিলিগুড়ির একটি অনিয়মিত বেতার কেন্দ্র থেকে তাজউদ্দীনের এ ভাষণ প্রচার করা হয়।

‘আপনি অত বুঝবেন না আমাদের ভেতরের কথা। বঙ্গবন্ধু আমাদের কী অথরিটি দিয়ে গেছেন সেটা আপনি বুঝবেন না (পৃ:৫১)’ র মতো শেখ ফজলুল হক মনির উদ্যতপূর্ণ আচরণ। শেখ মনির এ উক্তির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তাজউদ্দীন কিছুই জানতেন না? নতুবা শেখ মুজিবুরের কাছেন কেউ ছিলেন না তিনি? আসলে কী তাই? এ গ্রন্থ পাঠে জানতে পারি, খন্দকার মোশতাককে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রিত্ব না দেয়ায় ক্যাবিনেট না থাকার সিন্ধান্ত। এবং শেষমেষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার শর্তে ক্যাবিনেটে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।

মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠানের পর বিদেশী সাংবাদিকরা জায়গাটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তাজউদ্দীনের উত্তর: ‘‘এখন থেকে এ জায়গার নাম মুজিবনগর। বাংলাদেশ সরকার আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশ সরকার যে জায়গায় শপথ নিয়েছে সে জায়গার নাম মুজিবনগর ছাড়া আর কী হতে পারে! (পৃ:৫৩)।

এ বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাজউদ্দীন আহমদকে ঠেকাতে সিরাজুল আলম খান, শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক তোফায়েল আহমদ প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত মুজিব বাহিনীর অপতৎপরতা। এ বাহিনীর সদস্য রিক্রুটিংএর বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক। বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনী শুরু থেকেই মন্ত্রীসভা ভেঙে দেয়ার জন্য প্রচারণা চালাতে থাকে। এমনকি ভারতের ক্ষমতাসীনদের দক্ষিণপন্থী অংশটিও এতে ইন্ধন যোগাতে থাকে।’ শিলিগুড়িতে ৭০ এর নির্বাচনে জয়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের এক সম্মেলনে ছাত্র নেতাদের অনেকে জঘন্য ভাষায় সমালোচনা করতে করতে বলেন ‘তাজউদ্দীনকে দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্ভব নয়। তার কারণে আমরা সংগ্রহ করতে পারছি না। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে এ কাজ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সমস্যা এবং সেসবের সমাধান না খুঁজে এসব নেতারা জোর দিয়ে বারবার তাজউদ্দীনের অপসারণ দাবি করতে থাকেন। ’ (পৃ.৬১) তারপরেও এ সম্মেলনে অনেক দূরদর্শি নেতা তাজউদ্দীনের পক্ষে থাকায় তা ওখানেই সমাপ্ত হয়।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারে তাজউদ্দীনকে দায়ী করে এবং তাজউদ্দীনের মন্ত্রীসভা যতদিন ক্ষমতায় রয়েছে ততদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হবেনা’ ইত্যাদি প্রসঙ্গ। শুধু তাই নয় অক্টোবরের প্রথম দিকে তাজউদ্দীন আহমদকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায় মুজিব বাহিনী। শামীম এর ভাষায় ‘অক্টোবরের প্রথম দিকে একদিন এক যুবক আগ্নোয়স্ত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের দপ্তরে আসে। নিজেকে সে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে দাবি করে। এই যুবক জানায়, মুজিব বাহিনীল একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা তাজউদ্দীনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েচে। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে দেখে সে স্বেচ্ছায় হত্যার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাজউদ্দীনের ্কাছে এসেছে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর জীবন রক্ষা পায়। ’(৬২)। মুজিব বাহিনীর এহেন কর্মকা-ে মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের একটি অংশও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়- তা বুঝতে পেরে জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কায় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত শরবিন্দু চট্টোপাধ্যায় ছাড়া অন্য কেউ জানতে দেন নি।

এরপরই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে চাপ দিতে থাকে শেখ মনি। এ প্রস্তাব শুনে তাজউদ্দীন শুনতে পেয়েও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন এবং শেখ মনিকে ডেকে মুক্তিযুদ্ধে বাঁধা না দেয়ার নির্দেশ দেন এবং ‘এই অফিস থেকে পাঠানো সব আদেশই আপনাদের মানতে হবে’ বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন। এই বিচক্ষণতার পরিচয় না দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।

সরকার গঠনের পর থেকেই তাজউদ্দীন আহমদ জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সহযোগিতা কামনা করেন এবং স্বীকৃতি আদায়ে চেষ্টা করেন এবং তাতে সফল হন।

এ গ্রন্থে আমরা জানতে পারি, মেজর জিয়ার ব্যক্তি সুনাম প্রচারের জন্যে জেড ফোর্স নামে অভিহিত করার অপপ্রয়াস। অথচ সেনাবাহিনীতে এভাবে কোনো কমান্ডার কিংবা ব্যক্তির নামে ফোর্সের নাম দেয়ার উদাহরণ কোনোখানে নেই এবং এর প্রয়োজনও ছিলো না এ প্রেক্ষাপটে। এ খরব শুনে নিয়মের ব্যাপারে আন্তরিক মুক্তিযুদ্ধের সেনানিধনায়ক এমএজি ওসমানী মেজর জিয়াকে গ্রেফতারের দাবি তুলেন। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে তাজউদ্দীন মেজর জিয়াকে গ্রেফতারের পক্ষে মত না দিয়ে খালেদ মোশাররফকে কে ফোর্স, শফিউল্লাহর ফোর্সকে এস ফোর্সে বিভক্ত করে দেয়ার পরামর্শ দেন ওসমানীকে। তাজউদ্দীনের যুক্তি ছিল,‘এত দ্রুত একজন কমান্ডারকে গ্রেফতার করা হলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা অপপ্রচার চালানোর সুযোগ পাবে, অনেক সাধারণ সৈনিকের মনেও হতাশা দেখা দিবে এবং সর্বোপরি সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাও আকষ্মিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। (পৃ: ৬৪)।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরেন। ফিরেই প্রধানমন্ত্রীর পদে নিজেকে যুক্ত করলেন, তাজউদ্দীনকে দেয়া হলো অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর নতুন দায়িত্বে। প্রশাসনকে রাজনৈতিককরনে ঘোরবিরোধী ছিলেন তিনি এবং এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথেও দ্বিমত পোষণ করতেন। এই সুযোগ নিতে থাকে তাজউদ্দীন হত্যার প্রচেষ্টাকারী দক্ষিনপন্থীর ওই অংশটি। দুর্ভিক্ষের সময়ে আ’লীগের এক শ্রেণির নেতা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা গঠনে উঠেপড়ে লাগে। শেখ মুজিব নিজেও চাইতেন রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে ফেরত যেতে, বাকশাল বা একদলীয় সরকার ব্যবস্থা গঠন করতে। এ নিয়ে শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অর্থসচিব কফিলউদ্দিন মাহমুদকে ডেকে নিয়ে তাজউদ্দীনের ব্যাপারে নজরদারি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অনেক তালবাহনা করে যে মানুষটি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৬ ঘন্টা মুজিবনগর সরকারের কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই নেতাকে আ’লীগের কতিপয় স্বার্থবাদী মহল তাকেই চট্টগ্রামের কুখ্যাত চোরাকারবারী ম্যান ‘সেরু মিয়া’ বলে জনসাধারণের কাছে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে (!) তাজউদ্দীন আহমদকে অর্থমন্ত্রী থেকে সরে দাঁড়াবার পত্র দেন বঙ্গবন্ধু। তাকে সরিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদের কাছে পদলেহন করতে চেয়েছিলেন সেসব নেতাকে কাছে টেনে নেন। যে খন্দকার মোশতাককে আপন মনে করে বঙ্গবন্ধু কাছে টেনে নিয়েছিলেন সেই খন্দকার মোশতাকই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নেতৃত্ব দেন। এই হ’ল ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পরই তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলীকে গ্রেফতার করা হয়। আটকের পর থেকেই কারাগারেই কালো বর্ডার দেয়া লাল ডায়েরী। যে ডায়েরীতে লিখে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ইতিকথা।

তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে লেখা যেসব বই বের হয়েছে তার মধ্যে ইমতিয়ার শামীম এর ‘তাজউদ্দীন: নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক’ বইটি আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। মূলত ছোটদের জন্য রচিত হলেও যারা ইতিহাস অনুসন্ধিস্যু তাদের জন্য এ বইটি প্রয়োজন হতে পারে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস জানতে এ বইটি সকল পাঠকের পাঠ্য তালিকায় থাকা উচিত বলে মনে করি।
প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০১৪, লোক, ঢাকা।

১ thought on “‘তাজউদ্দীন : নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক’

  1. চমৎকার লেখা
    চমৎকার লেখা

    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *