বাংলায় ধর্মান্তরের কারণ: পর্ব – ২

গত পর্বে বাংলার গ্রামীণ বসতির সাথে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামীণ বসতির পার্থক্য নিয়ে আলোচনায় তিনটি ক্রাইটেরিয়ার কথা বলেছিলাম, যেগুলোর বিশেষ প্রকরণের কারণে বাংলার গ্রামসমূহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গ্রামসমুহের তুলনায় বেশি উন্মুক্ত ও কম সুসংবদ্ধ ছিল, যে কারণে এই অঞ্চলের গ্রামগুলোতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ইসলাম সহ অন্যান্য ধর্মমতের ছড়িয়ে পড়া অনেক সহজ হয়। ক্রাইটেরিয়াগুলো আবার বলে নিচ্ছি: বাইরের আক্রমণকারীদের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করা, বন্য প্রাণীকূল থেকে আত্মরক্ষা, ও গণ-পূর্ত ব্যবস্থাপনা যেমন সেচ ব্যবস্থা। গত পর্বে বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামীণ বসতির সাথে বাংলা অঞ্চলের গ্রামীণ বসতির পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে বন্য প্রাণীর থেকে আত্মরক্ষার ব্যাপারে কিছু আলোচনা করা হবে। সেই সাথে এই এলাকার বনাঞ্চল নিয়েও আলোচনা করা হবে। আলোচনার বিষয়বস্তুর নাম শুনে বুঝতেই পারছেন এটা কতটা বোরিং। তাই আগে থেকেই বোরডম এলার্ট!

প্রায়শই অনুমান করা হয় যে মূলত দুটো কারণে বনজঙ্গলের আশেপাশের গ্রাম আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। এক. বন্য প্রাণীরা জানমালের অনেক ক্ষতি করে যাদের তাড়াবার জন্য গ্রামবাসীদের মধ্যে ঐক্যের খুব প্রয়োজন থাকে। আরেকটি হল ঘন জঙ্গলকে মানুষের থাকার উপযোগী করার জন্য সামাজিকভাবে সংঘটিত বিভিন্ন কাজ কর্মের আয়োজন করতে হয়।

এমন নয় যে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বন্য প্রাণী কখনও আক্রমণ করে নি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎস্যে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বন্য প্রাণীর সাময়িক আক্রমণের ব্যাপার ভালভাবেই উঠে এসেছে। কিন্তু তবুও বাংলাদেশ অঞ্চলের বসতিপূর্ণ যে সমস্ত এলাকা আছে সেখানকার বাড়িঘরের যে গড়ন আমরা দেখি তা থেকে সহজেই বোঝা যায়, বন্য প্রাণীকে এই সব এলাকায় প্রধান হুমকি হিসেবে কখনই বিবেচনা করা হয় নি। দক্ষিণ এশিয়ার যে সব জায়গাতেই বন্য প্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা অনেক বেশি সেখানে দেখা যায় বাড়িঘর বানানো হয় খুটির উপর। কিন্তু পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার ঘরবাড়ি সব বানানো হয় মাটির উপর। কাজেই এখান থেকে এটা মনে করাই স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশ অঞ্চলে বন্য প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য কখনই কোন সামাজিক যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন পড়ে নি।

রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন এর নাম হয়তো আমরা অনেকেই জেনে থাকব। আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাস এবং এই উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার নিয়ে লেখার জন্য তিনি পৃথিবী বিখ্যাত। বাংলা অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার নিয়ে তিনি একটি গ্রন্থ লেখেন যার নাম ছিল “দ্য রাইজ অব ইসলাম এবড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টইয়ার, ১২০৪-১৭৬০ ” (বইটি অসাধারণ, আগ্রহীগণ এখানে পড়তে পারেন)। যাই হোক, বইতে ইটন সাহেব বাংলাদেশ অঞ্চলের ঘন জঙ্গলকে ধানী-জমিতে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনশক্তির প্রাচুর্যের গুরুত্বকে গুরুত্বের সাথেই উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু সমস্যা হল, তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বনাঞ্চলের বিভিন্ন পার্থক্যের কথা বিবেচনায় আনেন নি। মোটামুটিভাবে বললে এই অঞ্চলে তিন ধরণের বন ছিল: পাহাড়ী বন, অভ্যন্তরীন বন ও উপকূলীয় বন।

আমাদের দেশে যে আভ্যন্তরীন সমভূমির বন আছে তা হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র বাৎসরিক পাতাঝড়া বন (শীতকালে এখানকার গাছগুলোর পাতা ঝড়ে যায়), দেশে এটি শালবন নামে পরিচিত কারণ এখানকার বেশিরভাগ গাছই শালগাছ। এটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের আভ্যন্তরীন বনাঞ্চলের সাথে এর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। এখানে বেশিরভাগই শাল বা গজার গাছ। ভারি ভারি বা বড় বড় কোন গাছ একাহ্নে নেই। বাংলা অঞ্চলের সব জায়গাতেই একসময় বিশাল বিশাল শালবন ছিল যার অবশেষ এখন আছে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায়। এ ধরণের বন পরিষ্কার করা সহজ, গাছ কেটেও বন পরিষ্কার করা যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে আগুন জ্বালিয়েও গাছের মূল পুড়িয়ে বন পরিষ্কার করা যায়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই বনাঞ্চল পরিষ্কার করা যায়। এধরণের বন পুড়িয়ে যে ছাই তৈরি হয়, তা আশেপাশের জমিকে উর্বর করে। অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলের বনে চিরহরিৎ ( বা চিরসবুজ গাছ যেখানে গাছে সবসময় পাতা থাকে) ও বাৎসরিক পাতাঝরা গাছ সবই থাকে, এর সাথে থাকে বাঁশের ঝাড়। এখানকার বনাঞ্চল পরিষ্কার করার ফলাফল ক্ষতিকর হয়। এধরণের বনাঞ্চল কৃষিকাজের জন্য পরিষ্কার করা হয়।

আভ্যন্তরীন বনাঞ্চল পরিষ্কার করা বাঙ্গালিদের জন্য বড় কোন ব্যাপার নয় সহজেই তা বোঝা যায়, আর এজন্য যে সেরকম কোন সুসংবদ্ধ দলীয় সংগঠন তৈরিরও প্রয়োজন হয় না তাও বোঝা যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এইসব পাহাড়ি বনাঞ্চল পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি করতে বা বসতি তৈরি করতে বাঙ্গালিদের কি সংঘবদ্ধতার প্রয়োজন ছিল? একটা উদাহরণ দেয়া যায় যেখান থেকে এর উত্তরটা পাওয়া যেতে পারে। সঞ্জয় হাজারিকা ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিবাদ ও এর পটভূমি নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, “স্ট্রেঞ্জারস অব দ্য মিস্ট” নামে। সেই সেই বইয়ের সেকশন ওয়ান এর নাম ছিল “দ্য বাংলাদেশ সিনড্রোম” এবং প্রথম অধ্যায়ের নাম ছিল “ফ্রম ঢাকা টু ডেলহি”। অধ্যায়টিতে তিনি বিংশ শতাব্দির বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে রিফিউজির ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে আসার কথা বলেন, আর সেই সাথে পশ্চিম বঙ্গ ও দিল্লীতে এই রিফিউজিদের কারণে তৈরি হওয়া সমস্যা, ক্ষতি ও যারপরনাই করুন অবস্থার ব্যাপারটি তুলে ধরেন। যাই হোক, সেখানে হাজারিকা বাবু ১৯২১ সালের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আসামে বাঙ্গালিদের অভিবাসন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আসেন। ১৯২১ সালে আসামের সেনসাস কমিশনার সি. এস. মুলেন একটি রিপোর্ট পেশ করেছিলেন যেখানে বলা হয়,

“যেখানেই পতিত জমি পাওয়া গেছে সেখানেই ময়মনসিংহবাসীরা ছুটে গেছে। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, যেভাবে তারা খালি জায়গা দখল করেছে তা প্রায় রহস্যময় ঘটনার পর্যায়ে পড়ে। কোন উত্তেজনা, হুড়োহুড়ি ছাড়া, জেলার রাজস্ব বিভাগের কর্মচারিদের জন্য অযথা কোন বিপত্তি না ঘটিয়ে প্রায় পাঁচ লাখের এক বিশাল জনগোষ্ঠী গত পঁচিশ বছরে বাংলা থেকে আসাম উপত্যকায় নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সরকারের একটি বিষ্ময়কর প্রশাসনিক সাফল্য মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটি আদতে তা নয়। এর সাথে শুধু বিপুল সংখ্যক পিঁপড়ার দলবদ্ধ যাত্রার তুলনা করা চলে”। (“সঞ্জয় হাজারিকার “স্ট্রেঞ্জারস অব দ্য মিস্ট” বইটার প্রথম অধ্যায়ের পিডিএফ লিংক এখানে দেয়া হল। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।)

আসামে বাঙ্গালি অভিবাসীদের এই ইতিহাসটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলায় একই ধরণের বনাঞ্চল খুব কম খরচে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পক্ষে আবাদযোগ্য করা সম্ভব ছিল। আর তাই যেভাবে আসাম অঞ্চলে তারা সহজে অভিবাসী হতে পেরেছে সেভাবেই সহজে তারা বাংলার কোন সাংগঠনিক উদ্যোগ ছাড়াই পাহাড়ি বনাঞ্চলকে আবাদযোগ্য জমিতে পরিণত করতে পেরেছে।

এবারে আসছে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় বনের কথা যাকে সুন্দরবন বলা হয়। এধরণের বন পোড়ানো যায় না, আপনাআপনিই এগুলো নতুন করে গজিয়ে যায়। আর এসব জমি শুধু পরিষ্কার করলেই চলে না, লোনা জলের জোয়ার থেকে নতুন উদ্ধারকৃত জমিকে রক্ষা করবার জন্য সেই জমির চারপাশে বাঁধ দেবারও প্রয়োজন পড়ে। এই অঞ্চলে খাবার জলও সহজে পাওয়া যেত না, যে কারণে খাবার জল সরবরাহের জন্য এই অঞ্চলে বেশি করে পুকুর খননের দরকার পড়েছিল। আর তাই উপকূলীয় বনে বসতি স্থাপন ছিল যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল বসতিস্থাপন যদি এত কঠিন হয়েও যায় তাহলেও আবার তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী ও সুসংহত সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। বরিশাল অঞ্চলের ইতিহাস ঘেটে আমরা দেখতে পারি, সেখানকার জমিদারগণ সেই অঞ্চলের বন পরিষ্কার করার জন্য উপ-বন্দোবস্তি পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থ জোগান দিয়েছিল। ফলে গ্রামীণ সমাজে সুসংহত কোন সামাজিক পরিবেশের প্রয়োজনই ছিল না। বরিশাল অঞ্চলের গ্রামীণ বসতির বৈশিষ্ট্যই সেটা পরিষ্কার করে দেয়। সেখানে বাড়ি-ঘর ছিল ছড়ানো ছিটানো, যৌথ সামাজিক জীবন-যাপনের চরিত্র বা লক্ষণ ছিল সেখানে অনেক কম।

তো উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমি এটাই দেখাতে চাচ্ছি, বাংলাদেশ অঞ্চলের বনাঞ্চলের পরিবেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের বনাঞ্চলের পরিবেশ থেকে ভিন্ন ছিল। এখানকার জনগণকে বন্যপ্রাণীর আক্রমণের জন্য খুব একটা ভয় পেতে হয়নি, যা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষকে পেতে হত, আভ্যন্তরীন বনাঞ্চলে বিশাল বিশাল গাছ ছিল না, যেসব গাছ ছিল সহজে পরিষ্কার করা সম্ভব হত এবং এগুলোর ছাইও জমি উর্বর করত, যেমনটা বাংলা ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলে খুব একটা পাওয়া যায় নি। এখানকার পাহাড়ি অঞ্চলে যেসব বনাঞ্চল আছে সেরকমও অন্যান্য অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। আর উপকূলীয় বনাঞ্চল বা সুন্দরবনটা বাংলার একেবারেই নিজস্ব। বাংলাদেশ ও তার আশ-পাশের অঞ্চলে বন-জঙ্গলের অস্তিত্ব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংঘবদ্ধ গ্রামীণ বসতি গড়ে তোলাকে কখনই উৎসাহিত করেনি। এখানে যৌথ সংগঠনের ক্ষেত্রে ব্যয় এর তুলনায় লাভই কম ছিল। আর এটাই ছিল বাংলার গ্রামীণ পরিবেশের সাংগঠিক দুর্বলতার একটি অন্যতম কারণ।

(চলবে)

পূর্বের পর্ব:
বাংলায় ধর্মান্তরের কারণ: পর্ব – ১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *