তোমার আমার মিল-অমিল-গড়মিল

মানুষ সামাজিক জীব, অথচ তার আচরন মূলত অসামাজিক- আমার এক বন্ধুর এই বাণী আমাদের আজকের জীবন ব্যবস্থাকে খুব নিখাদভাবে বর্ননা করে। আমরা অন্য সবার সাথে পাশাপাশি বসবাস করি বটে, তবে সে সহাবস্থান আমাদেরকে কাছাকাছি আনতে পারে না তেমন। বড় শহরের পাশের বাড়ি তো দূরের কথা, পাশের ফ্ল্যাটে কে বা কারা থাকে তাই জানা হয়ে ওঠে না আমাদের। এই যান্ত্রিক জীবনে যন্ত্র হয়ে উঠতে পারার স্বান্তনা কিংবা যন্ত্র-মানব না হতে পারার যন্ত্রনা – এ দুয়ের সম্মিলনই শহুরে কেতাদুরস্ত দৈনন্দিন যাপিত জীবনের সংগা।

বহুদিন বিলেতে থাকি, জীবনের প্রায় অর্ধেকটা কাটিয়ে দিলাম বৈচিত্রময় মানুষকে নিয়ে, কিংবা ওই যে নিজের নির্মোকে লুকিয়ে আর সবার সাথে পাশাপাশি ছুটে চলে। এ শহর আমার প্রাণের শহর, এ শহর তৈরি করেছে এই আমাকে একটু একটু করে। ভেঙেছে নিষ্ঠুর হাতে, গড়েছে সযতনে নিজের মত করে- বৈশ্বিক নাগরিকের তকমা গায়ে এঁটে দিয়ে।

আমি সবসময় বলি, আমি কারো মাঝে পার্থক্য খুঁজে পাই না। আমার চোখ সাদা-কালো-বাদামি-হলুদ-জলপাই দেখে না; আমার কান আঞ্চলিক উচ্চরণে সজাগ হয় না। এ আমি যে আমি, সে তো তুমি ও। এ আমি যে সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস আর আচার-রীতি নিয়ে এসেছি, সে রকমই কোন সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস আর আচার-রীতি নিয়ে তোমার এ শহরে আমার গা-ঘেষে তোমার নিত্যদিনের পথচলা।

তুমি যখন তোমার বড় হয়ে ওঠার গল্প বল, সে গল্পে শুভ্র বরফের কথা বল তুমি, ক্রিসমাসের কথা বল তুমি, কনকনে ডিসেম্বরে হট চকলেটের মগে তিনটে মার্সমেলো তোমাকে ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এদিকে আমি আমার দেশের বৃষ্টির গল্প বলি, গরমের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ঝিমধরা দুপুরে ডোবা পুকুরে ডুবিয়ে চোখ লাল করে ফেলার আনন্দের কথা বলি আমি বড় বড় চোখে। তুমি তোমার ভাই বোনেদের সাথে গ্রীষ্মের স্বন্ধ্যায় হাউড এন্ড সীক খেলার কথা বল, আমি সে গল্প শুনে গেয়ে উঠি- কাঁনামাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ!

তুমি এখনও রাইস পুডিং দেখে বলে ওঠো – ইয়াম্মি!আমি শোনাই আমার দেশে মাটির চুলায় দুধের পায়েশে কেমন করে লালচে রং আসে।
মায়ের হাতের বীফ-স্ট্যু খেতে তুমি যখন একছুটে বাড়ি চলে যাও, আমি ছুটির দিনে ঝাল-ঝাল গরুর মাংসের ঘ্রাণ পাই হঠাৎ কাজের মাঝে।

একটু খানি ঝাল খেয়ে নাক-মুখ লাল করে তুমি বল, আই লাআআভ চিলি। আমি তখন তোমাকে বলি, মানুষে-মানুষে কোন ভেদ নেই; পৃথিবীর সব মানুষই আসলে বাঙালি, শুধু পার্থক্য হল কে কতটা ঝাল খেতে পারে!

তোমার-আমার মাঝে যে গরমিল, সেই আমাদের সবচেয়ে বড় মিল। ডাইভারসিটি বা বৈচিত্র আমাদের বিশ্বায়নের মূলমন্ত্র!

১ thought on “তোমার আমার মিল-অমিল-গড়মিল

  1. পড়ে খুব ভাল লাগল। এটা ঠিক যে
    পড়ে খুব ভাল লাগল। এটা ঠিক যে পার্টনারদের মধ্যকার ভিন্নতা ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে (এটা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা আছে, যেমনে এটিএটি) কিন্তু তারপরও এই ভিন্নতার অনেক পজিটিভ এফেক্টও থাকতে পারে, যেমন এদের একজন অধিকতর মোরালি বেটার হলে আরেকজন প্রভাবিত হয়, নতুন প্র্যাক্টিকাল স্কিল শেখা যায়, অনেকে বেশি সামাজিক হয়। যাই হোক, কোন এক জায়গায় শুনেছিলাম, ভালবাসা মানে দুজন একইরকম মগে একই রকম কফি খাওয়া নয়, বরং অন্যের প্রয়োজন বুঝে তার জন্য কফি তৈরি করা। এই ডিফারেন্স আমাদেরকে সেক্রিফাইস, কমপ্রোমাইজ করতেও শেখায়, আর এগুলোও ভালবাসার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *