আল ফারাবি: ভিন্ন পথে চলা এক আরব দার্শনিক


বলছিলাম বাংলা ব্লগ সহ বিভিন্ন জায়গায় ইবনে সিনা, আল রাজি, ইবনে রুশদ সহ বিভিন্ন দার্শনিক নিয়ে আলোচনা দেখি। কিন্তু আল ফারাবি নিয়ে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। তো একটা গ্রুপে একজন আল ফারাবি নিয়ে প্রশ্ন করায় ভাবলাম তাকে নিয়ে কিছু লিখি।

আল ফারাবির সম্পর্কে লিখেছেন রিচার্ড ওয়ালজার, এ. জে. আরবেরির মত বিখ্যাত ফিলোসফি এক্সপার্ট ও স্কলাররা। রিচার্ড ওয়ালজার তার সম্পর্কে “Greek into Arabic” আর এ. জে. আরবেরির “Reason and Revelation” এ উল্লেখ করেন। বইগুলো পড়ার সৌভাগ্য আমার হয় নি, কিন্তু ইবনে ওয়ারাকের বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে যেখানে তিনি আল ফারাবিকে নিয়ে ওয়ালজার ও আরবেরির মতামত তুলে ধরেন। ইবনে ওয়ারাক যে বইতে এগুলো নিয়ে এসেছেন তার নাম এখানে বলব না। বইটিতে তিনি সেই বইগুলোর রেফারেন্স টেনে আল ফারাবি সম্পর্কে সংক্ষেপে যা বলেছিলেন, তার বাংলায় অনুবাদ করেছি। এখানে দিচ্ছি,

“আল ফারাবি (৮৭০-৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ)

আল ফারাবিকে নিয়ে পড়াশুনা করলে আমরা তার এমন কিছু ধারণা পাই যা গোড়া ইসলামের সাথে একেবারেই যায় না। আরবারি দেখান আল ফারাবির ধারণায় মৃত্যুর পর দেহের পুনরাবির্ভাবের কোন জায়গাই নেই। কিন্তু আল ফারাবিকে তার ধারণায় সবসময় অনড় হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় না। পাইনস বলেছেন, এর জন্য হয়তো একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। তিনি বলেন, “আল ফারাবি এসব ব্যাপারে লেখার জন্য তার যে ক্ষতি হতে পারে এ ব্যাপারে সাবধান ছিলেন। তার লেখা পড়ে মনে হয় তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে তার রচনাগুলোতে একের পর এক বিমূর্ততা ব্যবহার করেছেন, এক্ষেত্রে স্পিনোজার লেখার ধরণের সাথে তার লেখার ধরণের মিল পাওয়া যায়। এভাবে তিনি তার নিজের চিন্তাধারাগুলো তার রচনায় কৌশলে ঢেকে রেখেছিলেন কারণ তিনি জানতেন যদি এগুলোকে খোলাখুলি প্রকাশ করা হয় তবে তা গোড়া ইসলামপন্থিদের কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না”।

আল ফারাবি এরিস্টোটলের চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে বিশ্বাস করতেন যে, শুধুমাত্র আত্মার বুদ্ধিদীপ্ত অংশেরই অমরত্ব থাকে। কিন্তু শুধুমাত্র যে আত্মাগুলো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের বুদ্ধিদীপ্ত চেতনা এবং পূর্ণতা অর্জন করেছে, তারাই কেবল সুখ লাভ করবে। এই পবিত্র আত্মাগুলো মৃত্যুর পর নিজেদের এককত্ব বা ইন্ডিভিজুয়ালিটি হারায় এবং স্বর্গরাজ্যের সক্রিয় চেতনা বা “একটিভ ইন্টেলেক্ট” এর অংশ হয়ে যায়। অন্যান্য আত্মারা জন্মান্তর বিধি অনুসারে পুনরায় দেহ ধারণ করবে।

আল ফারাবির এই সক্রিয় চেতনার ধারণা এসেছে নিওপ্লেটোনিস্টদের মতবাদ থেকে। আর এটা গোড়া একেশ্বরবাদীদের জন্য স্বভাবতই সমস্যার সৃষ্টি করল। আল ফারাবি এই সক্রিয় চেতনাকে একটি আলাদা অধিবিদ্যক সত্তা বলে মনে করতেন যা মানুষের মন এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যবর্তী কোন স্থানে অবস্থান করত। এবং এর মধ্য দিয়ে মানুষের মন এবং কল্পনা স্বর্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত হত। আল ফারাবির যুক্তির প্রতি সমর্থন এবং নবী দ্বারা আনিত বিধানের চেয়ে দর্শনের প্রতি আনুগত্য তাকে গোড়া মুসলিমদের কাছে সন্দেহজনক করে তোলে। আল ফারাবির মতে কেবল যুক্তির পূর্ণতাই মানুষকে প্রকৃত সুখের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যেহেতু কোন স্বর্গীয় আত্মা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই মানুষের জীবন কেবল মাত্র যুক্তি দ্বারাই পরিচালিত হতে পারে। যুক্তির উপরে এমন কোন জ্ঞান নেই যা বোধগম্য হতে পারে। আল কিন্দির কাছে দর্শন ছিল গৌন, এটা তার কাছে ছিল ধর্মতত্ত্বে দাসীস্বরূপ। কিন্তু আল ফারাবীর কাছে দর্শন এমনটা ছিল না, তিনি দর্শনকেই বরং মূখ্য এবং প্রধান বলে মনে করতেন। যেকোন দার্শনিক মতের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে তার সমাধান কোন স্বর্গীয় বিধান বা স্বর্গীয় গ্রন্থ দিতে পারেনা, একে সমাধান করতে পারে কেবলই যুক্তি। যুক্তিই হল চুড়ান্ত সমাধানদাতা। তার মতে, সঠিক সময় আসলে বিশ্বে একটি সার্বজনীন রাষ্ট্র তৈরি হবে, যেখানে সকলে এক নীতি অনুস্মরন করবে। যদি তা না হয়, বিভিন্ন ধর্ম সমান্তরালেই পাশাপাশি টিকে থাকবে। আর যদি এটাও অবাস্তব হয়ে যায় তাহলে ইসলামকে দর্শনের মহান জ্ঞানের আলোকে পরিবর্তিত হতে হবে। দর্শনই মানুষকে সর্বোচ্চ পূর্ণতা দিতে পারে।”

আল ফারাবি স্পষ্টভাবে কিছু লিখে যান নি, কারণ কি প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা সহজে বোঝা গেলে তার জীবন নিয়ে টানাটানি হবে যা ইতিমধ্যেই তার পূর্বের দার্শনিকদের সাথে হয়েছিল। তবুও যেটুকু তার লেখা থেকে বের হয়ে আসে তা থেকে বোঝা যায় তিনি যথেষ্ট হেরেটিক ছিলেন। একটা কথা না বললেই নয়, ইবনে সিনার ইবনে সিনা হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই আল ফারাবির। ইবনে সিনা আর তার দর্শন সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলছি না।

আসলে এরকম হেরেটিক দার্শনিক হিসেবে ইবনে সিনা, আল ফারাবি ছাড়াও আল সারাখসি, আল রাজি, ইবনে রুশদ সহ আরও নাম পাওয়া যাবে। ইসলামিক সিভিলাইজেশনে যে দার্শনিক মহলগুলো গড়ে উঠেছিল তা মূলত গ্রীক দর্শনকে ধরেই, আর তাদের চিন্তাধারাও তাই ইসলামের পরিসীমা পেড়িয়ে গ্রীক দর্শনকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হয়। কিন্তু গাজ্জালির পরে এদের ইসলামিক সিভিলাইজেশনে দর্শনের আলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে শুরু করে। দর্শন প্রতিস্থাপিত হয় অর্থোডক্স ইসলাম দ্বারা। এদিকে তাদের প্রচেষ্টায় এই ইসলামিক সিভিলাইজেশনের আলোর পথিকৃৎদের জ্ঞান পৌঁছে যায় ইউরোপে। যার ফলে তাদের এই জ্ঞানের আলো আরব বিশ্বকে আর আলোকিত করতে না পারলেও ইউরোপকে অন্ধকার যুগ থেকে আলো ঝলমলে রেনেসাঁয় নিয়ে আসতে প্রচণ্ড সাহায্য করে। ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্য খ্রিষ্ট ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হবার পর যে প্লেটো, এরিস্টোটলের দর্শনের আলো খ্রিষ্টীয় ঝড়ের দককা হাওয়ায় নিভে গিয়েছিল, সেই প্লেটো এরিস্টোলের দর্শনের আলোই যেন আবার আরবের ইবনে সিনা, ইবনে রুশদের মত দার্শনিকের হাত ধরে অন্ধকার নিমজ্জিত ইউরোপকে আলোকিত করে দেয়। কিন্তু দুঃখ তারা আলোকিত করতে পারলেন না নিজেদের আবাসভূমি আরববিশ্বকে…

২ thoughts on “আল ফারাবি: ভিন্ন পথে চলা এক আরব দার্শনিক

  1. অজানা কথা জানলাম।
    অজানা কথা জানলাম।

    আমার লেখা পড়ার ও ফেসবুকে আমার “বন্ধু” হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। আগের আইডি ছাগলের পেটে।এটা নতুন লিংক :
    https://web.facebook.com/JahangirHossainDhaka

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *