পাগলের প্রলাপ-২

প্রায় দু তিন মাস পর পর আমার কাছে সত্য আসে ঘুমের ভেতর। একটা অর্ধচেতন অবস্থার ভেতর একটা আলোড়িত স্বপ্নের মত কিছু চিন্তা বুদ্বুদের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে মস্তিষ্কের জলে। হঠাৎ আলোড়নে সত্য আসে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো ঝিলিক মেরে।

কি সেই স্বপ্ন, বলবো?
ঘুমের ভেতর প্রায়ই দেখতে পাই–ঈশ্বর আছেন! সংশয়-দগ্ধ অবিশ্বাসী মনে এটি প্রবল এক জাগরণ তৈরি করে। এই দেখতে পাওয়াটা কয়েক মিলি সেকেন্ডের অনুভূতি। এই সময়টুকুর ভেতরই আমি অনেক কিছু দেখে ফেলি। বিশাল বড় এক রহস্যের পর্দা মুহূর্তের তরে সরেই আবার বন্ধ হয়ে যায়।

আমি দেখতে পাই ঈশ্বরকে। তিনি খুব নৃশংস শিল্পী। অতিশয় দয়ালু তো দূরে থাক, দয়া মায়ার লেশ মাত্র নেই। স্বপ্নে দেখি ঈশ্বর স্থানময়। আমি ঈশ্বরের দেহের ভেতর অবস্থান করছি। সকলেই ঈশ্বরের শরীরে অবস্থান করে। আলো ও অন্ধকার খেলা করে এই আধারেই। তার ভেতর সকল বস্তুজগৎ–নিহারিকা, নেবুলাপরিবার–ঝাঁকঝাঁক নক্ষত্র জোনাকির মত উড়ে বেড়ায়। শূন্যতা ও সময়ের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, ধ্বংস নেই। সময় ঈশ্বরের আরেক নাম।

ঘুমের ভেতর মনে হয় ঈশ্বর সর্বত্র আছেন। অর্থাৎ সময় ও শূন্যতা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি নিরাকার। সময়ের রূপ নেই, শূন্যতারও তাই। সকল পদার্থই সময় ও শূন্যতায় অবস্থান করে। স্থান ও সময় অখণ্ড। এক ও অদ্বিতীয়। এর কোলেই জন্ম নিয়েছে যাবতীয় সূত্র ও বিধান। ঈশ্বর প্রান্তহীন। এমন এক বৃত্ত যার ব্যাস অসীম। শুরু বা শেষ নেই শুধু মধ্য আছে। এই মধ্যের ভেতরেই বাস করে সূর্য, চন্দ্র, আমি ও অন্য সকল জীব ও জড়। জীবত্ব ও জড়ত্ব একটি ক্ষণস্থায়ী অবস্থা মাত্র। জড় জীব হয়ে যায়, জীব জড় হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটি ঘটে শূন্যতা ও সময়ের (অর্থাৎ ঈশ্বরের) অভ্যন্তরে। নিজের পরবর্তী শরীরকে প্রতিনিয়ত ভক্ষণ করি আমরা। আজ যে পাখির সুস্বাদু মাংস খাচ্ছি, বর্জ্যটুকু বাদ দিলে তাই আমার শরীর হয়ে যায়।

শূন্যতা ও সময়ের কি সচেতন মন আছে? কেন তাকে ঈশ্বর বলবো তবে? তার মন কি নিউরন দ্বারা গঠিত? তার চিন্তন প্রক্রিয়া কি? আমি দেখতে পাই শূন্যতার মন আছে তবে তা নিউরন দ্বারা গঠিত নয়। এই মন কোথাও কেন্দ্রীভূত নয়, যেমন মানুষের মন থাকে মাথায়। ঈশ্বরের মনও তার দেহের মত নিরাকার। তিনি অলৌকিক মনের অধিকারী।

কোনো এক কালে প্রবীর ঘোষের কাছে শুনেছিলাম অলৌকিকতা বলে কিছু নেই। সব কিছুই লৌকিক। এটা জগৎ শুরুর পর থেকে হয়ত সত্য কিন্তু জগতের প্রাথমিক অস্তিত্ব লাভটা পুরোপুরি অলৌকিক। অস্তিত্ব লাভের পর থেকে সে যুক্তি ও বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী চলছে।

কার্যকারণ থিওরির একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সে রূপান্তরের ব্যাখ্যা দিতে পারে, মৌলিক জন্মের ব্যাখ্যা দিতে পারে না।

সব কিছু রূপান্তরিত হচ্ছে বুঝলাম; শক্তি তার চেহারা বদলাচ্ছে বুঝলাম; পরমাণু অবস্থান পরিবর্তন করছে বুঝলাম; কিন্তু তার প্রথম উৎপত্তি কেমন করে হলো? কেমন করে জন্মলাভ করল আদিতম কণাগুলো। এদের ভৌত শরীর সর্বপ্রথম কি করে এলো? এই প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত স্বপ্নেও দেখতে পাই নি।

ঘুমের ভেতর হঠাৎ মনে হয় আমি আবার জড় পদার্থে রূপান্তরিত হয়েছি। ঠিক সেই আগের মত। জন্ম লাভের আগে যেভাবে ছড়ানো ছিটানো ছিলাম। আবার ছড়িয়ে গিয়েছি কণায় কণায়। অণুতে অণুতে। অনন্ত কাল কেটে যাচ্ছে। সূর্য ধ্বংস হয়ে কুণ্ডলীভূত মেঘে পরিণত হয়েছে। আমি সেখানে আছি বাষ্প হয়ে। আছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার ধোঁয়া। আছেন জর্জ বুশ ও সাদ্দাম হোসেনের পরমাণু। আছেন জিয়াউর রহমান ও শেখ মুজিবুর রহমান। আছে অনেক আগে যিশুর উরুতে কামড় দেয়া সেই পিঁপড়েটির দেহবাষ্পও। আমরা সকলে অংশ নিচ্ছি নবতর খেলায়। আবার সৃষ্টি হলো নতুন নক্ষত্র। আবার সৃষ্টি হল নতুন পৃথিবী। আমার শরীরের কিছু অংশ হয়ে গেছে আলোর ফোটন কণা। নতুন পৃথিবীর আকাশে মেঘ জমেছে। মেঘে আশ্রয় নিয়েছে রক্ত থেকে বার হওয়া আমার অতীত প্রস্রাব। আর তা বৃষ্টি মনে করে গ্রামের গৃহবধূ কলসিতে ভরে রাখছে পানের আশায়। ঐ গৃহবধূটি ছিল আমার এককালের ক্রিকেট ব্যাট। ভূমধ্যসাগরের কোনো এক মাছের চোখে এবং ভিন্ন কিছু গ্যালাক্সি থেকেও এসেছে তার দেহের কাঁচামাল–এ রকম দশ কোটি স্থানে সে ছিল বহুকাল লুকিয়ে।

এই সব দুর্দান্ত অনুভূতি ঘুমের ভেতর ঝিলিক দিয়ে ওঠে আমার চেতনায়। হয়ত জ্ঞান নয় এগুলো। কেবলই পাগলের প্রলাপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *