ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমার প্রেমিকারা


বহুদিন আগে এক এলোমেলো চৈত্রের দুপুরে যখন শহরের সব পিচগলা পথে মহাসমারোহে নিজের উন্মত্ততা জানিয়ে দিচ্ছিল সূর্য, উত্তপ্ত নগরীতে পথিকেরা হারিয়ে ফেলতে চেয়েছিল পথিকেরা, থেমেছিল পাখিদের সব গান, তখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে দিয়ে হেঁটে হেঁটে এসে আমি মিশেছিলাম ইতিহাসের এই স্থিরচিত্রপটে। শাহবাগ থেকে টি এস সি কিংবা ভিসি চত্বর অথবা কলা ভবনের শ্যাওলা পড়া সমস্ত দেয়াল আর দেয়ালজুড়ে মিছিলের সব অমোঘ শব্দমালা সমস্ত জুড়ে যেন বৈশাখের আগমনী বার্তা, যেন বৈশাখ আমাদের বহুকাঙ্ক্ষিত সেই বিপ্লব যার অপেক্ষায় ছিল আমাদের পূর্বপুরুষ, তার পূর্বপুরুষ, তার পূর্বপুরুষ অথবা হয়ত আমরা সবাই। তবু এই সুতীক্ষ্ণ চৈত্রের রোদ আমার এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরিচয় ছিলোনা। মতিঝিলের সেই মিশনারি কলেজ থেকে শহরের পুরোনো বাসের হাতল ধরে ঝুলে ঝুলেই আমার প্রথম প্রেম এই প্রেয়সীর সাথে। কত পুরোনো, তবু কত অমলিন তার নিগুঢ় পদযাত্রা।

আমরা হাঁটলাম একসাথে বহুবছর, বছরের পর বছর, দিনের পরে দিন কিংবা রাতের আড়ালে রাত। আমরা হাঁটলাম একসাথে, পাশাপাশি, হাতে হাতে, ঠোঁটে ঠোঁটে। আমাদের কথা হতো গল্পে, কবিতায়, গানের সুরে, পাতা ঝরার মর্মরে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় আমার প্রেমিকা হয়ে উঠলো, আমার সঙ্গিনী হয়ে উঠলো। তবু একদিন আমি আবিষ্কার করলাম আমি যাকে ভালোবাসি তিনি তো কেবল একজন না, তাই আমিও বহুগামী হয়ে উঠলাম। আমি মাতাল প্রেমিকের মতো টি এস সি’র মোড়ের রাজু ভাস্কর্যকে নিয়ে এলাম নিজের বিছানায়। মাতাল প্রেমিকের প্রথম উষ্ণ আলিঙ্গনে সেদিন মিলন চত্বরের কৃষ্ণচূড়ার সমস্ত শাখা ছেয়ে গেলো রক্তিম ফুলে, রাস্তায় পড়ে থাকলো জীর্ণ পাতারা ব্যর্থ প্রেমিকের মতো। একদিন আমি প্রচণ্ড ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরলাম ভিসি চত্বরের সামনে দুবাহু মেলে থাকা প্রাচীন গাছটিকে যে আমার প্রেমিকা হতে চেয়েছিল। আমাদের ভালোবাসায় সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো পথ হারিয়ে ফিরতে ভুলে গেলো, মল চত্বরের মাঠে জমা হলো কাঁদা আর জল। দলবেঁধে মেয়েরা সেদিন খোলা রিকশায় চুল ভিজিয়ে চলে গেলো আমাদের দেখতে দেখতে। আদিম প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আমরা ভালবাসলাম প্রাচীন উষ্ণতায়। একে একে আমি শয্যায় নিয়ে এলাম মিছিলের সব গান, দেয়াললিখন, টি এস সি’র ভেতরের কোলাহল, চায়ের কাপের তুমুল আড্ডা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত প্যাভমেন্ট, মনুমেন্ট, পায়ের শব্দ, পাঠাগারের পুরোনো বইয়ের গন্ধ, বৃষ্টির কোমল অনুভূতি, রঙিন ফানুশ, এমনকি ক্লান্ত জরা-জীর্ণ পুরোনো সব মোটরকার।

তারপর ধীরে ধীরে আমার প্রেমিকারা চলে গেলো নষ্টদের অধিকারে, তাদের উরুতে গভীর ভাবে মিশে থাকতো দুর্বৃত্তের দাঁতের চিহ্ন। আমার প্রেমিকাদের কপাল থেমে মুছে গেলো রক্তের মতো লাল সিঁদুরের দাগ, আমি কোথাও খুঁজে পেলাম তাদের ছিন্নভিন্ন পোশাক, ব্রা, পেটিকোট এমনকি আমার উপহার দেয়া অন্তর্বাস। আমার প্রেমিকারা বিক্রি হয়ে গেলো। অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী চলে রাক্ষসের বাহুতলে নগ্ন নর্তকী হয়ে। তার শরীর জুড়ে এখন কাঁচা মাংসের থকথকে রঙ, এখন তারা ধর্শণ হয় প্রকাশ্যে, কিংবা গোপনে। এখন আমার প্রেমিকা, আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার একমাত্র শয্যাসঙ্গী কেবলই একটি ইতিহাস। বর্তমান যখন পশুদের হাতে বন্দী তখন আমি কেবলই তার ইতিহাসের কথা বলতে পারি।

১ thought on “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমার প্রেমিকারা

  1. এক সময় স্বপ্ন দেখতাম আমিও
    এক সময় স্বপ্ন দেখতাম আমিও প্রেমিক হবো এই মহারাণীর। কিন্তু অনেক আগেই তা ধ্বসে গেছে, এখন শুধু আপনার মত প্রেমিকের কাছে শুনতে চাই সেই প্রেমিকার কথা, শুনতে ভালো লাগে। যদিও বিষাক্ত নিঃশ্বাস তার বুকের উপর। প্রত্যহ ধর্ষিত হয় হয় তো বা!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *