পাগলের প্রলাপ-১

এই পৃথিবীতে মহৎপ্রাণ বলতে আমি কাউকে চিনি না। আবদুল্লাহ আল তারেক, তসলিমা নাসরিন, মাদার তেরেসা, হাজি মুহাম্মদ মুহসিন, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বোস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিশু, কৃষ্ণ, কিংবা আমার প্রাণপ্রিয় বাবা-মা, এরা কেউই একজন চোরের চেয়ে মহৎ নয়। বাহ্যিকভাবে সামাজিক বিচারে কেউ কেউ নিকৃষ্ট অথবা মহৎ হয়ে ওঠে যা আসলে প্রাণীর অভ্যন্তরীণ নকশার সঙ্গে প্রকৃতির নানা উপাদানের সংস্পর্শ, দ্বন্দ্ব-মিলনের ফলাফল ছাড়া কিছু নয়।

কুকুর কখনো হাম্বা রবে ডাকে না; গরু কখনো ঘেউ ঘেউ করে না। একজন মানুষের পক্ষেও তার জিনগত নকশার বাইরে আচরণ করা অসম্ভব। আমি আমার লিঙ্গ নির্ধারণ করি নি, গায়ের রঙ নির্ধারণ করি নি, উচ্চতা নির্ধারণ করি নি, জন্মসাল নির্ধারণ করি নি, বাবা-মা নির্ধারণ করি নি, রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করি নি, শারীরিক রূপ নির্ধারণ করি নি, রক্তপ্রবাহের গতি, বিভিন্নপ্রকার হরমন নিঃসরণের মাত্রা, মস্তিষ্কে নিউরনের আকার-সংখ্যা-পারস্পারিক সংযোগ কিছুই নির্ধারণ করি নি, তবে কি করে দাবি করি আমি আমার চিন্তাকে স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম? এবং চিন্তার ফলে আমি যে ধরণের কাজে অংশ নিচ্ছি তার দায় সম্পূর্ণ আমার?

শরীরের অভ্যন্তরীণ ফাংশন দ্বারাই বাহিরের আচরণ নির্ধারিত হয়। চিন্তার জন্ম হয় মস্তিষ্কে। আর মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, বিদ্যুৎপ্রবাহ, প্রবণতা কিছুই আমার নির্ধারিত নয়। নির্ধারণ করেছে প্রকৃতি। নিজের জৈববৈশিষ্ট্য যদি প্রকৃতিপ্রদত্ত হয় তবে আমার আচারণ-নির্ধারক কেন প্রকৃতি হবে না? কেন হবে কেবলমাত্র ‘আমি’? ‘আমি’ বস্তুটা আসলে প্রকৃতি ও পরিবেশের দ্বারা সৃষ্ট একটি সজীবপদার্থ মাত্র। ‘আমার’ আচরণও নির্ভুলভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের সূত্রমত কাজ করে। একবিন্দুও বাইরে যেতে পারে না। পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে জৈবপ্রবণতার মিথস্ক্রিয়াই ব্যক্তির চরিত্র গঠন করে। একই মানুষের প্রতিটি কাজ সৎ অথবা অসৎ নয়। আবার মহত্ব বা অন্যায়ের সংজ্ঞা দ্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞান ও অজ্ঞতার সমবায়ে নির্ণিত, নির্ধারিত হয় বলে বহুলাংশে আপেক্ষিক।

মানুষকে জৈবযৌগ হিসেবে দেখি। মেশিনের মত সে জ্বালানি গ্রহণ করে– খেয়ে, বর্জ ত্যাগ করে হেগে, মুতে, ঘেমে। আর কাজটা তার উৎপাদন। কোনো কাজ না করাটাও কাজ। ঘুমানোটাও কাজ। শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো সচল থাকাটাও কাজ। হৃদপিণ্ড চলছে। রক্ত ছুটোছুটি করছে, মস্তিষ্কে খেলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ –কাজ নয় এগুলো? তাই, একটি কুকুর, বিড়াল বা নেকড়েকে যে চোখে দেখি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার চেয়ে আলাদা কিছু ভাবি না। একটি গরু কিংবা মশার চেয়ে নিজেকে সম্মানিত মনে করি না। মানুষ হয়েছি বলে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। তাই, মানুষের কার্যকলাপ করছি বলেও আমার কোনো গৌরব নেই। জটিল সব কার্য ও আচরণের জন্য বিশেষ বাহাবা পাওয়ার যোগ্য নয় মানুষ। যা কিছু সে করে প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দে সে করে।

এই যে আমি কবিতা লিখতে পারি এর জন্য কি কোনো পুরস্কার দাবি করতে পারি? একদমই নয়। আমার পরিবেশ ও জৈব বাস্তবতায় কবিতা লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না বলে লিখি। যা কিছু ঘটে তা অনিবার্য মনে হয়। শত কোটি ভিন্ন সম্ভবনাকে পাশ কাটিয়ে যেটি ঘটে তা-ই সর্বাপেক্ষা সম্ভাব্য ছিল বটে। এখানে কেউ ভাববেন না যে আমি ধর্মকথিত ভাগ্যতত্ত্বের কথা বলছি। কোনো ভাগ্যদেবী, ভাগ্যদেবতা, শবেবরাতের আল্লা, কিংবা জ্যোতিষীদের ভাগ্যরেখায় বিশ্বাস না করেও অনিবার্যতায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠা যায়। যদি একটি ফুটবলকে সুনির্দিষ্টপরিমান বলপ্রয়োগ করে ছোড়া হয়, এবং যদি বাতাসের প্রবাহ, মাধ্যাকর্ষণ, মহাকর্ষণ, পৃথিবীর গতি, এবং আরো অন্য সকল প্রভাবককে আমলে নিয়ে নির্ভুলভাবে হিসেব করা যায় তবে ঠিক কতটুকু সময় পরে ঠিক কোন স্থানে বলটি থামবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলে দেয়া সম্ভব।

আমার কাছে নিয়তিও ঠিক তাই। আগে থেকেই এ জগত ধনাত্মক বল প্রাপ্ত। সেই বলই কোটিকোটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পর ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। অতীত থেকে উঠে এসে বর্তমান কাল সবেগে ভবিষ্যতের দিকে যায়। পূর্ববর্তী ঘটনাস্রোতসমূহ পরবর্তী ঘটনাধারার গতিপথ নির্ধারণ করে। জীব ও জড় সকলেই পরিস্থিতির দাসত্ব করে মাত্র। তাদের কারো কোনো স্বাধীনতা নেই। বাহ্যিকভাবে অনেকেই হয়ত মনে করেন জড়বস্তুর স্বাধীনতা নেই, জীবের আছে। সত্যের মত শোনালেও আসলে এটি মিথ্যা। স্বাধীনতা কারো নেই। অসংখ্য পদর্থের সমন্বয়ে জীবদেহ গঠিত হয়। কারো জীবিত অবস্থা মানে অসংখ্য জড় পদার্থের অংশগ্রহণে একটি কাঠামোবদ্ধ সূত্রাধীন বিশেষ অবস্থা যা প্রতিনিয়ত নতুন পরমাণুর আগমন ও পুরোনো পরমাণুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় বিকাশমান পরিবর্তনশীলতার পথ ধরে।

বহিরাঙ্গের কার্যাবলী অন্তরাঙ্গের ক্রিয়া দ্বারা নির্ধারিত। আর অন্তরাঙ্গের ক্রিয়া প্রকৃতির সূত্রাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

১ thought on “পাগলের প্রলাপ-১

  1. আপনিবোধহয়, হাইজেন বার্গের
    আপনিবোধহয়, হাইজেন বার্গের অনিশ্চয়তার নীতিটি কখনো পড়ার সময় করতে পারেন নি। সংগা দিই: “কোন কণিকার অবস্থান এবং ভরবেগ, একইসাথে নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব না”

    আপনি বস্তু পতনের মত একটি ভৌত বিষয় দিয়ে ”ভাগ্য আগে থেকে নির্ধারণের” যে গল্প বলে দিলেন তা জীবনের সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

    পরমাণুতে ঘূর্ণনরত কোন ইলেক্ট্রনের পারফেক্ট অবস্থান একটি নির্দিষ্ট সময়ে সঠিকভাবে নিরুপণ করা সম্ভব নয়। ফলে, আপনি বড়জোর ইলেক্ট্রনটির সম্ভাব্য প্রাপ্তিস্থানকে দেখাতে পারবেন, কিন্তু ইলেক্ট্রনটিকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে নয়। যেহেতু এখানে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, কাজেই ”সম্ভাবনা” কখনোই ভাগ্য নয়, বরং অনিশ্চয়তা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *