ক্রাচের কর্ণেল স্মরণে ……

২১ জুলাই ১৯৭৬ সাল। ভোর চারটা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। শ্রাবণের আর্দ্র রাত বিদায় নিচ্ছে। এই দেশ, এই জাতি, এই সময় আর সমাজের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় ঘটনা ঘটে গেল কারাভ্যন্তরে। মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে পা হারানো একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানায়ক কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তমকে তাঁরই মুক্ত করা স্বদেশভূমিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হলো। ক্ষুদিরাম বসু, সূর্যসেনের সঙ্গে, গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে আরেকটি নাম যুক্ত হলো—কর্নেল আবু তাহের।

নিঃশঙ্ক চিত্ত তাদেরই আছে, যাঁরা জীবনের বিনিময়ে নিজের বিশ্বাস সমুন্নত রাখতে পারেন, যাঁরা তাঁদের প্রতিজ্ঞার প্রতি আপস করেন না। নিঃশঙ্ক চিত্তের সেই মিছিলের একজন, আমাদের তাহের।

৮নং ডিগ্রী সেল
ঢাকা সেন্ট্রাল জেল
১৮ই জুলাই ১৯৭৬ সাল।

শ্রদ্ধেয় আব্বা, আম্মা, প্রিয় লুৎফা, ভাইজান ও আমার ভাইবোনেরা।
গতকাল বিকালে ট্রাইব্যুনালের রায় দেয়া হল। আমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। ভাইজান (তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান) ও মেজর জলিলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। আনোয়ার, ইনু, রব ও মেজর জিয়াউদ্দিনের দশ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ও দশ হাজার টাকা জরিমানা (প্রকৃতপক্ষে জিয়ার বারো বৎসরের কারাদণ্ড হয়েছিল)। সালেহা, রবিউলের ৫ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা (সালেহা যশোরের প্রাক্তন জাসদ নেত্রী, রবিউল সালেহার স্বামী, তৎকালীন যশোর জেলার জাসদ নেতা)। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ড. আখলাক, সাংবাদিক মাহমুদ ও মান্নাসহ ১৩ জনকে মুক্তিদান। সর্বশেষে ট্রাইব্যুনাল আমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে বেত্রাহত কুকুরের মত তাড়াহুড়া করে বিচার কক্ষ পরিত্যাগ করলো।

হঠাৎ সাংবাদিক মাহমুদ কান্নায় ভেঙে পড়লো। আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমার কান্না এ জন্য যে একজন বাঙালি কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করতে পারলো!’ বোন সালেহা হঠাৎ টয়লেট রুমে গিয়ে কাঁদতে শুরু করল। সালেহাকে ডেকে এনে যখন বললাম, ‘তোমার কাছ থেকে দুর্বলতা কখনোই আশা করিনি।’ সালেহা বললো, ‘আমি কাঁদি নাই, আমি হাসছি।’ হাসি-কান্নায় এই বোনটি আমার অপূর্ব। জেলখানায় এই বিচার কক্ষে এসে প্রথম তার সঙ্গে আমার দেখা। এই বোনটিকে আমার ভীষণ ভাল লাগে।

সমস্ত সাথীদের শুধু একটাই বক্তব্য, ‘কেন আমাদেরকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো না।’ মেজর জিয়াউদ্দিন বসে আমার উদ্দেশ্যে একটি কবিতা লিখলো। জেলখানার এই ক্ষুদ্র কক্ষে হঠাৎ আওয়াজ উঠল, ‘তাহের ভাই-লাল সালাম।’ সমস্ত জেলখানা প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। জেলখানার উঁচু দেওয়াল এই ধ্বনীকে কি আটকে রাখতে পারবে? এর প্রতিধ্বনি কি পৌঁছাবে না আমার দেশের মানুষের মনের কোঠায়?

রায় শুনে আমাদের আইনজীবীরা হতবাক হয়ে গেলেন। তারা এসে আমাকে জানালেন, যদিও এই ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না তবুও তারা সুপ্রিম কোর্টে রিট করবেন। কারণ বেআইনিভাবে এই আদালত তার কাজ চালিয়েছে ও রায় দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করবেন বলে বললেন। আমি তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলাম, প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করা চলবে না। এই প্রেসিডেন্টকে আমি প্রেসিডেন্টের আসনে বসিয়েছি, এই বিশ্বাসঘাতকদের কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইতে পারি না।
সবাই আমার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শুনতে চাইলো। এর মধ্যে জেল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে সরিয়ে নেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। বললাম, আমি যখন একা থাকি তখন ভয়, লোভ-লালসা আমাকে চারদিক থেকে এসে আক্রমণ করে। আমি যখন আপনাদের মাঝে থাকি তখন সমস্ত ভয়, লোভ-লালসা দূরে চলে যায়। আমি সাহসী হই, বিপ্লবের সাথী রূপে নিজেকে দেখতে পাই। সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করার এক অপরাজেয় শক্তি আমার মধ্যে কাজ করে। তাই আমাদের একাকিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আমরা সবার মাঝে প্রকাশিত হতে চাই। সে জন্যই আমাদের সংগ্রাম।

সবাই একে একে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে। অশ্রুসজল চোখ। বেশ কিছুদিন সবাই একত্রে কাটিয়েছি। আবার কবে দেখা হবে। সালেহা আমার সঙ্গে যাবে। ভাইজান ও আনোয়ারকে চিত্তচাঞ্চল্য স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু তাদেরকে তো আমি জানি। আমাকে সাহস জোগাবার জন্য তাদের অভিনয়। বেলালের চোখ ছলছল করছে। কান্নায় ভেঙে পড়তে চায়। জলিল, রব, জিয়া আমাকে দৃঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো। এই আলিঙ্গন অবিচ্ছেদ্য। এমনিভাবে দৃঢ় আলিঙ্গনে আমরা গোটা জাতির সঙ্গে আবদ্ধ। কেউ তা ভাঙতে পারবে না।

সবাই চলে গেলো। আমি আর সালেহা বের হয়ে এলাম। সালেহা চলে যাচ্ছে সেলের দিকে। বিভিন্ন সেলে আবদ্ধ কয়েদি ও রাজবন্দীরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে বন্ধ সেলের দরজা-জানালা দিয়ে। মতিন সাহেব, টিপু বিশ্বাস ও অন্যান্যরা দেখালো আমাকে বিজয় চিহ্ন। এই বিচার বিপ্লবীদেরকে তাদের অগোচরে ঐক্যবদ্ধ করলো।

ফাঁসির আসামিদের নির্ধারিত জায়গা ৮ নম্বর সেলে আমাকে নিয়ে আসা হলো। পাশের তিনটি সেলে আরো তিনজন ফাঁসির আসামি। ছোট্ট সেলটি ভালোই, বেশ পরিষ্কার। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন জীবনের দিকে তাকাই তাতে লজ্জার তো কিছুই নেই। আমার জীবনের নানা ঘটনা আমাকে আমার জাতির ও জনগণের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এর চাইতে বড় সুখ, বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?

নীতু, যীশু ও মিশুর কথা বার বার মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থ-সম্পদ কিছুই আমি রেখে যাইনি। কিন্তু আমার গোটা জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমরা দেখেছি শত-সহস্র উলঙ্গ মায়া-মমতা-ভালোবাসা-বঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।

বাঙালি জাতির উদ্ভাসিত নতুন সূর্য ওঠার আর কত দেরি! না, আর দেরি নেই, সূর্য উঠল বলে।এ দেশ সৃষ্টির জন্য আমি রক্ত দিয়েছি। আর সেই সূর্যের জন্য আমি প্রাণ দেব, যা আমার জনগণকে আলোকিত করবে, উজ্জীবিত করবে_এর চাইতে বড় পুরষ্কার আমার জন্য আর কি হতে পারে।

আমি মৃত্যুর জন্য ভয় পাইনা। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক চক্রান্তকারীরা আমাকে জনগণের সামনে হেয় করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। আতাউর রহমান খান ও অন্যান্যদেরকে বলবে সত্য প্রকাশ করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
তোমরা আমার শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আদর নিও।

তোমাদের
তাহের

———————————————————————–

“জন্মেছি, সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে;
কাঁপিয়ে দিলাম।
জন্মেছি, তোদের শোষণের হাত দুটো ভাঙ্গবো বলে; ভেঙ্গে দিলাম।
জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করবে বলে; করে গেলাম।
জন্ম আর মৃত্যুর দুটি বিশাল পাথর
রেখে গেলাম।
পাথরের নিচে শোষক আর শাসকের
কবর দিলাম।
পৃথিবী – অবশেষে এবারের মত বিদায়
নিলাম।”
……………তার একটা পা নেই। নকল পা পড়লেন। বিশেষ দিনে এটি পড়েন। আজ বিশেষ দিন। তার মৃত্যুদিন।
এরপর আম খেলেন, ফাঁসির
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মেজর জিয়াউদ্দিনের লেখা উপরের কবিতাটি পড়লেন এবং জল্লাদদের না দিয়ে নিজেই গলায় দড়ি জড়িয়ে বললেন, বিদায়
বাংলাদেশ। বিদায় দেশবাসী…

স্যালুট কর্ণেল তাহের।
আজ ২১ জুলাই।
প্রহসণের বিচারে আপনার মৃত্যুদন্ড এখনো আমাদের অপরাধী করে যায় প্রতিদিন।

———————————————————————
লুৎফার চিঠি (লুৎফা তাহের)

শ্রদ্ধেয় বড় ভাইজান,
আপনাকে যে কী লিখব তার কিছুই ঠিক করতে পারছি না। আমি ভাবতেও পারি না তাহের আর আমার সঙ্গে নেই। আমার জীবনসঙ্গীকে ছাড়া বাঁচার কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না। মনে হচ্ছে বাচ্চারা খুব কষ্ট পাচ্ছে। এত ছোট বাচ্চা, কিছুই বুঝতে পারে না। নিতু বলে ‘বাবা, কেন তুমি মরলে, তুমি আমাদের সাথে থাকলে এখনো বেঁচে থাকতে।’ ওরা বুঝতেও পারে না ওরা কি হারাল। প্রতিদিন ওরা ফুল নিয়ে কবরে যায়। কবরের ওপর ফুল রেখে ওরা প্রার্থনা করে ‘আমি যেন বাবার মতো হতে পারি।’ যিশু বলে ওর বাবা চাঁদের দেশে ঘুমিয়ে আছে।

দুর্ভাগ্যবশত নিতু ওর বাবাকে সেই নভেম্বরে শেষ দেখে। কিশোরগঞ্জে থাকায় পরে দেখতে পায়নি। আমি খুবই ভাগ্যবতী। তাহের আমাকে যে পথ দেখিয়ে গেছে, তা-ই আমার আসল অস্ত্র। বেঁচে থাকতে সে আমাকে বাঙালি নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সম্মান দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে আমি সারা পৃথিবীর শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছি। আমার সব আশাই এত কম সময়ে সে পূর্ণ করে গেল। তাহেরের বন্ধু ও সহকর্মীরা যখন আমাকে সহানুভূতি জানায়, মনে হয় তাহের এখনো এদের মধ্যে বেঁচে রয়েছে, চিরদিন বেঁচে থাকবে। এরা আমার আপনজনের মতো। আমি সত্যি গর্বিত, সে মৃত্যুকে পরাজিত করেছে। মৃত্যু তাঁকে কখনো মলিন করতে পারবে না। এখন যা ঘটেছে তার সবই আমি বর্ণনা করব।

১৭ জুলাই শনিবার ৩টার সময় তাহেরের মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষণা করা হয়। আমাদের পক্ষের ২৫ জন ব্যারিস্টারসহ আমরা সবাই নির্বাক হয়ে গেলাম। সারাদেশের লোক ক্ষেপে গিয়েছিল, তার কারণ সরকার পক্ষ কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। এমনকি সরকারি সাক্ষীরাও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে তাহেরের অবদানের কথা স্বীকার করেন। আতাউর রহমান, জুলমত আলীর মতো বিশিষ্ট ব্যারিস্টার, আলম আর অন্যরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে এই বেআইনি ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে চরম নিন্দা প্রকাশ করেন। তাহের তখন ব্যারিস্টারদের বলল, ‘এই সেই সরকার যাকে আমি ক্ষমতায় বসিয়েছি, এদের কাছে আপনারা কিছুই চাইবেন না।’ মৃত্যুদ-ের রায় শুনে তাহের অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল, অন্য বন্দীরাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তাহের সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ‘জীবন যদি এভাবে বিসর্জন না দেওয়া যায়, সাধারণ মানুষের মুক্তি তাহলে আর কীভাবে আসবে?’ আমরা তাহেরকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টাই করেছিলাম। তাহের অবশ্য আমাকে লিখেছিল, ‘তোমার মাথা নত করো না, আমি মরণকে ভয় পাই না। তুমি যদি গর্ব অনুভব করতে পার, তাতেই যথেষ্ট।’

১৯ তারিখ বিকেলে তাহের আমাদের সবার সঙ্গে দেখা করে। সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। রায় দেওয়ার পর সে যা লিখেছিল আমার তা পড়ে শোনায়। পরে আমাকে বলে, ‘তোমার শোক করা সাজে না, ক্ষুদিরামের পর দক্ষিণ এশিয়ায় আমিই প্রথম ব্যক্তি যে এভাবে মরতে যাচ্ছে।’ আর সবাই আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেছে সেকথা তাহেরকে বললে সে বলল, ‘সে-কি জীবনের মায়া ফিরিয়ে আনার জন্য? আমার জীবনের দাম কি জিয়া অথবা সায়েমের জীবনের চেয়েও কম?’

সে আমাদের এত উদ্দীপনা দিয়েছিল যে আমরা সবাই হাসিমুখে বের হয়ে এসেছিলাম; তখনো কেউ জানতাম না যে এটাই আমাদের শেষ কথা। দেশের সব শিক্ষক, রাজনীতিবিদ এমনকি বিদেশিরা পর্যন্ত সরকারের কাছে অনুরোধ করে তাহেরের মৃত্যুদ- রদ করার জন্য, কিন্তু তাহেরকে বাঁচতে দেওয়ার মতো সাহস কর্তৃপক্ষের ছিল না। এরা তাই তাহেরকে সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের সন্ধান দিয়েছে, তাঁকে অমরত্বের সুধা দিয়েছে। ইউসুফ, বেলাল, মনু-তাহেরের সব ভাইয়েরাই তাঁর সঙ্গে ছিল। ২০ তারিখ সন্ধ্যায় তাহেরকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে পরদিন ভোর ৪টায় তাঁর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে। সে শান্তভাবে এ খবর গ্রহণ করে ও যাদের ওপর এ খবর দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল তাদের ধন্যবাদ জানায়। এরপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় রাতের খাবার খেয়ে নেয়। পরে একজন মৌলবি এসে কৃত অপরাধের জন্য তাহেরকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে অনুরোধ জানান। সে তখন বলে ওঠে, ‘আপনাদের সমাজের কালিমা আমাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। কখনো না। আমি সম্পূর্ণ শুদ্ধ। আপনি এখন যান, আমি এখন ঘুমাব।’ সে এরপর শান্তভাবে ঘুমাতে যায়। রাত ৩টার দিকে তাঁকে ডেকে ওঠানো হয়। কতক্ষণ সময় আছে জানার পর তাহের দাঁত মাজে, সেভ করে ও গোসল করে নেয়। উপস্থিত সবাই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ‘আমার নিষ্পাপ শরীরে তোমাদের স্পর্শ লাগুক আমি তা চাই নাÑএই বলে তাহের তাদের নিবৃত্ত করে।

গোসল করার পর তাহের তাঁর জন্য চা করতে ও আমাদের দিয়ে আসা আম কেটে দিতে বলে। নিজে নিজেই সে নকল পা, জুতো আর প্যান্ট পরে নেয়। হাত ঘড়ি পরে, একটা ভালো শার্ট গায় দিয়ে তাহের তার চুলগুলো ভালোভাবে আঁচড়ে নেয়। এরপর সে আম আর চা খেয়ে নিয়ে সবার সাথে মিলে সিগারেট খেতে থাকে। একজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত লোকের এ রকম সাহস দেখে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তাহের তখন সবাইকে সান্ত¦না জানায়, ‘আপনারা হাসুন, সবাই এত বিষণœ কেন। আমি দুর্দশাগ্রস্তদের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত করতে চেয়েছিলাম। মৃত্যু আমাকে পরাজিত করতে পারে না।’ তাহেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁর কোনো শেষ ইচ্ছা আছে কি না, তাহের জবাব দেয়, ‘আমার মৃত্যুর বিনিময়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের শান্তি।’ এরপর তাহের জানতে চায়, ‘আর কোনো সময় বাকি আছে কি না?’ অল্প সময় বাকি আছে জানার পর তাহের সবার সামনে একটা কবিতা আবৃত্তি করতে চায়। তাহের এরপর তাঁর কর্তব্য ও অনুভূতি নিয়ে স্বরচিত একটা কবিতা আবৃত্তি করে। এরপর তাহের জানায়, ‘আমি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তোমরা এখন তোমাদের কর্তব্য পালন করতে পারো।’ তাহের ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে এগিয়ে যায়। নিজেই ফাঁসির দড়ি তুলে নেয়। গলায় রশি পড়ে নেয়ার পর তাহের বলে ওঠে, ‘বিদায় দেশবাসী। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ তাহের তখন তাদের বোতাম টিপতে বলে। কিন্তু কেউই সামনে এগিয়ে এল না। তাহের তখন এদের বিদ্রুপ করে বলে ওঠে, ‘তোমাদের কি এই সাহসটুকুও নেই?’ তখনই কেউ বোতাম টিপে দেয়, সব শেষ। তাঁর ভাইদের পরে মৃতদেহ দেখানো হয়। সেদিন জেলখানায় সাড়ে সাত হাজার বন্দীর কেউই দুপুরে ভাত খায়নি। আমাদের বেলা আড়াইটার সময় মৃতদেহ দেয়া হয়। কড়া নিরাপত্তার প্রহরার মধ্যে জেলের ভেতরে একটা গাড়ি নিয়ে গিয়ে তাতে মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয়। এরপর হেলিপ্যাড পর্যন্ত পাঁচটা ট্রাক-বাস ভর্তি নিরাপত্তা প্রহরীদের পাহারার মধ্যে মৃতদেহ একটা হেলিকপ্টারে তুলে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় পারিবারিক গোরস্তানে তাহেরকে কবর দেওয়া হয়।

একটা বিশেষ ছাউনি তুলে সামরিক প্রহরীরা ২১ দিন পর্যন্ত তাঁর কবর পাহারা দিয়েছে, এরা এমনকি একজন মৃত লোককেও ভয় পায়। সে আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেও আমাদের জন্য রেখে গেছে এক মূল্যবান উত্তরাধিকার। মানুষের প্রতি তাঁর মহান কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাঁকে শেষে বিষ আর মধুÑএ দুটোর সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল। নিজে বিষ গ্রহণ করে আমাদের জন্য সে রেখে গেছে মধুময় অমৃত। যেদিকে তাকাই চারদিকে শুধু অন্ধকার দেখি। কী করব তার কিছুই বুঝতে পারি না। মনে হয় সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছি। তবুও আমি জানি আমার এই দুর্দশা চিরকাল থাকবে না। এর শেষ আসবেই আসবে। তাহেরের আদর্শ সবার আদর্শে পরিণত হয়েছে, তা দেখতে পেলেই আমি শান্তি পাব। শুধু দুঃখ এই যে সেই সুখের দিনে তাহের সেখানে থাকবে না।

স্নেহের লুৎফা
কিশোরগঞ্জ
১৮ আগস্ট ১৯৭৬
টীকা: লুৎফা তাহের চিঠিটি লিখেছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী বড় ভাই ড. রফি আহমেদকে।

———————————————————————–

২১ জুলাই ১৯৭৬ সাল। ভোর চারটা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। শ্রাবণের আর্দ্র রাত বিদায় নিচ্ছে। এই দেশ, এই জাতি, এই সময় আর সমাজের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় ঘটনা ঘটে গেল কারাভ্যন্তরে। মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে পা হারানো একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানায়ক কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তমকে তাঁরই মুক্ত করা স্বদেশভূমিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হলো। ক্ষুদিরাম বসু, সূর্যসেনের সঙ্গে, গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে আরেকটি নাম যুক্ত হলো—কর্নেল আবু তাহের।

নিঃশঙ্ক চিত্ত তাদেরই আছে, যাঁরা জীবনের বিনিময়ে নিজের বিশ্বাস সমুন্নত রাখতে পারেন, যাঁরা তাঁদের প্রতিজ্ঞার প্রতি আপস করেন না। নিঃশঙ্ক চিত্তের সেই মিছিলের একজন, আমাদের তাহের।

———————————————————————–

পুনশ্চ : ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট উচ্চ আদালত সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরই মাধ্যমে সূচনা হয় কর্নেল তাহের হত্যার বিচার প্রার্থনার সাংবিধানিক অধিকার। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা’র বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামাতের পক্ষ থেকে আপীল করা হলে সুপ্রীম কোর্ট তা খারিজ দেন। ২০১০ সালের ২৩ আগস্ট ড. মো. আনোয়ার হোসেন, লুৎফা তাহের ও ফাতেমা ইউসুফ-এর পক্ষে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক কর্তৃক দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী এবং বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি আদেশে কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসি ও গোপন বিচারের সব নথি হাইকোর্টে তলব করেন। একই সাথে তাহেরের ফাঁসির আদেশকে কেনো অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা তিন সপ্তাহের মধ্যে জানাতে সরকারকে নির্দেশ দেন।

২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ কর্তৃক রিট শুনানি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর সরকারের আবেদনে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। ১০ জানুয়ারি থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ শুনানি হয়। শুনানি চলাকালে হাসানুল হক ইনু, মেজর জিয়াউদ্দিন, মাহামুদুর রহমান মান্না, সার্জেন্ট রফিকুল ইসলাম (বীরপ্রতীক), কর্পোরাল শামসুল হক, এডভোকেট রবিউল আলম, হাবিলদার আব্দুল হাই আদালতে বক্তব্য প্রদান করেন। রিট আবেদনকারী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন সম্পূরক রিট আবেদনের উপর আদালতে বক্তব্য প্রদান করেন।

তাহেরের মৃত্যুদ- কার্যকরকালে উপস্থিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট ফজলুর রহমান আদালতেকে জানান, ফাঁসির পূর্ব মুহূর্তে তাহেরের সর্বশেষ কথা ছিল ‘Long live my Country men’ ঢাকার উপ-কমিশনার মো. মজিবুল হককে আদালতে তলব করা হয়। ‘পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তাদের চাপে জিয়া তাহেরকে সরিয়ে দেন’। ব্যারিস্টার মওদুদের লেখা বইয়ের উদ্ধৃত অংশের ব্যাখ্যা আদালত লেখকের কাছে জানতে চান। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ই-মেইলে পাঠানো বার্তায় জিয়ার ডানহাত হিসেবে পরিচিতি জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু আদালতকে জানান যে, তাহেরের গোপন বিচার পরিকল্পনা করেন তিনজন জিয়া-সায়েম-সাত্তার। বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ আদালতে উপস্থিত হয়ে তাঁর দীর্ঘ জবানবন্দীতে জানান, ‘গোপন আদালতের বিচারে তাহেরের মৃত্যুদণ্ড একটি ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে জড়িত একজনের নাম বলতে বলা হলে, তিনি হলেন জিয়াউর রহমান।’

অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে অভিমত দেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমির-উল ইসলাম, ড. এম জহির, এডভোকেট এম আই ফারুকী, ব্যারিস্টার আখতার ইমাম, এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, এডভোকেট এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিন এবং এডভোকেট জেড আই খান পান্না। ড. শাহদীন মালিক এবং ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ রিট আবেদনকারীদের পক্ষে এবং এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এম কে রহমান ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এবিএম আলতাফ হোসেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন।

২০১১ সালের ২২ মার্চ ইতিহাসের দায়মুক্তির দিন আদালত রায় প্রদান করেন ‘তাহেরের বিচার অবৈধ’ এবং তাকে ‘ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ।তাহেরকে শহীদ এবং মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয় রায়ে। সহ-অভিযুক্তদের সকল সাজা মওকুফ করে তাদের যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বলা হয় রাষ্ট্রকে। জেনারেল জিয়াকে দায়ী করা হয় হত্যাকাণ্ডের জন্য। একমাত্র জীবিত ট্রাইব্যুনাল সদস্য আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয় হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে।

তথ্যসূত্র :

কর্ণেল তাহের আর্কাইভ ( http://www.col-taher.org/ )

“মানুষের সমাজ এবং কর্নেল তাহের” (https://www.istishon.com/?q=node/4469)

“ফাঁসির মঞ্চে কর্নেল তাহের:একটি অজানা কাহিনী-আনোয়ার কবির” (http://www.liberationwarbangladesh.org/2014/09/blog-post_4.html)

‘ক্রাচেরকর্নেল’-শাহাদুজ্জামান ( http://www.liberationwarbangladesh.org/2014/07/blog-post_4.html )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *